বাংলাভাষা প্রাণের ভাষা। বাংলা আমার মায়ের ভাষা। বাঙ্গালিরা যেমন আবেগপ্রবণ জাতি আবার অধিকার সচেতনও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তারই প্রমাণ বহন করে। একটি ভাষা একটি জাতীর সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে এটাকে আবার শক্তিশালি হাতিয়ার বলা হয়।মাতৃভাষার প্রচলন ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষা শিক্ষাকে শুধু উৎসাহিত করবে না। তা ভাষাগত ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যের উন্নয়নে অনুধাবনের ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহনশীলতা ও সংলাপের উপর ভিত্তি করে বিশ্ব সংহতি আরো জোরদার করবে। এতে পৃথিবীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলো সমৃদ্বি ও শক্তিশালী হতে উদ্বুদ্ধ করে। পৃথিবীতে ৭০০০ এর অধিক ভাষা রয়েছে কমবেশি সব ভাষাভাষি মানুষ রয়েছে।প্রতিটি আপন ভাষাভাষী মানুষের কাছে মায়ের ভাষা সমান গূরুত্বের দাবিদার। এক্ষেত্রে নিজ ভাষার জন্যে প্রাণ বিলিয়ে দেবার ইতিহাস খুব একটা নজরে পড়ে না। এক্ষেত্রে আমার বাংলাভাষা ব্যতিক্রম, রয়েছে গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস। কৌশলে কোন একটা বিষয় খাপ খাওয়াতে পারেন তবে জোর করে নয়।

পাকিস্তানিরা চেয়েছিল জোর করে ভাষা চাপিয়ে দিতে কিন্তু এটা ছিল তাদের বোকামি। যার ফল হলো বাঙ্গালীরা শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায় করে ছাড়েনি। স্বাধিনতার সুত্রপাতসহ পরবর্তীতে সকল আন্দোলনের দাবি আদায় করে ছাড়লো এই ভাষা আন্দোলন। নিশ্চয় ভাষা শহিদ, সৈনিকরা আমাদের অনুপ্রেরণার। তাদের ত্যাগের নজরানা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্হান ভাগ হলেও বাংলাদেশ-পাকিস্তান ভাগ হয় মূলত জাতিয়তাবাদী চেতনায়। এই চেতনা আজ আধুনিক শিক্ষিত কিছু লোকজনের নিকট হেয় মনে হয় কিনা জানি না। তবে তারা প্রমিত বাংলাভাষায় কথা বলা, আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাকে সেকালে ভাবে। এইভাষায় যতো মনের রস মেশানো যায়, যতো আবেগ উদ্বালিত করা যায়। অন্য ভাষায় জানিনা করা যায় কিনা। আর মিশ্রিত ভাষায় অতো আবেগ আসে না। অথচ এই ভাষার ইতিহাস সারাবিশ্বে আজ নন্দিত। আমরা ভিনদেশি ভাষাকে গ্রহণ করবো প্রয়োজনের স্বার্থে। কিন্তু বাংলাভাষাকে এড়িয়ে নয়। স্টান্ডার্ড হিসাবে ভিনদেশি ভাষা কোমলমতি বাচ্চাদের কাছে উপস্হাপন করা হয়।এমনকি এমন অভিযোগও আসে বাংলা পাঠ সাথে শিক্ষা দেয়া হয় না। ঐ বাচ্চাটা কিন্তু ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে একদিন রচনা পড়ে। গ্রামের ছেলেমেয়ে ভাষা সম্পর্কে যতটা ওয়াকিবহাল ঐ বাচ্চাটা নয়। তার কিছুটা ভিনদেশিদের মত অনুভূত হয়।

বাংলা আজ ত্রিশ কোটি মানুষের ভাষা, বিশ্বে প্রথম সারির দিকে অবস্হান।আফ্রিকান দেশ সিয়েরা লিওন বাংলাকে ২য় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মর্যাদা দিয়েছে।অনেক বিদেশীকে বাংলাভাষা চর্চা করতে দেখা যায়। কোন বাঙালী যখন বাংলাভাষায় বিদেশে কোন কিছু উপস্হাপন করে নিজেকে গৌরাবান্বিত মনে হয়। আজকাল ভাষার স্বকিয়তা অনেকাংশে মনে হয় হারিয়ে যেতে বসেছে। ভিনদেশি শব্দের মিশ্রণে কিংবা দাপটে বাংলাভাষার অস্তিত্বের হুমকির মুখে।গ্লোবালাইজেশন অনেকটা দায়ি বলা যায়। নিরেট গ্রাম বাংলায় ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যদিওবা অঞ্চলভেদে ভাষার ব্যবহার ভিন্ন রকম।মনে হচ্ছে কালান্তরে আধুনিকতার প্রভাবে যদি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান কিংবা পান্ডুলিপি আকারে ভাষার মগজ মননকে সংরক্ষণ করা না হয় হারিয়ে যাওয়াটা অনস্বীকার্য নয়।আসলে ভাষা হলো গতিশীল সময়ের তালে তালে ভাষার বানান রীতিও পরিবর্তন হচ্ছে।

২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৩ টি দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়ে আসছে। এটার মাধ্যমে হলেও এতগুলো দেশের কাছে আমাদের কমবেশি পরিচিতি লাভ করেছে। এটা কিন্তু ছোট বিষয় নয়। সেভাবে মূল্যায়নের বিষয়টা আপেক্ষিক থেকে যায়। বাংলাভাষার সাহিত্যের জগত অনেক বিস্তৃতি লাভ করেছে প্রতিবছর ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নতুন পুরাতন লেখকদের সাহিত্যের মিলনমেলা তার বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে।পাঠকদের ভাষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্বি পাচ্ছে। এবং ভাষার জট খুলে নতুন রহস্য উন্মেচিত হচ্ছে। ভাষার ভিত রচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক, জাতীয় পুরস্কারও কম ঝুড়িতে তুলা হয়নি।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্হাগুলোতে বাংলার ব্যবহার দাবিদার হয়ে আসছে। সবমিলিয়ে আমাদের সমৃদ্ধির পথও কম নয়। এটা হয়তো সময়ের কাটায় আরো ছড়িয়ে পড়বে। প্রমিত বাংলাভাষা চর্চার প্রতি গূরুত্ব দেয়া হোক। অনেকসময় অশুদ্ধ উচ্চারণে অর্থ পাল্টিয়ে যায়,বানানে ভুল দেখায়। শুদ্ধ উচ্চারণে ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।প্রমিত বাংলাভাষার উচ্চারণ মৌখিকতার উপর গূরুত্ব দিয়ে পাঠ্যপুস্তুকে অন্তর্ভূক্তি প্রয়োজন। বাচ্চাদের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুদ্ধটা শেখানো প্রয়োজন। ভাষার ব্যবহার ভাষাকে শক্তিশালী করে।এক্ষেত্রে সংবাদপত্র, মিডিয়াগুলো গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ভাষাকে প্রাণবন্ত ও সমৃদ্বি করে। প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাংলাভাষা চর্চাকে সহজ করা যায়। সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাভাষার ব্যবহার আরো সুসংহত হওয়া চাই।