গতিময়তাই জীবনের ধর্ম। প্রগতির অপরিহার্য দাবির ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সাহিত্য-শিল্প জীবনের দর্পণ। তাই, এ পরিবর্তন সার্থকভাবে প্রতিবিম্বিত হয় সাহিত্যে, শিল্পে। সাহিত্যের সবচে জটিল ও আকর্ষণীয় শাখা হচ্ছে কবিতা। কবিরা সত্য, সুন্দর ও নবীনের উদ্বোধকই শুধু নয়, কবিরা ভবিষ্যতের বার্তাবাহকও। দৃষ্টি তাদের সর্বদা সম্মুখে প্রসারিত। স্থান, কাল, সময়ের গন্ডি অতিক্রম করে কবিরা অবলোকন করেন অনাগত ভবিষ্যতের সূর্যালোক। সাধারণ মানুষ যা দেখতে পায় না কবিরা তাও দেখতে পান এবং সেই কথা কাব্যের যাদুকরী ভাষায় তুলে ধরেন মানুষের সামনে। এভাবেই কবিরা মানুষকে নিয়ে যান অপার্থিব স্বপ্নালোকে। আর এভাবে মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারেন বলেই তারা কবি।
বলা হয়ে থাকে, কবিরা সমাজের সবচে সংবেদনশীল ও সচেতন জনগোষ্ঠী। সত্য ও বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে কবিরা যে দিকনির্দেশনা দেন, সমাজ তারই অনুগামী হয়। এ সত্য ইতিহাস স্বীকৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আধুনিকতার সূত্রপাত হলেও যুদ্ধের বহু পূর্বেই ইয়েটস, ইলিয়ট, এজরা পাউন্ডের মতো কবিকে আধুনিক মনন ও অনুভূতির ভিত্তি স্থাপন করতে দেখা যায়। তেমনিভাবে কবি ইকবাল একদিন মুসলমানদের স্বাধীন আবাসভূমির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন পরবর্তীতে তা বাস্তব রূপ নেয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বেও বাংলাদেশের কবিরা তাদের কবিতায় বুলেট, বেয়নেট, যুদ্ধ ও নতুন পতাকার ছবি এঁকে মুক্তির সোনালি সোপানের চিত্র তুলে ধরেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সামনে। এর কারণ, সামাজিক পরিবর্তনের বহুপূর্বেই কবিরা সেই পরিবর্তিত সমাজের ছবি দেখতে পান এবং নিজের অজান্তেই সেই অনাগত ও পরিবর্তিত সমাজের বাসিন্দা হয়ে যান।
কবিরা যেহেতু সমাজের সবচে সংবেদনশীল ও সচেতন জনগোষ্ঠী, অনাগত সূর্যালোকের বাসিন্দা, তাই আগামী দিনের পৃথিবীটা কেমন হবে, দুনিয়ার মানুষকে সে কথা জানানোর পবিত্র দায়িত্ব কবিদেরই পালন করতে হয়। কবিরা নিজের মধ্যে ধারণ করেন অতীতের হীরন্ময় ঘটনাপ্রবাহ, সমসাময়িক সময়কে অবলোকন করেন গভীর অভিনিবেশ ও আন্তরিকতা সহকারে, আর এ দু’য়ের সম্মিলনে গড়ে তোলেন অনাগত এক সমাজ ও সভ্যতা। তাঁরা যতো নিখুঁতভাবে এ চিত্র আঁকতে পারবেন, সমাজ ততোই সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারবে অনাগত ভবিষ্যতের সে স্বপ্নের মঞ্জিলে।
বর্তমান বিশ্বে যে আদর্শিক সংঘাত চলছে, এ সংঘাত পৃথিবীকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, কেমন হবে আগামী দিনের পৃথিবীর রঙ, কবিরা কল্পনায় তার চিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। আধুনিক বাংলা কাব্যেও এ প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঘুনেধরা এ সমাজের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। অসুস্থ ও যন্ত্রণাময় এ বিশ্ব থেকে মুক্তি চাচ্ছে আজকের সমাজ। কবিরা সবসময় মুক্তিকামী জনতার স্বপক্ষে। কবিরা তাই প্রগতির পথপ্রদর্শক। ফলে, আধুনিক বাংলা কবিতায়ও একটা পরিবর্তন আনার সচেতন কর্মপ্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পরিবর্তন যতো না আঙ্গিক ও রচনাশৈলীর, তার চাইতে অধিক বিষয়বস্তু ও স্বপ্নকল্পনার।
আধুনিক বাংলা কবিতায় ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি বিষয়বস্তুর ব্যাপক চর্চা হয়েছে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় রাবিন্দ্রীক প্রেমজ বলয় ও ভোগবাদী আয়েশী আবহের কথা। এ বলয়ের সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে উঠে নতুন কোনো জগত সৃজন করা সম্ভব হয়নি বলে রবীন্দ্র যুগের অন্য কোনো কবি কাব্যামোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণে তেমন সফল হয়নি। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা কবিতায় যিনি ঝড় তুললেন তিনি হলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ভোগবাদের আয়েশী প্রেমজ আবহে আত্মাহুতি না দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও অসত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। জীবনান্দ দাশ একে নিয়ে গেলেন প্রকৃতির বিস্তীর্ণ ভুবনে। খুব শক্তিমান কবি না হয়েও জসীম উদ্দীন বেঁচে রইলেন পল্লীবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার মাঝে। ফররুখ আহমদ অমর হয়ে রইলেন স্বতন্ত্র ভাষারীতি এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিজয়গাঁথা অবলম্বনে কাব্যের এক নতুন ভুবন সৃজনের মাধ্যমে। এভাবে কবিতা ক্রমে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ধাবিত হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যিনি নতুন বিষয়কে কাব্যের মাধ্যমে জনগণের কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলতে পেরেছেন, তিনি সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের পেছনে ফেলে চিরায়ত সাহিত্যে নিজের আসন করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কেউ স্বীকার করুন আর নাই করুন, বাস্তবতা হচ্ছে, পরীক্ষিত ও চর্চিত বিষয়ে কাব্যচর্চা করে কোনো কবিই সফলতার সোনালি দিগন্ত স্পর্শ করতে পারেননি বরং একজন কবি তখনই আলোচিত বা সমালোচিত হয়েছেন, যখন তিনি কোনো নতুন বক্তব্য উপস্থাপিত করতে পেরেছেন বা নিদেনপক্ষে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বর্তমান সময়ে বাংলাকাব্যে সবচে আলোচিত ও সমালোচিত কবি হচ্ছেন কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদ। এর কারণও তাদের বিষয় নির্বাচন। শামসুর রাহমান দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত প্রবলভাবে বাংলাকাব্যে পদচারণা করছেন নগরজীবন ও নগর সভ্যতার বিচিত্র অলিগলি দিয়ে। ফলে, নাগরিক যন্ত্রণা ও নগরের মেকি জৌলুস স্থিতি লাভ করেছে তাঁর কাব্যে। নাগরিক কবি বলতে তাই শামসুর রাহমানকেই বুঝে। এই যে অবারিত গ্রামবাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ এখনো উতলা করে এ দেশের মানুষকে, তাকে ছাপিয়ে বিশেষ করে নগর জীবনকে কেন্দ্র করে সাহিত্য সৃষ্টি করতে পেরেছেন বলেই বাংলা সাহিত্যে ‘নাগরিক কবি’ বা ‘নগর জীবনের কবি’ হিসাবেই তিনি খ্যাতিমান হয়ে থাকবেন।
একই সময়ে কাব্যচর্চা করেও আল মাহমুদ সেই ‘নগরকে’ তাঁর কবিতার উপজীব্য করলেন না। তিনি বাংলা কাব্যে নিজের আসন নির্দিষ্ট করার জন্য বেছে নিলেন ভিন্ন ভুবন। বাংলার ভেজা মাটির সন্তান আল মাহমুদ লক্ষ্য করলেন, নগর সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে বাংলার চিরন্তন গ্রামীণ সমাজে এসেছে ভাঙন। যন্ত্রদানবের যতো প্রসার ঘটছে, প্রযুক্তির যতো উৎকর্ষতা বাড়ছে, ততোই বিলুপ্তি ঘটছে আবহমান বাংলার চিরন্তন মূল্যবোধ। যান্ত্রিকতা এসে নিঃশেষ করে দিচ্ছে মানুষের মন থেকে মানবিকতা। চিমনীর ধোঁয়া যতো বাড়ছে ততোই বিষাক্ত হচ্ছে নির্মল বাতাস। নির্মল বাতাসের অভাবে অসুস্থতা গ্রাস করছে সহজ সরল বাংলার মানুষগুলোকে। কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও সেই অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজদেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বাড়ছে স্বার্থপরতা, বাড়ছে অসহিষ্ণুতা, বাড়ছে ঘৃণার বারুদ। সবুজ শ্যামল বাংলা ক্রমেই বিবর্ণতায়, রুক্ষতায়, দীনতায়, হীনতায় পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি তাঁর কাব্যে তুলে ধরলেন গ্রাম বাংলার এ করুণ পরিণতির চিত্র। ফলে তিনি গ্রামবাংলার দুঃখী মানুষের সুখ-দুঃখের ভাগীদারই হয়ে উঠলেন না, হয়ে উঠলেন তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণার অনন্য রূপকারও। আর এভাবেই আধুনিক বাংলা কাব্যে তিনি তাঁর জন্য একটি আসন সুনির্দিষ্ট করে নিলেন।
ভোগবাদ তথা পুঁজিবাদের সন্তান হয়ে পুঁজিবাদের প্রতিভূ হিসাবে পুঁজিপ্রেমিকদের কাছে প্রিয়জন হয়ে গেলেন শামসুর রাহমান। পুঁজির বিকাশে মানুষের মনে জন্ম নেয়া ঘৃণা, ক্ষোভ, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা স্ফূর্তি লাভ করলো তাঁর কাব্যে। আর সেই পুঁজিবাদের বিরোধিতা করে পুঁজির যাতনায় মানুষের জীবনে নেমে আসা ক্লিষ্টতা, মানবিকতার বিনাশ, অসহায়ের কান্না, সবুজ ফসলের ক্ষেতে প্রাণহীন অট্টালিকার বিস্তার, গ্রাম বাংলার অশিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের বেদনার প্রতিরূপ কাব্যে এঁকে জীবনমুখী ও সারল্যপ্রিয় মানুষের প্রিয়ভাজন হয়ে গেলেন আল মাহমুদ। এভাবেই কবিতা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাত্রা করে কাব্যের সমৃদ্ধি আনে আর কবিকে বাঁচিয়ে রাখে তাঁর সৃষ্টির অনন্যতার জন্য। গড্ডালিকা প্রবাহে কাব্যচর্চা করে সমসাময়িক কালে কবি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া গেলেও ভাবী কালে তাদের বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন থাকে না। কবি হিসাবে টিকে থাকতে হলে এভাবেই একজন কবিকে তার নিজস্ব ও দৃষ্টিগ্রাহ্য ভুবন সৃষ্টি করতে হয়। নতুন বক্তব্য বা নতুনভাবে উপস্থাপিত বক্তব্য দিয়ে তিনি মহাকালের যাত্রাপথে যে মাইলফলকটি গেঁথে দিয়ে যান, চলতি পথে তার দিকে তাকিয়ে মানুষ স্মরণ করে সেই কবিকে। যারা এটা পারেন না, প্রচুর লিখেও তারা হারিয়ে যান সময়ের স্রোতে, আর যারা পারেন, শেষ পর্যন্ত কবি হিসাবে তারাই টিকে যান।
একজন কবির টিকে যাওয়া বা টিকে থাকা কখনো তার সৃষ্টির বিশালতার ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে সেই নতুনত্ব সৃজনের ওপর। আধনিক বাংলা সাহিত্যে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সৃজন সম্ভার খুব বেশি নয়, তারপরও বাংলাকাব্যে তিনি টিকে আছেন এবং টিকে থাকবেন তাঁর স্বাতন্ত্র্যের কারণে। যে পূর্ণিমা চাঁদকে সবাই দেখেছে প্রেমের আকর, সেই চাঁদকেই তিনি দেখেছেন সর্বহারা ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে, বলেছেন: ‘পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। একজন কবি প্রকৃত কবি হয়ে ওঠেন এই স্বাতন্ত্র ও নিজস্বতা গুণে।
কবিদের পর্যবেক্ষণ হতে হয় গভীর, দৃষ্টিকে করতে হয় সুদূরপ্রসারী। কবিকে আঁকতে হয় ভবিষ্যতের ছবি, ধরতে হয় সম্ভাবনার দিগন্ত। কবিরা স্বপ্ন দেখেন এবং জাতিকে স্বপ্ন দেখান। তাই কবিকে দেখতে হয় অনাগত পৃথিবীর স্বরূপ। দেখার ক্ষেত্রে যিনি যতোদূর দৃষ্টিকে নিয়ে যেতে পারেন তিনি ততো অধিক সময় বেঁচে থাকেন মানুষের চেতনায়, মানুষের আবেগ ও মননে। কবিরা যে স্বপ্ন জাতিকে দেখান, জাতি সে স্বপ্নের পথেই এগিয়ে যায়। তাই বলা যায়, বর্তমান কবিরা যে স্বপ্ন-কল্পনা ও দর্শন তুলে ধরছেন জাতির সামনে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সে স্বপ্ন ও দর্শনের বাস্তবতায় সমৃদ্ধ। এ কথাটিকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, অনাগত বাংলাদেশের চিত্র যিনি সফলভাবে আঁকতে পারবেন তাঁর কাব্যে ও সাহিত্যে, তিনিই অনাগতকাল ধরে বেঁচে থাকবেন এ জাতির চেতনায়, আর তিনিই হবেন কবি হিসাবে সার্থক ও সফল।
লক্ষ্যণীয়, বাংলাদেশের নবীন ও প্রবীণ কবিদের চিন্তা-চেতনা ক্রমেই একীভুত হচ্ছে একটা বিশেষ বিন্দুতে। কিছু চিরন্তন ও শাশ্বত প্রশ্ন নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে কবিদের লেখায়। আধুনিক বাংলাকাব্য যে গণবিচ্ছিন্নতা, আড়ষ্টতা ও নির্জীবতার শিকার হয়েছিল তা ক্রমে অপসারিত হচ্ছে। কবিতা আবার গণমানুষের চিন্তা-চেতনার সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। নতুন কোনো চিন্তা বা দর্শনের অভাবে জনগণ থেকে কবিতা যেভাবে দূরে সরে যাচ্ছিল, হয়তো এ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই কবিতা আবার জনগ্রাহ্যতা ফিরে পাবে। বিশেষ করে চলমান বিশ্বের ঘটনাবলী যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে কবিদেরকে তা প্রচ-ভাবে আলোড়িত করছে।
পূর্বেই বলেছি, কবিরা মুক্তিকামী জনতার স্বপক্ষে। আধুনিক বিশ্বে যেসব মুক্তি আন্দোলন চলছে তার প্রায় সবকটিই আদর্শিক চেতনাসমৃদ্ধ। ফিলিপাইনের শিরায় শিরায় এখন গর্জে উঠছে মুসলিম মুজাহিদদের প্রদীপ্ত ঈমান। কাঁধে স্টেনগান নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফিলিস্তিনের কিশোর যুবক। জেরুজালেমের পবিত্র মাটিকে অভিশপ্ত ইহুদীদের কবলমুক্ত করে মসজিদুল আকসায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করার স্বপ্নে তারা বিভোর। জামালুদ্দিন আফগানীর দেশ আফগানিস্তানের বীর জনতা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী শ্বেতভল্লুককে তাড়িয়ে ফিরছে। পুঁজিবাদী ও সমাজবাদীদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লব আলোকবর্তিকা হিসাবে আবির্ভুত হয়েছে মুক্তিকামী বিশ্বের সামনে।
অপরদিকে ব্যর্থ পুঁজিবাদের পচা লাশের গন্ধে অস্থির হয়ে উঠেছে লেবাননের বনি আদম। প্রগতির নামাবলি গায়ে মেহনতি মানুষের মুক্তির শ্লোগান দিয়েছিল যে সমাজতন্ত্র সে এখন প্রগতি সংহারকের ভূমিকায়। পোল্যান্ডের শ্রমিকরা তাই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এভাবে বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আগামী দিনের বিশ্ব হচ্ছে ইসলামি আদর্শের। কবিরা এ বিষয়টি গভীরভাবে নিরীক্ষণ করছেন। ফলে, ব্যাপকভাবে বিশ্লেষিত হয়ে কবিদের জীবনবোধ ও জীবনদর্শন একটা এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু নবীন নয়, প্রবীণ কবিরাও বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। জীবনের গভীর অনে¦ষায় তাই আজ তারাও ব্যাকুল। এ জন্যই কবি শামসুর রাহমানের কণ্ঠে শুনতে পাই ব্যগ্রব্যাকুল ধ্বনি:
‘……. কে আমি? কীইবা আমি? সেই
চিরন্তর প্রশ্ন করি নিরন্তর নিজেকে। এখানে
কেন এসেছি? কী কর্তব্য আমার?
আখেরে কোথায় যাবো? …….’
(শামসুর রাহমান, সন্ধানী, ৬ মে ১৯৭৯)।
কবি শামসুর রাহমানের মতো একই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলা সাহিত্যের আরেক কালজয়ী কবি আল মাহমুদ। তিনিও জানতে চান:
‘আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে-
সজনে গাছে একটি পাখি।
আমার সমস্ত সচেতন কালের মধ্যে এর
পালক খোঁচানো
আমি অবলোকন করি।
এ পাখিটি কার?’
(আল মাহমুদ, উপকণ্ঠ, ডিসিম্বর ১৯৭৮)।
তরুণ কবি হারুণ রশীদ। তার কণ্ঠেও একই প্রশ্ন:
‘মনে পড়ে একদিন নদীকে সুধিয়েছিলাম, নদী তুমি কার?
জল তুমি কার?”
(হারুণ রশীদ, উপকণ্ঠ, ডিসিম্বর ১৯৭৮)।
মোট কথা, এ পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা কে? আমি কে? আমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? শেষ পর্যন্ত আমার কি হবে? এসব প্রশ্ন এখন তাড়িয়ে ফিরছে কবিদের মন। আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই কবিদের সামনে ভেসে ওঠে রহস্যময় এক জগত। সীমা থেকে অসীমে ছুটে যায় তাঁর মন। কবি আল মাহমুদের মতো কবি প্রত্যক্ষ করেন তাঁর চোখের সামনে দুলে ওঠা মায়াবী পর্দা। প্রত্যক্ষ করেন পৃথিবীর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল কোরআন। সেই কোরআনের পাতায় পাতায় যতই তিনি সাঁতার কাটেন ততোই তাঁর সামনে থেকে সরে যায় মায়াবী পর্দা। যেনো তার সব প্রশ্নের জবাব নিয়ে বসে আছে সেই কোরআন। সেই কোরআন পাঠ করার পর প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নতুন করে ভাষা পায় কবির ঠোঁটে। এ কোরআন পাঠ করেই কবি আল মাহমুদ বলিষ্ঠ ভাষায় এবং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন:
‘মানবিক নির্মাণের প্রতি আমি আস্থা হারিয়েছি।’ (আল মাহমুদ, দৈনিক সংগ্রাম, ১৯৮০)।
এই মানবিক নির্মাণ মানে, মানুষের অপর্যাপ্ত জ্ঞান দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন মতবাদ। তা সমাজতন্ত্রই হোক, বা সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদই হোক। এসব মতবাদ যে মানবতার প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি এবং কখনো পারবে না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই একদা বামপন্থী কবি বলে পরিচিত আল মাহমুদ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘মানবিক নির্মাণের প্রতি আমি আস্থা হারিয়েছি।’
শুধু আল মাহমুদ নন, মানবরচিত দর্শন, চিন্তা-চেতনা, জ্ঞানবুদ্ধি যে সভ্যতার জন্য অভিশাপ ডেকে আনবে এটা এখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট। তাই, আধুনিক কবিদের অনেকেই আজ তীব্রভাবে অনুভব করছেন, প্রচলিত সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। আর এ পরিবর্তন কোন মানুষ নয়, বরং সকল মানুষের যিনি স্রষ্টা সেই মহামহিম আল্লাহর ঘোষিত পথে হলেই সমাজ ও সভ্যতা হবে শান্তিপূর্ণ, কল্যাণকর ও নান্দনিক। অর্থাৎ, ইসলামি জীবনাদর্শ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা পেতে পারি মানুষের চিরন্তন আকা´খা একটি সুন্দর পৃথিবী।
শক্তিমান কবি আফজাল চৌধুরী এ বক্তব্যই তুলে ধরেছেন তাঁর কাব্যনাটক ‘হে পৃথিবী নিরাময় হও’ গ্রন্থে। কবি অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে অন্যান্য মতাদর্শের অসারতা প্রমাণ করে এ অসুস্থ পৃথিবীর নিরাময়ের জন্য হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আদর্শের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন।
এ অপরিহার্যতা মেনে নিয়েছেন তরুণ কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। আর তাই তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোষণা করেন:
‘জাহান্নাম থেকে জান্নাতের যাযাবর আমি।’
(সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, দৈনিক বাংলা ১৯৭৯)।
কবিদের চেতনা এতোটুকুতেই থেমে থাকেনি। নিজের মুক্তির জন্য কেবল নয়, মুসলমানদের সৃষ্টিই করা হয়েছে মানবতার সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য ইসলামি বিপ্লবের কোনো বিকল্প নেই। কবি আফজাল চৌধুরীর ‘পৃথিবীকে’ নিরাময় করতে হলে প্রয়োজন কঠিন সংগ্রামের। সেই সংগ্রামের জন্য জনগণকে উদাত্ত আহবান জানাতেও কার্পণ্য করছে না কবিরা। তরুণরা কেনো সেই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না সেই আক্ষেপও ঝরে পড়ছে তাদের লেখায়। তারই প্রমাণ পাই আমরা কবি আবু বকর সিদ্দিকীর কবিতা থেকে। তিনি লেখেন:
‘পাখিরা কেন বল্লম তুলে নেয় না হাতে
এইটেই আমার দুঃখ।’
(আবু বকর সিদ্দিক, ঈদসংখ্যা সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ১৯৭৮)।
কিন্তু শুধু দুঃখ করলেই সমাজ বদল হয় না। সমাজ বদলের, মানবতার মুক্তির জন্য বল্লম হাতে নেয়ার প্রেরণা ও শিক্ষা কবিদেরকেই দিতে হবে। সংগ্রামের চারণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডাকতে হবে নতুন সাথীদের। কেবল তখনই নির্যাতীত জনগণ সাড়া দেবে সেই ডাকে, এরকম অনুভূতিও কবিরা লালন করছেন আপন বুকে। নিজের বিশ্বাস, ধর্মীয় পরিভাষায় যাকে আমরা বলি ঈমান, সেই ঈমানের দাবি কেবলমাত্র এই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েই পূরণ করা সম্ভব, এমন চেতনায়ও আজ সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা সাহিত্য। তরুণ কবি নিজামউদ্দিন সালেহ এই বিশ্বাসের শাণিত অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছুটে এসেছেন লড়াইয়ের ময়দানে। আমরা শুনতে পাচ্ছি তাঁর ডাক:
‘মাত্র বিঘত মাটির নিচে লুক্কায়িত
এক তাজা মাইন
আমার ঈমান।’
(নিজামউদ্দিন সালেহ, সবুজের আগ্নেয়প্রপাত)।
যে সাহিত্যে একজন কবি নিজের ঈমানকে তাজা মাইনের সাথে তুলনা করতে পারেন সে সাহিত্য জনগণ থেকে বেশিক্ষণ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। এ দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের জীবনের চাইতেও তাঁর ঈমানকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পার করে ঈমানের সম্বল বুকে নিয়ে। সাহিত্য যখন সেই ঈমানের সাথে একাকার হয়ে যায় তখন সেই সাহিত্যও হয়ে যায় ঈমানের মত মূল্যবান। মানুষ তখন কবিতাকে ঠাঁই দেয় বুকের গভীরে।
কিন্তু ঈমানের এ মাইন ব্যবহারের জন্য চাই উপযুক্ত ক্ষেত্র, উপযুক্ত সময়। অসাবধান হলে এ অস্ত্র নিজের জীবনকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে। তাই কোথায় এ অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে সে নির্দেশনাও আমরা পাই কবির কাছ থেকেই। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেন:
‘বাছারে সীমান্তে যা পাটাতন ঘামতে শিখুক।’
(মতিউর রহমান মল্লিক, ঋতুচক্র, গ্রীষ্মসংখ্যা ১৯৮০)।
এ কথা বলেই কবি থেমে থাকেন না, তিনি নিজেও সেই কঠিন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কবির কাব্য থেকে সে সত্যও আমরা জানতে পারি।
‘তারপর খুব প্রচ- রোদ মাথা পেতে নিলাম।’
(মতিউর রহমান মল্লিক, ঋতুচক্র, গ্রীষ্মসংখ্যা ১৯৮০)।
এভাবে দেখা যায়, বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতাঙ্গনে সত্য ও সুন্দরের শাশ্বত সুর দীর্ঘ বিরতির পর আবার নতুন করে বইতে শুরু করেছে। নবীন ও তরুণ কবিরা ছাড়াও পোড় খাওয়া প্রবীণ কবিদের একটা শক্তিশালী অংশ আন্তরিকতার সাথেই বাংলা সাহিত্যের এ পালাবদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন। কাব্যরসিকরা এ হাওয়াকে কতো প্রচণ্ডভাবে বইয়ে দিতে পারবেন তার ওপর কেবল বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যতই নির্ভর করছে না, যেসব কবিরা এই পালাবদলে সক্রিয় হয়েছেন তাদেরও ভবিষ্যত নির্ভর করছে। তবে, কালের গতিপ্রবাহ বলছে, বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে জাগরণ শুরু হয়েছে, সেই জাগরণকে সার্থকভাবে বিকশিত করার মধ্যেই যেহেতু মানবতার কল্যাণ নিহিত, বাংলাদেশের কবিরা এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার পক্ষে নয়। ইসলামের বিপ্লবী চেতনা যিনি যতো দক্ষতার সাথে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন, তিনি ততোই জনগণের প্রিয় কবির শিরোপা ছিনিয়ে নেবেন।
একঝাঁক কবি এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন, এদের মধ্য থেকে কে হবেন সকলের মধ্যমনি তা নির্ভর করে এ দেশের গণমানুষের চেতনা ও আদর্শ কে সবচে পারঙ্গমতার তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন। বহুচর্চিত ভোগবাদ, দেহসর্বস্ব কামজ ও প্রেমজ কবিতার সুড়সুড়ি এড়িয়ে, মানব রচিত পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের অসাড়তার প্রেক্ষাপটে আমাদের কবিরা ইসলামের বৈষম্যহীন মানবতার শাশ্বত সুর কতো তীব্রভাবে তাদের কাব্যে স্থান দিতে পারবেন তার ওপরই নির্ভর করছে আধুনিক বাংলা কবিতার ভবিষ্যত। পুরনো দিনের ধ্যান-ধারণা নয়, কবিতার বিচার হবে আদর্শের নিরিখে, এমনটি মনে করা এখন সময়ের দাবি। কারণ ইতিহাস বলে, কবি ও কবিতা তখনই বেঁচে থাকে যখন সে এমন একদল লোক পায় যারা তাকে পছন্দ করছে। ইসলামের শাশ্বত সুন্দর যার কাব্যে থাকবে, এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ তাকেই তাদের প্রিয় কবি হিসাবে গ্রহণ করবে। এ সত্যটা কেবল বুদ্ধি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়েও আমাদের অনুভব করতে হবে।