প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আনোয়ারা যে দুর্ব্বিষহ শিরঃপীড়ায় ও জ্বরাতিশয্যে শয্যাশায়িনী হইয়া ছট্ফট্ করিতেছিল ও প্রলাপ বকিতেছিল, আমরা আনুষঙ্গিক কথা-প্রসঙ্গে এ পর্যন্ত তাহার কোন তত্ত্বই লই নাই; এক্ষণে আসুন, আমরা ভূঞাসাহেবের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া একবার সেই পর্দ্দানশিন আনোয়ারাকে দেখিয়া আসি। ঐ শুনুন, “মাথা গেল-মাথা গেল!” বলিয়া বালিকা চিৎকার করিতেছে, বৃদ্ধ দাদিমা তাহার পিঠের কাছে বসিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইতেছেন।
এই সময় ভূঞাসাহেব একবার ঘরের দ্বারে আসিয়া উঁকি মারিয়া কহিলেন,-“মা, রাত্রিতে মেয়ের কি কোন অসুখ করিয়াছিল, হঠাৎ এরূপ কাতর হইবার কারণ কি?” জননী চোখের জল মুছিয়া কহিলেন,- “কি জানি বাছা, রাত্রিতে মেয়ের ভাত খাইতে যাওয়ায় একটু বিলম্ব হইয়াছিল বলিয়া, বৌ তাহাকে বাপান্ত করিয়া গালাগালি করিয়াছিল, তাই বাছা আমার, ঘেন্নায় ভাতপানি ত্যাগ করিয়া ঘরে আসিয়া শোয়। শেষ রাত্রিতে যখন আমি তাহাজ্জদের নামাজ পড়িতে উঠি, তখন মেয়ে ঘুমের ঘোরে দুই তিন বার জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে, শেষে ‘মা, মা’ করিয়া কাঁদিয়া উঠে। ভোরে হাত মুখ ধুইয়া ঘরে আসিয়াই তাহার এ দশা হইয়াছে। নাক চোখ- মুখ জবাফুলের মত লাল হইয়াছে, গা দিয়া আগুন ছুটিতেছে, থাকিয়া থাকিয়া প্রলাপ বকিতেছে।হামিদার মা দেখিয়া কহিল, মেয়ের অবস্থা ভাল নয়। সত্বর ডাক্তার দেখান” ভূঞাসাহেব তখন উঠিয়া স্বচক্ষে মেয়ের পীড়ার অবস্থা দেখিয়া চিন্তিত হইলেন এবং ধীরে ধীরে কহিলেন,-“এখন কি করা যায়? ভাল ডাক্তার নিকটে নাই, টাকা পয়সাও হাতে নাই,পাটগুলি খরিদদার অভাবে বিক্রয় হইতেছে না, এখন উপায় কি?” এই বলিয়া তিনি ঘর হইতে বাহিরে আসিলেন। ছেলের কথা শুনিয়া মা ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। এই সময় দক্ষিণ-দ্বারী ঘরের বারান্দায় বসিয়া গোলাপজান মাতা-পুত্রের কথাবার্ত্তা উৎকর্ণ হইয়া শুনিতেছিল। ভূঞাসাহেব প্রাঙ্গণে পদার্পণ করিবারমাত্র সে কুপিতা বাঘিনীর মত গর্জ্জিয়া উঠিয়া কহিল,- “আমার গালির চোটে তোমাদের সোনার-কমল শুকাইতে বসিয়াছে, এখন আর কি, পালের বড় গরুটা বেচে তার জন্য ডাক্তার আনা হউক্। তা যাই করা হোক্, ফয়েজ (আজিমুল্লার পুত্র) কাল টাকার জন্য আসিয়াছিল, তাদের খুব ঠেকা। আমি বলিয়া দিয়াছি, পাট বিক্রয় হইলেই তোমাদের টাকা দেওয়াইব। আমি ভালমুখে বলিতেছি, আমার ভাইয়ের বিনা সুদের হাওলাতী টাকা শোধ করিয়া, যাহা মনে চায়, তাই যেন করা হয়।”-এই বলিয়া গোলাপজান ঘৃণার সহিত মুখনাড়া দিয়া সবেগে রান্না ঘরের আঙ্গিনার দিকে বলিয়া গেল। ভূঞাসাহেব অপরাধী মানুষের মত চুপ্টি করিয়া বাহির বাড়ীতে আসিলেন। এই সময় আনোয়ারা পুনরায় প্রলাপ বকিয়া উঠিল,- “মাগো, আমাকে কাছে লইয়া যাও, আমি আর এখানে থাকিব না।”
বেলা এক প্রহর অতীত হইয়াছে; একখানি পান্সী ভূঞাসাহেবের বাহির বাড়ীর সম্মুখ দিয়া পশ্চিম মুখে চলিয়া যাইতেছিল। নৌকার মাঝি ভূঞাসাহেবকে দেখিয়া কহিল,- “আপনাদের পাড়ায় পাট পাওয়া যাইবে?” ভূঞাসাহেব কহিলেন,-“হাঁ, আমার বাড়ী এবং আরও অনেক বাড়ীতে পাট মজুত আছে।” মাঝি নৌকার গতিরোধ করিয়া তাঁহার ঘাটে নৌকা বাঁধিল। একটি ভদ্রলোক ও তাঁহার পিছনে পিছনে আর একটি লোক পাট দেখিবার নিমিত্ত ভূঞাসাহেবের বাড়ীর উপর নামিলেন। ভূঞাসাহেব ভদ্রলোকটিকে দেখিয়া কেমন যেন এক ধাঁধায় পড়িয়া অনেক ক্ষণ তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন, পরে জিজ্ঞাসা করিলেন,- “আপনাদিগের নৌকা কোথাকার?” সঙ্গীয় লোকটি বলিল,-“বেলগাঁও জুট-কোম্পানির।” ভদ্র লোকটিকে লক্ষ্য করিয়া কহিল,-“ইনি সেই কোম্পানির বড়বাবু।” ভূঞাসাহেবের ধাঁধা কাটিয়া গেল। বেলগাঁও বন্দরে সকলেই ভদ্র লোকটিকে ‘বড়বাবু’ বলিয়া সম্ভাষণ করিয়া থাকে। বড়বাবু কোম্পানির আদেশে পাটের মরসুমে একবার করিয়া মফঃস্বল ঘুরিয়া পাটের অবস্থা দেখিয়া যান এবং নমুনাস্বরূপ ২/৪ নৌকা রোঝাই করিয়া পাট লইয়া থাকেন। এবারও তিনি সেই উদ্দেশ্যেই মফঃস্বলে আসিয়াছেন।
ভূঞাসাহেব বড়বাবুকে সম্মানের সহিত নিজের বৈঠকখানায় বসিতে দিলেন। তাঁহার একজন চাকর এক ভাড়া পাট আনিয়া বড়বাবুর সম্মুখে রাখিল। সঙ্গীয় লোকটি পাট খুলিয়া নাড়িয়াচাড়িয়া দেখিতে লাগিল। এই সময় তালুকদার সাহেবও পাটবিক্রয়মানসে তথায় আসিলেন। তিনিও প্রথমে বড়বাবুকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন। আবার এই সময় আমাদের ভোলার মা কার্য্যােপলক্ষে বহির্ব্বাটীতে আসিয়াছিল, সে ঊর্দ্ধশ্বাসে বাড়ীর মধ্যে যাইয়া, হামিদার মাকে কহিল,- “মা-জান, মজার কাণ্ড, দুলামিঞা যে পাটের বেপারী!” হামিদার মা কহিল,-“তুমি বল কি?” ভোলার মা কহিল,-‘আমার চোখের কছম, সত্যি বলিতেছি, দুলামিঞা ভূঞাসাহেবের বৈঠকখানায় বসিয়া পাট কিনিতেছেন।” হামিদার মা কহিলেন,-“উনি কোথায় গেলেন?” ভোলার মা কহিল,-“তিনি দুলামিঞার কাছে গিয়াছেন।” হামিদার মা তখন ভোলার মাকে কহিলেন,-“তুমি এখনি যাও, তাঁহাকে বাড়ীতে ডাকিয়া আন।” ভোলার মা পুনরায় বহির্ব্বাটীর দিকে চলিল। এবার মা ও মেয়ে উভয়ে সন্দেহের দোলায় ঘুরপাক খাইতে লাগিলেন।
এদিকে বহির্ব্বটীতে পাটের দর-দস্তুর চলিতেছে; এখন সময় ভূঞাসাহেবের অন্তঃপুরে অস্ফুট ক্রন্দনের রোল উঠিল। তালুকদার সাহেব কহিলেন,-“বাড়ীর ভিতর কাঁদে কে?”
ভূ-সা। “বোধ হয় মা।”
তালু। “কেন? কি হইয়াছে”?
ভূ-সা। “মেয়েটি ভয়ানক কাতর হইয়া পড়িয়াছে।”
তালুকদার সাহেব-“বল কি!” বলিয়া বাড়ীর মধ্যে চলিয়া গেলেন; কিয়ৎক্ষণ পরে ফিরিয়া আসিয়া ভূঞাসাহেবকে কহিলেন,-“তোমার মত নির্দ্দয় লোক ত আর দেখা যায় না। তুমি আসন্নমৃতা কন্যাকে ঘরে রাখিয়া পাট বিক্রয় করিতে বসিয়াছ! সত্বর ডাক্তার ডাক।”
এই সময় বড়বাবুর সঙ্গীয় লোকটি আড়ালে যাইয়া তামাক খাইতেছিল। সে বাবুর সাক্ষাতে তামাক খায় না। এ ব্যক্তি পাটের যাচনদার, বড়বাবুর সঙ্গে থাকে। যাচনদার পীড়ার কথা শুনিয়া ভূঞাসাহেবকে ছোট ছোট করিয়া কহিল,-“আমাদের বড়বাবু খুব ভাল ডাক্তার, বাক্স-ভরা ঔষধপত্র ইঁহার নৌকায় আছে। ইঁহার মত লোক আমরা আর দেখি না। পীড়িতের প্রাণ রক্ষার জন্য ইনি নিজের প্রাণ তুচ্ছজ্ঞান করেন। এমন কি, চিকিৎসার জন্য কাহারও নিকট টাকা-পয়সা লন না। আপনি ইঁহার দ্বারা আপনার কন্যার চিকিৎসা করাইতে পারেন।” কৃপণ-স্বভাব ভূঞাসাহেব বিনা টাকায় চিকিৎসা হইতে পারিবে মনে করিয়া আশ্বস্ত হইলেন; কিন্তু কন্যা বয়স্থা মনে করিয়া ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন। অবশেষে তালুকদার সাহেবকে সমস্ত কথা খুলিয়া বলায় তিনি কহিলেন,-“যে অবস্থা, তাহাতে পর্দ্দার সম্মান রক্ষা করা অপেক্ষা এক্ষণে চেষ্টা করিয়া তাহার প্রাণরক্ষা করাই সুসঙ্গত মনে করি; আমাদের হাদিসেও এইরূপ বিধান আছে।” ভূঞাসাহেব তখন আর দ্বিধা বোধ না করিয়া বড়বাবুকে যাইয়া কহিলেন,-“জনাব, শুনিলাম আপনি একজন ভাল চিকিৎসক? আমার একটি কন্যা প্রাণসংশয়াপন্ন কাতর; আপনি মেহেরবাণীপূর্ব্বক তাঁহার চিকিৎসা করিলে সুখী হইতাম।” বড়বাবু কহিলেন,-“আমি চিকিৎসক নহি, তবে নিজের প্রয়োজনবশতঃ ঔষধ-পত্র সঙ্গে রাখি, সময় ও অবস্থাবিশেষে অন্যকেও দিয়া থাকি।” ভূঞাসাহেব কহিলেন-“তা যাহা হউক, এই আসন্ন বিপদে আমার উপকার করিতেই হইবে।” বড়বাবু তখন পীড়ার অবস্থা শুনিয়া শিষ্টাচার জানাইয়া কহিলেন,-“তবে এক বার দেখা আবশ্যক।”