বিশ্বমোড়ল আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে সারা দুনিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যেতে থাকে। আমেরিকার আগ্রাসী মনোভাবে কিছুটা হলেও ভাটা পড়তে শুরু করে। ফলে পরাশক্তি রাশিয়ার মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সাথে সহযোগী হিসেবে চীন ও ভারতকে কাজে লাগায় রাশিয়া। তিব্বতীদের স্বাধীনতার ইন্ধন কিংবা তাইওয়ানকে চীনের বিপরীতে দাঁড় করানোর সময় আর আমেরিকার হাতে অবশিষ্ট নেই। উত্তর কোরিয়া-তো প্রকাশ্যে হুংকার দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকাকে; ইতিমধ্যে বেশ কিছু দূর পাল্লার ক্ষেপনাস্র হামলার পরীক্ষামূলক মোহড়া বিশ্ব রাজনীতিতে দিয়েছে নতুন মাত্রা। যার ফলে চীন ও রাশিয়া এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার শুভ সূচনা করে। পাশাপাশি ভারত ও সুযোগের সদব্যবহারের অপেক্ষায় দন্ডয়মান। আর এইসবই হতভাগা আরাকানীদের কোপাল-এ ফাটন ধরাতে সুযোগ সৃষ্টি করে। আর শুরু হয় নতুন ক্রীড়াকলাপ। সম্প্রতি স্মরণকালের ভয়াবহ এক মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসী প্রত্যেক্ষ করেছে মিয়ানমারে। সদ্য সমাপ্ত সামরিক জান্তা থেকে ক্ষমতা নেয়া নোবেল বিজয়ী অং সাং সূ চি ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য হীনমানসিকতায় সেনাবাহিনী দ্বারা রাখাইন/আরাকান রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুন্ঠন, ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া, দেশ ছাড়তে বাধ্য করা। শিশু-নারী কেউই বাদ যায়নি তাদের নির্যাতন থেকে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছে-নারীর মন দিয়ে দেশকে ভালোবাসা যায় না। কারণ নারীর মন মমতাময়ী, কেবল কোমলতা আছে নারীর মনে, নেই কোন পাশবিকতা। আর সব ফরমূলাকে ভূল প্রমাণ করে-অং সাং সূ চি-নারী হয়েও হায়েনার রূপ ধারণ করে সভ্যতার এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। যা বিশ্ব ইতিহাসে মানুষ মনে রাখবে অনেক দিন।
রোহিঙ্গাদের আদি ইতিহাস ছিল বহু ভাঙ্গা-গড়ার। বর্তমান মিয়ানমারের ‘রোসাং’-এর অপভ্রংশ ‘রোহাং’ (আরাকানের মধ্যযুগীয় নাম) এলাকায় এই জনগোষ্ঠীর বসবাস। আরাকান-এর প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ (Kurukh) নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে। ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরবর্তীকালে ধর্মান্তরীত মুসলিম), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এসকল নৃগোষ্ঠীর শংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো আজকের রোহিঙ্গা। প্রকৃত পক্ষে রোহিঙ্গারা কথ্য ভাষায় ও চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দর ও প্রয়োগ রয়েছে। পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজ্য দখলদার কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা “আনাওহতা” (Anawahta) মগ’দের বারমা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে রোহিংগাদের বিতাড়িত করে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করান। রাখাইনে দুই’টি সম্প্রদায়ের বসবাস। দক্ষিণে বামার বংশোদ্ভুত ‘মগ’ ও উত্তরে ভারতীয় বংশোদ্ভুত ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে বহুল পরিচিত। দস্যুতার কারণে, অন্যায়ভাবে জোর জবরদস্তির করা, বল প্রয়োগের কারণে এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।
রাখাইন শব্দটি এসেছে পালী শব্দ রাক্ষাপুরা থেকে। যার সংস্কৃত প্রতিশব্দ হলো রাক্ষসপুরা। অর্থাৎ রাক্ষসদের আবাসভুমি। প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রাদিতে অস্ট্রিক (অষ্ট্রোলয়েড) মহাজাতিকে রাক্ষস জাতি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো-মগ জাতির কিন্তু অষ্ট্রোলয়েড মহাজাতির সাথে কোন সম্পর্ক নেই। তারা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির অন্তর্ভুক্ত জাতি।
রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন- আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা নাম। তবে, মধ্যযুগে ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা বিভিন্ন বইতে ওই রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন। রোসাঙ্গ রাজ্যের রাজভাষা ফার্সী ভাষার সাথে বাংলা ভাষাও রাজসভায় সমাদৃত ছিল। ইতিহাসে এটা জানায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা ‘বোদাওফায়া’ এই রাজ্য দখল করার পর চরম বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।
এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এই ভূখন্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই ধরনের বহু ভূল করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। সাথে সাথে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এই জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল ‘নে উইন’ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় চরম দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে প্রতিনিয়ত। জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। মিয়ানমারের মূল ভূখন্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘কালা’ নামে পরিচিত। ভারতীয়দেরও একই পরিচিতি। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।
ম্রক-ইউ রাজ্যের সম্রাট নারামেখলার (১৪৩০-১৪৩৪) শাসনকালে বাঙ্গালীদের আরাকানের বসবাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২৪ বছর বাংলায় নির্বাসিত থাকার পরে সম্রাট বাংলার সুলতানের সামরিক সহায়তায় পুনরায় আরাকানের সিংহাসনে আরোহন করতে সক্ষম হন। যে সব বাঙ্গালী সম্রাটের সাথে এসেছিল তারা আরাকানে বসবাস করতে শুরু করে। সম্রাট ‘নারামেখলা’ বাংলার সুলতানের দেওয়া কিছু অঞ্চল ও আরাকানের ওপর সার্বভৌমত্ব অর্জন করে। সম্রাট নারামেখলা পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বাংলার প্রতি ক্তৃজ্ঞতা স্বরূপ আরাকানে বাংলার ইসলামী স্বর্ণমূদ্রা চালু করেন। পরবর্তীতে নারামেখলা নতুন মূদ্রা চালু করেন যার একপাশে ছিল বার্মিজ বর্ণ এবং অপরপাশে ছিল ফার্সী বর্ণ। বাংলার প্রতি আরাকানের ক্তৃজ্ঞতা ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য। ১৪৩৩ সালে সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহের মৃত্যু হলে সম্রাট নারামেখলার উত্তরাধিকারীরা ১৪৩৭ সালে রামু এবং ১৪৫৯ সালে চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের দখলে ছিল। বাংলার সুলতানদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পরেও আরাকানের রাজাগণ মুসলিম রীতিনীতি বজায় রেখে চলেছিল। বৌদ্ধ রাজাগণ নিজেদেরকে বাংলার সুলতানদের সাথে তুলনা করতো এবং মুঘলদের মতোই জীবন যাপন করতো। তারা মুসলিমদেরকেও রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিত। ১৭ শতকের দিকে আরাকানে বাঙ্গালী মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা আরাকানের বিভিন্ন কর্ম ক্ষেত্রে কাজ করতো। যেহেতু রাজাগণ বৌদ্ধ হওয়ার পরেও বাংলার সুলতানদের রীতিনীতি অনুযায়ীই রাজ্য পরিচালনা করতো। তাই আরাকানের রাজদরবারে বাংলা, ফার্সী এবং আরবি ভাষার হস্তলিপিকর’দের মধ্যে অনেকেই ছিল বাঙ্গালী। কামেইন বা কামান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যারা মায়ানমার সরকারের নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্ত্বার মর্যাদা পেয়েছে তারা আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীরই একটা অংশ ছিল।
১৭৮৫ সালে বার্মিজরা আরাকান দখল করে। এর পরে ১৭৯৯ সালে ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ বার্মিজদের গ্রেফতার এড়াতে এবং আশ্রয়ের নিমিত্তে আরাকান থেকে নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে। বার্মার শাসকেরা আরাকানের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং একটা বড় অংশ’কে আরাকান থেকে বিতাড়িত করে মধ্য বার্মায় পাঠায়। যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে। তখন যেন এটি ছিল একটি মৃত্যুপুরী। ১৭৯৯ সালে প্রকাশিত ‘বার্মা সাম্রাজ্য’তে ব্রিটিশ ফ্রাঞ্চিজ বুচানন-হ্যামিল্টন উল্লেখ করেন-‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর অনুসারীরা’ যারা অনেকদিন ধরে আরাকানে বসবাস করছে। তাদেরকে ‘রুইঙ্গা’ (জড়ড়রহমধ) জাতি কখনই নিজেদেরকে ‘আরাকানের স্থানীয় বাসিন্দা’ বা ‘আরাকানের মুলনিবাসী’ (ঘধঃরাব ড়ভ অৎধশধহ) উল্লেখ করে নাই ।
কৃষিকাজের জন্য আরাকানের কম জন অধ্যুষিত এবং উর্বর উপত্যকায় আশপাশের এলাকা থেকে বাঙ্গালী অধিবাসীদের অভিবাসন করার নীতি গ্রহণ করেছিল ব্রিটিশরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে আরাকান পর্যন্ত বৃস্তিত করেছিল। আরাকান ও বাংলার মাঝে কোন আন্তর্জাতিক সীমারেখা ছিল না। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে কোন বিধি-নিষেধও ছিল না। তাছাড়া ব্রিটিশ আরাকান দখলের পূর্বকার সময় ‘কালাদান নদীর’ উত্তর তীর পযন্ত চট্টগ্রামের দক্ষিণ সীমানা ছিল; যা বার্মার সাথে যুক্ত ছিল বলে কোন ঐতিহাসিক দলিলের অস্তিত্ব এখন পযন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। ১৯ শতকে, হাজার হাজার বাঙ্গালী কাজের সন্ধানে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকানে গিয়ে বসতি গড়েছিল। এছাড়াও, হাজার হাজার রাখাইন আরাকান থেকে বাংলায় চলে এসেছিল।
১৮৯১ সালে ব্রিটিশদের করা এক আদমশুমারীতে দেখা যায়, আরাকানে তখন মাত্র ৫৮,২৫৫ জন মুসলমান ছিল। ১৯১১ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৮,৬৪৭ জন হয়। অভিবাসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ বাংলার সস্তা শ্রম, যা আরাকানের ধান ক্ষেতের কাজে লাগত। বাংলার এই অধিবাসীরা (বেশিরভাগই ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলের) মূলত আরাকানের দক্ষিণেই অভিবাসিত হয়েছিল। এটা নিশ্চিত যে, ভারত-এর এই অভিবাসন প্রক্রিয়া ছিল পুরো অঞ্চল জুড়ে, শুধু আরাকানেই নয়। ঐতিহাসিক থান্ট মিন্ট-ইউ লিখেছেন-‘বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, বার্মায় আসা ভারতীয়দের সংখ্যা কোনভাবেই আড়াই লক্ষের কম নয়। এই সংখ্যা ১৯২৭ সাল পর্যন্ত বাড়তেই থাকে এবং অভিবাসীদের সংখ্যা হয় ৪,৮০,০০০ জন। রেঙ্গুন নিউইয়র্ক-কেও অতিক্রম করে বিশ্বের বড় অভিবাসন বন্দর হিসেবে। মোট অভিবাসীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৩ কোটি (১৩ মিলিয়ন)। তখন বার্মার রেঙ্গুন, আকিয়াব, বেসিন, প্যাথিন এবং মৌমেইনের মত অধিকাংশ বড় শহরগুলোতে ভারতীয় অভিবাসীরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ব্রিটিশ শাসনের সময় বার্মিজরা অসহায়ত্ববোধ করত এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে তারা অভিবাসীদের উপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করত। অভিবাসনের ফলে সংঘাত মূলত আরাকানেই ছিল সবচেয়ে প্রকট। ১৯৩৯ সালে। রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যকার দীর্ঘ শত্রুতার অবসানের জন্য ব্রিটিশ প্রশাসন ‘জেমস ইস্টার’ এবং তিন তুতের দ্বারা একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিশন গঠন করে। কমিশন অনুসন্ধান শেষে সীমান্ত বন্ধ করার সুপারিশ করে। এর মধ্যে শুরু হয় ২য় বিশ্ব যুদ্ধ। এর পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা আরাকান ছেড়ে চলে যায়।
১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান সৃষ্টির সময় ভূলবশত তারা বিরাট এক ভুল করে বসে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিন্নাহের সাথে একাধিক বৈঠক করে পাকিস্তানের সাথে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। আর শুরু হয় রোহিঙ্গাদের কপাল পোঁড়ার। তাদের এই কাজটা আরাকানের অন্য জাতিগোষ্ঠিরা মেনে নিতে পারেনি। তাদের কপালে ‘বেঈমান’ তকমা লেগে যায়। এদিকে জিন্নাহ শেষমেশ অস্বীকৃতি জানায়। তখন তারা নিজেরাই রোহিঙ্গা মুসলিম পার্টি গঠন করে। তারপর থেকে আরাকান স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। আর তারা একদম কালো (Black listed) তালিকাভূক্ত হয়ে যায়, বার্মার সরকারের কাছে। ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার বার্মায় ক্ষমতা পেলে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার আরো বেড়ে যায়। ১৯৭৮ আর ১৯৯২ সালে দুইবার তাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে এপ্রিল মাসে বার্মা সরকারের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ৫০,০০০/- রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়। বাকীরা থেকে যায় বাংলাদেশে। চলতি বছরের শুরুতে একবার ও গত আগস্ট ২০১৭ মাসে আরও একবার দ্বিতীয় দফায় রোহিঙ্গা নির্যাতন, খুন, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া’সহ স্মরণকালের অমানবিক ও পাশবিক আচরণ করছে মিয়ানমার সরকার। শান্তিতে নোবেল জয়ী-অং সান সূ চি সামরিক জান্তা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসিন হলেও ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সামরিক বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। তাই কি নিধারূন, কি নিষ্ঠুর আচরণ ও গণহত্যাযজ্ঞ বিশ্ব বিবেককে হতবাক না করে পারেনা। যা যুদ্ধঅপরাধের সামিল। শিশু হত্যা, নারীর সম্ভ্রম হানী’সহ ইত্যাদির ভিডিও মিডিয়ার কল্যাণে সবই নগ্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে যে হারে রোহিঙ্গারা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে শতশত মাইল পায়ে হেঁটে, অর্ধাহারে, অনাহারে দিনাতিপাত করে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রায় তিন লক্ষ-এর বেশী ইতিমধ্যে প্রবেশ করা’সহ সর্বমোট এই সংখ্যা দশ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে। মানবিক কারণে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিলেও এতগুলো লোকের এক বোঝা এদেশের অর্থনৈতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করে। তবে আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক ক্রীড়নকের বলি হচ্ছে আরকান/রাখাইন রাজ্যের নিরপরাধ মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃজনগোষ্ঠি।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী;
শযধরৎ.যৎস@মসধরষ.পড়স