গাঁয়ু-মাইয়া

কী সাংঘাতিক ব্যাপার!টেরই পাইনি,কখন মেঘে মেঘে আকাশ, ছেয়ে গেছে।দড়দড় করে,এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল?দমকা হাওয়ায় সব হারিয়েও গেলো!শুধু বৃষ্টির কয়েক ফোটা পানি আমার শরীর ভিজিয়ে দিয়েই,চলে গেলো!
আমি বুঝতেই পারিনি,কখন-কীভাবে ফাতেমা আমার পাশে এসে নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।একটুখানি পিছন ফিরে,চোখে চোখ পড়ার সাথে সাথে,আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি।মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি যেন।ঝকমকা সালোয়ার-কামিজ পরে, একেবারে কপালে নীল টিপ এবং ঠোঁটে লাল লিপিস্টিক দিয়ে এসে হাজির!-এক্কেবার সিনেমার নায়িকা ঢঙে।
কতকাল দেখিনি ওকে।ওর মা মারা যাওয়ার পর, নানী বাড়ি,নানীর তত্বাবধায়নে থাকে।শুনেছিলাম,নানীদের বাড়ি সংলগ্ন হাইস্কুলে পড়ে।ফাতেমা প্রতিবেশী সম্পর্কে, আমার চাচাতো বোন।পাশাপাশি বাড়ি আমাদের।ওর মা, একদিন ওর বাবার সাথে ঝগড়া করে,ঘরের আড়ার সাথে, কাপড় গলায়
জড়িয়ে ঝুলে,আত্মহত্যা করে।খুব নাকি রাগি মেয়ে ছিল।কোনো কিছু হলেই ঘরের দরজায় খিল দিয়ে বসে থাকতো।
সেদিন সকালে পুলিশ আসে ওদের বাড়িতে।তারপর চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায়, বিষয়টার সমাধান করে,লাশ আমাদের গ্রামের কবরস্থানে দাফনের কাজ সম্পূর্ণ করে।তখন আমি আর ফাতেমা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তাম।ও আমাকে ধরে খুব-খুব কেঁদেছিল।একসাথে কত রকম খেলা করেছি।পুকুরে সাঁতার কেটেছি,মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি,ছোলার শাক তুলেছি।হঠাতই ঝড়োহাওয়া এসে,ঘরবাড়ির মত ভেঙেচুরে, এলোমেলো হয়ে যায় ওদের সংসার।
পরের দিন ফাতেমার নানী,ওকে নিয়ে গিয়েছিল।তাও এখন থেকে, প্রায় আট- নয় বছর হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে আমি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করছি।বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনরা বিয়ের জন্য মেয়ে খোঁজছে।আমিও মনে মনে মনের মত মেয়ে খুঁজছি।
ফাতেমাকে দেখে, চোখ ফেরাতে পারছি না।
প্রথমে ওই আমার সাথে কথা বললো,জলিল ভাই ক্যানদা আছো?
ওর কথা শুনে আমি হেসেছি কয়েক সেকেন্ড।তারপর বললাম,ভালো আছি,তুমি কেমন আছো?
-ভালাই তো,এতিম মাইয়ার ভালা যেমন, তেমনা।
এবার আমি ফিকফিক করে হেসে ফেলে,ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
ফাতেমা একটু অবাক হয়ে টেনেটেনে বললো,হাসলা ক্যান?হাসছোস্ ক্যান্?
আমি মুখে, নিজের হাত দিয়ে, হাসি ঠেকানোর চেষ্টা করছি।
ও বুঝতে পেরে, অসহায়তা প্রকাশ করে বললো,ও-বুজসি,আমার গাঁয়ু কতায় হাসলা?- হাসো,আমি তো গাঁয়ু মাইয়ায়।
আমি ওকে আর লজ্জা দিলাম না।ওর চিহারা এবং টলটলে শরীরের গঠন দেখার মত।
বললাম,গাঁয়ু মাইয়া তো!- তোমারে দেইকা তো পাগল হইবো যে কেউ…
-তুমি তো পাগল হও নাই,লোকের ছাওয়াল পাগল হইলে তুমার কী?
আমার কথার স্টাইল পাল্টিয়ে ফেললাম,মশকরা করলাম না।মনে মনে ভাবলাম,ওকে আর হাতছাড়া করবো না।
রাখটাক না করে স্পষ্ট করেই বলে ফেললাম,নারে তুই খুব ভালো মেয়ে,আমাকে বিয়ে করবি?
ফাতেমা খুব অবাক হয়ে বললো,কয় কী!- তুমি তো রাজপুত্।দ্যাবাগ মাইয়ায় তো তুমারে বিয়া করতে রাজি অইবে।
আমি আন্তরিক ভাবেই বললাম, কে রাজি হবে,সেটা বড় কথা নয়।তুমি রাজি হবে কিনা-বলো।
ফাতেমা তার ওড়না মুখে দিয়ে, আমার চোখে চোখ রেখে হারিয়ে গেলো,আমার মায়ের শাড়ির আঁচলের পিছনে।

আত্মজা

আব-ছায়া অন্ধকারে সাধনা ঘুরে বেড়াচ্ছে রেল স্টেশনে।গরু খোঁজা করে, খুঁজতে খুঁজতে চোখ দুটোয় ঘোলা দেখতে থাকে সে।অন্ধকার আর আলো এক হয়ে যায়।মাথাটা ঘোরে তার, চাঁদসূর্য একসাথে দেখে।
আজকের সুইপার সাধনা যুবতীকালে থৈথৈ যৌবন নিয়ে, টইটুম্বর নেচেছে যাত্রা মঞ্চে।তখন শীতের রাতে গ্রামে-গ্রামে,বাজারে-বাজারে সপ্তাহ ধরে যাত্রাপালা হতো।সেখানে ডানাকাটা পরী, সাধনার নাচ মানেই হাজার হাজার মানুষের ভীড়।হৈহৈরৈরৈ করে মঞ্চের সামনে যুবকরা সাধনার সাথে নাচতো।এখন যেমন শীত এলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা ক্লাবগুলো টাকা সংগ্রহের জন্য ধর্মীয় সভা দেয়,মাইকে নামের আগে হযরত মৌলানা মুফতি…ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক পদবী জুড়ে দিয়ে,বলে অশেষ নেকি হাসিল করুন।লোক যত বেশি হবে,টাকা তত সংগ্রহ বেশি হবে। এই আশায় অনেক অনেক আকর্ষণীয় কথা বলে প্রচার করে ।
ঠিক এই রকমই আগে প্রতিষ্ঠান বা ক্লাবগুলোর পক্ষ থেকে মাইকে গান বাজিয়ে বলা হতো,আরে-রে-রে নূপুরের ঝংকার,একঝাক ডানা কাটা পরীর সাথে দেখবেন, প্রিন্সেস সাধনার কোমর দোলানো নৃত্য। মানুষের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য প্রধান উপকরণ ছিল,আজকের সুইপার সাধনা,যার যৌবন দুলিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।সেই সাধনা,এখন বসবাস করে,আলমডাঙ্গা স্টেশনের ধারে, রেললাইনের গড়ানে কুঁড়ে ঘর পেঁতে।তার সাথে থাকে,তার একমাত্র যুবতী মেয়ে মালতী।মালতী যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটে,তখন মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান জাত ভেদাভেদ থাকে না,সব যুবকই হা করে তাকিয়ে থাকে।দেখতে থাকে,তার নিতম্ব দুলিয়ে হাঁটার ময়ূরী কারুকাজ।
রাত হয়েছে, মালতী এখনো ঘরে ফেরেনি।তাই সাধনার চোখ পলকহীন ঘুরছে স্টেশনের অলিতে-গলিতে।
তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির কারণে,যাত্রাপালার দিনও যেমন শেষ হয়েছে- তেমন সাধনার যৌবন হারিয়েছে।এখন বড় অসহায়ত্ব নিয়ে, ভীষণ দারিদ্রতার মধ্যে, সুইপারদের সাথে তার বসবাস করে।
যাত্রার ম্যানেজার রউফ বাবু, আগে প্রায়ই আসতো,এখন আর দেখাডাও করে না।তারও নাকি আয়-ইনকাম নেই।গ্রামে ভাইয়ের ছেলেদের কাছে থাকে আর মাঝে মাঝে লালণের আকড়ায় গিয়ে,গাঁজা খেয়ে হাঁবুড় হয়ে পড়ে থাকে।অথচ এই সাধনার বুকে মুখ না রাখলে, কোনো রাতেই তার ঘুম হতো না।
স্টেশনের পশ্চিমে আলো-ছায়ার মাঝে চোখ পড়ে সাধনার। মালতী দাঁড়িয়ে আছে,শুধু তার পা দুটো আর পিঠভর্তি চুলগুলো ছড়িয়ে আছে।পিছন থেকে মালতীর পোষাক আর মাজা থেকে স্রোতের মত গড়িয়ে যাওয়া পাছা দেখে,সাধনার বুঝতে বাকি থাকে না,এই শরীরই মালতীর শরীর।
সাধনা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
সুইপার সাধনা,সেকালের নর্তকী নয় সে।সে দাপটও নেই।অসহায়ের মত হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় বড় একটা পুরানো করবী গাছের আড়ালে।আলমডাঙ্গা স্টেশনের এ গাছটি বহুকালের, বহু ইতিহাসের সাক্ষী।
চোখে পড়ে,মুখ ভর্তি গোঁফ আর লম্বা-লম্বা চুলের লোকটা।সে তো ম্যানেজার!-
কী করছে সে?
জাত যে গেলো! তার নিজের মেয়েকে বুকের মধ্যে নিয়ে, সাধনার সাথে যা করতো তাই-ই করছে।
সাধনা চিৎকার করে ওঠে, তোর আল্লাহ, তোরে মাফ কইরবি নানে ম্যানেজার!- এ মালতী যে আমার মেয়ি…

আমাদের পৃথিবী

নিকষ অন্ধকার।আঁধারের একরাশ সাহসী বাতাস গুমরিয়ে বেড়াচ্ছে,দাপাদাপি করছে পৃথিবী জুড়ে।ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর এক প্রাণির ভয়ে নীরব মানবকুল।অথচ নিঃশব্দে আলোকিত হয়ে উঠছে চাঁদের ঝর্ণাময় এক জগত।মিষ্টতা ও স্নিগ্ধতায় ভরা সে আকাশ।
নির্ঘুম ও নীরব এ যাত্রাপথে, আমিই শুধু দাঁড়িয়ে আছি খোলা জানালায় হাত রেখে, কপালে গ্রিল ঠেকিয়ে, ঝড়ময় এক বিরহ নিয়ে।চারদিক থেকে, কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশের পর লাশ।যারা কবরস্থানের দিকে যাচ্ছে,তাদের গায়েও লাশের মত সাদা পোষাক।তাদের দেখতে,আমার কল্পনার ফেরেস্তার মত লাগছে।এ অন্য এক পৃথিবী, অন্ধকারময় পৃথিবী।
হঠাৎ মনে হলো,কেন দাঁড়িয়ে আছি,কেন আঁধারের দিকে তাকিয়ে আছি,তার কিছুই জানিনা।
এখন দেখছি,একপাল নর্তকী নেচে নেচে ঘুরছে, দূর আকাশের ঠিকানায়।হুলফুঁটানো মৌমাছির মত ভনভন শব্দ করে,কামড়িয়ে দিচ্ছে গোলাকার পৃথিবীটাকে।
আমি হয়তো অপেক্ষা করছি, আকাশের কোল থেকে ছড়িয়ে পড়া একপশলা চন্দ্রালোর প্রত্যাশায়।হায় আমার জীবন,যেন কবরে আছি।মাঝে মাঝে কোনো শৃগালও ভয়ে নড়ছে না-নড়ছে না কোনো বুনো পাখিও।তবে মাঝে-মাঝে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস, শরীরটা ছূঁয়েই হারিয়ে যাচ্ছে দূর অজানায়।দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে।এ কী লাশের গন্ধ,নাকি আমার স্মৃতি নিঃসৃত গন্ধ?- বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। এখন শুধু অন্ধকারই দেখছি না।দেখছি,নর্তকীর নৃত্য এবং ভোরের ভেজা আলো ও দূর্গন্ধযুক্ত বাতাস।যেহেতু চৈত্রমাস তাই প্রখর হতে সময় লাগবে না,এমনও বিশ্বাস জেগে জেগে উঠছে মনের কোঠরে।মনে হচ্ছে,জেগে উঠবে আমার স্বপ্নময় পৃথিবী।
পাশে কখন এসে, রজনী গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে, টের পাইনি।বামপাশে যখন ওমওম অনুভব করলাম, তখন ঝাঁকড়া একগুচ্ছ চুলের স্পর্শ আমাকে ভিন্নজগত থেকে ফিরিয়ে আনলো জানালার পাশে।আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে,একটুখানি হারিয়ে গিয়েছিলাম আঁধারে-আঁধারে,আলোর খোঁজে।সংসারটা যে আরো অন্ধকারময় তা অনুভব করলাম, আজই প্রথম।ভোগবাদী এ সমাজে আমরা ভারি অন্ধ।এমন সময়,এতরাতে কে যেন,সেই গানটি গাইছে, কানার হাটবাজার।ভালো করে খেয়াল করতে চেষ্টা করছি,বেশ দূরে সোহরাব মুন্সী গানটি গাইছে,একতারা বাজিয়ে।গানের সাথে টংটংটিংটিং শব্দ হলেও বেশ মধুর সুর মনে হচ্ছে।সোহরাব মুন্সী কোর্টে মহরার কাজ করে।বিয়েটিয়ে করেনি।মাথায় বড় বড় চুল রেখেছে।লালণের আখড়ায় যায়,গাঁজা খায়।এভাবেই কেটে যায় তার সময়।একদিন শুধু বলেছিল,মায়ার দুনিয়ায় মায়া বাড়িয়ি লাভ কী দাদা।যত তাড়াতাড়ি চইলি যাতি পারি ততই ভালো।
রজনী হাত ধরে টানছে।চলো না, ঘুমায়।
আমি বললাম রোজই তো তোমার সাথে ঘুমায়, আজ না হয় একাই ঘুমাও।
রজনী বাদ সাজে,না তা পারবো না।বলেই আমার একটা হাত উঁচু করে ওর বুকের মাঝে চেপে ধরলো।টইটম্বুর জীবনের মৃদুমৃদু ওম থৈথৈ করে নেচে উঠে।আমি ওর কপালে আমার ঠোঁট ঘঁষে-ঘঁষে বললাম,ও সব যে মানা।
রজনী মিষ্টি করে, পরীর ঢঙে হেসে বলে,মানা হোক চলো আমার সাথে।
কেন যেন আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম।সাথে রজনীও।
হঠাৎ রজনী চিৎকার দিয়ে, পূর্বদিকে হাত উঁচু করে দেখিয়ে বললো,দেখো দেখো কী সুন্দর চাঁদ উঠছে।
আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকলাম।গভীর রাতে তো, কখনো চাঁদ উঠা দেখার চেষ্টা করিনি।লাল আভায় আলোকিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী।ঝর্ণাধারায় মিষ্টি আলোয় আলোকিত হচ্ছে আমার চেতনা।
এটা যেন মহামুক্তির পথ।

উড়ে যায় পাখিরা

ছুঁই ছুঁই করে আর ছোঁয়া হয় না।থুঁই-থুঁই করে আর থোওয়া হলো না।ক্ষণে ক্ষণে উড়াল দিলো চন্দ্রালোয় মনটা।
সেদিন বাস যোগে কলেজে যাচ্ছিলাম।মেহেরপুর কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়তাম।মাঝপথে যাওয়ার পর,বাস থামলে, তিনজন মেয়ে স্কুল ড্রেস পরে, আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।আমরাও তিনজন ছিলাম-আশা, শহিদ ও আমি।লোকজন এমন ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে,পা রাখা জায়গা নেই।ভীড়ে সব চেপ্টা হয়ে যাচ্ছি।
অন্য দু’জন ছাত্রী বাসের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।আর একজন ছাত্রী আমার সামনে, আমার বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।কোনো রকমে সে আমার বুক থেকে, একটু দূরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।এরপরও বাসের ড্রাইভার ব্রেক করলেই, মেয়েটি আমার বুকে এসে ড্রপ খেয়ে, পিছানোর মরণপণ চেষ্টা করতে ব্যস্ত ছিল। এক সময় আমি উপরে দু’হাত দিয়ে,বাসের আড়া ধরে,মেয়েটিকে তার নির্দিষ্ট দাঁড়ানোর জায়গাটা নিরাপদ করে দিই।এরপর থেকে মেয়েটি বার বার ঘাড় উঁচু করে আমার মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিল।আমার চোখে চোখ পড়লে, অন্য মনস্কের ভাণ করে, চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলাম।এক ধরণের লুকোচুরি চলছিল আর পতপত করে মনের পর্দা দুলছিল।
বাসটা থেমে যায়,ওরা তিনজন তাড়াহুড়ো করে নেমে যায়।রাস্তার ধারের একটি হাইস্কুলে পড়ালেখা করে।
আমরা তিনজনেই কলেজ হোস্টেলে থাকতাম।সপ্তায় দুটো সিনেমা দেখতাম।দু,সপ্তা হলেই বৃহস্পতিবারে বাড়ি আসতাম।আবার শনিবারে সকালে, গাংনী থেকে বাসে উঠে,কলেজে গিয়ে ক্লাস ধরতাম।তার মানে,শনিবারে-শনিবারে ওই তিনজন ছাত্রীর সাথে দেখা হতো।এরপর আমার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির নাম জেনেছিলাম,মমতাজ।এভাবে,কয়েক মাস যেতে যেতে বেশ কাছাকাছি হই আমরা।
সপ্তাহ আর যেতে চাই না।দু’সপ্তাহ আর ধৈর্য ধরে না।প্রতি সপ্তায় বাড়ি আসি।আশা আর শহিদ না আসলেও, আমি ঠিকই আসি।কেন আসি তা জানি না।কারণহীন নীল আকাশের নীচে পাখা মেলে, উড়ার মত, উড়তে থাকি।মেয়েটি ছিপছিপে পাতলা, ঝকমকা শ্যামলা।ওর মিষ্টি হাসিটা দেখার জন্য একধরণের আকুলতা ছিল মনে মনে।
মমতাজ নামটা এতটা ভালো লেগে যায় যে,তাজমহল গড়ার স্বপ্ন দেখি।
একদিন মেহেরপুর শহরের স্টুডিওতে ছবি উঠতে গেছি।ভিতরে ঢুকে দেখি,আয়নার সামনে, মমতাজ ওড়নাটা রেখে,নিজেকে ঘুরে-ফিরে দেখছে।আমাকে দেখে বলে,এটা ভালো হলো না ভাই।
আমি ব্যক্তিত্ব দেখিয়ে বলি,তুমি ছবি ওঠো, আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।তখন মমতাজ লিপিস্টিক মাখা ঠোঁটটা আওলিয়ে, ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে, হেসে বলে,না-না আমার ছবি উঠা হয়ে গেছে।ছলাৎছলাৎ ঢেউ ওঠে মনে।
তখন ওর মুখের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা,কুঁকড়ানো চুলগুলো,ছূঁয়ে দিতে মন চাচ্ছিল। আমাকে বার বার আকর্ষণ করছিল।চেয়েছিলাম ওর দিকে।
আমি ওর সামনেই ছবি ওঠা চেয়ারে বসে পড়ি।আর স্টুডিওম্যান খোকন ভাই, নিজ হাতে, আমার ঘাড় একবার উঁচু করছিল,আবার একবার নিচু করছিল।মমতাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল,আর হাসছিল।আয়নার ভিতর মমতাজকে দেখছিলাম সিনেমার মত।সেদিন দুপুরেই ওকে সঙ্গে করে সিনেমাহলে ঢুকে ছিলাম।বুলবুল আহমেদ আর ববিতা অভিনীত ছবিটার নাম আজো মনে আছে।হয়তো মনে থাকবে অনেকদিন।
আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে।সে সময় একঝাঁক মেয়ে এসে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে।এদের মধ্যে মমতাজও ছিল।
শুধু আমরাই পরীক্ষা দিয়ে কলেজ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম,উচ্চ শিক্ষার জন্য, অন্য কোথাও ভর্তি হবো, সে প্রত্যাশা নিয়ে।মেহেরপুর ছাড়ার সময় অনেক বারই ভেবেছিলাম,মমতাজকে নিয়ে তাজমহল বানাবো।
রাজশাহীতে ভর্তি হয়ে,পরিচয় হয় নীলার সাথে।ধপধবে ফর্সা,লাল ঠোঁট, ডাগর ডাগর চোখ।যখন এ বর্ণনা দিচ্ছি,তখন আমি একশত ভাগ পুরুষ।তাই নীলা আমার সঙ্গি ছিল, শয়নে-স্বপনে।তিনটি বছর পেরিয়ে যায় আনন্দে-আনন্দে।
সেদিন সকালে ক্লাসে যাচ্ছিলাম।নীলাও রয়েছে সাথে। হঠাৎ মমতাজ এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে,ভাই আমি সমাজ বিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছি।ওহ্,আমাকে আর ছাড়তে চায় না।আমার শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে ওর সারা শরীর।নীলা অবাক হয়ে দেখছিল।হতাশা ওর মুখে মেঘের ছায়া ফেলেছে।অথচ আমি অনড়-অসাঢ় এক নীরব খুঁটি।
ধূসর হতে থাকি আমি।গড়তে পারিনি তাজমহল।ধরতে পারিনি নীলাকাশ। উড়ি মেঘে-মেঘে, পদ্মার কাশফুলের মত ঝরে ঝরে পড়ি…

নদী

একদিন একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে যায়।নামটা বলবো না।তবে নাম তো একটা দরকার।তাই ওর নাম রাখলাম নদী।ওকে সব সময়ই বলতাম,নদী শোন, কিছু বলো,একটু হাসো,একটু হাসো না সোনা ইত্যাদি।
নদী ওর মেঠো পথের মত শরীর দিয়ে, আমাকে ওর ওড়নার আঁচলে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতো।
তাকাতে বললে,নদী ঠিকই নদীর মত আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো।
ওর চোখের মধ্যে এবং চঞ্চলা চলমান আয়নার মত শরীরের মধ্যে আমার ঝলমলে মুখ দেখা যেতো।
নদী কলকল সুরে বলতো,ঠিক এই সুরে গান করোএবং আমার স্বরে কবিতা লেখো।
হাসতে বললে,নদী যখন হাসতো তখন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ভুলে যেতাম।
আমার আর বয়স কত হবে?
সেই শৈশবেই নদী আমাকে বায়ান্নের কবিতা শোনাতো।রক্ত দেওয়ার ইতিহাস বলতো।আমাকে প্রীতিলতা ও সূর্যসেনের কথা বলতো।আমাকে বিপ্লবী করে তুলতো।
অথচ সচেতন ভাবে ব্যক্তিত্ব বজায় রেখেই গোলাম মোস্তফা,ফররুখ আহমেদ,কায়কোবাদের কথা শুনতে উদ্বুদ্ধ করতো।অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
এরপর তার সবুজ শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দিগন্তে-দিগন্তে হারিয়ে যেতো।পাগল প্রেমিক আমি হা করে চেয়ে থাকতাম,আমার পরীর দিকে।
তখন আমার যৌবন আমাকে উন্মাতাল করে তুলতো।ওই দূর থেকে, নদী আমাকে হেসে হেসে হাত ইশারায় ডাকতো।ছুটতাম ওর পিছু পিছু।ঘুরতাম কলকল সুরের ছন্দ-তালে।একদিন নদী খুব, খুব কাছে ডেকে, ওর কোলের মধ্যে নিয়ে কবিতা শুনালো শামসুর রাহমানের কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’।
আজো আমি নদীর প্রেমে পাগল থাকি,পাগল হই,হায় নদী-আমার নদী।নিজের মুখ দেখি ওর চলমান শরীরে।শুধু কষ্ট হয়,কষ্ট আমার- যখন দেখি-ধীরে ধীরে ওর দ্রুত চঞ্চলা চলমান স্রোত,যেন থেমে যাচ্ছে।