উনিশ শতকের প্রারম্ভেই কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটলেও ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে প্রায় শতবর্ষ পরে জন্ম নেয় ঢাকাকেন্দ্রিক নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী। শতবর্ষের পশ্চাৎপদতার অলঙ্ঘ্য দেয়াল, রক্তস্রোতে জমে থাকা সংস্কারের মোহন-পুষ্ট প্রলেপ, ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কারণ-অকারণ সম্প্রদায়-বৈরী– সবকিছু মিলে বাঙালি মুসলিমমানস তখন পাড়ি দিচ্ছে এক ঊর্মিল ক্রান্তিলগ্ন। শতাব্দীর বেদনাময় যুগ-প্রতিবেশ অতিক্রমণের অভিলাষে নবজাগ্রত মুসলিম-মনীষা তখন হয়ে ওঠে সংস্কারমুখী, ছড়িয়ে দিতে চায় নতুন যুগের নতুন আলো; বিশ শতকের শুরুতেই তারা নতুন স্বপ্নের সম্ভাবনায় হয়ে ওঠে সৃষ্টিচঞ্চল। কিন্তু শতাব্দী-পরম্পরায় প্রসারিত সামন্ত মূল্যবোধের সঙ্গে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াতেই বিরোধ বাধে নবজাগ্রত এই শক্তির, রক্তাক্ত হয়ে ওঠে বুর্জোয়া মানবতাবাদে প্রত্যয়ী মধ্যশ্রেণীর সচেতন-সত্তা। বিশ শতকের সূচনালগ্নে যন্ত্রণাজর্জর এই যুগ-প্রতিবেশে বাংলা সাহিত্য-ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন মুক্তচিত্ত-দ্রোহী এক আধুনিক শিল্পী, নাম তাঁর খান বাহাদুর কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬)।

মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে ইমদাদুল হক হচ্ছেন সেই শিল্পী, যিনি শিল্প-উপাদান সংগ্রহে প্রথম মনোযোগী হলেন সমকালের প্রতি। তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত, উদার মানবতাবাদী, মননশীল এবং যুক্তিবাদী শিল্পদৃষ্টিসম্পন্ন ঔপন্যাসিক। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথালালিত সামন্ত-মূল্যবোধে স্নিগ্ধ মুসলিম সমাজ-অঙ্গনে বাসন্তি হাওয়ার প্রত্যাশায় ইমদাদুল হক সাহিত্যক্ষেত্রে দ্রোহীসত্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবু তিনি বিদ্রোহী নন, সমাজ ভাঙার ডাক নেই তার কর্মে-বরং মুসলিম সমাজের বিবিধ খণ্ডচিত্র আর গ্লানির অঙ্গন উপস্থাপন করেই তিনি তৃপ্ত থাকতে চেয়েছেন। বলা যেতে পারে, ইমদাদুল হক যেন অনেকটা মুসলিমসমাজের শরৎচন্দ্র (১৮৭৬-১৯৩৮), শরৎচন্দ্র পল্লী-সমাজ-এ (১৯১৬) যা করেছেন তাই যেন ধরেছেন ইমদাদুল হক তাঁর উপন্যাসে–অবশ্যই স্ব-সমাজের পটভূমিতে।

মহান শিক্ষাব্রতী ইমদাদুল হকের শিল্পিমানসের প্রধান শক্তি তাঁর প্রখর সমাজবীক্ষণ ক্ষমতা এবং এই প্রধান শক্তিই, আমাদের বিবেচনায়, তার শিল্পিসত্তার প্রধান দুর্বলতা। সমাজবীক্ষণ-সূত্রে হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ দেখে তিনি ব্যথিত হয়েছেন এবং সাহিত্যক্ষেত্রে এই বিদ্বেষের প্রতিফলনে তিনি হয়েছেন ক্ষুব্ধ। তিনি মুক্তচিত্তেই প্রত্যাশী ছিলেন ভারতের মহামিলনে– শিল্পিমানসের এই প্রত্যাশাই তার সকল সাহিত্যকর্মের মৌল প্রেরণা। তার স্বপ্ন আর প্রত্যাশা-প্রার্থনা কেমন ছিল, তা নিজেই তিনি লিখে গেছেন ১৩১০ সালের বৈশাখ সংখ্যা ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হিন্দু-মুসলমান ও বঙ্গ-সাহিত্য নামক প্রবন্ধে এবং সেখান থেকেই এক দীপ্র এলাকা :
হিন্দুগণ মুসলমানের হৃদয়ে আঘাত প্রদান করিয়া যে বিরোধ সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছেন, তাহার উপর আবার মুসলমানগণ যদি হিন্দুর অন্তরে ক্ষোভদান করিয়া বিরোধের উপর বিরোধ চাপাইতে বসেন, তাহা হইলে আমাদের ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার স্বপ্ন কস্মিনকালেও সফল হইবে না, কিন্তু হিন্দু সুলেখকগণ যদি মুসলমান-বিদ্বেষভাব সাহিত্যে এত পরিস্ফুট করিয়া তুলিয়া ইংরাজের ফরাসী এবং আইরিশ-বিদ্বেষের দৃষ্টান্ত অনুকরণ না করিতেন তাহা হইলে হিন্দু-মুসলমানকে আজ একই গৃহে আবদ্ধ বৈরীভাবাপন্ন দুই সহোদর ভ্রাতার ন্যায় পরস্পর কুণ্ঠিত ও সঙ্কুচিত হইয়া বাস করিতে হইত না।

০২.
চুয়াল্লিশ বছরের কর্মচঞ্চল জীবনে ইমদাদুল হকের প্রধান কীর্তি আবদুল্লাহ্ (১৯৩৩) উপন্যাস।২ একটিমাত্র উপন্যাস লিখে ইমদাদুল হক বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন তার স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর। আবদুল্লাহ উপন্যাস বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের সময়সীমায় প্রবাহিত মুসলিম জীবনবিশ্বাস এবং জীবন-যন্ত্রণার শিল্পিত ভাষ্য। একটি বিশেষ যুগসত্যকে ধারণ করে রচিত হলেও আবদুল্লাহ্ স্ব-কালের সীমা পেরিয়ে অভিষিক্ত হয়েছে কালোত্তীর্ণ শিল্পের মর্যাদায়। যে বিষয়পুঞ্জকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে আবদুল্লাহ্ তা এখনো আছে আমাদের সমাজে, হয়তো কমেছে তার মাত্রা এবং আসবে এমন একদিন যেদিন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুসলিমজীবন কেমন ছিল, তার অস্তিত্ব খুঁজবো ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্-র পাতায়–সেদিন আবদুল্লাহ্ বোধকরি, শিল্প থাকবে না, হবে ইতিহাস এবং সে-সূত্রেই আমরা বলছি, আবদুল্লাহ্ যতটা না শিল্প, তার চেয়ে বড় কথা এ-হচ্ছে সমাজচিত্র, খালি চোখে দেখা পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাজবাস্তবতা।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে গ্রামীণ মুসলিমসমাজের পীরভক্তি, ধর্মীয় কুসংস্কার, পর্দাপ্রথা, আশরাফ-আতরাফ বৈষম্য, হীন স্বার্থপরতা, সম্প্রদায়বিদ্বেষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া মানবতাবাদী প্রতিবাদ। মধ্যবিত্তের বিকাশের ফলে মুসলিমসমাজের ভিত্ কিভাবে নড়ে উঠেছে তার চিত্র আছে, আছে গ্রামীণ সমাজের বহুমাত্রিক জটিলতা ও বিরোধ; তবু স্রষ্টার ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানবতাবাদী দর্শনই আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মৌল-অভিজ্ঞান। ইমদাদুল হক স্বপ্ন দেখেছেন মানব-মৈত্রীর, ঘৃণা করেছেন সম্প্রদায়-বিদ্বেষী মানসিকতাকে মুসলিম জীবনচিত্রণ-সূত্রে এ-কথাই উচ্চারিত হয়েছে উপন্যাসে। এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় আবদুল্লাহ্ উপন্যাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিমত আবদুল্লাহ্ বইখানি পড়ে আমি খুশি হয়েছি–বিশেষ কারণে, এই বই থেকে মুসলমানের ঘরের কথা জানা গেল। এদেশের সামাজিক আবহাওয়া-ঘটিত একটা কথা এই বই আমাকে ভাবিয়েছে। দেখলুম যে ঘোরতর বুদ্ধির অন্ধতা হিন্দুর আচারে হিন্দুকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করেছে, সেই অন্ধতাই চাদর ত্যাগ করে লুঙ্গি ও ফেজ পরে মুসলমানের ঘরে মোল্লার অন্ন জোগাচ্ছে। এ কি মাটির গুণ? এই রোগবিষে ভরা বর্বরতার হাওয়া এদেশে আর কতদিন চলবে? আমরা দুই পক্ষ থেকে কি বিনাশের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরস্পর পরস্পরকে আঘাত ও অপমান করে চলব? লেখকের লেখনীর উদারতা বইখানিকে বিশেষ মূল্য দিয়েছে।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে ইমদাদুল হক ব্যক্তিচরিত্র অপেক্ষা সমাজমানসের প্রতি অধিক মনোযোগী ছিলেন; ফলে উপন্যাসের যে অন্যতম শর্ত চরিত্রসৃজন, তা থেকে গেছে গৌণ, কখনো-বা অবহেলিত-উপেক্ষিত। মানবচিত্তের মূল প্রবৃত্তিগুলির দ্বন্দ্বে মানুষ কত অসহায়–এই চিরন্তন সত্যের রূপ-অঙ্কনে কাজী সাহেব যতটা নজর দেননি, তার চেয়ে বেশী তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে গ্রাম-বাংলার মুসলমানদের বিশেষ সমাজ ও বিশেষ কালের ছবি আঁকার দিকে। শিল্পী বঙ্কিমচন্দ্রের (১৮৩৮-১৮৯৪) উপন্যাসসমূহ যেমন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে হিন্দু বঙ্কিমচন্দ্রের কঠোর শাসনে; তেমনি শিল্পী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্ বরাবর নিয়ন্ত্রিত হয়েছে সমাজের গলদ-প্রদর্শক একজন সমাজসংস্কারক ইমদাদুল হকের অদৃশ্য নির্দেশে। ফলে একটি মহাকাব্যিক পটকে স্পর্শ করেও ইমদাদুল হক ব্যর্থ হয়েছেন শৈল্পিক সিদ্ধি অর্জনে। এত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিষাদ-সিন্ধু (১৮৯১) আর আনোয়ারার (১৯১৪) পরে। আবদুল্লাহ্-র জাগরণকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি একটা বিশেষ সময়ের মুসলিমমানসের। শিল্পিত ভাষ্য হিসেবেই।

সফল হোক বা না-ই হোক, তবু আবদুল্লাহ-ই এ-উপন্যাসের নায়ক। তাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের ঘটনাক্রম আবর্তিত হয়েছে, ধরা যায় তাকে সমস্ত ঘটনার যোগসূত্র হিসেবেই–তবু তার কোন ভূমিকাই নায়কোচিত নয়। প্রথম আবির্ভাবে তাকে যেমনটি দেখেছি, উপন্যাসের অন্তিমলগ্নেও সে তেমনি থেকে গেছে, ভোগেনি একবারও অন্তর্দ্বন্দ্বে; সমস্ত বিপর্যয়ের মুখে সে সব সময়ই যেন যুধিষ্ঠির। প্রথম থেকেই আবদুল্লাহ্ সম্পূর্ণাঙ্গ চরিত্র, তার কোন উদ্ভব নেই, বিকাশ নেই, নেই কোন পরিণতি। আবদুল্লাহ যেন ইমদাদুল হকের মানস-আকাঙ্ক্ষার শিল্প-মূর্তি ইমদাদুল হকের মতোই সংযতবাক, অচঞ্চলচিত্ত ও আদর্শনিষ্ঠ এক শিক্ষাব্রতী।

এতসব সীমাবদ্ধতা ধারণ করেও, আবদুল্লাহ্ এই অর্থে অনন্য ভাস্বর চরিত্র যে, সে-ই নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তমানসের প্রথম শিল্প-সন্তান। রক্ষণশীলতার দুর্গ সৈয়দ সাহেব আর প্রগতিমুখী মীর সাহেবের চৈতন্যের সংঘাত-সংঘর্ষে আবদুল্লাহ্ তৃতীয় মাত্রা নিয়ে বুর্জোয়া মানবতাবাদের ধারক হয়ে উঠতে চেয়েছে–কূপমণ্ডুকতা-পীরপ্রথা-ধর্মপ্রথা আর পাথরচাপা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তাই অভীকচিত্তে সে বলতে পেরেছে এমন কথা–
ক. তাদের (হিন্দুদের) আছে বলেই যে আমাদের সেটা থাকতে হবে, এমন ত কোনো কথা নেই, আম্মা! আর এই পীর-মুরীদি ব্যবসায়টা হিন্দুদের পুরুতগিরির দেখাদেখিই শেখা, নইলে হযরত ত নিজেই মানা করে গেছেন, কেউ যেন ধর্ম সম্বন্ধে হেদায়েত করে পয়সা না নেয়।
খ. অত শরীয়তের ধার ধারিনে ভাই সাহেব; এইটুকু বুঝি যে মানুষের সুখ-সুবিধারই জন্য শরা-শরীয়ত জারি হয়েছে; বে-কায়দা কালে-অকালে কড়াকড়ি করে মানুষকে দুঃখ দেবার জন্যে হয়নি।
গ. খোদার উপর অবিশ্বাস দেখলে কোন্খানে? সংসারে উন্নতির চেষ্টা না করে কেবল হাত পা কোলে করে বসে থাকলেই যদি খোদার উপর বিশ্বাস আছে বলে ধরতে চাও, তবে আমি স্বীকার করি, আমার তেমন বিশ্বাস নেই।
আবদুল্লাহ্ পীরপ্রথা আর কুসংস্কারপ্রিয়তাকে প্রায়শই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে যেমন জর্জরিত করেছে, তেমনি উচ্চারণ করেছে অসাম্প্রদায়িক মানস-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন দেখেছে একটি নতুন সমাজের। বরিহাটীর স্কুল থেকে বিদায়-লগ্নে ছাত্রদের উদ্দেশে তার বক্তব্য মুসলিম মধ্যবিত্তের অসাম্প্রদায়িক জীবনদৃষ্টিকে যেমন প্রকাশ করেছে, তেমনি এর মধ্য দিয়েই ইমদাদুল হকের মৌল-আকাঙ্ক্ষাও অভিব্যঞ্জিত হয়েছে–আশীর্বাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও–যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা কত্তে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে কত্তে পারে। এই কথাটুকু তোমরা মনে রাখবে ভাই, –অনেকবার তোমাদের বলেছি, আবার বলি, হিন্দু-মুসলমানে ভেদজ্ঞান মনে স্থান দিও না। আমাদের দেশে যত অকল্যাণ, যত দুঃখ-কষ্ট, এই ভেদজ্ঞানের দরুনই সব। এইটুকু ঘুচে গেলে আমরা মানুষ হতে পারব দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারব।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে মুসলিম মধ্যবিত্তমানসের মৌল-লক্ষণ সমাজবিচ্ছিন্ন স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং একই সাথে সমাজ-সংশ্লিষ্ট কর্মচেতনা আবদুল্লাহ্ চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিল্পমূর্তি লাভ করেছে। আবদুল্লাহ্ তার দৃষ্টিকে সমাজ-অঙ্গন থেকে কখনো ব্যক্তিলোকে নিয়ে আসতে পারেনি ফলে সমাজস্রোতে ভাসমান ব্যক্তি-আবদুল্লাহর কোনই সংরাগ অনুরাগ–সংবেদনা আমাদের কাছে ধরা দেয়নি। সে সব সময় ভালো থেকে গেছে, খুব ভালো এবং শেষ পর্যন্ত এক ভালোমানুষ হিসেবেই নতুন-পুরাতনের দ্বন্দ্বে সে জয়ী হয়েছে– স্রষ্টা যেন নিজের মানসইচ্ছাকে আবদুল্লাহর মাধ্যমে শিল্পমূর্তি দান করেছেন। তাই উপন্যাসের অন্তিমলগ্নে হরনাথের দৃষ্টিকোণে লেখক উচ্চারণ করেছেন এমন কথা– এই মহৎ উদার যুবকের প্রতি তাঁহার (হরনাথ) মন আপনা হইতে নত হইয়া পড়িল। শ্রদ্ধায়, প্রীতিতে তাহার সমগ্র অন্তর্দেশ ভরিয়া উঠিল। তিনি উঠিয়া আবদুল্লাহকে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, ভাই, তোমার মহত্ত্বের কাছে আজ আমি নতশিরে পরাজয় স্বীকার করছি। আজ হতে সত্যিই তুমি আমার ভাই।
আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মৌল-বিষয় মুসলিমসমাজের জগদ্দল-প্রথা আর মিথ্যা সামন্ত আভিজাত্যের পতন-উন্মোচন এবং সে-সূত্রেই সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস-চরিত্রের উজ্জ্বল নির্মিতি। সৈয়দ সাহেবই এ-উপন্যাসের একমাত্র চরিত্র, যাকে ভালো-মন্দ মিলিয়ে রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয়। শরাফতী অভিমান, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অতিধার্মিকতা, মিথ্যা আভিজাত্যবোধ, অমিতচারিতা, খ্যাতি অর্জনের দুর্মর বাসনা এবং অর্থলোলুপতা–সবকিছু মিলে তিনি ধ্বংসোনুখ সামন্তসমাজের শেষ নিশ্বাস যেন। মীর হোসেন আলীর চরিত্র সৈয়দ সাহেবের বিপরীত প্রান্ত ধরে নির্মিত হয়েছে। সে সুদখোর, তাই প্রচলিত ধারণায় অধার্মিক–কিন্তু গভীরতর দৃষ্টিতে দেখলে সে অধার্মিক হয়েও মানুষ। ধার্মিক হলেই যে মানুষ শ্রদ্ধেয় হয় না, অথচ পুরোপুরি ধার্মিক না হলেও শ্রদ্ধেয় হতে পারে, এই দৃষ্টিকোণে চরিত্রদ্বয় চিত্রিত করে ইমদাদুল হক আধুনিক যুগের ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে তার সাধর্মের পরিচয় দিয়েছেন।১১ দুটো চরিত্রের অন্তসত্তার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে লেখক উপস্থাপন করতে চেয়েছেন মুক্তবুদ্ধির এক মৌল ধারণা, যা কাজী আবদুল ওদুদের ভাষ্যে– যখন ভাবা যায়, রক্ষণশীল সৈয়দ সাহেবের প্রকাণ্ড ব্যক্তিত্ব, তার চারপাশের জগতের উপরে তার প্রভাব, আর সমাজে অপ্রিয় কিন্তু তীক্ষ্ণদৃষ্টি ও বিচক্ষণ মীর সাহেবের অনাড়ম্বর কিন্তু সুনিশ্চিত সংস্কারপ্রয়াস ও তাতে অনেকখানি সাফল্য, তখন মনে হয় এই দুই ব্যক্তি অথবা দুই শক্তি আবদুল্লাহ-কারের তুলিকার প্রধান বিষয়, –আবদুল্লাহ্, আবদুল কাদের, রাবিয়া, হালিমা প্রমুখ মুসলিম নবীন-নবীনা হচ্ছেন বাংলার মুসলিমসমাজের এই দুই বিরুদ্ধশক্তির অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষজাত স্ফুলিঙ্গ। এই স্ফুলিঙ্গই অবশ্য ভবিষ্যতের অচঞ্চল আলোকের পূর্বাভাস।
আবদুল্লাহ উপন্যাসে নারী আছে, কিন্তু কোন নারী-চরিত্র নেই যারা ব্যক্তিত্বে-প্রেমে সংগ্রামে-সত্তায় সমুজ্জ্বল। কারণ একটাই, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুসলিম সমাজে নারীর ব্যক্তিত্ব-বিকাশের চরম অবরোধ। তবে এখানে লেখকের ব্যর্থতা ঢাকবার পুরোপুরি অবকাশ নেই, কারণ সালেহা-হালিমা বা রাবিয়ার বেশ কিছু পূর্বেই মোহাম্মদ নজিবর রহমানের (১৮৭৮-১৯২৩) শব্দস্রোতে আমরা পেয়েছিলাম ব্যক্তিত্বসচেতন আনোয়ারা চরিত্র–তারও ছিল একই সমাজপটভূমি।

দিগম্বর ঘোষ এবং হরনাথ চরিত্রের মাধ্যমে লেখক উপস্থিত করেছেন হিন্দু-সামন্তপ্রভুর মহাজনি শোষণের চিত্র। ইমদাদুল হকের শিল্পিমানসের মৌল-ধর্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সে-সূত্রে আবদুল্লাহর পরেই এসেছে ডাক্তার দেবনাথ সরকার চরিত্র। দেবনাথ সকল ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানবিক গুণে জাগ্রত এক উদার মানুষ। এ-উপন্যাসে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক চেতনা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের মুখে, কিন্তু লেখকের সাফল্য এখানেই যে, তিনি সচেতনভাবে তার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এবং আবদুল্লাহ্ ও দেবনাথ-চরিত্রের মাধ্যমে তার কেন্দ্রীয়বোধে জাগ্রত থেকেছেন।

কাজী ইমদাদুল হক বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক নন, তবে শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের অন্যতম ধর্ম যে পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা–তা ছিল আবদুল্লাহ্-কারের করতলগত। পর্যবেক্ষণক্ষমতার সূক্ষ্মতায় ইমদাদুল হক ছিলেন শ্রেষ্ঠমানের শিল্পী এবং এ সূত্রেই এ-উপন্যাসে পরিপ্রেক্ষিতের চরিত্রসমূহের উজ্জ্বল নির্মিতি। ইমদাদুল হক যে ঔপন্যাসিকের প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন, এ-উপন্যাসে পরিপ্রেক্ষিতের চরিত্রগুলো দেখেই আমরা তা অনুধাবন করতে পারি। নিরাসক্ত দৃষ্টি দিয়ে তিনি এমন কতিপয় চরিত্র নির্মাণ করেছেন, সমকালীন মুসলিম কথাকোবিদদের রচনায় তার তুলনা মেলা ভার। ২৯ পরিচ্ছেদে আছে এমন একটি উজ্জ্বল নির্মাণ। আবদুল্লাহ্ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে রসুলপুর স্কুলে। পল্লিগ্রামের রাস্তা বর্ষার অত্যাচারে গরুর গাড়ির জন্যে উপযুক্ত ছিল না, ফলে একস্থানে গাড়ি অচল হলো। রাস্তার পাশেই এক ব্রাহ্মণের বাড়ির উপর দিয়ে যাবার বিকল্প পথ ছিল। আবদুল্লাহ্ সে-চেষ্টা করতে গেলে উপন্যাসে ফুটলো সেই ক্ষণিকের উজ্জ্বল চরিত্র–
আবদুল্লাহ্ যথাশক্তি বিনয়ের ভাব দেখাইয়া কহিল, মশায়, আমি গরুর গাড়ি করে যাচ্ছিলাম, গ্রামের মধ্যে এসে দেখি রাস্তার এক জায়গায় ভাঙ্গা, গাড়ি চলা অসম্ভব। শুনলাম মশায়ের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা পথ আছে, যদি দয়া করে… লোকটি রুখিয়া উঠিয়া কহিলেন, হ্যাঁ, তোমার গাড়ি চলে না চলে তা আমার কি? আমার বাড়ির উপর দিয়ে ত আর সদর রাস্তা নয় যে, যে আসবে তাকেই পথ ছেড়ে দিতে হবে…
আবদুল্লাহ্ একটু দৃঢ়স্বরে কহিল, মশায়, বিপদে পড়ে একটা অনুরোধ কত্তে এসেছিলাম, তাতে আপনি চটছেন কেন? পথ চেয়েছি বলে ত আর কেড়ে নিতে আসিনি। সোজা বল্লেই হয়, না, দেব না।

ওঃ, ভারি ত লবাব দেখি! কে হে তুমি, বাড়ি বয়ে এসে লম্বা লম্বা কথা কইতে লেগেছো?
লোকটা গজর গজর করিতে লাগিল। আবদুল্লাহ্ ফিরিয়া চলিল। তাহাকে বিষণ্ণ মুখে ফিরিতে দেখিয়া গাড়োয়ান কহিল, দেলে না বুঝি? আমি জানি ও ঠাহুর ভারি ত্যান্দোড়। তবু আপনেরে একবার যাতি কলাম, ভদ্দর লোক দেখলি যদি যাতি দেয়।

গাড়োয়ানের সঙ্গে নিজে কাদায় নেমে গাড়ি চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় আবদুল্লাহ্। অবশেষে গ্রামের লোকদের সাহায্যে তারা গাড়ি খাদ থেকে তুলে নিতে সক্ষম হয়। তখন ব্রাহ্মণ ব্যক্তির অভিব্যক্তি–
ব্রাহ্মণটি উঠিয়া গিয়াছিলেন; কিছুক্ষণ পরে পান চিবাইতে চিবাইতে ডাবা হাতে আবার বাহিরে আসিয়া বসিলেন।… যাইবার পূর্বে আবদুল্লাহ সেই ডাবা-প্রেমিকটির দিকে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল ঠাকুরমশায় তাহাদের দিকে তাকাইয়া আছেন এবং সুস্থচিত্তে ধূমপান করিতেছেন।

অপ্রধান চরিত্রসমূহের ক্ষেত্রেও ইমদাদুল হকের এমন শৈল্পিক-সিদ্ধি লক্ষণীয়। বরিহাটী গভর্নমেন্ট স্কুলের হেডমাস্টার, পূর্বাঞ্চল-নিবাসী মৌলবী সাহেব, কলকাতার পীর সাহেব কিংবা রেলস্টেশনের হোটেলওয়ালার চরিত্র নির্মাণে ইমদাদুল হক রেখেছেন অসামান্য সাফল্যের স্বাক্ষর। পূর্বাঞ্চল-নিবাসী মৌলবী সাহেব এক বিস্ময়কর চরিত্র। এ-চরিত্রসূত্রে ইমদাদুল হক একদিকে যেমন তুলে ধরেছেন সমাজের শ্রেণী-বৈষম্যের উৎকট চেহারা; তেমনি তার আপন অস্তিত্বের অভিলাষ। সৈয়দ সাহেবের পারিবারিক মক্তবে প্রভু-পুত্র বাঁদী-পুত্রদের পাঠ-প্রদানে বৈষম্যের কারণ জিজ্ঞাসায় মৌলবী সাহেবের অকপট উচ্চারণ– মৌলবী সাহেব আবদুল্লাহর আরো কাছে ঘেঁষিয়া আসিয়া ফিসফিস করিয়া কহিতে লাগিল, খতাড়া খি, বোলেননি, দুলহা মিঞা? অরা অইলো গিয়া আত্রাফগোর ফোলাফান, অরা এইসব মিয়াগোরের হমান চলতাম্ ফারে? অবৃগো জিয়াদা সবক দেওয়া মানা আছে, বোজুলেননি?
এতক্ষণে আবদুল্লাহ্ এই পাঠদান-কৃপণতার মর্ম হৃদয়ঙ্গম করিতে সমর্থ হইল। পাছে প্রতিবেশী সাধারণ লোকের ছেলেরা নিজেদের ছেলেদের অপেক্ষা বেশী বিদ্যা উপার্জন করিয়া বসে, সেই ভয়ে তাহার শ্বশুর এইরূপ বিধান করিয়াছেন। সে আবার জিজ্ঞাসা করিল, তা ওদের পড়তে আসতে দেন কেন? একেবারেই যদি ওদের না পড়ান হয়, সেই ভাল নয় কি?

এই কথায় মৌলবী সাহেবের হৃদয়ে করুণা উথলিয়া উঠিল। তিনি কহিলেন, অহহঃ, হেডা কাম বালা অয় না, দুহা মিঞা! গরীব তাবেলম হিব্বার চায়, এক্কেবারে নৈরাশ করলে খোদার কাছে কি জবাব দিমু? গোমরারে এলেম দেওনে বহুত সওয়াব আছে কেতাবে ল্যাহে।

আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে ইমদাদুল হক মূলত এঁকেছেন সমাজচিত্র, তাই কোন চরিত্রেরই ব্যক্তিক মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণে তিনি উৎসাহী নন। নজিবর রহমানের আনোয়ারা-র মতোই আবদুল্লাহ্ সমকালীন মুসলিম-জীবনবিশ্বাসের শিল্প-প্রতিমা। তবে আনোয়ারার ঘটনাসংস্থান কিংবা চরিত্রচিত্রণ-প্রক্রিয়া যেখানে সষ্টার সামন্ত-মূল্যচেতনা ও নীতিবোধ নিয়ন্ত্রিত, সেখানে আবদুল্লাহ্-র ঘটনাংশ, চরিত্রসৃজন-কৌশল কিংবা পরিপ্রেক্ষিত-উন্মোচন একান্তই বিকাশোন্মুখ বুর্জোয়া মানবতা-শাসিত। ইমদাদুল হক সম্পূর্ণ স্বাধীন-চিত্তের ও মৌলিক পর্যবেক্ষণ-শক্তির পরিচয় দিয়েছেন আবদুল্লাহ্ উপন্যাসে। এ-বইটি বাঙালি মুসলমান সমাজের ক্ষয়িষ্ণু আদর্শ ও পরিহার্য রীতিনীতি-সমালোচনার এক স্মরণীয় প্রচেষ্টা।

০৩.
লেখকের ব্যক্তি-সংবেদনা এবং সমাজচৈতন্যের চিত্র ও চিত্রকল্পময় বর্ণনাত্মক নির্মিতির নাম যদি হয় উপন্যাস, তবে ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ্-কে আমরা দিতে পারি না একটা সফল উপন্যাসের অভিধা। উপন্যাসের গঠনশৈলী এবং প্রকরণ–পরিচর্যার দিকে ইমদাদুল হক তেমন মনোযোগী ছিলেন না; পূর্বেই বলেছি, তার কেন্দ্রীয় দৃষ্টি মূলত বহির্বাস্তব বৃহত্তর সমাজ-অঙ্গনেই ছিল বিচরণশীল। উপন্যাসের যে-কেন্দ্রানুগশক্তি সকল খণ্ডচিত্রকে একটি অখণ্ড মালায় গ্রথিত করে, তা এখানে নেই। কাহিনীর কেন্দ্রে থেকেও আবদুল্লাহ্ পালন করতে পারেনি সেই কেন্দ্রানুগ শক্তির ভূমিকা। ফলে উপন্যাস-অবয়ব ধারণ করেও আবদুল্লাহ অন্তিম বিচারে থেকে যায় প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-৮৩) আলালের ঘরের দুলাল-এর (১৮৫৮) মতোই সমাজের চিত্রমালা হিসেবে।
উপন্যাসের বর্ণনাংশে এবং সংলাপের ভাষা-ব্যবহারে ইমদাদুল হক সচেতন প্রযত্নের স্বাক্ষর রেখেছেন। উপন্যাসের যে-অংশ লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের আলোয় রচিত হয়েছে, সেখানকার ভাষা সাধুরীতির; আর চরিত্রসমূহের সংলাপে আছে চলিতরীতি। পূর্বাঞ্চলীয় মৌলবী সাহেব কিংবা কলকাতার পীর সাহেবের মুখে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে ইমদাদুল হক বিস্ময়কর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষা-ব্যবহারের সম্ভাবনার সীমা মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে ইমদাদুল হকের হাতেই প্রথম প্রসারিত হয়েছে। প্রকরণ–পরিচর্যায় ইমদাদুল হক সচেতন ছিলেন না–পূর্বেই বলেছি। তবু কখনো কখনো কিছু বর্ণনাত্মক পরিচর্যা পাঠকের সংবেদনাকে আকর্ষণ করে। এমন একটি দীপ্র এলাকা– বৈঠকখানা ঘরটি নিরতিশয় জীর্ণ এবং আসবাবপত্রও তাহার অনুরূপ। বসিবার জন্য একখানি ভগ্নপ্রায় চৌকি–সে এত পুরাতন যে, ধুলা-বালি জমিয়া জমিয়া তাহার রং একেবারে কালো হইয়া গিয়াছে। চৌকির উপর একটি শতছিদ্র ময়লা শতরঞ্জি পাতা, তাহার উপর ততোধিক ময়লা দুই-একটা তাকিয়া, উহার এক পার্শ্বে সদ্যব্যবহৃত ক্ষুদ্র জায়নামাজটি কোণ উল্টাইয়া পড়িয়া আছে। মেঝের উপর একটা গুড়গুড়ি, নয়চাটীতে এক ন্যাকড়া জড়ান হইয়াছে যে, তাহার আদিম আবরণের চিহ্নমাত্রও আর দৃষ্টিগোচর হইবার উপায় নাই। গৃহের এক কোণে একটি মেটে কলসী, কোণে একটি বহু টোল-খাওয়া নল-বাকা কলাইবিহীন বা স্বকৃত কর্দমের উপর কাৎ হইয়া পড়িয়া আছে।

ইমদাদুল হকের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কৌতুকময়তা এবং তাঁর কৌতুকে আছে মননশীলতা ও মার্জিত রুচির স্বাক্ষর। যেমন–
ক. বৈঠকখানার এক প্রান্তে তখন এ বাটীর পারিবারিক মক্তব বসিয়া গিয়াছে। একখানি বড় অনতিউচ্চ চৌকির উপর ফর্শ পাতা; তাহারই উপর বসিয়া পূর্বাঞ্চল-নিবাসী বৃদ্ধ মৌলবী সাহেব আরবী, ফারসী এবং উর্দু সবকের রাশিতে ছোট ছোট ছেলেদের মাথা ভরাট করিয়া দিতেছে।
খ. এইরূপ বহু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনার পর মৌলুদ-খান সাহেব এক দীর্ঘ মোনাজাত (প্রার্থনা) করিয়া মৌলুদ শরীফ সাঙ্গ করিলেন। সমস্তই উর্দু ভাষাতে কথিত ও গীত হইল; অধিকাংশ লোকই তাহার এক বর্ণও বুঝিল না; কিন্তু তাহাতে পুণ্যসঞ্চয়ের কোন বাধা হইল না।
প্রায় সকল লেখকের মতো, ইমদাদুল হকেরও যাত্রা শুরু কবিতার স্নিগ্ধতা নিয়ে। তবে। এ-উপন্যাসে তার সেই কবিসত্তা সুপ্তই থেকেছে, মাঝে একবার মাত্র প্রকৃতি-বর্ণনায় আঁখি জল (১৯০০) আর লতিকা-র ইমদাদুল হক উঁকি দিয়েছেন এখানে– তখন শরৎকাল প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। মাঠগুলি পরিপূর্ণ; মৃদুমন্দ বায়ু হিল্লোলে তাহাদের শ্যামল হাস্য ক্ষণে ক্ষণে তরঙ্গায়িত হইয়া উঠিতেছে। এই অপূর্ব নয়ন-তৃপ্তিকর দৃশ্য দেখিতে এবং শারদীয় প্রভাতের সুখ-শীতল সমীরণের মধুর স্পর্শ অনুভব করিতে করিতে আবদুল্লাহ্ মাঠের পর মাঠ এবং গ্রামের পর গ্রাম পার হইয়া চলিতে লাগিল।

ইমদাদুল হক প্রায়শই প্রবাদ-প্রবচনের অব্যর্থ ভাষ্যে তুলে ধরেন আপন বক্তব্য, যা আবদুল্লাহ উপন্যাসের ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উপমা-উৎপ্রেক্ষা তার শিল্পচেতনার প্রাতিস্বিকতাকেই প্রমাণিত করে। তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি চরিত্রের ভাবনাপুঞ্জের অনুগামী করে নির্মাণ করেন উপমা-উৎপ্রেক্ষা। যেমন–
ক. পথে হঠাৎ সাপ দেখিলে মানুষ যেমন এক লক্ষে হটিয়া দাঁড়ায়, সেও তেমনি হটিয়া গিয়া বলিয়া উঠিল, আহা, করেন কি, করেন কি, গোলদার সাহেব!
খ. দমাদম্ ঢোলে ঘা পড়িতে লাগিল। মদনের মনে হইল, যেন সে ঘা তাহার বুকের ভিতরই পড়িতেছে।
গ. হালিমাকে সঙ্গে লইয়া আবদুল্লাহ্ যখন গৃহে ফিরিল, তখন মাতা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাইলেন।

০৪.
আবদুল্লাহ উপন্যাস মোট ৪১ পরিচ্ছেদের সমষ্টি হলেও, কাজী ইমদাদুল হক লিখেছেন এর প্রথম ৩০ পরিচ্ছেদ মাত্র; বাকি ১১টি পরিচ্ছেদ লিখে উপন্যাসটির একটা সন্তোষজনক সমাপ্তি টেনেছেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর। মোসলেম ভারত (১৯২০) পত্রিকা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইমদাদুল হকের অসুস্থতাজনিত কারণে আবদুল্লাহ শুধুই ইমদাদুল হকের রচনা থাকেনি–তবে এই অর্থেই এটি ইমদাদুল হকের রচনা যে কাজী আনোয়ারুল কাদীর মূলত ইমদাদুল হকের খসড়া অবলম্বন করেই উপন্যাসটি সমাপ্ত করেছেন। যে ১১টি পরিচ্ছেদ আনোয়ারুল কাদীর লিখেছেন, তাতে তাঁকে ইমদাদুল হকের মতো সমাজের চিত্রকর ততটা মনে হয়নি, যতটা মনে হয়েছে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষক। আনোয়ারুল কাদীর অতি সংক্ষেপে পরিচ্ছেদগুলো শেষ করেছেন, ফলে তার স্বাতন্ত্র তেমন প্রকাশিত হতে পারেনি। তবু দু-একটি পরিচ্ছেদে তার শিল্পপ্রতিভার স্পর্শ লেখেছে। সালেহার মৃত্যু দৃশ্য কিংবা সৈয়দ সাহেবের অন্তিমযাত্রা বর্ণনায় তিনি অনেক সংযতবাক এবং নিরাসক্ত। বোধ করি, আনোয়ারুল কাদীরের শিল্পপ্রতিভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য পরিমিতিবোধ; বিভিন্ন চরিত্রের মৃত্যু-বর্ণনায় তার এই বৈশিষ্ট্য চমৎকার প্রকাশিত হয়েছে।

০৫.
সমাজবীক্ষণ যদি আধুনিক ঔপন্যাসিকের অন্যতম লক্ষণ হয়, তবে আবদুল্লাহ্-র স্রষ্টা ইমদাদুল হক আধুনিক ঔপন্যাসিকদের সগোত্র; কিন্তু তবু তিনি সফল ঔপন্যাসিক নন। তিনি সমাজ-প্রাঙ্গণ থেকে অনেক উপাদান সংগ্রহ করেছেন; কিন্তু কতটুকু রাখবেন আর কতটুকু বাদ দিবেন– তা তিনি বুঝতে চাননি কিংবা জানতেন না। তাই প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে; শিল্পী ইমদাদুল হকের পরাভব ঘটেছে শিক্ষাব্রতী সমাজ-সংস্কারক খান বাহাদুর কাজী ইমদাদুল হকের হাতে। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ মহৎ উপন্যাস। হতে পারেনি। তবু একটি বিশেষ সময়ের মুসলিম-জীবনবিশ্বাস ও জীবনযন্ত্রণার শিল্পরূপ হিসেবে আবদুল্লাহ-র মূল্য অনস্বীকার্য এবং পুনরায় বলছি–একগুচ্ছ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, আবদুল্লাহ্-ই নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রথম শিল্পসন্তান। শিল্পসিদ্ধিতে কালজয়ী মহিমা দাবি না করলেও, সমাজবিকাশের ইতিহাস হিসেবে আবদুল্লাহ্ উপন্যাসের মূল্য কোন সূত্রেই অকিঞ্চিৎকর নয়।