লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি ছড়া। ছড়া এক সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। কালক্রমে অনেক বাঁধা পেরিয়ে ছড়া সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। ছড়া এক সময় শিশুদের মনোরঞ্জনের বিষয় ছিল। এখন তা হয়ে উঠেছে বড়দের ভাবনার বিষয়। ছড়ার মাধ্যমে সহজে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছা যায়। ছড়া কোন বক্তব্যবাজি নয়, ছন্দসর্বস্ব বিবৃতিও নয়। এতে শিল্পের দায় রয়েছে। যতো বেশি হিউমার, রূপক, প্রতীক ছড়ায় যুক্ত হবে ছড়া ততো প্রাণবন্ত হবে। ছড়ার জীবনী শক্তি বৃদ্ধি পাবে। পাঠকের মনেও টিকে থাকবে। তেমনি একজন ছড়াকার আফসার নিজাম। যাঁর ছড়ার মধ্যে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো পাওয়া যায়। বিভিন্ন ছড়াকারদের মধ্যে আফসার নিজাম ব্যতিক্রমী ছড়াকার। তাঁর ছড়ায় আমরা খুঁজে পাই পটুয়া শিল্পীর দক্ষ হাতের ছোঁয়া। তাঁর কলমের সুনিপুন স্পর্শে ছড়া হয়ে উঠে বিমূর্ত বীণার ঝংকার।
“মিষ্টি আলোর বৃষ্টি” ছড়াকার আফসার নিজামের এক অনবদ্য সৃষ্টি বলে আমরা মনে করি। এই গ্রন্থে তিনি ছড়ার বৃষ্টি দিয়ে পাঠকের বিবেকে নাড়া দিয়েছে ।
আঠারটি ছড়ায় সমৃদ্ধ রাতুল গ্রন্থ প্রকাশ থেকে ২০১৬ একুশের গ্রন্থমেলায় প্রকাশ পেয়েছে চমৎকার শিশু ও কিশোরদের মনভরানোর মতো “মিষ্টি আলোর বৃষ্টি” গ্রন্থটি।
ছড়াকার আফসার নিজাম তাঁর হৃদয়ে এক পরিছন্ন বিবেক লালন করেন। তার বহিঃপ্রকাশ “মিষ্টি আলোর বৃষ্টি”।

যখন মানুষ বিপথগামী হয়। যখন; সমাজে ছড়িয়ে পড়ে অত্যাচার, অন্যায়ের শাসন। দেশকে মনে করা হয় নিজের সম্পদ। ক্ষমতাকে আকরে ধরে দুঃশাসনের স্টিম রুলারের কষাঘাতে নিরীহ মানুষদের যখন নির্যাতিত করা হয়। শাসক যখন অন্যায় আর কুলালসাকে চরিতার্থ করার জন্যে বিবেককে অন্ধকারের শিকলবন্ধি করে রাখে। তখন দেশে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। অরাজকতা। তখন সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার হারায়। প্রতিষ্ঠিত হয় জাহেলিয়াত। তখন আইনের শাসন পেজা তুলোর মতো আকাশে উড়তে থাকে। মানুষ হয়ে যায় অমানুষ।
মান-সম্মান, ইজ্জত লুলোপুটি খায় পথের ধুলায়। সমাজ জাতি অসহ্যে বিষিয়ে উঠে। মজলুমের আর্তনাদে কেঁপে উঠে খোদার আরশ। তখন পৃথিবীতে নেমে আসে শান্তির দূত।
এরকম চমৎকার ভাব প্রকাশ করেছেন ছড়াকার । আফসার নিজাম-
স্বর্গ হতে সোনার বালক
সঙ্গে নিয়ে আলোর পালক
আকাশ ছোঁয়া মিনার থেকে
একটুখানি দূরে
ভ্রু’র মতো একটু বাঁকা
এই পৃথিবীর স্বপ্ন আঁকা
আলোর বাতি জ্বালিয়ে দিলো
আজান দেয়া সুরে।
(সোনার বালক)
উপরে উল্লেখিত ছড়ার মধ্যে আমরা আশার আলো দেখতে পাই। আবার সোনার বালক আসবে। আলোর মশাল জ্বালিয়ে পথহারা জাতিকে সত্য ও সুন্দরের পথ দেখবে।

মুসলিম বীরের জাতি। বিজয়ই যাদের নেশা। অর্ধেক পৃথিবী একাই শাসন করেছে মুসলমান। সেই ঐতিহ্যময় দিনগুলো এখনো ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে খোদায় করা রয়েছে। সে বিজয় গাঁথা ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। ছড়া শুধু মজার বিষয় নয়। ছড়া যে একটি ইতিহাস তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন আফসার নিজাম-
সত্র ঘোড়া ছুটে আসে
দলের সবার আগে
মুসলমানের বাঙলা বিজয়
ভিষণ মজা লাগে।
(সত্র ঘোড়া)

প্রাণের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা, আমার বাংলা ভাষা। মায়ের মুখের মিষ্টি ভাষা, আমার বাংলা ভাষা। যতো সহজে আমরা মন খুলে কথা বলছি। হৃদয় উজার করে ভাব প্রকাশ করছি। সেই ভাষা সহজে আমারা পাইনি। আন্দোলন করতে হয়েছে। অন্যায় অত্যাচার সইতে হয়েছে। বাংলার দামাল ছেলেরা পিচ ঢালা কালো রাজ পথ রক্তে লাল করে লেখে গেছে একটি ভাষার নাম ‘বাংলা ভাষা’। ভাষার জন্যে যাঁরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। সেই ভাষা শহিদের জন্যে ছড়াকার আফসার নিজামের হৃদয় শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় ভরে উঠে। তাইতো ছড়াকারের হৃদয়ের আকুতি-
ভাষার জন্য দিলো যাঁরা
প্রাণের প্রিয় প্রাণ
তাঁদের জন্য গাইছি আমি
মাগফেরাতের গান।
(ভাষা)

সৃষ্টি আছে যার ধ্বংস আছে তার। নশ্বর এই প্রথিবী একদিন ধ¦ংস হবে। এটি অমোঘ সত্য কথা। নদী -সাগর ও মহাসাগরের পানি বিষেøশিত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অক্সিজেনে বিভাজিত হয়ে আগুন ধরে যাবে। মহা প্রলয়ের মধ্য দিয়ে কেয়ামত হবে। এই পরম বাস্তব ও পরাজগতের বিষয় ছড়াকারের হৃদয়ে দোলা দিয়েছে । যেমনটি তিনি বলেছেন-

আকাশটা উড়ে যাবে
পুড়ে যাবে নদী ও পানি
উড়ে যােব গ্রহ তারা
উড়ে যাবে পৃথিবীখানি
জানি জানি গো জানি
তোমর হুকুম হলে
হবে সুনামি।
(কেয়ামত)
সুন্দর সাবলিল ভাবের প্রকাশ। সহজে হৃদয়ে গেঁথে যায়। এটাই ছড়াকার আফসার নিজামের স্বাতন্ত্র কৌশল।

একজন মুসলমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নামাজ আদায় করা। আল্লাহর কাছে নামাজের হিসাব প্রথমে দিতে হবে। মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তি হওয়া যায়। সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। নামাজ হলো বেহেশতের চাবি। নামাজ ইমানদারের জন্যে মেরাজ। আর নামাজের পূর্বশর্ত হলো অজু। তেমনি অজু থেকে নামাজের বিষয়গুলো ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন আফসার নিজাম। কখন কোন নামাজ পড়তে হবে। কিভাবে পড়তে হবে। কয় রাকাত পড়তে হবে। সহজভাবে হৃদয়গ্রাহী ছন্দ তালের মাধ্যমে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন ছড়াকার আফসার নিজাম। অজু-নামাজ নিয়ে এই গ্রন্থে সাতটি ছড়া রয়েছে। এই ছড়াগুলো কিশোর যুবকদের জন্যে বেশি উপযোগি। কারণ এই বয়সটা বেপরোয়া। শাসন মানতে চায়না। বিভিন্ন অন্যায় অশ্লিল কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই ছড়াকার তাদের আতœনিয়ন্ত্রণের জন্য ছড়াগুলো লেখেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে “নিশ্চয় নামাজ সমস্ত অন্যায় অশ্লিল কাজ থেকে বিরত রাখে।” কতো সুন্দরভাবে নামাজের কথা তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন-

বিদ্যালয়টা ছুটি হলো
ছুটি হলো কারখানা
তৈরি হলো দুপুর বেলার
ফিরনি পায়েস আর খানা

এমন সময় আজান দিলো
জোহর আদায় করতে যাই
দশ রাকাতে আদায় করে
দুপুর বেলার খানা খাই।
(জোহর)

আফসার নিজাম কতোটা পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারি তা ‘ইমানদার’ ছড়া পাঠ করলে আমারা বুঝতে পারি। ছড়াকার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ইমানদার হতে হলে আমাদের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত।

শাদা বকের ডানার মতো
ইমানদারের মন
পবিত্রতায় হৃদয়খানি
গোলাপ ফুলের বন।
(ইমানদার)
ইমানদারের চরিত্র বর্ণনা করেই ছড়াকার থেমে থাকেননি। মুনাফেকের বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছেন সাবলিল ও ছান্দসিক ছড়ার মাধ্যমে।

সকাল বেলার আকাশ দেখে
যায চেনা যায দিনটি
তেমনি করে মুনাফেকের
পাই পরিচয় তিনটি।
(মুনাফেক)

মুহাম্মদ সা. ও ছোট শিশুর ঈদের মাঠের ঘটনাটিও ছড়াকারের দৃষ্টির অগোচর হয়নি। ঈদগাহের এক কোনে শিশুটি একা একা কাঁদছিলো। দয়ার নবি ইয়াতিম শিশুকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে এলন। ছড়াকার এই ঘটনাটি পরম মমতা দিয়ে ফুটে তুলেছেন-
জগতের নেতা তিনি ঈদগাহে হেঁটে যান
ঈদগাহে এক কোণে ছোট এক শিশু পান
ছোট এই শিশুছেলে কেঁদে কেঁদে বলে এই
ভালোবাসা চুমু দিতে তার প্রিয় কেউ নেই
নেতা তার কথাগলো মনোযোগ দিয়ে শোনে
তার দুখ ব্যথাগুলো নিজ ব্যথা দিয়ে বোনে
শিশুটির ভেজা চোখ চুমু দিয়ে মুছে দিলো
ভালোবাসা দিবে বলে নিজ ঘরে তুলে নিলো।
(মুহাম্মদ সা. ও ছোট শিশু)

বলা হয়ে থাকে জ্ঞানেই শক্তি। জ্ঞান অমূল্য সম্পদ। জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। রাসুল সা. বলেছেন, “জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চিন দেশে যাও”। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের জন্যে যদি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যেতে হয় তবুও যাওয়া দরকার। তবে সেই জ্ঞান হতে হবে আদর্শিক জ্ঞান, ও আলোকময়। যে জ্ঞান অন্ধকার দূর করে দেবে। এমন কথাগুলো ছড়াকার নিচের ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন-

জ্ঞানের বাতি আলো ছড়ায়
খুশবু ছড়ায় পলকে
নুরের জ্যোতি ঘর ভরে যায়
এক লহমা ঝলকে।

আল কোরানের জ্ঞান জ্বালাতে
সঠিকভাবে মন দিলে
জ্ঞানের জাহাজ বোঝাই করে
পৌঁছে যাবে মনজিলে।
(জ্ঞানের বাতি)

“মিষ্টি আলোর বৃষ্টি” গ্রন্থের ছড়াগুলো পড়লে আমরা বুঝতে পারি যে আফসার নিজামের বিশেষত্ব হলো তাঁর স্বভাষা, সহজিয়া, বলিষ্ট উচ্চারণ, সুস্পষ্ট মন্তব্য, সৃজনশীল চিন্তা এবং মননশীলতায় তিনি আপোসহীন। বলা যায় তিনি একটি মৌলিক ছড়াসত্তা। ছড়ার বিষয় নির্বাচনে আফসার নিজাম মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। বর্ণনায়, সাবলীলতা, রস, ছন্দের ঝংকার ছড়াগুলোতে চমক সৃষ্টি করেছে।

ছড়ার মান ও শব্দ চয়নের কৌশল প্রমাণ করে যে আফসার নিজাম ক্রমাগত উত্তরণের সিঁড়ি ভেঙ্গে তাঁর ছড়া সাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধি করে সম্মুখপানে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।