কবিতার আধুনিকতা
প্রায় ষাট বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে আধুনিক বাংলা কবিতার। রবীন্দ্রোত্তর কাল থেকে আধুনিক কবিতার যে পালাবদল শুরু হয়, সে পালাবদলে অনেক আলোচনা-সমালোচনার ঢেউ বয়ে গেছে, তবু কবিতা থেমে থাকেনি।যেহেতু আধুনিক শব্দটি চিরন্তনী,অগ্রসরমান তার ভূমিকা, থেমে থাকা তার চারিত্র্য লক্ষণ নয়। রবীন্দ্রনাথও আধুনিককে নদীর বাঁকের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মর্ডাণ। বাংলায় যাকে বলা হয় আধুনিক।এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ ( রবীন্দ্রনাথ, ‘আধুনিক কাব্য’. সাহিত্যের পথে) এই মর্জিটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন তিরিশের কবিরাই। তাই তিরিশের কালের কবিদের সময় থেকেই কবিতার আধুনিকতার শুরু। আসলে পুরো ব্যাপারটাই পাশ্চাত্য প্রভাবিত। তিরিশের কবিরা যেমন রবীন্দ্রনাথের মোহন বাঁশির সুরে আবিষ্ট না হয়ে তাঁকে পাশ কাটাতে চাইলেন তেমনি পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিদের কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে এদেশে আধুনিকতাকে ত্বরান্বিত করলেন, এমনকি অনেকে প্রভাবিতও হলেন। এদেশে এলিয়ট, ইয়েটস, পাউন্ড,রিলকে বোদলেয়ার, লোরকা, র্যাঁবো অজানা রইলেন না, এমন কি তাঁদের জীবনের ক্রিয়াকা-গুলো পর্যন্ত জানা হয়ে গেল। বাংলা কবিতায় আধুনিকতার যে চরিত্র্যলক্ষণ প্রকাশ পেল তার সংজ্ঞা নির্দেশ করলেন অনেক কাব্য আলোচক এমনকি কবিরা স্বয়ং। উনিশশ’ চল্লিশ সালে প্রকাশিত আধুনিক সংকলনে আবু সায়ীদ আইয়ুব বলেন-‘কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী এবং ভাবের দিক রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী কাব্যকেই আমরা আধুনিক কাব্য বলে গণ্য করেছি।’(ভূমিকা, আধুনিক বাংলা কবিতা)। তিরিশের অন্যতমম কবি বুদ্ধদেব বসু আধুনিক কবতিাকে সনাক্ত করলেন এই বলে- ‘এই আধুনিক কবিতা এমন কোন পদার্থ নয় যাকে কোন একটা চিহ্ন দ্বারা অবিকল সনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদেও কবিতা, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ,বিশ্ববিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি। আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা আ বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা, এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন ভিন্ন কবিতা নয়, কখনো হয়তো বা বিভিন্ন সময়ে একই কবির কবতিায়।’(বদ্ধদেব বসু, ভূমিকা- আধুনিক বাংলা কবিতা)

আধুনিক যুগমানসের প্রতিচ্ছবি, একাধারে নতুন, তরতাজা। সর্বোপরি আধুনিকতা যুগধর্মকে বড় বেশি চিহ্নিত করে। আধুনিকতার সূত্র ধরেই কবিতায় এসছে বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, অস্তত্ববাদ, সাম্যবাদ, দাদাবাদ, না-বাদ ইত্যাদি এবং সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস। স্বাভাবিকভাবেই এগুলোর নতুন, বিষয়ে টাটকা গন্ধ। অর্থনীতি,সমাজনীতি, রাজনীতি ইত্যাদির সঙ্গে আধুনিকতার যুগসূত্র মহামিলনের সমপর্যায়। এও সত্য কবিতার পরিধি বিস্তারে এবং সমৃদ্ধিতে এগুলোর ছিল সহায়ক। যে রবীন্দ্রনাথ একাধারে আধুনিক কাব্যবিষয়ে প্রবল বিরোধী প্রবন্ধ(রবীন্দ্রনাথ ‘সাহিত্যের পথে’ গ্রন্থে ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধে আধুনিক কবিতা বিষয়ে বহুবিধ মন্তব্য করেছেন। কখনো বলেছেন ‘ল্যাঙটপর’, গুলিপাকানো ধুলোমাখা আধুনিকতা।’ বলেছেন-‘হাট ত্রিসীমনিয়ি নেই বটে, কিন্তু হট্টগোল যথেষ্ট আছে।’ সাহিত্যের স্বরূপ গ্রন্থে বলেছেন-‘তাতে শ্রী নেই, তাতে রূপ নেই আছে প্রচুর বাক্যের পি-। অর্থাৎ এটা দানবিক ওজনের, মানবিক ওজনের নয়। এরাও আপন অতিমিতির দ্বারাই মরছে। প্রাণের ধর্ম সুমিতি, আর্টের ধর্মও তাই।’) লিখে মহলকে উত্তেজিত করে তোলেন, তিনিই ‘পুনশ্চ’-এর মতো কাব্য এবং শেষের কবিতার মতো আদুনিক উপন্যাস লেখেন, যা দেখে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আধুনিক কবিদের সাবধান করে দেন এই বলে- ‘তপস্যা কঠিন রবীন্দ্রনাথের পক্ষে যেটা মোক্ষ, আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়তো সর্বনাশের সূত্রপাত।’( সুধন্দ্রিনাথ দত্ত, ‘ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ’, স্বপত) জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় সৌন্দর্য তাঁর কবিতায় তুলে ধরলেও সুক্ষ্ম আধুনিকতার যে স্পর্শ রেখে যান তাতে কবিতার অর্থ আবিষ্কার অতালন্ত সাগরের নিচে মুক্ত খোঁজার সামিল মনে হয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘নাস্তির নিখিল বিশ্ব’ কী দুর্মরভাবে পাঠককে নিয়ে যার আরেক জগতে সাম্যবাদে আস্থাশীল বিষ্ণু দে ‘জনতা জোয়ারে’ ভেসে সামাজিক চেতনাকে কবিতার উপজীব্য কওে তোলেন আর অমিয় চক্রবর্তী প্রাচ্য ও প্রতীচ্যেও মহামিলনের জয়গান গাইতে কবিতার ‘মিষ্টিক’ চেতনাকে কাজে লাগান। শামসুর রাহমান নগরকেন্দিক ভুবনে আস্থা খোঁজেন, আল নিসর্গ ও ঈশ্বরচেতনায় নিমগ্ন হন, সৈয়দ শামসুল হক জীবনের মধ্যে প্রবাহিত হতে চান, আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তবতার মধ্যে মুখ গোঁজেন, রফিক আজাদ উম্মাতাল জীবনের দিকে ধাবিত হন, একজন তরুণ কবি রাজনৈতিক চেতনাতাড়িত হয়ে সামাজিক অনাচার আর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্বে কবিতা লেখেন। সত্য বলতে, এসবই আধুনিকতা। যুগের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা। যুগচেতনতা আধুনিকতারই নামান্তর। একজন আধুনিক কবিকে যুগসচেতন হতে হয়। নদীর বাঁক তো নিয়তই দেখা দেবে কিন্তু সেই বাঁককে আধুনিক বলে মেনে নিতে না পারলে পুর্ণভ্রান্তির অতলে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।

২. কবির কবিতা: আপনাপন কথকতা
শঙ্খ ঘোষের সেই উক্তিটি-‘লিখতে হবে নিঃশব্দে কবিতা এবং নিঃশব্দ কবিতা’(শঙ্খ ঘোষ, ‘নিঃশব্দে তর্জনী’) যা একজন কবিকে বহুভাবে কবিতার উৎসের দিকে ফিরে নিয়ে যেতে পারে। কেননা কবিতা এক সবুজ আত্মার চিহ্নপ্রকরণ, নিয়মে বাঁধা, ভেতর-বাহিওে যার সমপর্যায়ী আঘ্রাণ। কবিতা নিশ্চয়ই এলোমেলো শিল্পবাহন নয় আর কবি তো ক্ষণ দাঁড়িয়ে যান নীলাকাশের খোলামেলা রোদের নিচে, পরিচিত ভুবন প্রতিদিন তার কাছে ধরা দেয়, অভিজ্ঞতা আর কল্পনা পারম্পর্য সূত্র ধরে এগিয়ে যায় সফল পরিণতির দিকে, তৈরি হয় একটি কবিতা, তাঁর আপন কথকতা। সেই কথা দিয়ে কবিতা তৈরির এক নিরন্তর প্রচেষ্টাই কবিকে করে যেতে হয়। ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’-এর কথার আড়ালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকারান্তরে কি বলতে চেয়েছিলেন? সমাজে বেঁচে থাকা কত দুঃসাধ্য? মাত্র একটি লাইনে সমস্ত কবিতার যে গূঢ়ার্থ প্রকাশ পেয়েছে, সে শুধূ কথা বলার ভঙ্গির জন্য, যে কথা বলতে জানেন কবিরা, যা কিনা নীরবে, নির্ভতে গড়ে ওঠে তাঁরই বুকের গহনতলে। জীবনানন্দ যখন বলে, ‘আমাকে একটি কথঅ দাও, যা আকাশের মতো সহজ বিশাল গভীর’-কোন্ সে কথা যা কেবল অনুরোধে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যা সহজ অথচ মহৎ, বিশাল অথচ গভীর? এই জন্যই কবিকে অপেক্ষা করতে হয়। কখন সে রূপ পরিগ্রহ করবে, ক্রমশ অস্পষ্ট স্বভাব অপসৃত হবে, কবি জানবেন। কখন সে কথাকে আকুতি দিতে হবে। আমাদেও প্রবাহিত জীবনে কত কথা ঝরে পড়ছে পাতার মতো, উড়ে যাচ্ছে দিগন্তব্যাপী, কখনো অন্ধকাওে, শীতের সকালে শিশিরে, ফসলের প্রান্তওে নদীর অথৈ জলে, নির্জন অরণ্যে আর নগরের বিশাল ভিড়ে। সর্বত্রই কথার ছড়াছড়ি। কথা তো ছড়িয়ে আছে, সেই কথাকে ধরতে পারা, তাকে আপন বাঁধনে বেঁধে রাখা সে কার দায়িত্ব? কাদের অন্তরে কথা নীরবে গড়ে উঠতে চায়? এক বিশাল ভিওে হাজারো কথা গুমরে উঠছে, কে মনে রাখছে সেসব কথা? কিন্তু সে ভিড়ের সবকথাই কি অবান্তর, অগ্রহণযোগ্য? অথচ সেই ভিড় থেকেই কবরিা কথার মালা গেঁথে তুলে আনেন সুষমাম-িত মানব সমাজ। দুঃখ-কষ্ট-শোক-তাপ-সুখ-আনন্দ-ক্ষোভ ইত্যাকার অনুভূতি নিরন্তর বয়ে চলা জীবনে যদি একেবাওে অগ্রহণীয় না হয়ে থাকে তাহলে কবিতাতো নানা ঢংয়ে, নানা রঙে কথা বলে উঠবে, সে কথা কখনো হতে পারে উচ্চকিত, কখনো নমনীয়, কখনো ছন্দোবদ্ধ, কখনো ছন্দোহীন-তবুও সে তো কবিতা।
কবি এই সমাজে আছেন, কবতিাও এই সমাজের কথা বলতে চায়। কবিতার প্রত্যেকটি কথাই তো উঠে আসে সমাজ থেকে। সমাজের সুন্দর-অসুন্দও কথাগুলো তবে কে বলবে? বিশেষ করে অসুন্দরকে কবিরা একেবারে ছেঁটে ফেলতে চান সমাজ থেকে অথচ এই দায়িত্ব তাঁদের কেউ দেয়নি। কবির আপন চিত্তই আগ্রহান্বিত, যেহেতু তিনি কবিতার কাছে নতজানু।

৩. কবিতার পাঠক ও ভিড়ের হৃদয়ের পরিবর্তন
কবিতার অভিনিবেশী পাঠক চেয়েছিলেন জীবনানন্দ, তাই বলেছিলেন-‘ভিড়ের হৃদয় পরিবর্তিত হওয়া দরকার।’(কবিতার কথা) আধুনিক কবিতার পাঠক সীমিত, কবিতার পাঠক শুধু কবিরাই-বাংলা কাব্যাতিহাসের গত ষাট বছরে একথা উচ্চারিত হয়েছে হাজারবার। কবিও যেন গত্যন্তরহীন, তা না হলে বদ্ধদেব বসু, যিনি কবি ও পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনায় ছিলেন উদ্বাহু,তাঁকে কেন বলতে হয়-‘কবিতা পড়ে শুধু কবি ও কবিযশোপ্রার্থীরা।’ দুর্বোধ্য, দুরূহ, পাগলামো,অর্থহীন প্রলাপ,পলায়নবাদী,ছন্দোহীন,আঙ্গিকসর্বস্ব ইত্যাকার অভিযোগে অভিযুক্ত কবি ও কবিতা। আধুনিক কবিতা লেখা সহজ বলে একশ্রেণীর পাঠক কটাক্ষ করেন অনায়াস, যেন যখন তখন কবিতা লেখা যায়,যেন-তেন শব্দ সাজালেই কবিতা হয়। তাই কি কবিতা? কবিরা কি এত সহজে লেখেন কবিতা? একজন বলেন-‘পৃথিবীর দুরূহতম কর্মসমূহের মধ্যে কবিতা রচনা একক ও অনন্য। এমন কি যাঁদের কাব্যসাধনা দীর্ঘদিনের এবং সিদ্ধি যাঁদেও আয়ত্তাধীন তাঁরাও, আমার বিশ্বাস,দ্বিমত হবেন না।’(হায়াৎ মামুদ,কবিকণ্ঠ,মার্চ,১৯৬৭) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও বলেন-‘কবিতা রচনার কষ্ট অনেক বেশী। এই শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করা যে কি সাঙ্ঘাতিক, বিপজ্জনক ব্যাপার-ভুক্তোভোগী ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না। একটু অসতর্ক হলেই আঙ্গুল ঝলসে যাবে। কবিতা জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেনিতে হয়। বড় কঠোর সেই প্রস্তুতি পর্ব।’ (‘কবিতার সুখ-দুঃখ’,দেশ,সাহিত্য সংখ্যা,১৩৭৯) তাই কবিকে অনেক সতর্ক হয়েই কবিতা রচনায় এগোতে হয়। একজন প্রকৃত কবিকে জানতেই হয়-‘কাব্যের পথে উল্লঙ্ঘন চলে না, সেখানকার প্রতিটি খাত পদব্রজে গরণীয়।… সেখানে পলায়নের উপায় নেই, বিরতির পরিণাম মৃত্যু।’(সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ‘কাব্যের মুক্তি’, ‘স্বগত’।) কবি তো তাঁর কবিতার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেই ভালোবাসেন। কবিতার ভেতর অবধি শিকড় চালিয়ে যে রস তিনি আহরণ করেন সে রস পাঠকের কাছে বিতরণে তিনি কার্পণ্যহীন। সতেচন পাঠক, আমার বিশ্বাস, এই রস আস্বাদনে পরিপূর্ণ সক্ষম। এই পাঠকের কাছে অসচেতন কবি অচিরেই ধুলিসাৎ হবেন, তাঁর কপটতা পাঠকের ক্ষমাহীনতাকে বেগবান করে তুলবে নিঃসন্দেহে। শব্দ,চিত্রকল্প,উপমা, প্রতীক-যে উপকরণ সহযোগেই কবি কবিতা লিখুন, কিন্তু তার পাঠোপযোগিতা যেন না হারায়; কেবল বয়স্ক মেধার জোরে অপাঠযোগ্য কবিতা যেন চালান না হয়, তাহলে রাতারাতি কবি হওয়ার গোপনতম ইচ্ছাকে পাঠক বিসর্জনের নৌকায় তুলে দেবেন দ্বিধাহীনভাবেই। কিন্তু সেই পাঠক যিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পওে আর এগোতে চান না, যাঁরা পৃথিবীর পরিবর্তনীয় ধ্যান-ধারণায় অনাগ্রহী, চিন্তাশক্তি পারম্পর্যহীন,কবিতার বক্তব্যের গভীরে প্রবেশ করতে কুণ্ঠিত, আধুনিক কবিতার ইতিহাস সম্পর্কে যাঁদের অজ্ঞতা সীমাহীন-তাঁরা আধুনিক কবিতার পাঠক হতে পারে না। কবির দায়িত্ব ফুল ফোটানো নয়, ফুল কিভাবে ফুটে আছে তাই বলে দেওয়া। কবি পাঠককে হাত ধরে কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তির ব্যাখ্যা দানে তৎপর হবেন, এটা কাম্য নয়, তিনি উপলব্ধির মাল্যরচনায় সহায়তা করতে পারেন মাত্র, অতঃপর পাঠককেই এগিয়ে যেতে হবে বন্ধ দরোজা খুলে বিশাল আবিষ্কারের উন্মুখ হতে। স্বদেশ স্বকাল, সমাজ, মানুষ, নিসর্গ সর্বোপরি বিশাল বিশ্ব একাকার হয়ে ওঠে কবিতায়-পাঠক এসব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না। তিনিও তো সমাজের শুদ্ধ চৈতন্যের উত্তরাধিকার রূপে স্বীকৃত। এই পাঠককে জানা প্রয়োজন: বাংলা কবিতায় একদিন যে দুর্বোধ্যতা বা দুরূহতা অনিবার্য ছিল, এখন তা অনেক অবসিত। কবিতা এখন, আমার ধারণা, এক অনুপম সরলাকরণের পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে।
কবিরা চান ধৈর্যশীল পাঠক। যে পাঠকের নিষ্ঠা করায়ত্ত, উপলব্ধির আকাক্সক্ষায় তিনি যদি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চান, তবে কবিকেও সহানুভুতির হাত বাড়িয়ে নেমে আসতে হবে পাঠকের কাছাকাছি। সর্বোপরি কবিতার প্রতি পাঠকের থাকতে হবে অচলাভক্তি, যে ভক্তি শেষাবধি কবির কবিতা ও কবিতার পাঠককে অচলায়তনের অর্গলবদ্ধ দ্বার উন্মোচনে উদ্বুদ্ধ করে।

৪. শেষ কথন
আধুনিক বাংলা কবিতার এই দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় আমরা পেয়েছি অনেক প্রতিভাবান কবিদের, তাঁদের কবিতা আমাদের দিয়েছে আরো দূরে যাওয়ার পথ, সে পথ আগামীদিনের। হয়তো আরো পরীক্ষা-নিরিক্ষায় উত্তীর্ণ হবে কবিতা। জীবন যখন প্রবহমান, সে প্রবহমানবতার উল্টোমুখে কবিরা বসে থাকতে পারেন না। তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়। একটা কবিতা কেন হয়? অন্যটা হয় না, কেন একটা কবিতা বোধগম্য, অন্যটা বোধের বাইরে থাকে- এ কূটতর্ক চলবেই। কবিতা সম্পর্কে নানা অভিযোগও আসতেই থাকবে। কিন্তু আমরা এখনও কবিতার নিখুঁত নির্মাণ চাই, ভুল নির্মাণ নয়। কাছ থেকে অথবা দূর থেকে, অস্থির অথবা সুস্থির সময়ের মধ্য থেকে কবিকে ছেঁকে তুলে আনতে হবে অটুট, নিষ্কলঙ্ক কবিতা। কবি তো কবিতার মধ্যেই বেঁচে থাকবেন। কেননা কবির আর্তি চিরকালই এরকম: ‘শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম… শুধু কবিতার জন্য আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়’।

(‘কবিতা:অনুষঙ্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ১৯৮৯)