আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শুরু করেছিলেন একজন কলেজ শিক্ষক হিশেবে। তিনি এদেশের মেধাবী ছাত্রদের আধার ঢাকা কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। তার তীব্র রসবোধ, চমৎকার ও রুচিস্নিগ্ধ বাচনভঙ্গী ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি বেশ কয়েকটি কলেজ ছাত্র প্রজন্মের কাছে একজন জনপ্রিয় ও সদাহাস্যময় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন।

এর পাশাপাশি তিনি ষাটের দশকে লিটিল ম্যাগাজিনভিত্তিক সাহিত্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সম্পাদনায় ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা পূর্ব বাংলা ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের তারুণ্যনির্ভর সাহিত্যের মুখপত্র হয়ে উঠেছিল। ষাট ও সত্তর দশকের অনেক ট্রেডমার্ক কবি ও লেখকের আত্মপ্রকাশ হয়েছিল ‘কণ্ঠস্বর’-এর পাতায়। যেমন রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ। আধুনিক বাংলা কবিতা ও গদ্যের বিকাশে ষাট দশকের এই সাহিত্য আন্দোলন একটি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিল। তিনি ছিলেন এই সৃজনশীল ও নিরীক্ষাধর্মী অতি আধুনিকতাবাদী তরুণ সাহিত্যিকদের একজন প্রধান সংগঠক ও উদ্যোক্তা। এদিক থেকে তার রোল মডেল ছিলেন বাংলা ভাষায় আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের প্রধান পুরোহিত বুদ্ধদেব বসু ও তার সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা। এই প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায় ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায় বিকশিত সংস্কৃত ভাষা প্রভাবিত কলকেতীয় আধুনিক বাংলা গদ্যের মধ্যে। এদিক থেকে বলা যায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পূর্ব বাংলার সাহিত্যভাষার অভিমুখ কলকাতার দিকে স্থাপনের একজন অন্যতম কান্ডারী। তিনি তার বর্ণিল চিত্রকল্পময় গদ্যরচনাসমূহের মধ্য দিয়ে একজন সাহিত্য সমালোচক ও শিক্ষাবিদ লেখকও হয়ে উঠেছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট বয়ান বা চিন্তার উন্মেষ বা বিকাশ তার লেখায় দেখা না গেলেও ভাষাশিল্পের সৌকর্যে ও কুশলতায় তিনি একজন জাদুকর গদ্যশিল্পী হতে পেরেছেন, নিঃসন্দেহে।

এরপরে আমরা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে দেখতে পাই ঢাকায় সদ্য উদ্বোধিত ইলেকট্রনিক মিডিয়া টেলিভিশনের স্ক্রিনে। মনে রাখতে হবে ষাট দশকের মধ্যভাগে ঢাকায় যখন টেলিভিশন এসেছে তখন কলকাতায় কিন্তু টেলিভিশন আসেনি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এদেশের টেলিভিশনে বিনোদনমূলক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। টেলিভিশন তখন ছিল শিক্ষিত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নাগরিক শ্রেণির আধুনিক চেতনা ও রুচির ধারক ও বাহক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের রুচিস্মান ও শীলিত বাচন, রসবোধ ও হাস্যময়তায় ঋদ্ধ এবং বাক্যবাগীশ উপস্থাপনা এদেশের টেলিভিশন উপস্থাপনায় একটি মৌলিক রূপকল্প বা জ়নরা হিশেবে পরিগণিত হয়েছে। তার কলেজ অধ্যক্ষ নাটকবান্ধব পিতার সূত্রে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিশেবে মুনীর চৌধুরীর সান্নিধ্য পেয়ে তিনি বাগ্মীতা ও উপস্থাপনার কলাকৌশল ভালভাবে রপ্ত করতে পেরেছিলেন। হাইকলার ঘিয়ে পাঞ্জাবি ও কোটি, ঢোলা সাদা পাজামা, রাজ কাপুরীয় গোঁফ এবং শান্তিনিকেতনী ঝোলায় তিনি একাধারে এক শিক্ষক-সাহিত্যিক-উপস্থাপকের ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন। তার এই পোষাক নির্বাচন ও ব্যক্তিত্বের চেতনা এবং শৈলীতে বিধৃত হয়েছে রাবীন্দ্রিক/শান্তিনিকেতনী বাঙালিত্বের সঙ্গে তিরিশী আধুনিকতার সংশ্লেষ। পূর্ব পাকিস্তানে তার তারুণ্যের উন্মেষ ও বিকাশ হলেও তার ব্যক্তিত্ব ও চেতনায় লক্ষ করা গেছে বায়ান্নো-উত্তর আধুনিক সেক্যুলার বাঙালিত্বের প্রতিচ্ছায়া। সেখানে ইসলামিকতা বা মুসলিমত্বের উপাদান অনুপস্থিত ও গৌণ।

সত্তর দশকের শেষে তিনি তার শিক্ষক সত্তার অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার অভিলাষ থেকে শুরু করলেন ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। এটি ছিল মূলত একটি বই-পড়া আন্দোলন। পাঠচক্র আঙ্গিকে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে তিনি এই পাঠ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করলেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে তিনি এই কগনিটিভ আন্দোলনকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে গেছেন। পরিমাণগত দিক দিয়ে এই কর্মসূচির বিপুল বিস্তার হয়েছে, নিঃসন্দেহে। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছে এবং উপকৃত হচ্ছে, নিঃসন্দেহে। ঢাকার বাংলা মোটরে একটি ক্ষুদ্র ভৌত পরিসর থেকে আজ এক বৃহৎ ভৌত কাঠামোতে পরিণত হয়েছে এই সংগঠনটি। সবকিছু ছাপিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবন ও কর্মের সিগনেচার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এই ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সমস্ত অর্জন ও কৃতিত্বের সালতামামি করার পরে তিনি ও তার ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ সম্পর্কে কিছু অপ্রিয় প্রশ্নও করা দরকার বলে মনে করি। বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যচেতনা বিনির্মাণে তার ভূমিকা কি? ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ যেসব পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে এর পাঠচক্র কর্মসূচিগুলি পরিচালনা করে সেগুলিতে কোন কোন বিষয় ও ডিসকোর্স বা বয়ান প্রাধান্য পায়? সেখানে কি এদেশের তরুণদের কাছে তাদের ইসলামিকতা বা মুসলিমত্বকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কভারেজ দেয়া হয়? নাকি একধরনের রাবীন্দ্রিক/শান্তিনিকেতনী বাঙালি চৈতন্য ও সংস্কৃতির প্রাধান্যকে সেখানে অনিবার্য করে তোলা হয়েছে? অথবা সাহিত্য ও ইতিহাসকে প্রাধান্য দিয়ে, দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মকে প্রান্তিক করে রেখে, বাঙালি মুসলমানের মননশীলতাকে সর্বদা খাটো করে রাখা হয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর মূলত না-বাচকই হবে। তাহলে আমার শেষ প্রশ্ন: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ কি এই মাসলাক ও উসুল নিষ্পাপ-নিষ্কলুষ হয়ে অজ্ঞতাবশত প্রণয়ন করেছে? নাকি এটি তারা হিশেব-নিকেশ করে সচেতনভাবেই অনুসরণ করছে? সেক্ষেত্রে তো একে আর নিরীহ বলা চলে না। বরঞ্চ একে হিডেন এজেন্ডা গাইডেড-ই বলতে হবে।