মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে সহজেই ইতিহাসবিদ বলতে আমার একটু বাধো বাধো লাগতো। কিন্তু পরে খতিয়ে দেখেছি তাঁর কাজ তো ইতিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি প্রকৃতপক্ষে কালের শব্দে উচ্চকিত কান খাড়া একজন মানুষ। তিনি বঙ্গভঙ্গের উপর যে কাহিনী লিখেছেন সেখানে একজন দৃঢ়চেতা ইতিহাসবিদকে আমরা প্রত্যক্ষ করি। আবদুল মান্নান খুঁটি-নাটি অনেক উপাদান জোগাড় করেছেন এবং দেশ ভাগ হওয়ার কাহিনীটা সোজাসুজিভাবে আমাদের হৃদয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই কৃতিত্ব তাঁর নিজের জীবনকে অনেকটাই বদলে দিতে পারতো। কিন্তু তিনি নিরহঙ্কারী হওয়ায় একজন ব্যাংকার হিসেবে আত্মপরিচয় দিতে হয়ত বা ভালোবাসেন। আমি ঠিক জানি না।

আবদুল মান্নানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে অনলস পরিশ্রমের অনেক চিহ্ন। আমার মনে হয় আজ না হোক কাল তিনি তাঁর ইতিহাস রচনার ক্ষমতাকেই প্রধান করে তুলবেন। অবশ্যই এই প্রাধান্য দেয়াটা তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তাঁরও তো বউ-বাচ্চা আছে। সুখ এবং শান্তিও দরকার।

আমার বিশ্বাস, আবদুল মান্নান যদি তাঁর অন্যান্য কাজকে ঈষৎ স্তিমিত রেখে শুধু ইতিহাস ঘাটাঘাটি করেন তা হলে আমাদের জাতি তাঁর কাছে এক দুর্লভ নিরপেক্ষতা নিয়ে একজন ইতিহাসবিদকেই আবিষ্কার করবে। আমার খুব বলতে ইচ্ছা করে যে ভারত বিভাগের উপর তাঁর কাজ যদি আরো পেছন থেকে শুরু হয় এবং পটভূমিটি সঠিকভাবে নির্ধারিত হয় তা হলে কে জানে হয়ত তাঁর দ্বারা অনেক অলিখিত সংবাদ যা ইতিহাস হিসাবে রচিত হয়নি তার অনেক ফয়সালা বেরিয়ে পড়বে। আমি যদি তাঁর সুহৃদ হই (তিনি আমাকে তাঁর বন্ধুই মনে করেন) তা হলে আমি তাঁকে বেশ গোড়া থেকেই শুরু করতে বলব। গোড়া থেকে শুরু করলে বৃটিশ আমলে ভারতের অবস্থাটা কেমন ছিল, রাজ্যহারা মুসলমানদের পরিস্থিতি তখন কোন্পর্যায়ে পৌঁছে ছিল- সেটা আবদুল মান্নানের চেয়ে বেশি কে আর জানে?

একজন সেনাপতি যদি শেষ পর্যন্ত ঘোড়ার কোচওয়ানে পরিণত হয় তখন বুঝতে হবে যে দুর্ভাগ্যের মার মুসলমানদের উপর কি মর্মান্তিক পরিণতি সৃষ্টি করেছিল। ইংরেজরা মুসলমানদের শুধু পরাজিতই করেনি, মানসিকভাবে পরাভূত করারও চেষ্টা করেছে। মুসলমানরাও তাদের কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনার চেয়ে মাটিতে মিশে যাওয়াই শ্রেয় বলে মনে করেছিল। ফলে একজন সেনাপতির ঘোড়ার কোচওয়ানে পরিণত হওয়ার একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে-এ টা খতিয়ে দেখার লোক কই?

আবদুল মান্নান যদি ইতিহাসটা সঠিকভাবে আমাদের কাছে তুলে ধরতে পারেন তা হলে মন্দ কী? আমি জানি, ওই ইতিহাস অশ্রু সজল না হয়ে কারো পক্ষে বিশেষ করে মুসলমানদের পক্ষে পাঠ করা সম্ভব নয়। আর একথাও সত্য, আবদুল মান্নান এই কাজটি করার জন্য যোগ্যতম পাত্র।

আমি মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে গোড়া থেকে পতনের কাহিনীটি সজ্জিত করতে অনুরোধ করি। বঙ্গভঙ্গের মতো ব্যাপারটা হয়ত এতটা পরিচ্ছন্ন হবে না। তবে কেউ না কেউ তো মুসলমানদের পতনের কার্যকারণগুলো সঠিক ব্যাখ্যায় উপস্থিত করবেন। আমরা চাই, আবদুল মান্নানই সেটা করুন। কারণ তাঁর দ্বারাই যেহেতু বঙ্গভঙ্গের কাহিনী সুচারুরূপে লেখা সম্ভব হয়েছে, তাঁর পক্ষেই এটা খুঁজে বের করা সম্ভব যে বৃটিশরা মুসলমানদের কীভাবে মুহ্যমান করে রাখার ব্যবস্থা করেছিল।

একটা বিষয় আমরা বুঝতে পারি না। সেটা হলো মুসলমানদের এই অবমাননার কালে সবটাই কি শান্তভাবে মেনে নেয়া হয়েছিল? বিদ্রোহ হয়নি? আমাদের তো মনে হয়, মুসলমানরা অত সহজেই বিষয়টা মেনে নিতে রাজি হয়নি। তারা হয়ত ছোট-খাটো বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু তার স্বরূপটা আমাদের জানা নেই। আমরা কেবল সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাসটা জানি এবং এর পরিণতিও দেখেছি। সিপাহী বিদ্রোহ স্তিমিত হওয়ার পর অতিশয় নির্মমভাবে সিপাহী বিদ্রোহের নেতাদের দন্ড দেয়া হয়।
এতে অবশ্য সম্ভ্রম হারা মুসলমানরা প্রশমিত হয়নি। সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর কেন বাঁশের কেল্লা নিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হয়েছিলেন? তিনি কি জানতেন না, বাঁশের কেল্লার দ্বারা ইংরেজের কামানের গোলা ঠেকানো যায় না? তবু তিনি বাঁশের কেল্লা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?

আমরা জানি, সৈয়দ নিসার আলী অনেক প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতাও ছিল অসাধারণ। তবু যে তিনি বাঁশের কেল্লা নিয়েই দাঁড়িয়েছিলেন এর কারণ এই নয় যে, তিনি বোকা ছিলেন। তিনি জানতেন, বাঁশের কেল্লা দিয়ে কামানের গোলা ঠেকানো যাবে না। কিন্তু তিনি যদি সেদিন বাঁশের কেল্লা নিয়ে না দাঁড়াতেন তা হলে বাঙালী মুসলমানরা ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে ভবিষ্যতে আগোয়ান হতো না। নিসার আলীর বাঁশের কেল্লা সেদিন বাঙালী মুসলমানদের বুকে বুকে আগুনের হলকা ছড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে এমন একটাও দিন পার হয়নি যেদিন মুসলমানরা বৃটিশের বিরুদ্ধে তীব্র বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয়নি। সব সময় চেষ্টা ছিল হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার। এক দিনের জন্যেও বৃটিশরা মুসলমানদের বিশ্বাস করেনি। তাদের পোশাককে দারোয়ানের পোশাকে পরিণত করে ইংরেজরা আসলে এদেশীয় সংস্কৃতিকে অপমান করতে চেয়েছিল। সেটা অবশ্য খানিকটা সফল হলেও কার্যক্ষেত্রে বিদ্রোহের আগুন সব সময় মুসলমানদের অন্তঃস্থলে দাউ দাউ করে জ্বলেছে।

ইংরেজের দু’শ’ বছরের মধ্যে একটি দিনও বৃটিশরা এমন অতিক্রম করেনি যে মুসলমানদের ব্যাপারে তাদের কোনো ভয় ছিল না। যদি হিন্দু জমিদারদের সহায়তা না থাকত তা হলে ইংরেজদের কোনো স্থায়ী হওয়ার সুযোগই থাকত না। ইংরেজরা হিন্দুদের বিশেষ করে ধনী হিন্দুদের ব্যাপকভাবে সুবিধাদি দিয়ে রাজা-মহারাজা বানিয়ে মুসলমানদের উপর কর্তৃত্ব করতে বসিয়ে দেয়। মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের এই ফুলে-ফেঁপে উঠা পরিস্থিতি লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাচ্ছিল্যের সাথে তাদের সব সময় অবলোকন করেছেন। বৃটিশরা কলকাতা নগরীর পত্তন করেছিল প্রকৃতপক্ষে হিন্দু জমিদারদের নিরাপত্তার জন্য। সেটা ইংরেজদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে গড়ে উঠেছিল এবং সেটা রক্ষার জন্য কলকাতার পশ্চাতভূমি হিসেবে পূর্ববঙ্গের কৃষকদের হাড়-মাংস জ্বালিয়ে খেয়েছে। পরে অবশ্য অনেক দিন পরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রজাস্বত্ব আইন করে তাদের খানিকটা রক্ষার চেষ্টা করেন এবং সেটা সঠিকভাবে হিন্দুদেরও কাজে লাগে। শেরে বাংলা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না কিন্তু মুসলিম প্রজাদের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এটাই ছিল মুসলমানদের প্রথম উপকারী একটি সংস্কার।

বাঙালী মুসলমানরা একদিনের জন্যেও বৃটিশ শাসন সহ্য করার মতো পরিস্থিতিতে মাথা নত করেননি। অথচ হিন্দু জমিদাররা এমন একটি কুট-কৌশলের সাথে মুসলিম প্রজাদের শোষণ করার প্রয়াস চালাতে শুরু করলেন যে দেশে ধীরে ধীরে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল এবং যেহেতু পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ প্রজাই ছিল মুসলমান তারা অতিশয় হীনবল এবং মাটির সাথে মিশে গেল। তবে বাঙালী মুসলমানদের মাথা তোলার চেষ্টা একদিনের জন্যও স্তিমিত হয়নি। পূর্ব-বাংলার কৃষক বিদ্রোহ বলে যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে তাতে এর কিছু বিবরণ থাকলেও সামগ্রিক অর্থে তা একটি ইতিহাস নয়। মাত্র ইতিহাসের ক’টি সূত্র এতে উল্লেখিত হয়েছে। মুসলমান কৃষকরা সব সময় যেখানে সুযোগ পেয়েছে সেখানেই ইংরেজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং এইসব বিদ্রোহের সার-সংক্ষেপ করলে দেখা যাবে যে বৃটিশ শাসন মেনে নেয়ার ব্যাপারে হিন্দু জমিদারগণ যেমন উদার এবং সমর্থক ছিলেন, তেমনি মুসলমান কৃষক প্রজারা কখনো তা মেনে নিতে পারেননি। এই না পারার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত অস্বীকৃতি।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান যদি গোড়া থেকে এই বিষয়গুলো সূত্রবদ্ধ করে একটি ইতিহাস রচনায় প্রয়াসী হন তা হলে সেটা হবে নিঃসন্দেহে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান। আমরা তাঁকে অনুরোধ করি, শুধু বঙ্গভঙ্গ নয় অনেক কিছুই তো ভেঙেছে, আজো তার একটিও জোড়া লাগেনি। সেক্ষেত্রে ভাঙনের কাহিনী যদি লিখতে হয় তা হলে আবদুল মান্নানকে ভাঙনের অনেক বিষয় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যাবে। আমরা চাই, আবদুল মান্নান সমস্ত ভাঙন সূত্রবদ্ধ করে একটি মহাগ্রন্থ রচনা করুন। বইটির নাম তিনি কি দেবেন জানি না তবে আমরা এর নাম দিতে চাই ‘মহাভাঙনের কাহিনী’।

তিনিই যোগ্য লোক। আমাদের বিবেচনায় মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এ কাজটি নির্ভুলভাবে আঞ্জাম দিতে পারবেন।

এর মধ্যে তাঁর যে সব বই বেরিয়েছে ‘বাংলা ও বাংগালী ঃ মুক্তি সংগ্রামের মূলধারা’, ‘আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা’, ‘বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ’, ‘সোনার দেশ বাংলাদেশ’, ‘শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও জামালউদ্দীন আফগানী’, ‘ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা’, এসবই দুর্মূল্য কিতাব। আমরা এইসব বইয়ের জন্য তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। আশা করি, আমাদের অনুরোধ তিনি বিবেচনা করে দেখবেন। এছাড়া প্রতিটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যা মুসলমানদের স্বার্থে এ পর্যন্ত ঢাকার বুকে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনি আমাদের সাথে ছিলেন। আমরা সেই সব আন্দোলনের সঙ্গী হিসেবে তাঁর কাছে দাবি করি যে মহাভাঙনের ইতিহাসে তিনি অনেক কথাই সূত্রবদ্ধ করতে সক্ষম হবেন।