মানুষের জীবন তখনই আদর্শবান হয়, যখন সে হয় বলিষ্ঠ নৈতিকতার অধিকারী, কঠিন সত্যের উপাসক। একটা জীবনকে আদর্শরূপে গড়ে তুলতে হলে প্রথমে তার চাই সুন্দর নিষ্কলুষ চরিত্র। কেননা যে জীবন হবে মানুষের আদর্শ, যাকে লক্ষ্য করে চলবে অগণিত মানুষ।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক এমন একজন মানুষ, যার চরিত্র ও আদর্শ জীবন আমাদের প্রেরণা যোগায়, সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দেয়। কবি মতিউর রহমান মল্লিক একজন আপোষহীন, অকুতোভয় সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী, বিনয়ী, একজন পরিশ্রমী মানুষ। তিনি আজীবন সাহিত্য সংস্কৃতির মূল ধারার সাথে জড়িয়ে ছিলেন। তার স্মৃতি তার ভালবাসা জড়িয়ে আছে এ আন্দোলনের পরতে পরতে। যেখানেই হাত রাখি সেখানেই তার স্মৃতিময় ইতিহাস জড়িয়ে ধরে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তার বাগান ভরা ফুলের সুবাস। মধুময় ঘ্রাণে মুখরিত সবখানে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিককে নিয়ে স্মৃতিচারণের ঝাপি খুলতে চাইলেও এত সহজে খোলা সম্ভব নয়। সে অনেক সময়ের প্রয়োজন। কতো মানুষই তো অকালে ঝরে যায়। আমরা তাদের আকস্মিক বিদায়কে বেদনার আঁচড়ে লিখে রাখি, স্মরণের আবরণে ধরে রাখতে চাই। এ বুঝি মানবহৃদয়ের অক্ষম ভালবাসার ঋণ শোধের খেয়ালিপনা। কবি মতিউর রহমান মল্লিককে নিয়ে যেনতেনভাবে খেয়ালিপনা করা আমার পক্ষে মোটেও সম্ভব নয়। কারণ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অদম্য অধ্যায় সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলনের মাধ্যমে মতিউর রহমান মল্লিক আমাদেরকে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হওয়ার দ্বার খুলে দিয়েছেন। আমাদের চলার পথে সকল বাঁধাকে উপড়ে ফেলে অন্ধকার থেকে আলোর পথে চলার দিশা দিয়েছেন। তিনি তার পরিচালিত মরু সাইমুমের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিবাদী চেতনার পথ দেখিয়েছেন। যে পথে আজো চলছে ইসলামপ্রিয় গণমানুষের দৃপ্ত পদচারণা।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক আশির দশকের একজন অন্যতম প্রধান কবি। তবে তাঁকে প্রধানত একজন গীতি কবি বললেও ভুল হবে না। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর বাংলা সাহিত্যে ইসলামী সঙ্গীতকে আধুনিক ভাবধারার একমাত্র তিনিই উজ্জীবিত করেছেন। এক সময় বাংলা ভাষার অনুকরণে উর্দু, ফার্সি ও আরবি শব্দের সংমিশ্রণে আমাদের দেশে কিছু গান পরিবেশিত হতো। এসবকে বলা হতো গজল। কালক্রমে এসব গজল প্রায় বিলুপ্তির পথে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক সে সূত্র ধরে তাঁর লেখনির মাধ্যমে ইসলামী ভাবধারার এসব গান-গজলকে আধুনিকতার রূপ দিয়ে বর্তমান সময়ে ইসলামী সংগীতের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে শ্রোতাদের মাঝে তার আত্মপ্রকাশ ঘটান।
মুসলিম ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবনের জন্য এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কবি মতিউর রহমান মল্লিক আজীবন ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ পুরুষ। তিনি বীরের জাতি মুসলমানদের হারানো গৌরব উদ্ধারের প্রবল আকাক্সক্ষায় আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন আমরণ একজন আদর্শবান সাহিত্যিক। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে দক্ষতার জন্যও প্রশংসিত। আমরা সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবদান খুঁজে পাই। মাত্র ৫৪ বছর জীবনকালের মধ্যে কবি মতিউর রহমান মল্লিক আমাদের সাহিত্যে অসংখ্য ছড়া-কবিতা, গান, প্রবন্ধ ইত্যাদি রেখে গেছেন। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সমস্ত চিন্তায়, কাব্য ভাবনায় কবি ইকবাল, নজরুল ও ফররুখ এই তিন কালজয়ী পুরুষের ভাবনার সম্মিলিত ছায়া পড়েছে। এই ভাবনার সম্মিলনে তাঁর মানস গড়ে উঠে সফল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে, শুধুই মানবতাবাদের মজবুত ভিতের ওপর। অন্তরে বাইরে অভিন্নতা, সততা ও বিমালতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে করে তুলেছে দুর্দান্ত সাহসী ও তেজস্বী। ব্যক্তি জীবন, প্রাত্যহিক, ব্যবহারিক জীবন ও কর্মে তার দৃষ্টান্ত রেখেছেন সারাজীবন জুড়ে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের স্বপ্ন ছিল বিরাট, চিন্তা ছিল নিখাঁদ এবং কর্মে কোন ফাঁক বা অসততা বা ক্লান্তি ছিল না। তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে তিনি আপ্রাণ চেষ্টায় গড়ে তোলেন ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির ওপর গবেষণা, এর চর্চা ও প্রচার প্রসারের উদ্দেশ্যে দেশের প্রথম ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান সাইমুম, ঐতিহ্য সংসদ ও বিপরীত উচ্চারণ। এর অঙ্গনে জমায়েত হয়েছেন দলমত নির্বিশেষে বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিল্পী তেমনি ইসলাম প্রিয় সাধারণ মানুষ। তিনি সারাদেশের প্রতিভাবান তরুণদের একত্র করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাতিকে উপহার দিয়েছেন শত শত কবি সাহিত্যিক ও সঙ্গীত শিল্পী। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নবীন প্রতিশ্র“তিশীল প্রতিভাদীপ্ত তরুণ কণ্ঠগুলো ছড়িয়ে গেছে সারাদেশে। তাঁর সংস্পর্শে এসে প্রবীণ যৎস্বী শিল্পীরা যাঁরা তাদের প্রতিভা ও অবদানের সীমিত বৃত্তে আবদ্ধ ছিলেন, তারা পেলেন যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান। সাইমুম, ঐতিহ্য ও বিপরীত উচ্চারণের কর্মকাণ্ড দেশের মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনায় এনে দিলো এক নতুন প্রাণস্পন্দন, নব জোয়ার।
অবাক বিস্ময় ও মুগ্ধতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মসহ সকল মানুষ অবলোকন করলো, পরিচিত হলো নতুন করে বিস্মৃতপ্রায় বিশাল প্রতিভার অনাবি®কৃত পরম সম্পদের সাথে যা আমাদের সকল স্তরের মানুষের জীবনবোধ, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দায়িত্ব দেশ, জাতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং সম্পূর্ণ ও যথাযথ প্রচার ও প্রসারের মতো, সে দূরূহ কাজ সম্পাদনের জন্য যে ধারার তিনি সূচনা করে গেছেন, তা আজো দুর্জয় গতিতে বহমান, পরিণতির সমুদ্রের দিকে ধাবিত। তাঁর কোন প্রত্যাশা ছিল না। প্রাণের আনন্দে, প্রাণের তাগিদে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে হীনমন্যতা এবং পরশ্রীকাতরতা প্রসূত আক্রমণের শিকার তিনি হয়েছেন।
কিন্তু তাঁকে ভালবেসে গেছেন, শ্রদ্ধা করেছেন সবাই। দেশের ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে কবি মতিউর রহমান মল্লিক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল।
যে মানুষটি সারাজীবন অর্থবিত্তের ধার ধারেন নি, সেই মানুষটি গভীর নিমগ্ন থেকেছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সকল কর্মকাণ্ড পরিকল্পনায়, পরিচালনায়। ক্লান্তহীন মনে হতো আমৃত্যু সে নিমগ্নতা। কর্মচঞ্চল, প্রাণস্ফূর্তিতে ভরপুর এই মানুষটি দীর্ঘদিন বিছানায় শায়িত নিমগ্নতার কোন গভীরে অবগাহন করেছেন তা জানি না। বাইরে কোলাহল, কোন্দল, মানুষের দীনতা কিছুই তাঁকে তখন বিচলিত করে নি। তাঁকে প্রতিদিন দেখেছে শত শত মানুষ। কতো ভালবাসা প্রকাশ করেছে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাঁর ভক্তবৃন্দ। শ্রদ্ধাবনত হয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কতো মানুষ।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের একটি বড় সৃষ্টি হলো তাঁর শিশু সাহিত্য। যা এখনো লুকায়িত রয়েছ। যা প্রকাশ পেলে শিশু সাহিত্যের রাজপথ মুখরিত হয়ে উঠবে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন একজন হাস্যরসিক। তাঁর মন ছিলো নরম। গাল্পিক মন। শিশু মনের অধিকারী এই দাবি ছোট ছোট শিশুদের হাসির জগতে আকর্ষণ করেছেন। তিনি কখনো নির্মূল আনন্দ বিতরণ করতেন, কখনো বা নীতি, উপদেশপূর্ণ ভাল ভাল কথা ছড়া-কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরে তৃপ্ত করেছেন। যেমন-
‘আর যারা তোমাদের বন্ধু-সাথী
ছড়িয়ে রয়েছে সারা বাংলাদেশে
তাদের হাতেও তুলে দিলাম আমি
ছড়াতে ছড়াতে ছড়া একটু হেসে।’

অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী কবি মতিউর রহমান মল্লিক বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম গীতি কবি। তার কবিতায়, গানে রয়েছে ছন্দ, শিল্প, সুষমা, ভাবের সুঠাম বিন্যাস আর নিখুঁত কারুকাজ। তাঁর রচিত প্রতিটি লেখায় ধ্বনিত হয় একটি ম্যাসেজ যা বড় মাপের একজন কবির প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই বৈশিষ্ট্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় শিশু সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও। তিনি তাঁর লেখায় ছোটদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছেন। তিনি নতুন শব্দ ও ভাষার ঝংকারে রস-রচনা লিখেছেন অনেক। মন ও মেজাজে চঞ্চল এই লেখক সমাজ বা জাতির জন্য মূলত লেখনি ধারণ করলেও তাঁর শিশুতোষ রচনাবলী স্পন্দিত হয়েছে। শিশু সাহিত্যে তিনি ছিলেন আলোর অভিসারী, রঙিন সকাল প্রত্যাশী মানবতাবাদী একজন কবি। যেমন-
‘শিউলী যেমন খুব সকালে/ সাজায় বনোতল,
তেমনি আমি সকাল হলেই/ বাড়িয়ে মনোবল-
নিজেই নিজের ঘুম তাড়াবো/ করবো যা দরকারী,
মন লাগিয়ে মনের মতই/ সাজাবো ঘরবাড়ী।’
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন অপূর্ব প্রাণশক্তির প্রতীক। তিনি ছিলেন প্রেমের কবি। সে প্রেম প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য, দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য, দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার জন্যে, মানবতার জন্যে। তাঁর লেখায় ছিলো আল্লাহর প্রেম, রাসূলের প্রেম।
শিশু সাহিত্য রচনায় কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছিলেন শিশু মনস্তত্ত্ববিদ এবং শিশুদের বন্ধু। তিনি শিশুদের আদর করতে করতে বলতেন-
‘পড়ো এবং পড়ো- শেখার জন্য পড়ো
লেখার জন্য পড়ো, যে পড়ে সে বড়।’

কবি মতিউর রহমান মল্লিক গ্রামের ছেলে। তিনি গ্রামেই লালিত-পালিত এবং গ্রাম্য সৌন্দর্যময়ী প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ কবি- আত্মার অধিকারী করেছে। বাংলায় প্রাকৃতিক রূপ, গাঁয়ের সরল মানুষের প্রেম-প্রীতি, আনন্দ-বিলাপ সবকিছুকে তিনি মমতার দৃষ্টি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে চুক্ষুষ্মান করেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এই ঐতিহ্য ধারার অনুসারী। কবি মতিউর রহমান মল্লিক শিশুতোষ রচনায় এসব অনুসরণ অনুকরণ করলেও স্বীয় কর্মের প্রভাবে উত্তরসূরী হয়েও এ পথে এক নব দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক ছোট বড় সবার কবি। তিনি সবার জন্যে লিখেছেন। অনেক অনেক লেখা তার। সে তুলনায় প্রকাশিত হয়েছে মাত্র সামান্য কিছু গান-কবিতা। তাঁর অসংখ্য লেখা এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের রচিত গ্রন্থের মধ্যে কাব্য : আবর্তিত তৃণলতা (১৯৮৭), অনবরত বৃক্ষের গান (২০০১), কিশোর কবিতা- রঙিন মেঘের পালকি (২০০২), গান- ঝংকার (১৯৭৮), যত গান গেয়েছি প্রবন্ধ- নির্বাচিত প্রবন্ধ, সম্পাদনা-পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে, প্রত্যয়ের প্রাণ প্রকাশিত হয়েছে।
এই বড় মাুনষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই। গত ১২ আগস্ট ২০১১ তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়
মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়।’
তাই হলো! তিনি এখন আর পৃথিবীতে নেই। আজকের এই দিনে শুধু তাঁকে মনে পড়ে।