পাঠক অবগত আছেন, আনোয়ারার পীড়ার কথাপ্রসঙ্গে বড়বাবু কহিলেন-“একবার দেখা আবশ্যক।” ভূঞাসাহেব কহিলেন-“তবে মেহেরবাণী করিয়া বাড়ীর ভিতর চলুন।” তখন বড়বাবু ভূঞাসাহেব ও তালুকদার সাহেবের সহিত আনোয়ারার শয়নকক্ষে উপস্থিত হইলেন। বালিকার দাদিমা তৎপূর্ব্বেই তাহাকে মশারি দ্বারা পরদায় আচ্ছাদিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। ঘরে যে লোকজন প্রবেশ করিয়াছে, বালিকা তাহা টের পায় নাই; সে দুর্ব্বিসহ শিরঃপীড়ায় অস্থির হইয়া এই সময় মশারি উল্টাইয়া ফেলিয়া দিল। তাহার দাদিমা, “পোড়ারমুখী সব ফেলিয়া দিল” বলিয়া পুনরায় তাহাকে পর্দাবৃত করিতে চেষ্টা করিলেন। বড়বাবু কহিলেন,-“আচ্ছা একটু অপেক্ষা করুন, আমি শীঘ্রই পীড়ার অবস্থা বুঝিতে পারিব।” এই বলিয়া তিনি বালিকার মুখের দিকে তাকাইলেন। দৃষ্টিমাত্র বিস্ময়ে তাঁহার অন্তস্তল আলোড়িত হইয়া উঠিল। কিন্তু প্রচণ্ডবেগে ঘূর্ণিত পৃথিবীর গতি যেমন অনুভব করা যায় না, সেইরূপ বাহিরের অবস্থায় বড়বাবুর ভাবান্তর অন্য কেহ টের পাইলেন না। তিনি বুঝিলেন, এই বালিকাই শেষে খিড়কীদ্বার হইতে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে। এই সময় বালিকা একবার চক্ষুরুন্মীলন করিল। তাহার রক্ত-চক্ষু দেখিয়া বড়বাবু একান্ত বিমর্ষ হইলেন; এবং সত্বর মাথায় জলপটী দেওয়া আবশ্যক মনে করিয়া কাঁচি ও সূক্ষ্ম বস্ত্রখণ্ড চাহিলেন। ভূঞাসাহেব তাহা আনিবার জন্য কক্ষান্তরে গমন করিলেন। বড়বাবু থার্ম্মোমিটার দ্বারা পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন, জ্বর ১০৫ ডিগ্রী। তিনি ব্যাকুলভাবে হাত ধরিয়া নাড়ী দেখিলেন। দেখিয়া বুঝিলেন, সান্নিপাতিক জ্বর। বড়বাবু হতাশচিত্তে পুনরায় বালিকার মুখের দিকে চাহিলেন এবং অস্ফুটস্বরে কহিলেন,-“দয়াময়! তুমি ইহাকে রক্ষা কর।” এই সময় আনোয়ারা জ্ঞানশূন্যভাবেই পুনরায় চক্ষুরুন্মীলন করিয়া পার্শ্বপরিবর্ত্তন করিল এবং প্রলাপের বাক্যে কহিল-“ইনিই কি তিনি?”
ভূঞাসাহেব কাঁচি ও বস্ত্রখণ্ড লইয়া পুনরায় তথায় আসিলেন। বড়বাবু তাঁহাকে কহিলেন,-“আপনি রোগিণীর ঠিক মাথার মাঝখানের এক গোছ চুল কাটিয়া দেন।” ভূঞাসাহেব কহিলেন,-“আমার কাটা ঠিক হইবে না, আপনিই কাটুন।” বড়বাবু তখন বালিকার মাথার একগোছ চুল কাটিয়া ফেলিলেন। কর্ত্তিত কেশগুলি এত চিক্কণ ও দীর্ঘ যে, তিনি ওরূপ কেশ আর কখন দেখেন নাই। ইতস্ততঃ করিয়া তিনি আর চুল কাটিলেন না। কর্ত্তিত স্থানের আশেপাশের চুল সরাইয়া মাথায় জলপটী বসাইয়া দিলেন। এই প্রক্রিয়ায় বালিকার অসহ্য শিরঃপীড়া অল্প সময়ে অনেকটা উপশমিত হইল। ভূঞাসাহেব বড়বাবুকে বিজ্ঞ ডাক্তার বলিয়া জ্ঞান করিলেন। বড়বাবু সকলের অজ্ঞাতে ক্ষিপ্রহস্তে কর্ত্তিত কেশগুলি অঙ্গুলিতে জড়াইয়া নিজ পকেটস্থ করিলেন।
অতঃপর সকলে উঠিয়া বহির্ব্বাটীতে আসিলেন। বড়বাবু নৌকা হইতে ঔষধের বাক্স আনাইয়া দুই প্রকার দুই শিশি ঔষধ দিলেন। ক্ষুধা পাইলে দুধবার্লি পথ্যের কথা বলিয়া দিলেন। পাটের দরদস্তুর করিতে আর কথাখরচ কোন পক্ষেই হইল না। ভূঞাসাহেব ১৩০ মণ ও তালুকদার সাহেব ২৭ মণ পাট ৫ টাকা দরে বিক্রয় করিলেন। পাটের মূল্য মিটাইয়া দিয়া নৌকায় উঠিবার সময় ভূঞাসাহেব পাঁচটী টাকা দর্শনীস্বরূপ বড়বাবুকে দিতে উদ্যত হইলেন। বড়বাবু কহিলেন,-“আমি টাকা লইয়া চিকিৎসা করি না। যে ভাবে যতটুকু পারা যায়, মানুষই মানুষের উপকার করিবে, এই মনে করিয়া চিকিৎসা করিয়া থাকি।” এই বলিয়া তিনি টাকা গ্রহণ করিলেন না। আরও যাইবার সময় বলিয়া গেলেন, আমি স্থানান্তরে পাট দেখিয়া অপরাহ্ন ৩/৪টার সময় পুনরায় আপনার কন্যাকে দেখিয়া যাইব। আপনারা সাবধানে পর্য্যায়ক্রমে ঔষধ সেবন করাইবেন। বেলা তখন প্রায় ১২টা।
তালুকদার সাহেব পাট বিক্রয় করিয়া নিজ অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলেন। হামিদার মা কহিলেন,-“তুমি এতক্ষণে বাড়ীর মধ্যে আসিলে? আমার যে উৎকণ্ঠায় প্রাণ বাহির হইবার মত হইয়াছে।”
তা-সা। “কেন, কি হইয়াছে?”
হা-মা। “দামাদ মিঞা (জামাতা) কোথায়?”
তা-সা। “সে কি! এমন সংবাদ তোমাকে কে দিল?”
হা-মা। “তবে কি মিথ্যা কথা? ভোলার মা শশবাস্তে আসিয়া আমাকে বলিল-‘দুলামিঞা ভূঞাসাহেবের বাড়ীতে পাট কিনিতেছেন।’ আমিত শুনিয়াই অবাক্।” তালুকদার সাহেব হাসিতে লাগিলেন। এই সময় ভোলার মা তথায় আসিয়া তালুকদার সাহেবকে কহিল,-“বাবাজান, কৈ দুলামিঞাকে বাড়ীর মধ্যে আনিলেন না?” তালুকদার সাহেব তখন উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন এবং পরিহাস করিয়া ভোলার মাকে কহিলেন,-“দামাদ মিঞাকে তুমি ডাকিয়া না আনিলে, তিনি আসিবেন না বলিয়াছেন।” ভোলার মা কহিল,-“তবে আমিই যাই, তাঁহাকে আদর করিয়া লইয়া আসি।” এই বলিয়া বৃদ্ধা গমনোদ্যত হইল। রহস্য বুঝিয়া তখন হাসির চোটে তালুকদার সাহেবের পেটে ব্যথা ধরিল। হামিদার মা স্বামীর হাসির ভাবে বুঝিলেন ভোলার মা অন্য লোককে দামাদ মিঞার মত মনে করিয়াছে। তাই তিনি মুচ্কি হাসিয়া ভোলার মাকে কহিলেন,-“দূর হতভাগী, চোখের মাথা কি একেবারেই খেয়ে বসেছ?” ভোলার মার তখন কতকটা জ্ঞান হইল। সে কহিল,-“তবে কি বুবুজানও খেয়ে বসেছেন?” ভোলার মা হামিদাকে বুবুজান বলিয়া ডাকে।
হামি-মা। “ওমা! সে কি কথা? তাই বুঝি মেয়ে আমার ভাতপানি ছেড়ে বসেছে?”
হা-পি। “সে দেখিল কিরূপে?”
ভো-মা। “সেই দিন বুবুজানই ত তাঁর সইদিগের আঙ্গিনা হইতে দেখিয়া আসিয়া পহেলা আমাকে বলিয়াছেন।” তালুকদার সাহেব ঘটনার রহস্য আদ্যন্ত বুঝিয়া হাসিতে হাসিতে অস্থির হইয়া পড়িলেন। হামিদা কক্ষান্তরে থাকিয়া সরমে মরমে মরিয়া যাইতে লাগিল।
অতঃপর, হামিদার পিতা স্ত্রীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন,-“ঘটনা যেরূপ দাঁড়াইয়াছে তাহাতে সকলেরই ভুল হওয়া স্বাভাবিক। আমি এ বয়সে এমন এক চেহারার দুইজন লোক কোথাও কখন দেখি নাই। যিনি পাট কিনিতে আসিয়াছেন, তাঁহার সহিত দামাদ মিঞাকে বদল করা চলে। অন্যের কথা দূরে থাকুক, দামাদ মিঞা বলিয়া প্রথমে আমারই ভ্রম হইয়াছিল।” পিতার মুখে প্রকৃত অবস্থা শুনিয়া হামিদা হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল।
বলা বাহুল্য, আমাদের প্রাতঃকালে দৃষ্ট নৌকাস্থ যুবক হামিদার ভ্রমকল্পিত স্বামী, ভোলার মার দুলামিঞা, যাচনদারের বড়বাবু, আনোয়ারার চিকিৎসক ও আমাদের পূর্ব্ব-বর্ণিত নুরুল এস্লাম একই ব্যক্তি।
অতঃপর আমরা ইঁহাকে নাম ধরিয়া ডাকিব।
নুরুল এস্লাম অপরাহ্ন ৪টায় ফিরিয়া আসিয়া ভূঞাসাহেবের সহিত তাঁহার রোগিণীকে পুনরায় দেখিলেন। জ্বর কমিয়া ১০২ ডিগ্রী নামিয়াছে, চক্ষের লালিমা অনেক কমিয়াছে। তিনি ঔষধ বদলাইয়া দিয়া সে রাত্রি ভূঞাসাহেবের বাড়ীর ঘাটেই নৌকা বাঁধিয়া অবস্থান করিলেন। মঙ্গল মত রাত্রি প্রভাত হইলে, পুনরায় তিনি রোগিণীকে দেখিতে বাড়ীর মধ্যে গেলেন। দেখিলেন, স্ফুটনোন্মুখ গোলাপ-কলিকা যেমন মাধ্যাহ্নিক রবিকরতাপে বিবর্ণ ও কুঞ্জিত হইয়া যায়, নিদারুণ জ্বরোত্তাপে বালিকা সেইরূপ মলিন ও কৃশ হইয়া পড়িয়াছে; কিন্তু সুখের বিষয়, তাহার জ্বর ও চক্ষুর রক্তাভ ভাব ছুটিয়া গিয়াছে। নুরুল এস্লাম বহির্ব্বাটীতে আসিয়া রোগিণীর জ্বর-প্রতিষেধক বলকারক ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন এবং কহিলেন,-“আমি পাটের অবস্থা দেখিতে কিছুদিন এ অঞ্চলে আছি, ২/৩ দিন পরে আবার আসিয়া ঔষধ বদলাইয়া দিয়া যাইব।” ভূঞাসাহেব নুরুল এস্লামের ব্যবহারে ও মহত্ত্বে একান্ত মুগ্ধ হইলেন।