প্রাক-কথন
যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষাই সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি। ভাষিক আপেক্ষিকতাবাদ স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে দেখার বা ভাববার পথ করে দেয় ভাষাচিন্তন-প্রক্রিয়া। আর ভাষা আয়ত্তকরণের অগ্রগতি নির্ভর করে পরিজ্ঞান-পদ্ধতি বা চিন্তন বিকাশের ওপর। মানব-সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ তার জন্মলগ্ন থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ও পরবর্তীকালে চর্চা করা ভাষার প্রতি দাবি আর দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গাদি প্রসারিত করেছে। বিস্তৃত হয়েছে ভাষার অধিকার আর মর্যাদা-বিষয়ক চিন্তারাজি। অপরাপর সামাজিক মৌলিক অধিকার অর্জন-প্রাপ্তির মতো ভাষার অস্তিত্ব-রক্ষার ভাবনাবলয়ও মানুষকে বিচলিত ও সচেতন রাখে আটপ্রহর। তেমনই এক স্বাভাবিক ভাষাপ্রীতি আর ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম বাঙালির ঐতিহ্যে যোগ করেছে নবতর ইতিহাস আর অর্জনের সম্ভ্রম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্র“য়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি আর বাংলাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বমানবের বিশেষ অভিনিবেশের মহাসড়কে। বায়ান্নোর ভাষা-আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম সুসংহত স্ফুরণ; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন ছিল মূখ্যত একটি জাতীয় সংগ্রাম। আর এর মূলকথা ছিল ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যচেতনা।

পটভূমির আগের কথা
আমাদের ভাষার ওপরে আক্রমণের ব্যাপারটা আকস্মিকভাবে, পাকিস্তান শাসনকালে, ঘটেছে- এমন নয়; আগেও ঘটেছে। বিশশতকের প্রথমদিকে ভারতের জাতীয় ভাষা নির্ধারণ-প্রশ্নে বাংলা ভাষা প্রথম বাধার শিকার হয়। রাজকার্য পরিচালনা এবং জ্ঞানের আদান-প্রদানের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজন দেখা দেয়। ভাষাগত উৎকর্ষ, ভাষাব্যবহারকারীর সংখ্যা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ধারক ও লালনকারী হিসেবে, তখন ভারতে, ১৪৭টি ভাষার মধ্যে বাংলা ছিল অগ্রবর্তী। বাংলার বাইরে বিভিন্নদিকে তার পরিব্যাপ্তি ছিল, মর্যাদা ছিল; মননের ও কাজের বিচিত্রদিকে অবিভক্ত ভারতে ছিল বাঙালির খ্যাতি। কিন্তু ধর্ম-ব্যবসা-রাজ্যবিস্তার আর জ্ঞানপ্রচারের বাহনরূপে বাংলা ভাষার প্রসারের প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়Ñ এর বর্ণমালা ও বানানের অস্পষ্টতা-অস্থিতি এবং সহজ-আয়ত্ব নয় বলে। ফারসি-সংস্কৃত-ইংরেজির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কার্য-পরিচালনায় বাংলা সেদিন তার সম্ভাব্যতা হারিয়েছে কেবল হিন্দি ভাষাব্যবহারকারীদের প্রতিপত্তি ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিজাত রাজনৈতিক কারণে। কেননা, সেসময় কংগ্রেস নেতারা হিন্দিকে ভারতের জাতীয় ভাষা করার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। দেশবিভাগ-পরবর্তীকালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা-প্রশ্নে রাজনৈতিকভাবে উর্দুকে আরোপ করার অনুপুঙ্খ চেষ্টা চলেছে; এছাড়া পূর্ব-পাকিস্তানে আরবি হরফে, অথবা, না-পারলে, নিদেনপক্ষে রোমান হরফে, বাংলা লেখার প্রস্তাবনাও বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং অধিকারে আঘাত হেনেছে অনিবার্যভাবে। আর তখন থেকেই চিহ্নিত হতে থাকে বাংলা ভাষার শত্রু-মিত্র।
যে মাতৃভাষার জন্য ১২৫২ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জনসাধারণ আন্দোলন করেছিল, আক্ষরিক অর্থে তা মুখের ভাষা ছিল না। কথ্য ভাষার জন্য প্রকৃতপক্ষে এমন আন্দোলনের দরকার হয় না। বাঙালির যদি শুধু ভাষার কথ্য রূপটাই থাকতো, তাহলে আন্দোলন অর্থহীন হতো। পৃথিবীতে এখনও অনেক জাতি-উপজাতি রয়েছে, যাদের গোষ্ঠীগত নিজস্ব ভাষা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রধান ভাষায় ব্যবহারিক কাজকর্ম করতে হয়। তাই বলতে হয়, সমস্যা দেখা দিয়েছিল বাংলা ভাষার লেখ্য রূপ থাকার জন্য, তাও আবার তা কি-না উর্দুর চেয়ে পুরনো, সর্বোপরি, তার ছিল এমন এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যা পৃথিবীর বহু উন্নত ভাষাতেও বিরল। এমনকি ইসলামি সাহিত্যের বিচারেও তা উর্দুর চেয়ে পিছিয়ে ছিল না। একুশের ভাষা-আন্দোলন তাই লেখ্য বাংলা ভাষার আন্দোলন, যার ওপরে আক্রমণ এসেছিল, এবং যা রক্ষা করতে বাঙালি তরুণদের প্রাণ দিতে হয়েছিল।

পরিপ্রেক্ষিত
একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল ওই একটি দিন কিংবা তারিখকেন্দ্রিক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; একটি জাতির, একটি ভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদার ওপর আসতে-থাকা আঘাতের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক-পরিকল্পিত চেতনার যোগফল। হাজার বছরের বাংলার ভাষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর বাংলা ভাষাসম্পদের চারিত্র্য রক্ষার অবশ্যম্ভাবী প্রতিবাদের অপর নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতালাভের পর থেকে বায়ান্ন-পরবর্তী সময়েও চলতে থাকে এই চেতনার বাদ-প্রতিবাদ। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির (১৪ আগস্ট ১৯৪৭) অব্যবহিত পরেই পূর্ব-পাকিস্তানের (আজকের ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূখণ্ড) জনগণ উপলব্ধি করেছে তাদের ঘোরলাগা-মেকি রঙমাখা চোখে আঁকা ‘সোনালি স্বপ্নে’র বাস্তবতা। তারা তখন দেখতে শুরু করেছে সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদের নিষ্পেষণে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষা-ভাষা-সংস্কৃতির স্বাভাবিক বিচরণে প্রতিবন্ধকতা আর গণতন্ত্র নির্বাসনের ইঙ্গিত। ১৯৪৮ সালে প্রাদেশিক পরিষদে ব্যাপকভাবে আলোচিত হবার পর বাংলা ভাষার বিরোধিরা আন্তরিকভাবে না হলেও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষা হওয়ার যুক্তি স্বীকার করতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের মনের কথা ছিল অন্যরকম। আধিপত্যবাদী-আগ্রাসি শাসক ইংরেজ যেমন ভারতের জনগণের ভাষাকে উপেক্ষা করে নিজ ভাষাকে এ ভূখণ্ডে দিয়েছিল বিশেষ মর্যাদা, নবগঠিত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও পূর্ব-পাকিস্তানের জনতার ভাষাকে অবহেলা করে, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে, চাপিয়ে দিতে চাইল তাদের ভাষা উর্দুকে। তখন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং অন্যঅর্থে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংগঠিত হয়েছে ভাষা-আন্দোলন বা ভাষা-সংগ্রাম। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের আইন-পরিষদে এবং অন্যত্র বাঙালির প্রভাব হবে উর্দুভাষীর চেয়ে কম- এমনটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি সেদিনের বাংলাভাষী মানুষ।
এই সংগ্রামের ইতিহাস ও প্রসঙ্গ কেবল আলংকারিক বর্ণনা-ভাষ্য নয়; এর ভেতরে রয়েছে আবেগ আর জাতীয়তা-সংলগ্নতার উর্বর বীজতলা। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ কিংবা ‘মাগো ওরা বলে,/সবার কথা কেড়ে নেবে/তোমার কোলে শুয়ে/গল্প শুনতে দেবে না’- এইসব উত্তেজক-জনপ্রিয় গান-কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে জন্মসূত্রে পাওয়া মায়ের ভাষা ব্যবহার করার অধিকারবোধ। ১৯৫২-র একুশে ফেব্র“য়ারি, বাঙালি, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে, প্রাদেশিক বাজেট অধিবেশন চলাকালে, সরকারঘোষিত আন্দোলন-প্রতিরোধক ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে, দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং জীবন উৎসর্গ করে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজপথে রক্তদান মানব ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা। জাতিসত্তার ধারণা বদলে দিতে পারে এমন ঘটনা সব সময়ে ঘটে না। কিন্তু ১৯৫২’র একুশে ফেব্রুয়ারিতে তেমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। আবহমান বাংলার ইতিহাসে ধূমকেতুর আবির্ভাবের মতো এই ঘটনা বাঙালি জাতিসত্তার ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত করে রাখে এক অমিত সম্ভাবনা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল বহির্প্রকাশ।
মাতৃভাষার স্বাধীকারচিন্তা তখন কেবল ভাষাকেন্দ্রিকই আবদ্ধ থাকেনি; মন-প্রাণ যুক্ত হয়ে মানবগোষ্ঠীর সামগ্রিকতায় উন্নীত হয়েছিল। বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও রাষ্ট্রভাষা-চিন্তার অন্তর্গত ছিল। এই অলঙ্ঘ্য কারণেই আটচলি¬শ-বায়ান্নো’র ভাষা-আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারি- প্রতীকে ধারণ করে রেখেছে প্রতিবাদী, সংগ্রামী বাঙালিত্বের অভিযান।

প্রাপ্তি
একুশে ফেব্র“য়ারি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ের স্মারক, যা আমাদেরকে অস্তিত্বের গভীর শেকড়ের দিকে তাকাতে বাধ্য করে, যে স্মারক মাতৃভাষা শব্দটিকে দেয় অনন্য তাৎপর্য, মায়ের প্রতি ভালোবাসার মতোই আমাদের আবেগকে উদ্বেলিত করে, সংগ্রামে প্রেরণা দেয়, সংকটে দেয় আশ্রয়। ভাষা-আন্দোলনের এই দিনটি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে মর্যাদা পায় এবং ১৯৫৬-তে বাংলা ভাষা, উর্দুর পাশাপাশি, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি লাভ করে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের (১৯৭১) মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হলে বাংলা একক রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার এই দুর্লভ আত্মত্যাগ ও পরম মূল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর ২১-এ ফেব্র“য়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৯৭ সালে ১ জানুয়ারি ‘বহুভাষীক ও বহুজাতিক মাতৃভাষাপ্রেমিক গ্রুপ’ নামে যে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করেছিল, সেটিই পরবর্তীকালে ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্র্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নাম ধারণ করে। এবং এই নবনামাঙ্কিত সংগঠনটি একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার যাবতীয় সাংগঠনিক-প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ ও দায়িত্ব পালন করে। এতোদিন একুশে ফেব্রুয়ারি সাড়ম্বরে কেবল বাংলাদেশে পালিত হতো; আর বাংলাদেশের বাইরে আংশিক-বিচ্ছিন্নভাবে পালিত হতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায়। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘভুক্ত দেশসমূহে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। সারাবিশ্বে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম, আলোচনার টেবিলে জায়গা পেয়েছে ভাষা-শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা এবং বাঙালির শৌর্য ও বীরত্বের কথামালা।
প্রসঙ্গত মনে করা যায়, ‘আন্তর্জাতিক মে দিবস’ (শ্রমিক দিবস)-এর কথা। ১৮৮৬-র মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ঘটেছিল শ্রমিক অভ্যুত্থান; প্রতিদিন ৮ (আট) ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে আত্মাহুতি দিয়েছিল শ্রমিকরা। ১৮৯০ সাল থেকে দেশে দেশে প্রতি বছর পয়লা মে পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক চরিত্রের ‘মে দিবস’ মূলতই শ্রমিক মানুষের। আর, আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ক্ষেত্রে বিবেচ্য যে, গুরুত্বে-মাত্রিকতায় সেই পরিধি ব্যাপকতর, বহুধাবিস্তৃত। কেননা, ভাষার সম্পৃক্ততা সমস্ত মানুষকে নিয়েই; মানুষের সর্বাঙ্গীণতার ধারক-পরিচায়ক তার ভাষা-সম্পদ। স্বাধীকার-নিশ্চয়তার আরেক নাম মাতৃভাষার অধিকার।
একুশ থেকে আমরা লাভ করেছি ঐতিহ্য পুনর্গঠনের বিষয়-পরিসর। শহীদ মিনারের গঠন, প্রভাতফেরি অনুষ্ঠান বা আলপনার ব্যবহারের মধ্যে তার প্রতিফলন রয়েছে। বিশেষভাবে প্রাচীন কৃষিসংস্কৃতির অন্যতম লোকশিল্প আলপনার যে নবরূপায়ন এখানে ঘটেছে, তা এক অভিনব আধুনিক সংযোজন। শহীদ মিনারের ভাস্কর্যের মধ্যে ইউরোপীয় কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় চেতনার মিশ্রণ। প্রভাতফেরির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অজ্ঞাত অতীতের খালি পায়ে পরিভ্রমণের স্মৃতি। মূলত একুশের অনুষঙ্গ যে আবহ সৃষ্টি করে, তা নতুনভাবে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ আধুনিক জাতিসত্তার গাঠনিক উপাদান, চেতনায় যা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়বাহী।

আপাত প্রাপ্তির অন্তরালে
মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রভাষার অধিকার লাভ এবং পরবর্তীকালে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ অভিধাপ্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক স্বস্তি। বাংলাভাষী মানুষ মর্যাদা ও স্বস্তির একটি বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হলেও বাংলা ভাষা আজও অযত্ন আর অবহেলার পাহাড়সম যন্ত্রণা বহন করে চলেছে। প্রশাসনিক কাজে এবং শিক্ষা ও প্রচার ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক ইংরেজিপ্রীতি আর বাংলা ভাষার যথেচ্ছ প্রয়োগ আমাদের সমূহ প্রাপ্তির পিঠে এক প্রবল আঘাতের চিহ্ন হিসেবে আজ বর্তমান। বাঙালির ইংরেজিয়ানা এবং ভাবপ্রকাশে জাতিগত হীনমন্যতা কম লজ্জার নয়। প্রায়োগিক-ভাষার অস্থিরতা মানবমনকেও বিচলিত-বিভ্রান্ত করছে প্রতিনিয়ত। আর সারা দুনিয়ায় মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আমাদের অবদানের জয়গান ঘোষিত-প্রচারিত হলেও এই দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতির লালনে আমরা সরকারি ও রাজনৈতিকভাবে ভীষণরকম অমনোযোগী এবং দায় ও দায়িত্ববর্জিত।
ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হবার প্রায় ছয় দশক অতিক্রান্ত হলেও, আজও তৈরি হয়নি এর নির্ভরযোগ্য ইতিহাস। সংগ্রামে পুরোভাগে নেতৃত্বে কারা ছিলেন, কতজন প্রাণ দিয়েছেন, কতজন আহত হয়েছেন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কী?- তার সঠিক হিসাব পাওয়া অন্তত কঠিন নয়; আজও জীবিত ও সক্রিয় রয়েছেন বেশকজন ভাষাসৈনিক, রয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচেষ্টা; রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, অন্যান্য গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতা। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী ২১ তারিখে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে নিহতের সংখ্যা ৩ (তিন) জন, আহত ৩০০ (তিনশত) জন ও গ্রেফতার ১৮০ (একশত আশি) জন; ২৩ ফেব্রুয়ারির সংবাদপত্রে পরিবেশিত তথ্য থেকে জানা যায়, নিহত ৫ (পাঁচ) জন, আহত ১২৫ (একশত পঁচিশ) জন ও গ্রেফতার ৩০ (তিরিশ) জন; ২৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় কর্মপরিষদের সভা থেকে সরকারকে ৭৫ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে যে পত্র দেয়া হয়, তাতে ৩৯ (উনচল্লি¬শ) জন শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করা হয় (এবং ওই সভায় ৫ মার্চ ‘শহীদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়); ২১ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যা ৭ (সাত) টায় লেখা একুশের প্রথম কবিতায় মাহবুব উল আলম চৌধুরী বলেছেন- ‘ওরা চলি¬শজন কিম্বা আরো বেশী/যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রৌদ্রদগ্ধ/কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়/ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য বাংলার জন্য/যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে’; প্রভাত ফেরিতে আবদুল গাফফার চৌধুরীর যে গান আমরা গাই, তাতে তিনি লিখেছেন- ‘ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্র“য়ারী/আমি কি ভুলিতে পারি’। আজকের প্রজন্মের কাছে, বিশ্ববাসীর কাছে, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের মাহাত্ম্যকে তুলে ধরতে হলে প্রয়োজন ইতিহাস-অন্বেষা এবং সঠিক তথ্য পরিবেশনের সদিচ্ছা। রাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি প্রচারমাধ্যম কিংবা বাংলা একাডেমীসহ অন্যান্য গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় এ দায়িত্ব পালনের দায় গ্রহণ করতে পারে।

প্রত্যাশা
একুশে ফেব্র“য়ারির মাহাত্ম্য, আজ, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ফলে ২১-কে নতুনভাবে জানার, উপলব্ধি করার ও বিশ্লেষণের এক বিশেষক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নতুন কাল-পরিসরে নিজস্ববলয়ে পূর্বাপর প্রাসঙ্গিকতা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে শিক্ষার বাহনরূপে ওইসব জাতির ভাষাকে ব্যবহারের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার; বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতি এবং মানবাধিকারের স্বার্থেই এমনটি বিবেচ্য। সারা দুনিয়ায় কতটি মাতৃভাষা রয়েছে, কতটি ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন, কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পেষণের শিকার কি-না; শিকার হয়ে থাকলে, তা থেকে উত্তরণের কৌশল ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন-প্রচেষ্টা এবং সকল জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে তাদের শিক্ষা ও সাহিত্যশিল্পচর্চার মাধ্যম হিসেবে অগ্রবিবেচ্য রাখার দাবির প্রসঙ্গ, আজ, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর প্রধান প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। কেবল অন্ধ ইতিহাসচর্চায় আত্মনিমগ্ন না থেকে, যে পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, তা মনে রেখে, বাংলা ভাষার সামর্থ্য ও সৌকর্য বৃদ্ধির জন্য বাংলাভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাকরণ রচনার উদ্যোগ এবং ভাষা-প্রয়োগে সবধরনের গোঁজামিল-অসমতা-বিভ্রাট-নৈরাজ্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে। আর এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার সঠিক পরিচর্যায় মনোনিবেশ করতে হবে; এবং এ দায় ও দায়িত্বের অনেকটাই বাংলাভাষীর ওপরÑ স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যিক-ঐতিহাসিক কারণেই।

শেষকথা
ভাষাকে বাঁচাতে হলে, ভাষার মর্যাদা ও অধিকারকে সমুন্নত রাখতে গেলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভাষা-পরিকল্পনা। আর এর সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে সামাজিক-ভাষিক অবস্থিতিবোধ। ভাষার ঐতিহ্যিক স্থৈর্যলাভ ছাড়া জাতীয় সামূহিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। যে ভাষা নতুন অর্থ উৎপাদন করতে সক্ষম, যে ভাষা মানুষের বাসনাকে ধারণ করে, যে ভাষা নতুন-জাগা প্রজ্ঞাকে প্রকাশ করে- চিন্তা ও যাপনকে মিলাতে পারে, সে ভাষার লালন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভাষা, জাতীয়তা এবং রাষ্ট্র কীভাবে পরস্পর অন্বিত হয়ে একটি অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাবিত হয়, সে-সম্পর্কে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বা কাঠামো নির্মাণের সুস্থির মনোযোগ ও সময় থেকে আমরা এখনও অনেকটা দূরে অবস্থান করছি। একটি অপরিহার্য অথচ স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ ও গণআন্দোলনের প্লাবন আমরা পেয়েছি, রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, যোগ হয়েছে রাজনৈতিক কার্যক্রমের তর্কাতীত অনিবার্যতা আর সংস্কৃতি বিকাশের চেতনাপ্রবাহ। এখন দরকার সুস্থিত ভাষা-কাঠামো নির্মাণের আর বিশ্বপরিপ্রেক্ষিতে মাতৃভাষার অস্তিত্ব-রক্ষার সমাজতাত্ত্বিক অধিকারবোধ জাগ্রত রাখার বাস্তব প্রয়াস।

সহায়ক গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা ও প্রবন্ধ
১. হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), একুশে ফেব্রুয়ারি, প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৫৩
২. একুশের কবিতা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩
৩. হুমায়ুন আজাদ, ভাষা-অন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমি, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯০
৪. আবুল কাসেম, বাংলাভাষার লড়াই : স্বরপের সন্ধানে, ঢাকা, ১৯৯১
৫. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও অন্যান্য (সম্পাদিত), অমর একুশের প্রবন্ধ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০০
৬. মুহম্মদ মতিউর রহমান (সম্পাদিত), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্মারক, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০০
৭. এ. বি. এম. রেজাউল করিম ফকির, ‘ভাষা ও চিন্তন প্রক্রিয়া’, নিবন্ধমালা, একাদশ খণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মার্চ ২০০২
৮. মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম (সম্পাদিত), ভাষা-আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মারক, ঢাকা, জুলাই ২০০২
৯. এবাদুর রহমান ও অন্যান্য (সম্পাদিত), পূর্ব বাংলার ভাষা, ঢাকা ২০০২
১০. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ‘বাংলা বানানে অন্যায় হস্তক্ষেপ’, নতুন দিগন্ত, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, ঢাকা, জানুয়ারি-মার্চ ২০০৩
১১. ফারুক হোসেন, বিশ্বদিবস, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৫
১২. মঈন চৌধুরী, ‘বাংলা বানান সংস্কার : আগুন ও আঁচ’, আবহমান (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত), ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, ঢাকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৫
১৩. আলী আনোয়ার, ‘ভাষার রাজনীতি’, কালি ও কলম (আবুল হাসনাত সম্পাদিত), পঞ্চম বর্ষ : পঞ্চম সংখ্যা, ঢাকা, জুন ২০০৮
১৪. হেমন্তকুমার সরকার, জীবনের জোয়ার ভাটায়, ঢাকা, আগস্ট ২০০৮

(‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উপলক্ষে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর বাংলা বিভাগ আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপনের জন্য। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০)