এদিকে আনোয়ারা অনেক সময় নির্জনে অশ্রু মোচন করিয়া অনিদ্রায় কাল কাটাইতে লাগিল। ফলতঃ জ্বলন্ত অগ্নির উত্তাপে নববিকশিত কদলীপত্র যেরূপ বিশুষ্ক ও মলিন হইয়া যায়, সৌন্দর্য্য-প্রতিমা বালিকা সেইরূপ নবীভূত ভাবান্তরে কৃশ ও বিবর্ণ হইতে লাগিল। হামিদা সইএর মনের ভাব বুঝিয়া আশ্চর্য হইল, নির্জনে তাহাকে নানাবিধ প্রবোধ দিতে লাগিল। আনোয়ারার দাদিমাও পৌত্রীর ভাবান্তর উপলব্ধি করিলেন। তিনি এক সময় পরিহাসচ্ছলে কহিলেন,-“কি লো! ডাক্তারের বিচ্ছেদে পাগল, হবি নাকি?” আনোয়ারা মলিন মুখে নিরুত্তর রহিল।
আনোয়ারার পিতামহ আরবী পারসী বিদ্যায় প্রসিদ্ধ মুন্সী ছিলেন। বর্তমান সময়ের মৌলবী নামধারী সাহেবেরা, জ্ঞানগরিমায় বিদ্যা-বুদ্ধিতে সে সময়ের মুন্সী সাহেবানের শিষ্যগণের তুল্য-মূল্যও অনেকে বহন করেন না। যাহা হউক, আনোয়ারার দাদিমা আনোয়ারার বয়সেই মুন্সী সাহেবকে পতিত্বে বরণ করেন। তাঁহাদের বিবাহ পরস্পর পবিত্র প্রণয়সূত্রে সংঘটিত হয়। তাঁহাদের এই বৈবাহিক-জীবন যেরূপ সুখের হইয়াছিল সচরাচর সেরূপ দেখা যায় না। স্বামীর গুণে আনোয়ারার দাদিমা আরবী পারসী বিদ্যার সুশিক্ষিতা হন, সুতরাং বিদ্যার অমৃত আস্বাদ তিনি পাইয়াছিলেন। সংসারের অবস্থাও তাঁহাদের খুব স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু চিরসুখ-সৌভাগ্য কাহারও ভাগ্যে ঘটে না। বৃদ্ধার অর্দ্ধেক বয়সে তাঁহার স্বামী এবং দুই পুত্র ও দুই কন্যা কালের করাল কবলে পতিত হন। কিছু দিন পর তাঁহার প্রাণাধিক পুত্রবধূ (আনোয়ারার মাতা) লোকান্তর গমন করেন। কেবল মাত্র পুত্র খোরশেদ আলী ও পৌত্রী আনোয়ারা বৃদ্ধার শেষজীবনের অবলম্বন হয়। বৃদ্ধা, স্বামী পুত্র কন্যা ও পুত্রবধূর অসহ্য শোক শান্তির জন্য আনোয়ারাকেই অন্ধের যষ্টির ন্যায় বোধ করেন, এবং স্বকীয় উন্নত হৃদয়ের স্নেহরাশি পৌত্রীতে ঢালিয়া দিয়া তাহার সুখ-দুঃখের চিরসঙ্গিনী হন। ফলতঃ তাহাকে বৃদ্ধার অদেয় কিছুই ছিল না।
একদিন রাত্রিতে শয়ন করিয়া বৃদ্ধা ডাক্তার সাহেবের প্রতি নাতিনীর অনুরাগ প্রকৃত কিনা পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত ধীরে ধীরে কহিলেন,-“আনার, শুনিলাম-তোর বাপ ফয়েজ উল্লার সহিত তোর বিবাহ বন্দোবস্ত করিয়াছে। আমি এ বিবাহ ভালই মনে করি। তুই তিন হাজার টাকার সম্পত্তি, পনর শত টাকার গহনা, নগদ পনর শত টাকা পাবি, ফয়েজ উল্লাও তোর যোগ্য পাত্র হইবে।” আনোয়ারা শুনিয়া কোন উত্তর করিল না, বিরক্তির সহিত পাশ ফিরিয়া শয়ন করিল।
বৃদ্ধা। “কি লো? বিয়ের কথা শুনে যে মুখ ফিরালি?”
আনোয়ারা দেখিল, তাঁহার সহিত কথা না বলিলে তিনি মনে আঘাত পাইবেন; তাই সে কহিল,-“ও কথা আমি পূর্ব্বেই শুনিয়াছি।”
বৃ। ‘কবে, কার কাছে শুনেছিস্?
আ। “যে দিন আমি ব্যারামে পড়ি, সেই দিন সইএর নিকট শুনিয়াছি।”
বৃ। “তাই, শুনেই বুঝি র্মতে বসেছিলি? এতদিন আমাকে বলিস্ নাই কেন?”
আ। “বলিবার কথা হইলে বলিতাম।”
বৃ। “ও বিবাহে তবে তোর মত নাই?”
আনোয়ারা নিরুত্তর। বৃদ্ধা আবার কহিলেন,-
“আচ্ছা, তোর বাপ ত ঐ বিবাহ দেওয়াই ঠিক করেছে। এখন তুই কি র্কবি?”
আনোয়ারার কণ্ঠনালী শুষ্ক হইয়া আসিতেছিল, সে অনেক কষ্টে ঢোক গিলিয়া মৃদু স্বরে কহিল,-“তুমি বাধা দিবে না?”
বৃ। “তোর বাপ ত আমার কথা শুনে না। বাদসার মা যা বলে, সে তাই করে।”
আনোয়ারা কহিল,-“আর একজন ঠেকাইবে।”
বৃ। “কে সে?”
আ। “আমরা ওজু করিয়া এক্ষণে যাঁর নাম করিলাম।” দাদি নাতিনী এশার নামাজ পড়িয়া শয়ন করিয়াছিলেন। পুণ্যশীলা বৃদ্ধা আনোয়ারাকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন,-“আনার, আজ তোর কথায় আমার দেল ঠাণ্ডা হইল। যাঁর নাম করেছিস্ বল্লি, তাঁর প্রতি চিরদিন যেন তোর এইরূপ ভক্তি থাকে, সময়ে অসময়ে সকল অবস্থায় তিনিই তোকে রক্ষা করিবেন, তিনিই তোর সহায় হইবেন, তিনিই তোর মনোবাসনা পূর্ণ করিবেন।”
এইরূপ বলিয়া বৃদ্ধা পুনরায় প্রকাশ্যে জিজ্ঞাসা করিলেন,-“আচ্ছা, ডাক্তার সাহেবের সহিত তোর বিবাহের প্রস্তাব করিলে কেমন হয়?”
আনোয়ারা ইহাতেও কোন উত্তর করিল না, কিন্তু ডাক্তার সাহেবের নামে তাহার ঘন ঘন শ্বাস পড়িতে লাগিল, আরাধ্য প্রিয়জনপ্রতি অকৃত্রিম প্রেম-প্রযুক্ত তাহার হৃদয়তন্ত্রী বাজিয়া উঠিল; কণ্ঠনালী জড়ীভূত হইয়া আসিল; তাহার গোলাপগগুদ্বয়ে ইন্দ্রবর-নিন্দিত নয়নদ্বয়ে লজ্জার আভা প্রতিফলিত হইয়া অপূর্ব্ব শোভা বিস্তার করিল। অস্পষ্ট দীপালোকে বৃদ্ধা নাতিনীর এই দিবালাবণ্যময়ী মুর্তি স্পষ্টরূপে দেখিতে পাইলেন না, কিন্তু তাহার সঘন নিশ্বাসত্যাগে ও জড়সড় ভাবে বুঝিতে পারিলেন, ডাক্তার সাহেবের নামে মেয়ের হৃদয়ের অন্তস্তল আলোড়িত হইয়া উঠিয়াছে। তাই তিনি পরিহাস করিয়া কহিলেন,-“কি লো ডাক্তার সাহেবের নাম শুনেই যে দশা ধরিলি, কথা বলিস্ না কেন?” আনোয়ারা জড়িত-কণ্ঠে কহিল,-“কি বলিব?”
বৃদ্ধা। “ডাক্তারের সহিত বিবাহ দিলে তুই সুখী হইবি?” আনোয়ারা বাহিরের দিকে চাহিয়া কহিল,-“দাদিমা, দেখ, জানালার পাশে কি সুন্দর চাঁদের আলো আসিয়াছে।” ঐ সময় সওয়ালের চাঁদের কিরণে রাত্রি দিনের মত দেখাইতেছিল। প্রবীণা বৃদ্ধা পৌত্রীর চতুরতা বুঝিয়া কহিলেন,-“আ-লো, চাঁদের আলো যদি ডাক্তার হইত, তবে বুঝি হাতে ধ’রে তায় ঘরে তুলিতি।” আনোয়ারা মৃদুহাস্যে বৃদ্ধার গা টিপিয়া দিল। এইরূপ রসালাপ-প্রসঙ্গে বৃদ্ধা তন্দ্রাভিভূতা হইয়া পড়িলেন। আনোয়ারাও নিদ্রিতা হইল।
বৃদ্ধা, নুরুল এস্লামকে উপযুক্ত পাত্র জ্ঞানে এবং নাতিনী তাঁহার প্রতি অনুরক্ত হইয়াছে বুঝিয়া ভাবিলেন, ‘এরূপ অবস্থায় পাত্র বিবাহ স্বীকার করিলে, এই বিবাহে নাতিনী আমার চিরসুখী হইতে পারিবে।’ এ নিমিত্ত তিনি এই বিবাহ সংঘটনমানসে অতঃপর বিধিমত চেষ্টায় উদ্যোগী হইলেন।