যুবক মোনাজাত; অন্তে পশ্চাৎ ফিরিয়া সযত্নে যুজদানে কোরাণশরিফ বন্ধ করিয়া যথাস্থানে রাখিতে নৌকার ভিতরের দিকে আরও সরিয়া গেলেন। বালিকার প্রতি তাঁহার দৃষ্টি পড়িল না। আত্মহারা বালিকাও তাঁহাকে দেখিতে পাইল না। এই সময় বালিকার পশ্চাদ্দিক্ হইতে-“সই, তুমি এখানে?” বলিয়া আর একটি বালিকা প্রথমা বালিকার দক্ষিণ পার্শ্বে আসিয়া বসিল। আগন্তুক বালিকার বয়স প্রথমা বালিকা অপেক্ষা দুই বৎসরের বেশী হইবে। পরিধানে সাদা সেমিজের উপর নীলাম্বরী সাড়ী, হাতে সোণার বালা, করাঙ্গুলিতে প্রেমের নিদর্শন স্বর্ণাঙ্গুরী; সুতরাং অলঙ্কার-পরিচ্ছদের তুলনায় প্রথমাটীকে দ্বিতীয়াটীর সহিত তুলনা সম্ভবে না। কিন্তু দেহের বর্ণ ও গঠন বদল করিলে কাহারও ক্ষতি হইবে বলিয়া বোধ হয় না।
সখিত্ব-সম্বন্ধে উভয়ের মনের বিনিময় পূর্ব্বেই হইয়া গিয়াছে। ‘সই’ শব্দ শুনিয়া যুবক নৌকার ভিতর থাকিয়া একটি ক্ষুদ্র জানালার ছিদ্রপথ দিয়া একটু তাকাইলেন। দেখিলেন, দুইটি জীবন্ত-কুসুম পশ্চিম পারে খিড়কীর দ্বার আলো করিয়া বসিয়া আছে। প্রথম বালিকাটি বড় গোলাপ, দ্বিতীয়টী পূর্ণবিকশিত শতদলস্বরূপ। ‘সই’ ডাক শুনিয়া বালিকার সুখের ধ্যান ভাঙ্গিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব্ব এখানেই চিহ্ন তাহার মুখে ফুটিয়া উঠিল। সে দ্বিতীয়া বালিকার দিকে ফিরাইয়া বসিল। দ্বিতীয়া বালিকা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া সবিস্ময় দুঃখে কহিল,- “সই, তোমার মুখের চেহারা এরূপ হইয়াছে কেন? এমন ত কখন দেখি নাই? রাত্রে কি ঘুমাও নাই?” প্রথমা বালিকা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিল,-“গত রাত্রে, মা আবার অকথ্য ভাষায় গালি দিয়াছে, তাই জীবনের প্রতি ঘৃণা জন্মিয়াছে; সই, আর বরদাস্ত হয় না।” বলিতে বলিতে কথিতার চক্ষু অশ্র“পূর্ণ হইয়া উঠিল।
দ্বি-বা। “কেন গালি দিয়াছিল?”
প্র-বা। “মগরেব বাদ হজরতের জীবনচরিত পড়িতেছিলাম, তাই রান্নাঘরে যাইয়া ভাত খাইতে বিলম্ব হইয়াছিল।”
দ্বিতীয়া বালিকা বুদ্ধিমতী ও চতুরা। শিক্ষিত স্বামি-সহবাসে, সংসারের অনেক বিষয়ে জ্ঞানলাভ করিয়াছে। সে একটু চিন্তা করিয়া কহিল,- “সই, তোমার মা ত দিন-রাতই তোমাকে তিরস্কার করে, তাহাতে তোমাকে কেবল কাঁদিতে দেখি, কিন্তু তোমার চোখ-মুখের এমন অবস্থা ত কখন দেখি নাই। অবশ্যই তোমার মনের কোন বিশেষ ভাবান্তর ঘটিয়াছে?” প্রথমা বালিকার বিষাদপূর্ণ-মুখে একটু বিজলীর আভা স্ফুরিল, কিন্তু মুখ ফুটিল না। দ্বিতীয়া বালিকা নৌকার দিকে চাহিয়া কহিল ‘ওপারে একখানি সুন্দর ছৈ-ঘেরা পান্সী নৌকা দেখিতেছি, কোথা হইতে আসিয়াছে?” প্রথমা বালিকা সরলমনে কহিল,- “জানিনা, কিন্তু কার ভিতর কে যেন কোরাণশরিফ পড়িতেছিলেন, এমন সমধুর কণ্ঠে কোরাণশরিফ পড়া আর কখন শুনি নাই। এতক্ষণ তাই শুনিতেছিলাম।” দ্বিতীয়া বালিকা পুনরায় নৌকার দিকে চাহিয়া কহিল,- “কৈ সই, নৌকায় ত কাহারও সারা-শব্দ নাই?” প্রথমা বালিকাও নৌকার দিকে চাহিল। নৌকা নীরব। যুবক এই সময় পাটের জমাখরচ মিলাইতে ছিলেন, তিনি বালিকাদ্বয়ের কথোপকথন শুনিতে পাইলেন।
দ্বিতীয় বালিকা কহিল,- “যাক্, কাল বিকালে তোমরা যখন স্কুল হইতে চলিয়া আইস, তার পরই ডাকপিয়ন বাবাজানকে একখানি মণি-অর্ডার দিয়া যায়। সেই সঙ্গে আমিও কলিকাতার আর একখানি চিঠি পাই। চিঠি লইয়া আমি আমার পড়ার ঘরে বসিয়া চুপ করিয়া পড়িতে ছিলাম। একটু পরে বাবাজান বাড়ীর মধ্যে আসিয়া মাকে বলিলেন, -‘এই ধর ১৮টি টাকা, আলাহিদা করিয়া রাখিয়া দাও? ইহা আনোয়ারার বৃত্তির টাকা। এই টাকা আর তাহার পিতার হাতে দিব না। সে কাপড়ে-চোপড়ে, পুঁথি-পুস্তকে মেয়েটিকে যে কষ্ট দেয়, আমি মনে করিয়াছি এই টাকা দিয়া তার সে কষ্ট দূর করিব।’ মা কহিলেন,- ‘ও সব কষ্ট ত কিছুই না। মেয়েটাকে তার মায়ে দিনরাত যে ভাবে খাটায় আর তিরস্কার করে, তা দেখিলে বুক ফাটিয়া যায়। সৎ-মা অনেক দেখিয়াছি, কিন্তু এমন অসৎ সৎ-মা বুঝি ত্রিভুবনে আর নাই। আবার মেয়েটীর মত ভাল মেয়েও কোথায় দেখা যায় না’।”
প্র-বা। “সই ও সব কথা থাক্, চল-বাড়ীর ভিতর যাই, বড় মাথা ধরিয়াছে।”
দ্বি-বা। “সই, তোমার এক ভয়ানক খবর আছে; তা এখানেই নির্জ্জনে বলি। বাবাজান আর মা, কাল বিকালে তোমার সম্বন্ধে কথা বলিয়াছেন-সবই বলিতেছি।”
প্র-বা। (উদ্বিগ্নচিত্তে) “কি খবর সই?”
দ্বি-বা। “মা বলিল, অতবড় সেয়ানা মেয়ে, তথাপি সে তার সৎ-মার অত্যাচার নীরবে সহিয়া তারই আদেশ-উপদেশ মত চলে, টুঁ শব্দটী পর্য্যন্ত করে না, ভুলেও সৎ-মার নিন্দা করে না; বরং কেহ নিন্দাবাদ করিলে, সে সেখান হইতে উঠিয়া যায়। ধন্নি মেয়ে!”
প্র-বা। “সই, আসল কথা কি তাই বল?!”
দ্বি-বা। “আমি দুই কানে যা শুনিয়াছি, সবই বলিতেছি।”
এই বলিয়া দ্বিতীয়া বালিকা আবার বলিতে লাগিল,- “বাবাজান কহিলেন, ‘মেয়েটি দেখিতে যেমন সুন্দর, তার স্বভাবটীও তেমনই মনোহার, আবার পড়াশুনায় আরো উত্তম। আনোয়ারার স্মরণশক্তি অসাধারণ; স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, ভুগোলপাঠ, ভারতের ইতিহাস আদ্যস্ত মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছে। চারুপাঠ, সীতার বনবাস, মেঘনাদবধ কাব্য, পদ্যপাঠ প্রভৃতি সাহিত্য পুস্তক সুন্দররূপে বুঝাইয়া লিখিতে পারে। জামা-শেলাই, নীলাম্বরী কাপড়ে ফুলতোলা দেখিয়া সেদিন ইনস্পেক্টার সাহেব তাহাকে যে ১০্ টাকা পুরস্কার দিয়া গিয়াছেন, তাহা ত বোধ হয় জান? মেয়ে পড়ার বই ছাড়া, ২০/২৫ খানি স্ত্রীপাঠ্য পুস্তক-আমি যাহা নির্দ্দেশ করিয়া দিয়াছি, তাহা সুন্দররূপে আয়ত্ত করিয়াছে। মেয়ের জ্ঞান-পিপাসা দেখিয়া আমি বাস্তবিকই বিস্মিত হইয়াছি। ইহার মধ্যে আবার আমাকে হজরত ওমরের জীবনচরিত আনিতে টাকা দিয়াছে। আনোয়ারার কোরাণ পাঠ শুনিলে আমি অশ্র“ সম্বরণ করিতে পারি না।’
মা কহিলেন, -‘তা যেন হ’ল, মেয়ে যে বড় হয়ে গেল তার কি হয়? তার বাপ ত এবিষয়ে লক্ষ্যই করিতেছে না।’ শেষে মা বাবাজানকে, তোমার সয়ার মত নির্গুণ কদাকার একটা বরের হাতে তোমাকে সমর্পণ করিতে অনুরোধ করিলেন। এই বলিয়া সে একটু মুচ্কিয়া হাসিল, তারপর কহিল, -মা বিশেষ করিয়া বলিলেন, ‘যেমন মেয়ে তেমন উপযুক্ত পাত্র না হইলে সবই বিফল হইবে।’ বাবাজান শুনিয়া বিশেষ দুঃখের সহিত বলিলেন, ‘বিফল হইবে বলিয়াই বোধ হইতেছে।’ তখন মা চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, ‘সে কি কথা!’ বাবাজান কহিলেন, ‘তিন হাজার টাকার কাবিন, পনর শত টাকার গহনা এবং পনর শত টাকা নগদ লইয়া জাফর বিশ্বাসের নাতির সহিত ভূঞা সাহেব মেয়ে বিবাহ দিবেন বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন-শুনিলাম।’ মা উত্তেজিত হইয়া কহিলেন, ‘তুমি বল কি? জাফর বিশ্বাস যে ডাকাত ছিল, শেষবার ধরা পড়িয়া জেল খাটিয়া মরিয়া গিয়াছে। ভূঞাসাহেব হিতাহিত-জ্ঞানশূন্য হইয়া রূপে মজিয়া জাফর চোরের মেয়েকে বিবাহ করিয়াছে বলেই কি আনোয়ারার মত বেহেস্তের হুরকে তাহাদের ধরে বিবাহ দিবে? আমার হামিদা, আনোয়ারার সাহিত ‘সই’ সম্বন্ধ করিয়াছে, উভয়ের মধ্যে যেরূপ ভাব, তাহাতে এ সম্বন্ধ যাবজ্জীবন অচ্ছেদ্য। আনোয়ারার বিবাহ চোরের ঘরে হইলে, হামিদা যে সরমে মরিয়া যাইবে, আমরা যে কোথাও মুখ পাইব না? বিশেষতঃ আনোয়ারা সেয়ানা মেয়ে, শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সব বুঝিয়া উঠিয়াছে, সে শুনিলে যে কি ভাবিবে বলিতেই পারি না।’
বাবাজান কহিলেন, ‘যার মেয়ে সে যদি বিবাহ দেয়, আমরা কি করিব?’ মা কহিলেন, ‘এ বিবাহ যাহাতে না হয়, সেজন্য তোমরা দশজনে মিলিয়া শক্ত করিয়া বাধা দাও।’ বাবাজান কহিলেন, ‘আজিমুল্লা (জাফর বিশ্বাসের পুত্র) এই বিবাহের জন্য আবুল কাসেম তালুকদার, নুরউদ্দীন মুন্সী, মীর ওয়াহেদ আলি প্রভৃতি প্রধানদিগকে একশত টাকা করিয়া ঘুষ দিয়াছে, সুতরাং এ বিবাহ আর নিবারণ করা চলিবে না। এখন খোদাতালার ইচ্ছা, আর মেয়ের কপাল।’ এই বলিয়া বাবাজান বাহির বাড়ীতে চলিয়াগেলেন; মা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘হামি, তোর সইএর বিবাহের কথা শুনেছিস্?’ আমিত গোপনে তাঁদের কথাবার্ত্তা সবই শুনিয়াছি, তবু মার মুখের দিকে তাকাইলাম। আমি কাল বিকালেই তোমাকে বলিতে আসিতাম, কিন্তু কলিকাতার পত্রের উত্তর লিখিতে বিলম্ব হইল, আর ভাবিলাম, এ সংবাদ শুনিলে রাত্রে তোমার ঘুম হইবে না, তাই আসি নাই; কিন্তু তোমার মুখের চেহারায় বুঝিতেছি যে এ সংবাদ তোমার কানে আগেই গিয়েছে।” আনোয়ারা কহিল- “না সই, তোমার মুখে এই প্রথম শুনিলাম।” হামিদা আনোয়ারার মুখের দিকে চাহিল, দেখিল-তাহার রুক্ষমুখ অধিকতর রুক্ষ হইয়াছে, ডাগর চক্ষু দুইটী নীহার সিক্ত ফুটন্ত জবার ন্যায় লাল হইয়া উঠিয়াছে। সে হামিদার কথায় আর কোন উত্তর করিল না, কেবল মৃদুস্বরে কহিল, “সই, বড় মাথা ধরিয়াছে, চল-বাড়ীর ভিতর যাই।” এই বলিয়া আনোয়ারা উঠিয়া দাঁড়াইল, হামিদাও তাহার সঙ্গে অন্দরমুখী হইল।
এই সময় নৌকা হইতে প্রয়োজনবশতঃ অবতরণকালে যুবক পেট-কাটা ছৈ মধ্যে দাঁড়াইয়া কাশিয়া উঠিলেন। হামিদা ফিরিয়া তাকাইয়াই চমকিয়া উঠিল এবং ব্যাকুলভাবে মাথায় ঘোমটা টানিয়া বাড়ীর মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল। আনোয়ারাও ফিরিয়া চাহিল,. চারি চক্ষের মিলন হইল! কিন্তু কল্পিত বা স্বপ্নদৃষ্ট হৃদয়ের সামগ্রী প্রত্যক্ষ করিলে লোকে যেমন আশ্চর্য্যবোধে চমকিয়া উঠে, যুবকের প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্র বালিকা সেইরূপ শিহরিয়া উঠিল। যুবকও কি যেন ভাবিয়া হর্ষ বিষাদপরিমিশ্রিত প্রশান্ত-সৌম্য-বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে করুণ-দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিলেন। বালিকার আয়ত আঁখি লজ্জায় মুকুলিত হইল। পরন্তু সে ভাবিল, ‘ইনিই বুঝি নৌকার ভিতর মধুরকণ্ঠে কোরাণশরিফ পাঠ ও মোনাজাত করিয়াছেন।’ ঝঞ্ঝাবাতসমুত্থানে তটিনী-বক্ষ যেরূপ প্রবল উচ্ছ্বাসে তরঙ্গায়িত হইতে থাকে, সুখদুঃখের সংমিশ্রিত-ভাবাবেশে তাহার সুকোমল ক্ষুদ্র হৃদয়খানি তখন সেইরূপ আন্দোলিত হইতে লাগিল এবং তৎসঙ্গে তাহার মাথার বেদনা আরো বাড়িয়া উঠিল। সে ধীরপদে অন্দরে প্রবেশ করিল। কেবল অস্ফুটস্বরে কহিল “তবে ইনিই কি তিনি? মা, তোমার কথা যেন সত্য হয়, আমি একমাস নফল রোজা রাখিব।”