জীবনের অংশ

জীবন এসেছে যখন যেতেই হবে একদিন
যাবো না, যাবো না বললেও শুনবে না কেউ!

হাতে-পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি
অন্তহীন সমস্যার ঘের, স্বজন পরিজনের প্রণয়
আর ভালোবাসার; এসব ভেবে উদাস গালে হাত
কীভাবে যাবে এসব ফেলে?

যতো ভাবনা, বাড়বে ভাবনা! শেষ হবে না!
মন নিয়ে টানাটানি, খেলাখেলি, দড়াদড়ি
ঢিলে হবেই রশি!

রশির একপ্রান্তে মরণ অন্যপ্রান্তে স্বজন-প্রিয়জন
কালো-নেকাবে ঢেকে আপাদমস্তক হা-হা-হা
হাসবে মৃত্যুদূত।

ভয় হচ্ছে, ভয় কিসের?
জীবন যখন এসেছে তখন সঙ্গে এসেছে মৃত্যু
মৃত্যু তো জীবনেরই একটা অংশ।
…………………………………………..

বলেন না ভাই

ঢিলে হয়ে গেছে মগজের নাট-বল্টু
বুঝতে পারছি না কিছুই
ডাক্তার বলেছে নাদান একটা!

কী দোষ ভাই আমার বলেন!

চাল পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর
পিঁয়াজ-আলু ধাইধাই প্রতিদিন!
সয়াবিন তেল, আটা নাগালের বাইরে
দিনকেদিন! যখন-তখন সবজি, মাছ,
গোস্ত আগুন বরাবর!

সবকিছুর মূল্য যাচ্ছে বেড়ে
বাড়ছে না মধ্যবিত্ত সংসারের আয়!
পরিবারে এত্তগুলো আগুনচুল্লি কোনদিকে
যাই, কোনদিক সামলাই!

এত্ত ঝক্কি-ঝামেলায় নাট-বল্টুর কী দোষ
আপনারই বলেন! বলেন না ভাই!
…………………………………………..

একুশে

যখন দশ
প্রথম দেখা তার সঙ্গে; হাতে ছিল
অন্যের বাগানের ফুল, পায়ের নিচে
নিহার ভেজা মাটি!

কুয়াশামাখা উত্তাল প্রেমে গেয়েছি
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি”…

কেটে গেছে অনেকগুলো বছর
হাতে এখন ক্রীত ফুল, পায়ের নিচে কঠিন পথ
মিডিয়ায় মিডিয়ায় ছবি; এখনও যাই তার কাছে
গেয়ে উঠি
“আমার ভাইয়ের …… ভুলিতে পারি।” …

তার কাছে যাই
পুষ্পাঞ্জলি দেই, প্রেম উত্তাল মনে গান বাজে
কিন্তু সেই দশের উন্মাদনা বাজে না!

বিশ্ব পরিচিতি পেয়ে
সে এখন সীমাবদ্ধতার জলাভূমি; মনে আনন্দ
অথচ প্লাবনে ভাসে না আমার বুকের জমিন!

একুশে আমার প্রিয় একুশে
তোমার জন্য বেদনার নীলজল প্লাবিত করে
আজ বয়সি এই আমাকে! কেন? বলো কেন?
…………………………………………..

তুমি কেন চলে যাও

তুমি কেন চলে যাও ফিরে না তাকাও
আঁখিজল ঝরে প্রিয় অবিরল।

চলে গেছ তুমি
বসন্ত বাতাসে ওড়ে না পরাগ-রেণু
ডাকে না পাখি, আসে না সকাল
চাঁদের চোখে জল ঝরে অবিরল।

না থাকলে তুমি
ফুটে না কলি, আসে না অলি
বহে না সমিরণ, শূন্য বুকে নদী
তীরে আর জলে করে কলকল।

কেন চলে যাও ফিরে না তাকাও!
…………………………………………..

এমন তো কথা ছিল না

এমন তো কথা ছিল না।
নদী উত্তাল হওয়ার আগেই
মরে যাবে
কলি ফুটতে না ফুটতেই
ঝরে যাবে
বিকশিত হতে না হতেই চাঁদ
ডুবে যাবে
জীবনের স্বাদ না পেতেই দীপ
নিভে যাবে
পরিপূর্ণ সুখ আসবার আগেই
চলে যাবে
আঁখিসাগর শুধুই আঁখি জলে
ভরে রবে
খেলা শুরু হবার শুরুতেই খেলা
সাঙ্গ হবে

এমনতো কথা ছিল না!
…………………………………………..

মৃত্যুই শ্রেয়

সানকি আর
কাঁচের বাসনে কি তফাৎ
যদি খাবার না থাকে!

মিহি আর মোটায়
কিসের ফারাক
যদি কাপড় না থাকে!

না খেয়ে যদি মরতে হয়
বস্ত্রের অভাবে দিতে হয় সম্ভ্রম
তবে ধুঁকেধুঁকে মৃত্যুর কি প্রয়োজন?

যদি অর্থ ঘটায় অনর্থ
সেই অর্থের নেই প্রয়োজন
শিক্ষা যদি কুশিক্ষা
দরকার নেই সেই শিক্ষার!

শিক্ষার জন্য, অন্ন-বস্ত্রের অধিকার
আদায়ের জন্য যুদ্ধ
সেই যুদ্ধে মৃত্যুই শ্রেয়।
…………………………………………..

অনুজ প্রজন্মকে

অন্ধকার দূর হয়নি, এখনও অস্বচ্ছ ভোর
লাইনবন্দী মধ্যবিত্ত পড়ুয়া শিশু-কিশোর
নেই রেশন, আছে ন্যায্যমূল্যের
পিঁয়াজ-তেল-চাল-চিনি।

অফিসঘরে বসে দেখছি ডাল-ভাতের টেন্ডার
লক্ষ লক্ষ টাকার ডাল-ভাত প্রকল্প!

ওদিকে
অস্বচ্ছ ভোর থেকে মধ্য দুপুর
ওদের মধ্যে কেউ কেউ গনগনে আগুন বাতাসে
ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য দাঁড়িয়ে, গা পুড়িয়ে দিনশেষে
ক্ষুধা পেটেই যাচ্ছে ফিরে!

মনের মধ্যে জ্বলছে দাবানল
লঙ্গরখানায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছি অনুজ প্রজন্মকে!
…………………………………………..

হৈমন্তিকার মনপত্র

হররোজ যাওয়ার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও চলে যায় সে-
হৈমন্তিকার মনের কারিগর। গাড়ি থেকে নেমেই মোবাইল!
কন্ঠস্বরে তাঁর ক্লান্ত পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ!

ওই কন্ঠস্বর কষ্টের সিটি বাজায় হৈমন্তিকার মনের প্রান্তিক শহরে,
যেখানে চব্বিশ বছর আগে নোঙর করেছে নীলকষ্টের কালোজাহাজ!

সেটা নড়েচড়ে না, যায়ও না। শুধু উথুলি-পুথুলি ঢেউ ছড়িয়ে দেয়
হৈমন্তিকার úেস-মেকারের চারপাশে। আসলটার মেয়াদ শেষ
এখন ডুপ্লিকেট দিয়ে কাজ সারতে হয় তাঁর। ডুপ্লিকেট হদয়…

কষ্টে ডুবতে ডুবতে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হৈমন্তিকা, সে তাঁর কে ?
কেন তাঁর জন্য এত কষ্ট? জবাব মেলে না। মোদ্দা কথা প্রশ্নের জবাব
কোনদিন খুঁজেনি হৈমন্তিকা। সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে সেই মানুষটি!

হৈমন্তিকার অবশ্য প্রশ্ন একটাই, এত ভালোবাসা, এত প্রেম, এত প্রণয়
তবু কেন সরে না কালোজাহাজ? কেন শেষ হয় না বেহুলা-ভাসান?
…………………………………………..

শূন্য টানেল

শূন্য টানেল! একলা সে শুধু নিজের পায়ের শব্দ শোনে
টানেলের বাতাসে মিশে যায় নিজেরই শ্বাসের শব্দ
নিশ্বাসের শব্দ যত হালকাই হোক তা নিঃশব্দতার দ্বারে
আঘাত করে জোরে! সে শব্দে আঁতকে উঠে নিজেই!

বায়াত্তর ঘন্টার বেশি হয়ে গেল দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে
নয়নে আষাঢ়ের মেঘ, ভারী বর্ষন হবে এখনই!

কতদিন আর ভালো লাগে বলো এই ঈশ্বর প্রেম!
কতদিন বলো খেলবে মনের বাড়িতে ঘর বানিয়ে
বাজার-হাট, রান্না-বান্না, ছেলেপুলে লালন-পালন
করার খেলা! সবসময় তো ভালো লাগে না
প্লেটোনিক প্রেম !

অনেকের মতে প্লেটোনিক প্রেমের স্থায়িত্বকাল কম,
শরীর নাকি মনের থেকে বেশী কথা বলে; অতশত
বুঝে না সে। সে শুধু বুঝে প্রেরণার উৎস এই
প্লেটোনিক প্রেম! তবুও মাঝে মাঝে…

বোধের অগম্য এই মন নিয়ে বসবাস করে সে
আর করে তাঁর জন্য অপেক্ষা!

এতগুলো বছর পথ চলছে তাঁর সঙ্গে; একদিন ঘর ছিল না;
যখন ঘর হলো তখন ভেবেছিল, সে দুজনের কথা চিন্তা করে
সাজিয়ে তুলবে ঘর! কিন্তু না! ওর কথা তো নয়ই,
নিজের কথাও চিন্তা করেনি সে!

তাঁর প্রতীক্ষাতে থাকে সে, একথা মনেও আসেনি
কখনও তাঁর! তাঁকে এ-সব কথা বলতে পারেনি মুখে!
না বলতে পারায় রক্তক্ষরণে মুমূর্ষ তাঁর হৃদয়!

তাঁর ভাবনায় এখন শুধু ঘোরাফেরা করে
কেউ নেই! একেবারে একা সে! যেমন প্রকৃতির সব থেকেও
নেই কিছু! মানুষ-পশু-অরণ্য-সাগর-নদী সব বুকে রেখেও
প্রকৃতির নেই কেউ; তাঁরও নেই!
…………………………………………..

একলা থাকার কাব্য-৫

অনেক রকমের দিবস পালিত হচ্ছে এখন
পরিবার দিবস, মা-বাবা দিবস, বন্ধু দিবস, পরিবেশ
দিবস, ট্র্যাফিক দিবস ইত্যাদি, ইত্যাদি…

সব রকমের দিবস পালিত হচ্ছে, শুধু পালিত হচ্ছে না
যন্ত্রণা দিবস!

যন্ত্রণা দিবসে নারী-পুরুষ বয়ান করতে পারতো তাদের
যন্ত্রণার কথা। মানুষের তো যন্ত্রণার শেষ নাই!

আছে ট্র্যাফিক যন্ত্রণা, আছে খুন জখম রাহাজানি ছিনতাই
আছে শ্লীলতাহানির মতো যন্ত্রণা, আছে রাস্তা খোঁড়ার যন্ত্রণা,
বৃষ্টিতে পথ ভেসে যাওয়া, আর লোড শেডিংএর যন্ত্রণায় তো
অন্ধকার- অন্ধকার- অন্ধকারে ছেয়ে আছে জীবন, আছে মুদ্রাস্ফীতি,
শেয়ারবাজারের জল, কাঁচা বাজারের আগুন, আছে চাকরি না থাকার
সাময়িক কিংবা চিরতরের যন্ত্রণা!

একে অন্যকে ব্যথা দেওয়ার যন্ত্রণা, অন্যকে না-পাওয়ার যন্ত্রণা
ভালো না বাসার, ভালো-বাসা না থাকার কষ্টের নীল যন্ত্রণা
একজনকে ভালোবেসে, তাকে পেয়েও ব্যথার হাওড়ে সাঁতার
কাটার যন্ত্রণা, নিজেকে বুঝতে না-পারা, বুঝাতে না পারার
এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় বিক্ষুব্ধ মন!

কথার ওপর ট্যাকশো দেওয়ার যন্ত্রণার মধ্যে সুখের ঠিকানা
হাতড়ে ফিরতে হয় দেশের মানুষকে!

সব যন্ত্রণার কথা কি ফলাও করে বলা যায়; যায় না!

তাই স্লোগান হোক- যন্ত্রণা দিবস চাই, চাই যন্ত্রণা দিবস।
…………………………………………..

সে ও আমি

রমনা রেস্তরাঁয় ছাতার নিচে বসে আছি। ঝরছে বৃষ্টি। চারপাশে দেখছিলাম।
বৃষ্টি জলে ধোয়া সবুজ পত্রালী, ঘাস, ঘাসফুল। সময় অপেক্ষার। সময় কেটে
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে আবেশ। যদি ও একা তবু ও একা লাগছিলো না।
বৃষ্টি দেখতে দেখতে তার অপেক্ষা।

ঝরঝর বৃষ্টির মধ্যে সে এলো।
কিছুক্ষণ তার হাতে হাত রেখে বৃষ্টি দেখলাম।

তার স্পর্শ মনের মুগ্ধতায় হৃদয়ের ঘরে বেজে উঠলো গান।
গুনগুন করতে ভালো লাগলো।
তুমি এলে তাই
সুন্দর এলো জীবনে
দুজনের দেখা হলো সময়ের অভীপ্সায়।

এক ঝলক বৃষ্টি। তারপর ঝলমলে রোদ। প্রকৃতি ভরে গেছে
কনে দেখা আলোয়। বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।