বাঙালির প্রাণের মেলা একুশে বই মেলার বিদায় সুর করুণরস হয়ে বই প্রেমিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণের সৃষ্টি করছে। এমন সময়ে মেলার শেষদিকে বিশিষ্ট ফোকলোর ও লালন গবেষক অধ্যাপক ডক্টর আনোয়ারুল করিমের রবীন্দ্রনাথের দিনরাত্রি ও ছিন্নপত্রাবলী এবং শিক্ষাবিদ ও অসম্প্রদায়িক দু’বাংলার ইতিহাস-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের একুশ শতকীয় সংগ্রামী সৈনিক অধ্যাপক আবু ইউসুফ মোঃ আবদুল্লার ভারত ও বাংলা ভাগ: এক বিয়োগান্তক অধ্যায় বই দু’টি জ্ঞান পিপাসুদের আশার সঞ্চার করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। শিলাইদাহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে রবীন্দ্রনাথের জমিদারি এ অঞ্চলের মানুষের অন্তরের প্রতিচ্ছবি ধারণের এক অনন্য মাধ্যম। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বদরবারে ঠাঁই করেছেন বাংলার অপরূপ বর্ণনা করে। রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি গীতাঞ্জলি বাংলাদেশেই রচিত হয়েছে, যা আনোয়ারুল করিম তাঁর পূর্ববর্তী রচনা রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ শীর্ষক বইয়ের সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
এ গ্রন্থে লেখক তুলে ধরেছেন ঐ সমস্ত পত্রাবলী (২৫২টি পত্র) যেগুলো এ বাংলা থেকে দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভাইঝি ইন্দিরাকে লিখেছিলেন। ডক্টর করিম চিঠিগুলো কেন বিশ্বসাহিত্যে পত্রসাহিত্যের দিকনিদর্শন হিসেবে স্থান করেছে তা তুলে ধরে বলেন, “অদ্যাবদি পত্রসাহিত্যের এই নতুন ধারায় রবীন্দ্রনাথ গোটা বিশ্বেই বোধকরি অপ্রতিদ্বন্দ্বী।” এ পত্রগুলোর মধ্যে শিলাইদাহ থেকে ৯৩টি, শাহজাদপুর থেকে ৪৪টি, পতিসর থেকে ২৩টি এবং বাকীগুলো ঐ জমিদারি অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে যেসব জায়গায় গিয়েছেন সেখান থেকে লিখেছেন। লেখক পত্রগুলোকে স্থান, কাল ও বিষয়বস্তুর তাৎপর্য অনুসারে সাজিয়েছেন যাতে পাঠক রবীন্দ্রনাথের অর্ন্তদৃষ্টির প্রতিচ্ছবি উপলব্দি করতে পারে।
বাংলাদেশদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, হিন্দু-মুসলিম সর্ম্পক ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বুঝতে হলে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রবলী পড়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথকে এক অনন্য দার্শনিকও বানিয়েছে।” “খরা মৌসুমে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদাহ থেকে মেঠোপথে পাল্কীতে গড়াই নদীর ধার পর্যন্ত এসে নৌকায় চড়ে অপর পাড়ে কুষ্টিয়া শহরে ‘টেগোর এন্ড কোং’র বােিড়তে যেতেন। আর আসা যাবার সময় ক্ষণে ক্ষণে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে মানবিক রবীন্দ্রনাথ একাকার হয়ে যেতেন।”
ছিন্নপত্র কেন নাম হলো, এ প্রসঙ্গে ডক্টর করিম বলেন, “এর একটি চিঠির সঙ্গে অন্যটির তেমন কোনো মিল নেই। চিঠিতে অঞ্চলভেদ রয়েছে তেমনি এক স্থান থেকে লিখলেও তা ভিন্ন স্বাদের। প্রায় চিঠিগুলোর মধ্যে এক অশরীরী স্রোতোধারা যে ফল্লুর মতো প্রবাহমান, চিঠি পাঠেই তা দৃষ্টিগোচর হয়ে ওঠে।”
এ পত্রগুলোর কারণ কী? কিসের প্রয়োজনে এসব লেখা হলো? আধুনিক সময়ে খামের ভিতর কোন লিখিত চিঠি নিয়ে ডাকহরকরা আর দৌড়ে প্রাপকের কাছে ছুটে যায়না। এমনকি ই-মেইলের মাধ্যমেও এখন আর মানুষ নিজের কথাগুলো প্রকাশ করেনা। এখন সবাই ভিডিও কলের মাধ্যমে মনের কথাগুলো প্রকাশ করে বলেই মানের অনেক কথায় আবেগ প্রকাশ পায়না। কিন্তু চিঠির মাধ্যমে দূরদুরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজন ও মনের মানুষের মনের কথাগুলো দিনের পর দিন হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে লেখক বলেন “কীভাবে রবীন্দ্রনাথ বার্তা পাঠাবেন তাঁকে। কবিতা? গল্পে? না, চিঠিপত্রে। শেষমেশ চিঠিতেই লিখলেন তাঁর ভাবনার মনোহারিত্বের কথা। চিঠি হয়ে উঠলো সাহিত্য। কিন্তু এ কি সাহিত্য! এতো চলমান জীবনের নিত্যদিনের কথকতা। প্রতিমুহূর্তে, তাঁর দিন-রাত্রি সবকিছু যেন অবাক হয়ে কেবলই পত্রেই প্রকাশ পেল। এটি বুঝি বাংলা সাহিত্যে প্রথম পত্রসাহিত্য।”
রবীন্দ্রনাথের এ পত্রগুলোর মাধ্যমে কিভাবে বাংলাদেশ প্রকাশ পেল এবং বাংলাদেশ কিভাবে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বানিয়েছে এ প্রসঙ্গে শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “জমিদারি পরিদর্শন ও পরিচালনা করিতে আসিয়া বাঙালার অন্তরের সঙ্গে তাহার যোগ হইল-মানুষকে তিনি পূর্ণদৃষ্টিতে দেখিলেন। তাঁর কাব্যে ও অন্যান্য রচনায় নূতন রস, নূতন শক্তি, নূতন সৌন্দর্য দান করিল।” একই প্রসঙ্গে প্রমথনাথ বিশী তাঁর শিলাইদাহে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে দাবী করেন, “অনেক সময় ভাবি ঠাকুর পরিবারের এষ্টেট এই বঙ্গে না হয়ে যদি বাঁকুড়া বা পুরুলিয়ার নদী বিরল উষর অঞ্চলে হত, তবে রবীন্দ্র সাহিত্য কী রূপ গ্রহণ করতো? পদ্মা ও নদীময় বঙ্গ যে তাঁর কাব্যকে একটি বিশেষ দিকে প্ররোচিত করেছিল তাতে কারো সন্দেহ নাই, – পূর্বোক্ত উষর অঞ্চল কে প্রেরণা যোগাতো তাঁকে, কোন পথে প্ররোচনা দান করতো, স্থানের রূপান্তর কী রূপান্তর সাধিত করতো এবং শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রকাব্যে কী আকার ধারণ করতো চিন্তা করে কৌতুহর বোধ করি।”
আর ডক্টর করিমও একই অভিমত ব্যক্ত করেন। এ চিঠিগুলো নিছক ব্যক্তিগত চিঠি নয়। কেননা, “চিঠিগুলো এমন সময়ের লেখা যখন রবীন্দ্রনাথ তেমন খ্যাতিলাভ করেন নি এবং অন্যদের কাছে অনেকটাই অজানা ছিলেন। এই চিঠিগুলোর উপর তাঁর বিশেষ মমত্ব ছিল। বাংলাদেশের নানা জীবনবৈচিত্র্য এবং দুঃখ-শোকের কাহিনীগাথা এই ছিন্নপত্রাবলী। এই ছিঠিগুলোকে তিনি তাঁর সৃষ্টির এক সমৃদ্ধকাল ও যৌবন বয়সের এক মহৎ কর্মফল হিসেবে গণ্য করেছেন। এই পত্রগুলোতে তিনি মুক্তবিহঙ্গের আনন্দ পেয়েছেন। লেখার জন্য কোন চাপ ছিল না। যখন যা মনে হয়েছে, সেটিই লিখেছেন। প্রতিটি চিঠি পাঠ করলে তাঁর অসাধারণ ভালোবাসা ও মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়।” আর তাই লেখককে বলতে শুনি , “রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে কিন্তু তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটল পুষ্পিত সৌরভে বাংলাদেশ বাংলাদেশে এসেই।”

বইটি ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে ‘ভূমিকা’ ও ‘রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইংরেজ’ অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এ দু’অধ্যায়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বাংলাদেশে অনেক গুজব ও ভ্রান্ত মতবাদের জবাব দিযেছেন। প্রথমটিতে বাংলা ও বাংলাদেশের সাথে রবীন্দ্রনাথের জীবনবোধের সর্ম্পক এবং দ্বিতীয়টিতে তিনি যে ইংরেজ তোষণ করেন নি তা তুলে ধরেছেন।
পরিশেষে একথা বলা যায় বইটি লেখকের পল্লী উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের সমবায় ভাবনা, রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ, শিলাইদাহে রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার বাউল গ্রন্থের ধারাবাহিক প্রকাশনা। নি:সন্দেহে বলা যায় বইটি পত্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথ সর্ম্পকে নতুন ভাবনার উদয় ঘটাবে।

প্রকাশক : নওরোজ সাহিত্য সম্ভার
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৯
প্রচ্ছদ : জর্জ হায়দার
মূল্য : পাঁচশত টাকা