কয়েক দিবস পর অপরাহ্ন ৩ ঘটিকার সময় নুরুল এস্লাম পুনরায় আনোয়ারাকে দেখিতে আসিলেন। এই সময় পুরুষ মানুষ কেহই তাহাদের বাড়ীতে ছিল না; বাদসা রামনগর স্কুল হইতে এখনও ফিরে নাই, চাকরাণীগণ ঢেঁকিশালে। গতকল্য আজিমুল্লা আসিয়া তাহার ভগিনী গোলাপজানকে লইয়া গিয়াছে। এখন কেবল আনোয়ারা ও তাহার দাদিমা উপস্থিত। ভূঞাসাহেব কোথায় গিয়াছেন, কেহই জানে না। আমরা কিন্তু জানি, পরমন্ত্রৈণ ভূঞাসাহেব আজিমুল্লার বাড়ীতে গিয়াছেন। আনোয়ারার সহিত যাহাতে আজিমুল্লার পুত্রের বিবাহ হয়, তাহার পাকাপাকি বন্দোবস্তের নিমিত্ত চতুর আজিমুল্লা ভগিনীকে নিজ বাড়ীতে লইয়া গিয়াছে, ভূঞাসাহেবও তথায় উপস্থিত। আজিমুল্লার ভগিনীও ভগিনীপতিকে নানাবিধ সুখ-সুবিধার প্রলোভনে বশীভূত করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছে।
নুরুল এস্লাম বৈঠকখানায় প্রবেশ করিয়া কহিলেন,- “ভূঞাসাহেব বাড়ী আছেন?” আনোয়ারার দাদিমা বৈঠকখানার ঘরের আড়ালে থাকিয়া কহিলেন,- “আপনি বসুন, খোরশেদ সকাল বেলায় কোথায় গিয়াছে। যাইবার কালে বলিয়া গিয়াছে, আজ ডাক্তার সাহেব আসিতে পারেন; তিনি আসিলে, নৌকার লোকজনসহ তাঁহাকে জিয়াফৎ করিবে, আমি সত্বরই বাড়ী ফিরিব।” এই বলিয়া বৃদ্ধা আবার কহিলেন,- “আমার অনুরোধ, আপনি মেহেরবাণী করিয়া নৌকার লোক-জনসহ গরীবখানায় বৈকালের জিয়াফৎ কবুল করুন।” ডাক্তার সাহেব কহিলেন,- “জিয়াফতের আবশ্যক কি? আগে আপনার নাতিনীর কুশল সংবাদ বলুন।” বৃদ্ধা কহিলেন,- “আপনার চিকিৎসার গুণে আল্লার ফজলে নাতিনী আমার সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়াছে।” এই কথা বলিয়া বৃদ্ধা আনোয়ারার ঘরের সম্মুখে যাইয়া তাহার নাম ধরিয়া ডাকিলেন। আনোয়ারা দাদিমার নিকট আসিয়া মৃদুস্বরে কহিল,- “ডাকিলে কেন?”
বৃদ্ধা। “ডাক্তার সাহেব আসিয়াছেন, তাঁহাকে বৈকালের জিয়াফৎ করিলাম, এখন পাকের যোগাড়ে যা। আজ তোকেই রান্না র্কতে হবে।” শিশির-মুক্তাখচিত নববিকসিত প্রভাতকমল বালার্ক-কিরণোদ্ভিন্ন হইলে যেমন সুন্দর দেখায়, আনোয়ারার মুখপদ্ম এই সময় তদ্রুপ দেখাইতেছিল।
প্রবীণা দাদিমা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া কি যেন চিন্তা করিলেন।
বিশিষ্ট ভদ্রলোক নিয়ন্ত্রিত হইলে আনোয়ারাকেই পাক করিতে হইত। সে এক্ষণে পাকের কথা শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিল,- “কি রান্না করিব?”
বৃদ্ধা। “ঘরে পোলাওয়ের চাল আছে, ঘি-মসলা সবই আছে।”
আনো। “তরকারী কি দিয়া হইবে?” বৃদ্ধা নাতিনীর মন বুঝিবার জন্য কহিলেন,- “তোর টগর, জবা দুইটা দে। তোর বাপ বাড়ী আসিলে কিছু দাম লইয়া দিব।” টগর ও জবা আনোয়ারার স্নেহপালিত দুইটা খাসী মোরগের নাম। আনোয়ারা স্মিতমুখে কহিল,- “দাম যদি দাও তবে পঁচিশ টাকার কম লইব না।” বৃদ্ধা সুযোগ পাইয়া কহিলেন,- “যিনি বিনামূল্যে তোর প্রাণরক্ষা করিলেন, তাঁহারই জন্য মোরগ চাহিলাম, সেই মোরগের দাম অত টাকা চাহিলি? এই বুঝি লেখাপড়া শিক্ষার ফল? উপকারীর উপকার স্বীকার করা বুঝি এই রূপেই শিখিয়াছিস্?” আনোয়ারা কহিল,- “তুমিই ত প্রথমে দাম দিতে চাহিয়াছ। নচেৎ দুই দশটা মোরগ কেন, উপকারীর প্রত্যুপকারে জান দিতে পারি।” আনোয়ারা নবানুরাগে আত্মহারা হইয়া এই প্রথম অসাবধানে কথা কহিল। বৃদ্ধা কটাক্ষ করিয়া কহিলেন,- “হাঁ বুঝেছি, এখন পাকের যোগাড়ে যা।” আনোয়ারার তখন চৈতন্যোদয় হইল; সে দাঁতে জিব কাটিয়া সরমে মর মর হইয়া সরিয়া গেল। দাদি-নাতিনীর কথাবার্ত্তা অনুচ্চরবে হইতেছিল, তথাপি নুরুল এস্লাম তাহা শুনিতে পাইলেন। আনোয়ারার শেষ কথা তাঁহার কর্ণে অমৃতবর্ষণ করিয়া হৃদয়ের অন্তস্থল অভিষিক্ত করিয়া তুলিল। তিনি অনাস্বাদিতপূর্ব্ব সুখরসসিঞ্চনে বিভোর হইয়া ধীরে ধীরে নৌকায় গিয়া উপস্থিত হইলেন।
সন্ধ্যার পূর্ব্বে ভূঞাসাহেব বাড়ী আসিলেন। আনোয়ারার মোরগদ্বয় জবেহ করিয়া পোলাওয়ের আয়োজন হইল; তালুকদার সাহেবকেও জিয়াফৎ করা হইল। রাত্রিতে নৌকার লোকজনসহ নুরুল এস্লাম ভূঞাসাহেবের নিমন্ত্রণ রক্ষা করিলেন। তৃপ্তির সহিত সকলের ভোজনক্রিয়া শেষ হইল। আহারান্তে গল্পগুজব। তালুকদার সাহেব ও নুরুল এস্লামের পরস্পর বাক্যালাপে আনোয়ারার দাদিমা বাড়ীর মধ্য হইতে নুরুল এস্লামের যাবতীয় পরিচয় ও অবস্থা জানিতে পারিলেন এবং জানিয়া তিনি যেন এক ভবিষ্যৎ আশার আলোক সম্মুখে দেখিতে পাইলেন।
আহারান্তে নুরুল এস্লাম নৌকায় আসিলেন। পাচক নৌকায় যাইয়া কহিল,- “পাকের বড়াই আর করিব না। এমন পোলাও, কোর্মা জন্মেও খাই নাই। আকবরী পোলাওয়ের নাম গল্পে শুনিয়াছিলাম; আজ তাহা পেটে গেল।” যাচনদার কহিল,- “খুব বড় আমির ওমরাহ লোকের বাড়ীতেও এমন পাক সম্ভবে না।” নুরুল এস্লাম কহিলেন,- “তোমাদের কথা অতিরঞ্জিত বলিয়া বোধ হয় না; পাক বাস্তবিকই অনুপম হইয়াছিল।”
প্রাতে নামাজ ও কোরাণ পাঠ শেষ করিয়া নুরুল এস্লাম বিদায়ের জন্য ভূঞাসাহেবের বাড়ীর উপর আসিলেন। ভূঞাসাহেব ১৫্টি টাকা তাঁহার হাতে দিতে উদ্যত হইয়া কহিলেন,- “আপনার চিকিৎসার মূল্য দেওয়া আমার অসাধ্য। ঔষধের মূল্যবাবদ এই সামান্য কিছু গ্রহণ করুন।” নুরুল এস্লাম কহিলেন,- “আমি চিকিৎসা করিয়া টাকা লই না, পূর্ব্বেই বলিয়াছি।” ভূঞাসাহেব কহিলেন,- “ইহা না লইলে মনে করিব অযোগ্য জ্ঞানে গ্রহণ করিলেন না। তাহা হইলে আমার অসুখের সীমা থাকিবে না।” নুরুল এস্লাম কহিলেন,- “আপনি টাকা দিলে আমি শতগুণে অসন্তুষ্ট হইব।” ভূঞাসাহেব অগত্যা নিরস্ত হইলেন। ভূঞাসাহেব ও তাঁহার মাতাকে সালাম জানাইয়া, নুরুল এস্লাম বিদায় গ্রহণ করিলেন। যাইবার সময় তালুকদার সাহেবকেও সালাম করিয়া গেলেন।