মধুপুর প্রাচীন গ্রাম। বাঁশ, আম, তেঁতুল, গাব, বট, দেবদারু প্রভৃতি সমুচ্চ বৃক্ষরাজীতে পূর্ন। গ্রামখানি নিম্ন সমতল। আষাঢ় মাসে পানি আসে, আশ্বিনে চলিয়া যায়। গ্রামের চতুষ্পার্শ্বস্থ ক্ষেত্রে প্রচুর পাট জন্মে। গ্রামের অধিবাসী সকলেই মুসলমান। মধুপুর হইতে তিন গ্রামে অন্তরে জামতাড়া; এ গ্রামের অধিবাসী বারআনা হিন্দু। বেলতা গ্রাম মধুপুর হইতে ১০ মাইল পূর্ব্বে একটি অনতিপ্রশস্ত স্রোতস্বিনীর তীরে অবস্থিত। এ গ্রামে ৩/৪টি ভদ্রবংশীয় উচ্চ শিক্ষিত মুসলমান গবর্ণমেন্টের চাকরী করেন। বেলগাঁও প্রসিদ্ধ বন্দর; মধুপুর হইতে ৩০ মাইল দক্ষিণপূর্ব্ব-কোণে স্রোতস্বতী নদীর পশ্চিম তটে অবস্থিত। পাট ও অন্যান্য বাণিজ্য দ্রব্যের জন্য বিখ্যাত। বড় বড় ২/৩টি জুট-কোম্পানি এখানে ব্যবসায়ের অনুরোধে বড় বড় গুদাম ও কলকারখানা স্থাপন করিয়াছেন।
পূর্ব্বকথিত খোরশেদআলী ভূঞাসাহেব মধুপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত ও প্রধান ব্যক্তি। পৈতৃক অবস্থা খুব সচ্ছল ছিল, ভূসম্পত্তি মন্দ ছিল না, এখন মধ্যবিত্ত অবস্থা। দেড় শত বিঘা জমি, সাতখানা হাল, নয় জন চাকর, এক পাল গরু। কেবল পাট বিক্রয় করিয়া বৎসরে ৭/৮ শত টাকা পান। বাড়ীর প্রায় ঘর করোগেট টিনের। ভূঞাসাহেবের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। বর্ণ গৌর, আকৃতি দোহারা, মুখের চেহারা নিতান্ত মন্দ নয়। কৃপণস্বভাব ও অর্থগৃধ্রু। পিতা মাতার প্রথম ও আদরের ছেলে ছিলেন বলিয়া অর্দ্ধশিক্ষিত। তাঁহার বর্ত্তমান অবস্থায় তিনি সন্তষ্ট নহেন, আর্থিক উন্নতিবিধানে সর্ব্বদা চিন্তিত ও চেষ্টান্বিত। ভূঞাসাহেব নিজ গ্রাম হইতে ৭ ক্রোশ দূরে রছুলপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বংশে বিবাহ করেন। বহুপুণ্যফলে তিনি ফাতেমা জোহরার ন্যায় ধৈর্য্যশীলা রূপবতী পত্নী লাভ করেন। ইঁহার গর্ভে ভূঞাসাহেবের দুইটি পুত্র ও একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে। পুত্রদ্বয় অকালে কালকবলে পতিত হয়; কন্যা জীবিত আছে। কন্যার ২ বৎসর বয়সের সময় তাহার মাতা পরলোকে গমন করেন; কিন্তু ধর্ম্মশীলা বুদ্ধিমতী জননী এই বার বৎসরের কন্যাকে যে ভাবে গড়িয়া রাখিয়া গিয়াছেন, সচরাচর সেরূপ দেখা যায় না।
কথিত জাফর বিশ্বাস ডাকাতের সর্দ্দার ছিল। শেষ জীবনে পুলিশের চেষ্টায় ধরা পড়িয়া কঠিন পরিশ্রমের সহিত ৮ বৎসরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। এবং সেখানেই তাহার মৃত্যু ঘটে। তাহার স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা জীবিত থাকে। পুত্রের নাম আজিমুল্লা। সুখের বিষয় যে পিতার শোচনীয় পরিণাম চিন্তা করিয়া অনেকাংশে সে আত্মসংযমপূর্ব্বক সংসার করিতেছে। কন্যার নাম গোলাপজান। গোলাপজান ভুবন-মোহিনী সুন্দরী। ছোট লোকের ঘরে ঈদৃশী সুন্দরী মেয়ের জন্মলাভ খুব কম দেখা যায়।
জামতাড়া হইতে পাঁচ মাইল পূর্ব্বে বসন্তবিশুষ্ক-বর্ষাপ্লাবিত একটি নদীর পশ্চিমতটে আদমদীঘি গ্রামে কাশেম সেখের পুত্র মেহের আলীর সহিত ১০/১১ বৎসর বয়সের সময়, এহেন রূপসী গোলাপজানের বিবাহ হয়। কিন্তু জানি না, কেন বিবাহের পর হইতে সে স্বামীর বাড়ী ত্যাগ করিয়া পলাইতে আরম্ভ করে। তাহার শ্বশুর ও স্বামী এজন্য তাহাকে বিধিমত শাসনাদি করিতে থাকে, কিন্তু কিছুতেই তাহার পলায়ন-অভ্যাস দূর হয় না। একবার শ্রাবণের নিশিতে ভরানদী সাঁতরাইয়া সে বাপের বাড়ী চলিয়া আসে। সকলে মেয়ের সাহস দেখিয়া অবাক্! মেহেরআলী অনন্যোপায়ে তাহাকে তালাক দিল। গোলাপজান প্রসিদ্ধা সুন্দরী; সুতরাং এদ্দতকাল অতীতের পূর্ব্বেই নিজ গ্রামের নবীবক্সের সহিত তাহার বিবাহের বন্দোবস্ত হইল। নির্দ্দিষ্ট দিনের শেষে নবীবক্স গোলাপজানের পাণিগ্রহণ করিল। নবীবক্সের সাংসারিক অবস্থা ভাল ছিল। আজিমুল্লা ও তাহার মায়ের শাসনে গোলাপজান এবার শ্বশুরালয় হইতে আর পলাইল না, কিন্তু এ সংসারে আসিয়া তাহার আর একটি গুণের বিকাশ পাইতে লাগিল।
নবীবক্স গোলাপজানের রূপের মোহে তাহাকে প্রাণাধিক ভালবাসিতে লাগিল। সংসারে বৃদ্ধা শাশুড়ী মাত্র বর্ত্তমান; সুতরাং আদর-সোহাগে গোলাপজান সংসারের সর্ব্বময় কর্ত্রী হইয়া উঠিল। সে এক্ষণে এক একটি করিয়া গোপনে গোপনে নবীবক্সের শ্রমার্জ্জিত ঘটী-বাটী, কাপড়-চোপড়, ধান-চাল, তেল-তামাক পর্য্যন্ত অনেক দ্রব্যই ভ্রাতা আজিমুল্লার বাটীতে প্রেরণ করিতে লাগিল। আজিমুল্লা তাহাতে আন্তরিক খুসি ছিল। কিছু দিন পর গোলাপজান এক পুত্র-সন্তান প্রসব করিল। প্রিয়তমা প্রেয়সীর গর্ভে পুত্রসন্তান লাভ করিয়া নবীবক্স গোলাপজানকে মাথায় তুলিল, এবং বাছিয়া বাছিয়া পুত্রের নাম রাখিল,Ñবাদসা। সুখে সন্তোষে এইরূপে চারি পাঁচ বৎসর কাটিল; কিন্তু দিন কাহারও একভাবে যায় না, নবীবক্স কার্ত্তিক মাসের কলেরায় হঠাৎ প্রাণত্যাগ করিল। তিন দিন পর তাহার বৃদ্ধা মাতাও পুত্রের পথানুসরণ করিল। গোলাপজান এখন সংসারে একাকিনী। শিশু পুত্র লইয়া কেমন করিয়া পতির সংসারের কাজ করিবে? সুতরাং ভ্রাতা আজিমুল্লা তাহাকে নিজ বাড়ীতে লইয়া গেল, এবং দুই এক করিয়া নবীবক্সের স্থাবরাস্থাবর সম্পত্তি নিজ সংসারে মিশাইয়া নিজ গৃহস্থালী বড় করিয়া তুলিল। শিশু বাদসা মাতৃসহ মাতুলালয়ে মহাদরে প্রতিপালিত হইতে লাগিল।
এদিকে আনোয়ারার বার বৎসর বয়সের সময় তাঁহার মাতা পরলোক গমন করেন। খোরশেদআলী ভূঞাসাহেব বিপত্মীক হইয়া দারান্তর গ্রহণের অভিলাষী হন। জামতাড়া গ্রামের আজিমুল্লা সম্প্রতি অবস্থাপন্ন লোক। গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় লেখাপড়া শিখিয়া কিছু শিক্ষিতও হইয়াছিল। অবস্থা ভাল হইলে এবং তৎসঙ্গে কিছু শিক্ষাদীক্ষা পাইলে নানাদিক্ দিয়া লোকের খেয়াল উচ্চ হয়। আজিমুল্লা নীচবংশের সন্তান হইলেও কৌলিক মর্য্যাদা লাভের আশা এক্ষণে তাহার হৃদয়ে বলবতী হইয়াছে। সে ভূঞাসাহেবকে বিপত্মীক দেখিয়া, স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া তাঁহার সহিত বিধবা ভগ্নী গোলাপজানের পুনরায় বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব করিল। ভূঞাসাহেব ডাকের সুন্দরী গোলাপজানকে পূর্ব্বেই দেখিয়াছিলেন, এক্ষণে সাধা বিবাহের প্রস্তাবে উল্লসিত হইলেন; কিন্তু কুলের দোহাই দিয়া কহিলেন, ‘নজরাণা না পাইলে কি করিয়া কার্য্য হয়?” আজিমুল্লা তিন শত টাকা সেলামী দিতে স্বীকার করিল।
এই বিবাহে ভূঞাসাহেবের মাতা, “নাম যাইবে, জাতি যাইবে, কুলে কলঙ্ক রটিবে”-বলিয়া অনেক আপত্তি করিয়াছিলেন। ভূঞাসাহেব গোলাপজানের রূপের মোহে মাতার কথায় কর্ণপাত করিলেন না। গ্রামের পাঁচজনকে দিয়া মাতাকে বুঝাইলেন, অবশেষে বিবাহ হইয়া গেল। নির্দ্দিষ্ট দিনে প্রাণাধিক পুত্র বাদসাকে সঙ্গে করিয়া গোলাপজান তৃতীয়-স্বামী ভূঞাসাহেবের ভবনে পদার্পণ করিলেন। বাদসা এখানে আসিয়া রামনগর মাইনর স্কুলে পড়িতে লাগিল। বাদসাকে বাদসাজাদার মতই সুন্দর দেখাইত। ভূঞাসাহেব আনন্দে তাহার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করিতে লাগিলেন।
গোলাপজানের রূপে কি যে এক মাদকতা-শক্তি ছিল। ভূঞাসাহেব কিছুদিনের মধ্যেই সেই রূপে কায়মনঃপ্রাণ উৎসর্গ করিলেন। আনোয়ারার মা বাঁচিয়া থাকিতে ভূঞাসাহেবের মা সংসারের সর্ব্বময়ী কর্ত্রী ছিলেন। তাঁহার আদেশ-উপদেশানুসারে আনোয়ারার মা সংসারের সমুদয় কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতেন; শাশুড়ীকে মায়ের অধিক ভক্তি করিতেন, উপযুক্ত সময়ে তাঁহার স্নানাহারের তত্ত্ব লইতেন। আনোয়ারা তখন হামিদাদিগের আঙ্গিনায় তাহার সহিত বালিকাস্কুলে পড়িত। ৪টি চাকরাণী বাহিরের সমস্ত কাজকর্ম্ম নিরুত্তরে সম্পন্ন করিত। স্বামি-সোহাগ-গর্ব্বিণী গোলাপজান অল্প দিনেই এ বন্দোবস্ত উল্টাইয়া, নিজ হস্তে সংসারের ভাব লইল। এরূপ করিবার তাহার দুইট প্রধান উদ্দেশ্য ছিল; প্রথম উদ্দেশ্য সংসারের ভার নিজ হাতে থাকিরে, ইচ্ছামত জিনিসপত্র মা-ভাইর্য়ে বাড়ী পাঠান যাইবে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আরও মারাত্মক!
বিধবা হইবার পর ভ্রাতার বাড়ী অবস্থানকালে, গোলাপজান যখন সীমন্তিনী-সোহাগ তৈলে তাহার দীর্ঘ কেশপাশে বিচিত্ররূপে খোঁপা বাঁধিয়া, কুন্দদন্ত মঞ্জন-রঞ্জিত করিয়া, আয়ত আঁখি অঞ্জন-শোভিত করিয়া, প্রতিবাসিগণের বাটীতে ভ্রমণে বহির্গত হইত; তখন অন্যান্য স্ত্রীলোকেরা তাহার ভুবন-ভুলান রূপ দেখিয়া অনিমেষ-লোচনে তাকাইয়া থাকিত। কোন কোন মুখরা সরলা মুখ ফুটিয়া বলিত,- “বাদসার মায়ের যেমন রূপ, এমন আর কোথাও দেখি না।” বাদসার মা তখন মনে করিত ‘তার মত বুঝি সুন্দরী আর নাই।’ কিন্তু যখন সে তৃতীয়-স্বামী ভূঞাসাহেবের বাটীতে পদার্পণ করিয়া বার বৎসরের মেয়ে আনোয়ারাকে দর্শন করিল, তখন তাহার রূপের গর্ব্ব একেবারে চূর্ণ হইয়া গেল। বাস্তবিক বালারুণ-রাগ-রঞ্জিত বিকাশোম্মুখ পদ্মিনীর সহিত যেমন কীটগর্ভ শ্লথদল-দলিত জবার তুলনা সম্ভবে না, সেইরূপ সৌন্দর্য্য-প্রতিমা সরসা বালা আনোয়ারার সহিত যৌবনোত্তীর্ণা বিকৃতসুন্দরী গোলাপজানের উপমাই হয় না। কিন্তু না হইলেও গোলাপজান নিজ রূপের সহিত সতীন-কন্যার রূপের তুলনা করিয়া হিংসায় জ্বলিয়া উঠিত। স্বামী-সোহাগে সে এক্ষণে গৃহের কর্ত্রী; সুতরাং সে নানাপ্রকারে তাহার এই বিজাতীয় বিদ্বেষ-বিষে আনোয়ারাকে দগ্ধ করিতে আরম্ভ করিল।
সে প্রথমে আনোয়ারার পড়াশুনা বন্ধ করিয়া দিল, এবং নানা ছলনায় অশ্রাব্য অকথ্য কটূক্তির সহিত তাহাকে দাসীগণের কার্য্যরে সহায়তা করিতে বাধ্য করিল। বালিকা ভয়ে ভয়ে বিমাতার আদেশ পালনে প্রবৃত্ত ইইল ইহাতে তাহার নিয়মিতরূপে স্কুলে পড়া আর চলিল না। আনোয়ারার দাদিমা বিদুষী রমণী ছিলেন। নাতিনীর পড়া বন্ধ হওয়ায়, তিনি যারপর নাই দুঃখিত হইলেন। পরন্তু, তিনি মেয়েকে দাসীর কার্য্যে প্রবৃত্ত দেখিয়া আর সহ্য করিতে পারিলেন না।
একদিন তিনি গোলাপজানকে কহিলেন,-“বৌ, তুমি সংসারের কর্ত্রী হইয়াছ, তাহাতে আমি সুখী হইয়াছি; কিন্তু তোমার একি ব্যবহার? মেয়ে আজন্ম নিজ হাতে যাহা কখন করে নাই, আমরা দাসী দ্বারা যে সকল কাজ করাইয়া থাকি, তুমি কোন্ আক্কেলে সেই সব কাজ আমার অতিসোহাগের নাত্নী দ্বারা করাইতেছ। তোমার জুলুমে নাত্নীর আমার পড়া-শুনা বন্ধ হইয়াছে। যাহা হউক, ইহার পর তুমি আমার নাত্নীকে যে-সে সাংসারিক কাজে কখন র্ফমাইস্ করিতে পারিবে না? আমি কাল থেকে তাহাকে পড়িতে পাঠাইব।” বৃদ্ধার কথায় গোলাপজানের হৃদয়ের হিংসানল অনিবার্য্যবেগে জ্বলিয়া উঠিল; সে বাড়ীময় তোলপাড় করিয়া উচ্চকণ্ঠে নানাবিধ অকথ্য বাক্যে পঞ্চমুখে দাদি নাতিনী উভয়কে দগ্ধ করিতে লাগিল।
সেই রাত্রিতে আহারান্তে ভূঞাসাহেব তাঁহার দক্ষিণদ্বারী শয়ন-গৃহে খাটে বসিয়া, পৈতৃক রৌপ্য-ফুরসীতে চিন্তিত মনে তামাক সেবন করিতে করিতে স্ত্রীকে কহিলেন,- “দেখ, আজ সকালে তুমি যে কেলেঙ্কারী করিয়াছ, তাহাতে আমার কোন স্থানে মুখ দেখাইবার উপায় নাই।” গোলাপজান শুনিবামাত্র ক্রোধকটাক্ষে গ্রীবা উন্নত করিয়া কহিল,- “কি করিয়াছি?” ভূঞাসাহেব যত টুকু বিরক্ত হইয়া কথাটি পাড়িয়াছিলেন, গোলাপজানের ক্রোধ-কটাক্ষ দর্শনে থামিয়া গেলেন। একটু সুর নরম করিয়া কহিলেন,- “মা ও মেয়েকে বাপান্ত করিয়া গালাগালি করিয়াছ কেন?” গোলাপজান গর্ব্বভরে নিঃসংকোচে কহিল,- “বেশ করিয়াছি, আরও করিব!” ভূঞাসাহেব দুঃখিতস্বরে কহিলেন,- “কথা বলিতেই তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠ, তোমাকে আর কি বলিব?”
গো। সাধে কিগো জ্বলে উঠ্তে হয়।
ভূ। মা ও মেয়ে তোমার কি অনিষ্ট করিয়াছিল?
গো। না, তারা আর অন্যায় করিবে কি? তারা পীর-মোরশেদের মত শুয়ে-বসে খাইলে কোন দোষ নাই? আর আমি রাত দিন আগুনের তাতে চুলার গোরে বসিয়া বাঁদী-দাসীর মত খাট্নী খাটিয়া তাহাদিগকে দু’ একটা কাজের কথা বলিলেই যত দোষ?
ভূ। কাজের কথা ছোট-গলায় আদরের সহিত বলিলে দোষ হয় না? কিন্তু বাজারে-স্ত্রীলোকদিগের ন্যায় পাড়ামাথায় করিয়া অকথ্য বাক্যে গালাগালি করিলে জাত-মান থাকে না। আমাদের ঘরের বৌ ঝি অমন করিয়া গালবাজী ও ইতরামী করিলে সমাজের নিকট আমাদের মুখ দেখান ভার হয়।
গো। (ক্রোধকম্পিত আননে) “হাঁ, আমি বাজারে-স্ত্রীলোক-আমি ইতর?” এই বলিয়া অতি রোষে ঝট্কা দিয়া খাট হইতে নামিয়া পড়িয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইবার উপক্রম করিল। ভূঞাসাহেব ভাবিলেন, ‘যদি এ সময় ঘর হইতে চলিয়া যায়, তবে মহাবিভ্রাট ঘটাইবে। হয়, রাতারাতি জামতাড়া চলিয়া যাইবে, না হয়, কুস্থানে রাত কাটাইয়া আমার মুখে চূণ কালি দিবে।’ এ নিমিত্ত তিনি হুকার নল ফেলিয়া থাবা দিয়া তাহার বস্ত্রাঞ্চল ধরিয়া ফেলিলেন। কিন্তু গোলাপজানের সক্রোধ বল-প্রকাশে তাহার অবগুণ্ঠন খুলিয়া গেল। ভূঞাসাহেব দেখিলেন, গোলাপজানের দুধে-আলতা-মাখান দেহলাবণ্য ভিত্তিগাত্র-সংলগ্ন সুশুভ্র কাচ কাঞ্চনরশ্মি-প্রভায় জোলেখার সৌন্দর্য্যকে পরাভূত করিয়াছে। এই অপরূপ সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে ভূঞাসাহেবের মস্তিষ্ক ঘুরিয়া গেল; তিনি গোলাপজানের হাত ধরিয়া বিনীতভাবে বলিতে লাগিলেন,- “প্রিয়ে! আমাকে ত্যাগ করিয়া কোথায় যাইতেছ? তোমার অভাবে যে আমি দশদিক্ অন্ধকার দেখি। রাগে মাথায় দু’কথা বলিয়াছি বলিয়াই কি ঘর হইতে বাহির হইয়া যাইতে হয়? এ ঘর-সংসার, গরু-বাছুর, চাকর চাকরাণী সবই যে তোমার, সকলকেই যে তোমার হুকুম মত চলিতে হইবে।” স্বামী এই সামান্য ঘটনায় অমনভাবে অপরাধ স্বীকার করিলে, অতি দুর্জ্জন স্ত্রীলোকের মনও অনেকটা কোমল হইয়া আসে। গোলাপজানের মনও নরম হইল, সে ক্রন্দনের স্বরে বলিল,- “আমি কি তোমার গৃহস্থালীর লোকসান দেখিতে পারি? তোমারই সংসারের আয়-উন্নতির নিমিত্ত শরীর মাটী করিতেছি। আর তোমার কলাগাছের মত মেয়ে কেবলই ফুলের সাজী হইয়া শুইয়া-বসিয়া কাল কাটাইবে তাহাকে তোমারই সংসারের কাজে এক-আধটুকু র্ফমাইস করিলে, তোমার মা মুখে যা আসে তাই বলিয়া আমাকে গালি-গালাজ করে, পারে ত ধরিয়া মারে। এমন ভাবে আমি আর তোমার সংসার করিতে চাই না, তুমি আমাকে আমার ভাইয়ের বাড়ী পাঠাইয়া দেও, সুন্দরী বিবি আনিয়া সংসার কর?” ভূঞা সাহেব দেখিলেন, তাঁহার প্রেয়সীর নয়নযুগল অশ্র“প্লাবিত হইয়াছে; মনও খুব কোমল হইয়া আসিয়াছে। তখন তিনি প্রিয়তমার হস্ত ত্যাগ করিয়া তাহার স্খলিত-অঞ্চলযোগে গলিত-নয়নবারি মুছাইয়া দিয়া কহিলেন,- “প্রাণাধিকে! আর রাগ করিও না? তোমার ইচ্ছা মতই সংসার চালাও, আমি আর কিছু বলিব না।” এই বলিয়া তিনি আদরপূর্ব্বক তাহাকে খাটে তুলিলেন। সে রাত্রির পালা এইরূপে শেষ হইল।
ভূঞাসাহেব গোলাপজানকে বিবাহ করিয়া শেষ জীবনে এইরূপ অভিনয় আরও অনেকবার দেখাইয়াছেন এবং “দেহি পদপল্লবমুদারম্” বলিয়া পটক্ষেপ করিয়াছেন।
এস্থলে আমরা মধুপুরের আর একটি ভদ্র-পরিবারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ধৈর্য্যশীল প্রিয় পাঠক-পাঠিকাকে উপহার দিয়া আরব্ধ পরিচ্ছেদ শেষ করিব।
এই ভদ্র পরিবারের অভিভাবকের নাম-র্ফহাদ হোসেন তালুকদার। ইনি আমাদের হামিদার পিতা ও বালিকা-বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভূঞা সাহেবের বাড়ীর সহিত সংলগ্ন পশ্চিমাংশে ইঁহার বাটী। নিজ বাটীতেই বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে পর্দ্দার সুন্দর বন্দোবস্ত। বিবাহিতা ও অবিবাহিতা অনেক মেয়ে এই স্কুলে অধ্যয়ন করে। মধুপুরে তালুকদার সাহেবেরা বনিয়াদী ঘর। কালচক্রে তালুকের অনেকাংশ পরহস্তগত হইয়াছে; অবশিষ্ট তালুকের বার্ষিক আয় তিন শত টাকা মাত্র। তালুকদার সাহেবের খামারে তিন খাদা জমি। জমি বর্গা বা আধি দিয়া যে শস্যাদি প্রাপ্ত হন, তদ্বারা তাঁহার সংসার-খরচ চলিয়া যায়। পরিবারের মধ্যে স্ত্রী, এক কন্যা, এক শিশুপুত্র, একটি চাকরাণী ও একটি রাখাল চাকর। তালুকদার সাহেবের স্ত্রী শিক্ষিতা; কন্যা হামিদাকে তাঁহারা নিজ হাতে শিক্ষা দিয়া পূর্ব্বোল্লিখিত বেল্তা গ্রামে একটি সম্ভ্রান্তবংশীয় যুবকের সহিত বিবাহ দিয়াছেন। হামিদার স্বামী বি. এ পাশ করিয়া এক্ষণে কলিকাতা ল্ ক্লাসে পড়িতেছেন। র্ফহাদ হোসেন তালুকদার সাহেবের ন্যায় আত্ম প্রসাদী সুখী লোক অতি বিরল। ভূঞাসাহেবের সহিত তালুকদার সাহেবের বংশগত কোন আত্মীয়তা নাই; কিন্তু বহুকাল একত্র একস্থানে বাস করিয়া উভয় পরিবারে আত্মীয়তা অপেক্ষাও অধিকতর ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়া গিয়াছে। ভূঞাসাহেব অপেক্ষা তালুকদারসাহেব বয়সে বড়, জ্ঞানে প্রবীণ, স্বভাবে শ্রেষ্ঠ ও ধর্ম্মে উন্নত। ভূঞাসাহেব সংসারের গুরুতর বিষয় তালুকদার সাহেবকে জিজ্ঞাসা না করিয়া সম্পন্ন করেন না।