ভঙ্গুর অস্তিত্ব

ব্যস্ত সময়ের ঝুলি কাঁধে নিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছি পথ প্রান্তরের মিছেমিছির হাটে,
খানিক অবসরের খোঁজে ক্লান্ত দেহে ঘুরে দাঁড়াতে দেখি খরস্রোতা নদীর করালগ্রাসে গিলে খেয়েছে আমার পিছনে ফেলে আসা বিস্তৃত মাঠ; সুজলা সুফলা নয়নাভিরাম জনপদ এখন নদীর পেটে উত্তাল ঢেউ তুলছে।
ভাঙাগড়ার এই বাজারে আমারই টিকে থাকার নিশ্চয়তা কোথায়? কতটা ভঙ্গুর আমার অস্তিত্ব! একদিন হয়ত আমিও ইতিহাস হব, বিলীন হয়ে হারিয়ে যাব কালের গর্ভে। অনুজদের ভালোবাসাসিক্ত সমাধীতে দেয়া খোদাই করা নাম ফলকও খসে পড়ে মিশে যাবে মৃত্তিকার বুকে।।
……………………………………………

অলিখিত ইতিহাস

লিখিত ইতিহাসের চেয়ে অলিখিত ইতিহাস বেশ শক্তিশালী,
লিখিত ইতিহাসে সুক্ষ্ণ খাঁদ থাকে, থাকে হারামীপনার নিখুঁত পরিকল্পনাও,
লিখিত ইতিহাস রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে, জালিমকে মানবতার ধারক বাহক বানায় আবার মানবতার ধারক বাহকে বসায় জালিমের আসনে, দালালিপনায় ভর করে পথ চলে পৃথিবীর লিখিত ইতিহাসগুলো।
রাজাবাদশাহ ও ক্ষমতাসীনদের স্তুতি আর নির্লজ্জ তোষামোদীই ইতিহাসের মূল খোরাক।
আমি এমন বর্বর একচোখা ইতিহাস অস্বীকার করি, ঘৃণা করি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আর কামনা করি, মিথ্যার বেসাতিপরা অহমিকার নীলচাদরের গিলাপ বেষ্টিত ইতিহাসের প্রতিটির অক্ষর মুছে যাক, পৃথিবী বেঁচে যাক মিথ্যার নির্লজ্জ অভিশাপ থেকে আর জেগে উঠুক সত্য সুন্দরের প্রকৃত ইতিহাস, হোক না সেটা যতই অলিখিত।।
……………………………………………

জীবনের অমিমাংশিত অঙ্ক

আমি অনবরত হাঁটছি, ঘুরছি দেশ থেকে দেশান্তরে, বিরামহীন চলার মাঝে অবসাদ আসলে খানিক জিরিয়ে ফের ছুটে চলছি,
কোথায় আমার শেষ গন্তব্য? আমি কী আদৌ জানি আমার এই ছুটে চলার শেষ কোথায়?
কিংবা কতদুর পথ পাড়ি দিতে হবে?
আমার এই ছুটে চলা কী আসলে কোন অলিক মরীচিকার পিছে চলা নাকি সত্যিকার গন্তব্য অভিমুখে?
এক ধাপ পার হলেই আরেক ধাপ টপকানোর ইচ্ছে মাথাছাড়া দিয়ে উঠে সাংঘাতিকভাবে আর আমিও ধাপের পর ধাপ টপকিয়ে যাচ্ছি; প্রতিটি ধাপ টপকানোর সময় ভাবি হয়ত এটাই বুঝি আসল সফলতা কিন্তু না, তাহলে এটা কী লোভ নাকি আপেক্ষিক কিছু?
জীবনের অঙ্কগুলো এখানে বেশ অমিমাংশিত, গাণিতিক সূত্রগুলোও আজ যেন অকেজো।।
……………………………………………

প্রত্যাশার সোনালী বন্দর

অথই সমুদ্রে জীবন কম্পাস হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ায় আমি গন্তব্যচ্যুৎ হয়েছি, দিনরাত অনবরত ছুটে চলছি গন্তব্যের সন্ধানে কিন্তু আমি আমার গন্তব্যের কোন সন্ধান খুঁজে পাচ্ছি না, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমতো আর কম ঘুরিনি, ঘুরতে ঘুরতে আজ আমি বড্ড ক্লান্ত, আমার শরীরের অঙ্গগুলো যেন করজোড়ে আকুতি জানাচ্ছে আমরা আর পারছি না এবার নিস্কৃতি দাও, দাও অবসর।
তাহলে কী আমি মাঝপথে হেরে যাব? গন্তব্যের হাল ছেড়ে দিব? আর একটু চেষ্টা চালাতেতো দোষ নেই, যদিও দাঁড় বেয়ে যাবার শক্তি আমার হাতের নেই, বার বার হাত থেকে ছিটকে পড়ছে জীবনতরীর দাঁড়।
ক্লান্ত অবসাদ দেহ এলিয়ে পড়ছে আর আমিও হতাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছি, চোখভরা ঘুম আমাকে কামড়িয়ে ধরছে ঠিক তখনি কে যেন আমার কানে কানে বলছে “অলা তাহেনু অলা তাহজানু ওয়া আনতুমুল আওলাউনা ইন কুনতুম মু’মিনুন”, আমি জড়তা ঝেড়ে চোখ খুলতেই দেখি প্রত্যাশার সোনালী বন্দর ঠিক আমার সামনেই।।
……………………………………………

স্বেচ্ছায় নির্বাসন চাই

আমি হংস বলাকার মত ডানা ঝাপটিয়ে শূন্য আকাশে ওড়তে চাই,
যেখানে নেই কোন প্রতিপক্ষ কিংবা জাত দুশমন,
যেখানে শুধু আমি আর আমি, কেবলই আমার একক আধিপত্য।
ইচ্ছেরা আমায় ইদানিং এমন মুক্ত আকাশের সন্ধানে বেশ পুড়ছে, জ্বালাতন করছে বারবার বহুবার।
স্বার্থময়ী পৃথিবীতে অসম যুদ্ধে আমি এক পরাজিত সৈনিক,
আমার পরাজিত মনটা বারবার ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠে,
খুঁজে ফিরে প্রশান্তিময় এক সবুজ নীলিমা,
পৃথিবী আমাকে এমন প্রশান্তিময় সবুজ নীলিমা দিতে ব্যর্থ নাকি আমি পৃথিবীকে যুঁৎসই করে নিতে পারিনি সেটা বড্ড আপেক্ষিক,
তবে এখানে একসময় মানুষে মানুষে ছিল দারুণ সেতু বন্ধন, এখন যেটা সাংঘাতিক ভঙ্গুর,
সামান্য রেষারেষি কিংবা স্বার্থে একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, রক্তপানে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।
এখানে জীবনের দাম পানির দামের চেয়েও কম,
ইজ্জতের দামতো সেই কত আগেই খোলাবাজারে নিলাম হয়েছে।
মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতি যেন স্বেচ্ছায় নির্বাসনে!
আমিও স্বেচ্ছায় নির্বাসন চাই, হারিয়ে যেতে চাই হিংসা দ্বেষ কলহমুক্ত কোন ভীন গ্রহে।।
……………………………………………

অবিরত হাঁটছি

হাঁটছি অবিরত, এই যেন দক্ষ এক হাঁটুরে
কখনো নির্দিষ্ট ঠিকানায় আবার কখনোবা উদ্দেশ্যহীন,
যেমনটা পথহারা পথিক অজানায় বারবার পথের সন্ধানে হাঁটে,
দেহ মনে ক্লান্তি ভর করলে খানিক জিরিয়ে ফের হাঁটছি।
জানি না, সঠিক গন্তব্যে হাঁটছি কি না? নাকি কক্ষচ্যুত হয়ে ভিনগ্রহে?
অজানা বন্ধুর এবড়ে থেবড়ে পথে বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে ফের দাঁড়িয়ে গন্তব্যে হাঁটছি,
জীবন সুরুজ ডুবার আগেই যে আমাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতেই হবে,
টিকে থাকতে হবে আপন কক্ষ বলয়ে।।
……………………………………………

পতনের পদচিহ্ন

অচেনা পথের এক পথিক আমি,
হাঁটছি নিরবধি, এ যেন এক দক্ষ হাঁটুরে,
কখনো গতি কমে বাড়ে আবার কখনো ঠিক থমকে দাঁড়ায়,
খানিক বিরতির পর ফের ছুটে চলা,
আমি আমার কক্ষপথে নিরবধি ছুটে চলছি,
জানি না, এই ভবঘুরের পথ চলার শেষ কোথায়?
কোথায় গিয়ে চুড়ান্ত থমকে দাঁড়াবে জীবনগাড়ি?
নাকি শীর্ণদেহে আরো কয়কাল বয়ে যেতে হবে জীবনবোঝা?
অক্ষমতা আমায় ইদানিং তাড়াও করে না খুব একটা,
কেমন জানি নিরব উপহাস! নাকি চরম বিরক্ত?
তবে আমি জানি, আমি আমার পতনের শেষ পদচিহ্নটুকু আঁকছি, যেমনটা আঁকে শামুক।
……………………………………………

এই মিছিল থামাও

মিছিল থামাও, এই মিছিল আর বাড়তে দেয়া ঠিক হবে না,
ঘৃণ্য ও ধ্বংসাত্মক এই মিছিলের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে বিপদ ঢের বাড়বে,
প্রয়োজনে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করো, কাঁদানো গ্যাসের আমদানি বাড়াও সাথে বুলেট বেয়নটের ব্যবহারও,
তবুও এই মিছিল থামাও,
মিছিল যেমন অনেক হয়েছে, ঠিক তেমনি হয়েছে এই মিছিল প্রতিরোধে সীমাহীন গাফলতি,
এই দায় কার? সরকারের নাকি আমজনতার?
তবে দায়ী খুঁজতে গিয়ে প্রতিরোধের কথা ভুলছি বার বার বহুবার, করছি বহু দোষারোপের আরেক ঘৃণ্য রাজনীতি,
দোষারোপের রাজনীতিতে আমরা বেশ পারঙ্গমও বটে।
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে আমরা কী পারি না এই মিছিল থামাতে?
একটা স্বাধীন ভুখন্ডে ধর্ষিতা লাশ আর শোকের মিছিল এতদুর গড়াতে পারে না,
এই ঘৃণ্য ধ্বংসাত্মক মিছিল আর করদুর গড়ালে পরে আমাদের বোধোদয় হবে?
দোহাই লাগে এই মিছিল এক্ষুনি থামাও।
……………………………………………

পোড়া লাশের গন্ধ

বাতাসে ভাসছে পোড়া লাশের কর্কট দুর্গন্ধ,
এখানের বাতাস কেবল দূষিতই হচ্ছে,
দানবীয় উল্লাসে প্রতি ইঞ্চি মাটিও বিষাক্ত হচ্ছে,
দিন দিন মানবের জন্য বসবাসের অনুপোযোগী হচ্ছে এই জমিন।
সমাজের পরতে পরতে লোভাতুরের বিষেল দাঁতের ক্ষত চিহ্ন আর হায়েনার অবাধ বিচরণ,
হায়েনারা দাঁত কেলিয়ে হাসছে আর মানবের প্রতি ছুঁড়ছে ব্যঙ্গাত্বক তাচ্ছিল্যের চাহনি।
মানবতা জেগে উঠুক,
হায়েনারা নিশ্চিহ্ন হোক
আর মুক্তি পাক পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটি।
……………………………………………

নীল দহনের যাতনা

আমি অহর্নিশ জ্বলছি, জন্ম থেকেই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হওয়াই আমার নিয়তি,
অতি পোড়ার মাঝে নাকি গিনি সোনা হওয়া যায়, নয়তোবা কয়লা।
জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হওয়ার মাঝে আমি জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে ফিরি,
আগুনের নীল দহন আমাকে যত পোড়ায় যতো দগ্ধ করে ততই আমি জীবনকে নতুন করে উপলব্দি করি,
প্রতিনিয়তই আগুনের লেলিহান শিখায় বসে আমি স্বর্গের সুখ খুঁজে ফিরি।
আমি নীল দহনের যাতনায় পুড়ে পুড়ে বেঁচে যাই, ছুটে ফিরি অমৃতলোকের সন্ধানে।
……………………………………………

স্বর্গের সুখ আস্বাদন

আমি জেনে শুনে পা বাড়িয়েছি এমন বন্ধুর পথে,
জানি, আমার পথ চলা কুসুমাস্তীর্ন নয়, সাংঘাতিক কন্টকাকীর্ণ বটে।
আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছি,
যুদ্ধ ঘোষণা করছি দুনিয়ার পরাশক্তিগুলোর সাথে,
আমার প্রতিপক্ষ একক কোন শক্তি নয়, তাবৎ দুনিয়া আমার প্রতিপক্ষ।
আমি জানি, আমার শেষ পরিনতি কী হতে পারে? কীসের মুখোমুখি আমাকে দাঁড়াতে হতে পারে?
লোহার চিরুনি দিয়ে আমার হাঁড় থেকে মাংস আলাদা করা হতে পারে, চোখ নোখ উপড়ে দিতে পারে, করাত দিয়ে আমার একেকটা অঙ্গকে আলাদা করা হতে পারে, ড্রিল মেশিন দিয়ে আমার হৃদপিন্ডকে ফুটো করে দেয়া হতে পারে, স্টেনগান কিংবা রিভালবার ঠেকিয়ে আমার মাথা গুড়িয়ে দেয়া হতে পারে, শুলে চড়াতে পারে কিংবা জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে।
তবুও আমি প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করছি তাবৎ দুনিয়ার বিরুদ্ধে, আমি স্বাগত জানাচ্ছি আমার উপর নির্যাতনের যাবতীয় স্টীমরোলারকে।
আমি স্বজ্ঞানে আলিঙ্গন করেছি ঘাত প্রতিঘাত চড়াই উৎরাই আর অভাব অনটনকে।
আমি লড়াইকে সমাধান মনে করি, কাপুরুষের মতো পিষ্ঠ প্রদর্শনকে আমি মন মননের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঘৃণা করি।
সত্যের পথে লড়তে গিয়ে হাজার বাধার পাহাড়ের বেড়াজালেও আটকে পড়ে নির্যাতনের স্টীমরোলারে পিষ্ঠ হয়েও আমি স্বর্গের সুখ আস্বাদন করি।
……………………………………………

সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে

আর কতটুকু পথ পাড়ি দিলে সুখের দেখা মিলবে?
নাকি পথ চলার মাঝে গতিরুদ্ধ হয়ে জীবনাবসান হবে?
কাংখিত সুখ আর কত দূর?
আমি মুসাফির, ঘুরে ফিরে সুখের খোঁজে আজো পথ প্রান্তর মাড়িয়ে যাচ্ছি,
পথের যন্ত্রণার নীল দহনে লীন হয়েছি বারবার,
আশাহত হয়েও ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছি,
অনবরত ছুটে চলছি সমতল অসমতল পাহাড়ি বন্ধুর পথ।
এক বুক বিশ্বাস, আমি আমার সুখ মানযিলে পৌঁছতে পারব
নিতে পারব স্বচ্ছ নির্মল বায়ুর খানিক নিঃশ্বাস।
বয়সের ভারে আজ আমি ন্যুজ, তবুও ছুটছি বিরামহীন।
মন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠে কাংখিত সুখ আর কতদুর?
আর কতদুর হাঁটলেই পাব সুখ মানযিলের ঠিকানা?
আশা নিরাশার চোরাবালি মাড়িয়ে তবুও চলছি,
অচেনা এক আগন্তুক এসে পথ আগলে দাঁড়ায়-
বলে এসো বাছা, ঢের হয়েছে এবার বিশ্রামে যাও,
ওই দেখ সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে তোমার ঠিকানা,
আপাতত কয়দিন নাহয় ওখানেই থাকো।।