লন্ঠন

সূর্যাস্ত ফেলেছে নিঃশব্দে ফেরেশতাদের রঙচঙে কাপড়-চোপড়।
উচ্চণ্ড দোকানাবীথি ফুলে-ওঠে ভিড়ে কোলাহলে বাল্বে বাতাসে
এত খুশি, যেন চাঁদে যাবে;
জুতোর ফিতের প্রজাপতি উড়িয়ে লোকেরা যাচ্ছে লেকে-পার্কে-সিনেমায়
সূর্যাস্তের মতো রাঙা বেশ্যা
নীল জানালার পাটতনে ব’সে আয়না ধরেছে,
যেন মুখের সম্মুখে থাবা ধ’রে আছে নিবিড় বাঘিনী;
সারি-সারি আমগাছ মেহগনি-বৃক্ষ হ’য়ে যায়,
তার ফাঁকে-ফাঁকে
জাফরান রোদ সন্ধ্যার চিকুরে আঁচড়ায় সোনার চিরুনি।
সন্ধ্যেবেলা সময়ের নাভি ট’লে ওঠে
ধর্ম যেন পাটকিলে সিংহিনী শোভাবাজারের তেতলায়;
তীব্র আলো-জ্বলা সরু করিডোরে
পাশা-আঁকা নীরক্ত মোজেকে
আদর্শ, নগ্ন রূপসী, তার নাভিমূলে টুংটাং ঘণ্টা বেঁধে
কুক্কুরীর মতো চারি পায়ে ঘোরার চত্বরে জুড়ে
শতকের রাঙা অভিশাপ;
চায়ের কাপের মতো লঘু হাত ফশকে প’ড়ে গিয়ে
চুরমার প্রত্যেকের ভিতরে বিশ্বাস।
বৃহৎ জগৎ থেকে মার খেয়ে ফিরে এসে, দেখি আমি :
কমলালেবুর একখানি কোয়া, নড়ছে তারার চাকা, আর পারা
থার্মোমিটারের, বালিশের অড়,
আংটির মতো ঠোঁট-গোল-করা এতটুকু মেয়ে,
কুকি রমণীর নৃত্যে খুলে-দেয় হিরণ দরোজা,
কাঁচা আমের মাংস, নিসর্গ, আব্বার হাত, আলস্যের ডালপালা :
কিন্তু এইসব পাখি-চোখ গণনায়
কী ক’রে চিহ্নিত করি এই শতাব্দীতের ভুল-ক’রে-আসা আমি-টিকে?
বলা যায় : পরেছে কাচের জুতো ঝড়।
তাই ঘরে ব’সে শুনি : থেকে-থেকে বারা-বার টিয়ের ক্রেঙ্কার,
আর আসকালসন্ধ্যা ব’সে-ব’সে
মেজে-ঘ’ষে তুলেছি লন্ঠন, একমাত্র লন্ঠন আমার।
তারই সন্ধ্যালোকে
টালির উপর থেকে রঙচঙে একটি মোরগ লাফিয়ে নামলে,
মনে হয় :
কোনো শিল্পী বর্ণস্নাত করেছে মোরগটিকে,
অতিযত্নে, লাল পরিশ্রমে।
—কোন শিল্পী? কে ক’রেছে?
—ফাজিল আলোয় ব’সে নিদ্রার অপার জামা প’রে আমার আল্লার ধ্রুবা!
কিন্তু পরক্ষণে আমূল শিউরে উঠে পাই টের :
হায় পৃষ্ঠদেশে বিঁধে আছে চোখা, বাঁকা অবিশ্বাস!
বিশ্ববাংলার ঘরে-ঘরে ক্রমে আলো জ্ব’লে ওঠে;
আমি দীপহীন অন্ধকার ঘরে একা
এরি মাঝখানে নিজের আগুনে জ্বালিয়েছে লণ্ঠন আমার,
এই শতাব্দীর সন্ধ্যাকালে।
সমসাময়িক কুক্কুর-সভ্যতা রুখে
চোখে জ্বলে একি নিষ্পলক ব্যক্তিগত পরকলা,
দেখি : রাত্রিআকাশের গাঢ় ফেজ্ টুপি-পরা কালো খোজা
আর সোনার-ফরশা সুলতানা
শুয়ে আছে মেঘে আর চাঁদে আকাশের সুনীল পালঙে।
আকাশে বাসেছে মুশায়রা,
—ফিরোজার অত্যাচারে পোড়ে মধ্যরাত—
তুলে ধরি বান্দার রেকাব,
কবিতা : হা কবিতা আমার,
তুলে ধরি স্ফিংসের মতন দুর্বোধ্য কবিতা আমার।
মেঘ ক’রে এলে, তবু
রাতভোর শেফালির বিছানানির্মাণ চলে।
তাই ভাবি :
এ আঁধারে দু-হাত পেয়ালা ক’রে
তারা-জ্বলা পানি খাবো ব’লে নেমে যাবো ভীষণ জীবনে।
আমার নিজের তৈরি, নিজের আগুনে জ্বালা
লন্ঠন কি সঙ্গে যাবে? লন্ঠন কি সঙ্গে-সঙ্গে যাবে?
০২.০৯.৬৯
…………………………………………..

চল্ , উদ্বাস্তুরা ! চল্ !

ঝরছে বাংলাদেশ : রূপসীর আননের ছাঁচে
কাঠ-ফাটা তৃষ্ণা, রোগ, ক্ষুধা, জরা, বলিরেখা।—
মন্দিরে, আত্মার ঘণ্টা, কুয়াশার মধ্যে খ’সে পড়ে :
আঁধারে, সবুজ পাতা। একা নাচে দীর্ণ মসজিদে
বেলোয়ারি দিন, রাত্রি; চ’লে গেছে নামাজির দল,
প্রশান্ত ইমাম; টুংটাং ঝাড়বাতি নড়ে; ধূসরতা
আর পাণ্ডু মুখ-চাওয়াচাওয়ি ক’রে ব’সে থাকে
শূন্য পুরোনো বাড়িতে; মসজিদে, মৃদু, শান্ত জলে
কৃষ্ণ-দিন রক্ত-রাত ব্যেপে খেলে লাল-নীল মাছ।
হটাৎ রাত্তিরে ঘুম ভেঙে, দেখি, পরগাছা জামা
শরীর লেপটে আছে—মুসলমানের; বাঙালির
নয়;—কারা-সে নিসর্গচ্ছিন্ন খেলে দীর্ঘ তলোয়ার
আমাদের বাড়ি ঘিরে, নেচে ওঠে হিংসা-অগ্নি-ক্ষুধা :
এই কি পাবক, চৈতন্যের নীল দেশলাই নয়?
ক্ষুধা এই, পূর্ণিমা পলায় যার প্রত্ন গ্রাস থেকে?
এই কি হিংসা, ঈশ্বরে যে দ্বন্দ্বিতা হেঁকেছে জোরে?
শিরার ভিতর থেকে ছিটকে বেরোয় লাল ফিতে,
একরাশ, খুলে যায়, ভাঁজ খুলে ইচ্ছে-মতো যায়;
মাথায় পিঞ্জর থেকে লোহিত-হরিৎ টিয়েপাখি,
চ্রিক-শব্দে বের হ’য়ে মানচিত্র ছিঁড়েখুঁড়ে ফ্যালে।
চিৎকারে ছুটেছি একটি কালো ঘোড়া, প’রে নিয়ে
মানুষের ছদ্মবেশ ;—দীপ্র, সান্দ্র আত্মা বিক্রি ক’রে
জীবনের লঘু-গুরু প্রত্যেকটি দোকানে ফিরেছি,
শরীরে ধারণ ক’রে একমাত্র লাশের প্রচ্ছদ।
…তারপর যতবার কল্যাণে গিয়াছি, কে হেঁকেছে :
“এ দেশ তোমার নয় !” ভালোবাসা-প্রবেশের কালে
বেজে ওঠে তুঙ্গ নাদ : “বেরোও এখান থেকে তুমি!”
ঘৃণার রেলোয়ে বেয়ে ছেড়ে যাই ভালোবাসা-লোক।
বিশ্বাসের বাড়ি ঘিরে চোখ-বাঁধা ভীষণ আগুন
“পালাও এখান থেকে !” বলে।—কুক্কুর-অভ্যাসে দেখি :
ততবার ফেলে যায়, যতবার স্বপ্ন নিয়ে আসি
দাঁতে বিঁধে, বস্তুর অজস্র চাকা অতিক্রম ক’রে।
১৯.১০.৬৭
…………………………………………..

রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতা

সোনার বন্যার মতো গলগল করে বলি অমিতাভ আকাঙ্ক্ষার কথা :
যেন উড়ে চলে যায় বালকের হাত থেকে হাওয়া-ভরা শত রঙিন ফানুশ
সপ্রাণ খুশির ভরে, দূর থেকে আরো দূরে নীলিমার পারে পৃথিবীর
রেস্তোরাঁ টেবিল জ্বলা সন্ধেবেলা থেকে দূর শূন্যে উড়ে যায় শব্দহীন।
পরে, মনে পড়ে যায় :—বসন্ত, কলম তুলে কোনোদিন লিখেছে কবিতা
স্মৃতিরেখা তাও নেই : দুঃস্বপ্নে আমার জন্ম : উগরে দিয়েছে বঙ্গদেশে
পঞ্চাশের মন্বন্তর নামহীন ফুটপাতে পিলপিল ভিড়ের ভিতরে—
আমার জননী, সে তো ক্ষুৎকাতর পঞ্চাশের মন্বন্তর ছাড়া কেউ নয়।
আজো কি রক্তের কালোজামগাছে শিরা-উপশিরা ভরে নিরন্তর বয়
তারি গুপ্ত স্রোতখানি? তারি সঙ্গে নাড়িতে-নাড়িতে বাঁধা পড়ে গেছি, হায়?
বুঝি তা-ই মুঠো থেকে বারে-বারে পড়ে গেছে, যতবার তুলেছি গোলাপ!
এঁকেবেঁকে সব রাস্তা—আক্রান্ত, গোধূলি-দ্বারা—চলে গেছে হাঁ-খোলা কবরে!
আমার কি দোষ, বলো, যদি বেঁকে যায় যতবার অক্ষর লিখেছি?
চেতনা প্রখর হয়ে ওঠে হিরের ছুরির মতো : ‘হায় নিহিত প্রতিভা!
‘হায় নিরঞ্জন পাখি! তুমি-যে আল্লার থুতু : আশরীর ধুলোয় লুটোলে!
‘বড়-জোর এ-ই হয় : ধূসর গুজব তুলে ফুৎকারে ভরবে নির্মোক!
‘আমুন্ডুনখাগ্র তুমি লোবানের ঘ্রাণে ভরা—বেঁচে থাকতে কাফন পরেছ
‘শাদা, কলঙ্ক-না-পড়া শিশুর মনের মতো, বহুব্যবহৃত দেহ আর
‘ত্যক্ত মন ঢেকে নিয়ে; কেবলি ক্রন্দন এক আত্মার ফোয়ারা থেকে উঠে
‘গ্রেফতার করে রাখে : ‘মরণের পরে পরবে জীবনের লাল জামাখানি!’
‘ধুলো- আর স্বপ্ন-ভরা হায় নিরঞ্জন কবি! আটকা পড়েছ হরিণের
‘অনুপম শিঙ নিয়ে লুব্ধ ডালপালাময় ভুবনভাঙার কেশপাশে!’
—মানব : সে পেকে, প’চে, ভেঙে-যাওয়া ফল বাতাস করেছে কলুষিত; আর
আল্লার কড়ে আঙুলে আমার কড়ে আঙুল লাগিয়ে দিয়েছি ঝট করে।
‘ওহ! কী ভুল করেছি!’ ভাবতে-ভাবতে ফের তানপুরার রাস্তায়
কতবার চলে গেছি পরোক্ষ কমলালেবু হাতে করে; আর যতবার
ভেবেছি একটি অর্থ-ভরা কবিতা লিখব, ততবার শব্দের প্রপাত
আমাকে আড়ালে রাখে… আমাকে কেন্দ্রে রেখে ঝরে যায় নিরর্থ তারানা।
রেকাব, ব্যর্থ বিড়াল, ডালিমের দানা, জুঁইফুল, পেরেক, সুসমাচার,
ঝরা পাতা, প্রথম কিশোরী—যার নিতম্ব চাঁদের চেয়েও ভারি হয়ে আসে :
একটি স্টিললাইফে রূপায়িত হয়ে গেলে তবু কিছু বাকি থেকে যায় :
কখনো-বা ফোঁপায় অভাব, কখনো-বা কেঁদে ওঠে মুঠো-মুঠো মুগ্ধ আশরাফি।
অর্থাৎ, শূন্যতা শুধু;—সবি শূন্য ?—তা-ই বটে : নাস্তির নিখিল নটরাজ
নৃত্য করে চরাচারে; জন্মান্ধ রেলোয়ে ব্যেপে নিরন্তর ‘বিদায়, বিদায়!”
যায় কেঁদে; সবার উড্ডীন হাত কেঁপে-কেঁপে লিখে যায় বাতাসে কেবলি :
‘মেদিনী একটি বাঁধাকপি : পাতাগুলি খুলে নিলে পাওয়া যাবে না তাকে।’
স্টেশনের অপেক্ষাগৃহের মতো এই এলোমেলো ঘরে, দুদণ্ডের ঘরে
কত কাল পড়ে আছি : স্নানাহার নেই, শরীরে শ্যাওলা জমে গেছে, গান
গাইতে গেলে ছিঁড়ে যেতে চায় গলা, উড়ে যেতে চায় প্রাণ, নোংরা কাপড় :
বেহালার জ্ঞান নেই, গিটার ঘুমিয়ে আছে, খসে গেছে পিআনোর রিড ॥
…………………………………………..

সৃষ্টিশীলতার প্রতি

শুধু তোমাকে সালাম—আর কাউক্কে তোয়াক্কা করি না,
আর-সব-পায়ে-দলা মুথাঘাস—শুধু তুমি ঘাসে রত্নফুল,
আর-সব নোংরা টাকা-পয়সার মতো : হাতে-হাতে ঘোরে-ফেরে—
শুধু তুমি অমল-ধবল তুমি,
তোমার আহারে শুধু ঘড়ি লাগে—আর-কিছুই রোচে না তোমার,
নামো ঝরনা ফাটিয়ে পাথর—সৃষ্টি তার মুখোশ ছিঁড়েছে,
বস্তুর বিরুদ্ধে শুধু অফুরান প্রজাপতি ওড়ে ॥

…………………………………………..

লাল-নীল মাছ

আলতামিরা গুহা থেকে পাগল বেরিয়ে এসে ছুটেছে বাইসন
পৃথিবী মাড়িয়ে, ভেঙে ফেলে ট্যাবু ও টোটেম,
একটু আড়াল বুঝে হরিণী লুকিয়ে পড়ে
শহরের কোনো গলিপথে,
মসজিদের পাশে, আয়ত নয়নে দ্যাখে :
নিথর চৌবাচ্চা ব্যেপে খেলা করে লাল-নীল মাছ ॥
…………………………………………..

লেখক

একদিন মানুষ ছিলেন, এখন লেখক।
মানুষের সমস্যা কখনো পীড়ন করে না আর তাঁকে,
লেখকের সমস্যায় আপাদমস্তক জর্জরিত।
অন্য লেখকের চেয়ে বড় হতে হবে তাঁকে।
অন্য লেখকের চেয়ে বেশি খ্যাতিমান।
অন্য লেখকের চেয়ে পেতে হবে বেশি পুরস্কার।
…………………………………………..

কবি

কোত্থেকে বেরিয়ে এলে?
—তোমাদের ঐ সূর্য থেকে।
এখন কোথায় যাবে?
—অনন্তে : যেখানে অস্ত যায় না কোনা-কিছু।
মাথায় কী?
—স্বপ্ন-ঘেরা কালোজাম-পাতার মুকুট।
হাতে?
—চাঁদের খুলি মধ্যে-পাওয়া একমুঠো সোনার ছাই।
দূরে কী দেখছ?
—চান্দ্র-মাস বসেছে বিহারে।
বটে? ও-তো শ্রোণিভারে বেদম রমণী :
কী-রকম তড়পায় দেখেছ?
—যেন ডাঙায় কাৎলামাছ, সদ্য পানি থেকে তোলা।
ওদিকে?
—জেলের আতত জাল, ভুল করে সূর্যে পড়েছে।
সঙ্গে আছে কেউ?
—আছে : একটা পাগলা কুকুর, ঈশ্বর বলে ডাকি।
জানো, কী মাড়িয়ে চলেছ?
—হ্যাঁ জানি : বাস্তব।
জানো, আমি কে?
—তুমি তো আয়না।
তুমি কে?
—একলা কবি ॥
…………………………………………..

আমার কবিতার শবে-বরাত

একটি জ্বলন্ত পঙ্ক্তি থেকে সারি-সারি শাদা
রক্তহীন ইন্দ্রিয়বিহীন পঙ্ক্তি জ্বালিয়ে নিয়েছি।
বিদ্যুতের চেয়ে উৎসাহে ঘরে-বাইরে ছুটেছি দুদ্দাড়।
ইলেকট্রিসিটি নয়—আমার নিজের তৈরি অগ্নি জ্বলে
ঘরে-ঘরে, বারান্দায়, করিডোরে,
রেলিঙে, কার্নিশে, জানালার পাটাতনে, ছাদে
গাছের ফোকরে—বাড়িময়।
এক-হাজার ঝলমলে পায়রা এসে বসেছে এখানে—
ওরা কোন জাদুদণ্ডে স্থির থেকে আশ্চর্য উড়ছে।
দুঘণ্টার জন্য আমি পৃথিবী কিনেছি।
ফিরে আসবে তারপর বাল্বে আলো—গরিব, ময়লা;
বৃত্তে কাজ—চিরন্তন।
শুধু দীর্ঘ রাত্রি জেগে বসে থাকবে একটি বালক
আত্মার জানালা এই চক্ষুদ্বয় নিষ্পলক জ্বেলে।
অন্য সব ধ্যান-জ্ঞান লুপ্ত তার। দেখবে সে সমস্ত গাছের
সেই এক-লহমার সিজদা দেওয়া মাটিতে লুটিয়ে,
সমস্ত শব্দের সেই গাঢ়তম আত্মনিবেদন ॥
…………………………………………..

কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড

এখানে কবিতা বানানো হয়।
সব ধরনের কবিতা।
রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা।
নাগরিক কবিতা, গ্রামীণ কবিতা।
প্রেমের কবিতা, শরীরের কবিতা।
স্বপ্নের কবিতা, বাস্তবের কবিতা।
চল্লিশের কবিতা, পঞ্চাশের কবিতা।
ষাটের কবিতা, সত্তরের কবিতা।
আশির কবিতাও আমরা বাজারে ছাড়ছি শিগগিরই।
কবিতার হাত, পা, মাথা, ধড়,
শিশ্ন, যোনি, চুল, নখ,
চোখ, মুখ, নাক, কান,
হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল—
সব-কিছু মওজুদ আছে আমাদের এখানে।
স্বদেশি ও বিদেশি উপমা ও চিত্রকল্প,
শব্দ ও ছন্দ,
অন্ত্যমিল ও মধ্যমিল
লক্ষ লক্ষ জমা আছে আমাদের স্টকে।
ব্যাঙের ছাতার মতো আরো অনেক কবিতার কোম্পানি
গজিয়েছে বটে আজকাল। কিন্তু,
আপনি তো জানেনই,
আমাদের কোম্পানি ইতোমধ্যেই বেশ নাম করেছে।
আর ফাঁকি দিয়ে কি খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব,
বলুন?
হ্যাঁ, আপনার অর্ডার-দেওয়া কবিতাটি এই-তো তৈরি হয়ে এলো।
চমৎকার হয়েছে।
ফিনিশিং টাচ শুধু বাকি।
একটু বসুন স্যার, চা খান,
কবিতার কয়েকটা ইস্ক্রুপ কম পড়ে গেছে আমাদের,
পাশের কারখানা থেকে একছুটে নিয়ে আসবার জন্যে
এখখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি লতিফকে।
…………………………………………..

রাত-শহরের তুমি

শোক-আর-সোনা-পরা শহর এখন জ্বলছে
বিশাল বাঘের মতো
আমার বেদনা আর আনন্দ উঠছে নামছে ছুটন্ত হরিণের চার পায়ে
শস্তা রেস্তোরাঁর ঝাঁপি খুলে আশ্চর্য পোশাক-পরা বাদশার মতো
ময়লা মেঘের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে চমৎকার চাঁদ
রাত্রি-আমি চলেছি ভোর-তোমার উদ্দেশে
রাত্রির ভিতর তুমি আমার একমাত্র জ্বলা নিদ্রাহীন সোনালি জানালা
ভুল সূর্য
রাত্রির ভিতর দিয়ে ঝরনা আমি চলেছি
তুমি প্রত্যেকটি পাথর
আমি হয়ে উঠি জ্বলন্ত দহমান রাত-শহর
তুমি চাঁদের মতো নিতম্বে নক্ষত্রের মতো স্তন-চূড়ায় নিশীথনীলিমা
খুব মধ্যরাতে
মাথার উপরে চাঁদ দেখে
হঠাৎ শাহবাগের মৃত ফোয়ারা শতধারে উচ্ছ্রিত-উৎসারিত হয়ে ওঠে
টেলিফোন-তারের ভিতর দিয়ে স্পন্দমান সুসংবাদ আমি
চলেছি তোমার উদ্দেশে
মধ্যরাতে
ঘুমন্ত ট্যাক্সি চঞ্চল খরগোশ শাহরিক শান্ত জটিল
জ্যামিতির মধ্যে লাফিয়ে বেড়ায়
ডি.আই.টি. বিল্ডিং-এর চূড়া দীর্ঘ দুষ্টুমি করে
একবার চাঁদকে ছুঁয়ে ফ্যালে
সারা রাত্রি আকাশে চলে নক্ষত্রের টাইপ-রাইটার
হঠাৎ বেজে ওঠে টুং
কণ্ঠে সোনার মার্বেল-বেঁধা ঘুঘুর ডাকে
রাত্রির ভিতর দিয়ে ঝরনা-আমি চলেছি তোমার উদ্দেশে
আমার জলে
শহরের শেষ গোলাপজামগাছ থেকে আহত একটি পাপিয়া
ঝরে পড়ছে
তাকে আমি বয়ে নিয়ে চলেছি
আমি চলেছি
ভিতরে পাপিয়া
ঊর্ধ্বে চাঁদ
তুমি
ময়লা আলো নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি শহরতলির প্রান্তিক লাইটপোস্ট
সারা রাত্রি ফ্রিজ-এ বাজে ঝিঁঝির ক্রেঙ্কার
আমার রোদন চুরি করে কেঁদে চলেছে ও।

আবদুল মান্নান সৈয়দ (৩ আগস্ট ১৯৪৩—৫ সেপ্টেম্বর ২০১০) বাংলাদেশের, বাংলা ভাষারই গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি। তবে কথাসাহিত্য, বিশেষ করে সমালোচনা-সাহিত্যে তার নিষ্ঠা কখনোবা কবি-খ্যাতিকে আড়াল করে ফেলেছে অনেক পাঠকের কাছে। যদিও আমাদের বিবেচনায় কবি হিশেবেই তিনি অনন্য।
ষাটের দশকে আবির্ভাবমাত্র ‘পরাবাস্তব কবি’ এই অভিনাম কবির জন্য শ্লেষ ও শ্লাঘা উভয়েরই এক গোপন সূত্র রচনা করেছে। সেই সূত্র ছিন্ন করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। অনলাইনে তার কবিতা প্রায় দুষ্প্রাপ্য। সে কারণে পরস্পরের পক্ষ থেকে এই বাছাইয়ের উদ্যোগ।
তীব্র ৩০-এর সিরিজে মান্নান সৈয়দের কবিতা নির্বাচন ও মুদ্রণের কাজে সবিশেষ কষ্ট স্বীকার করেছেন কবি রাশেদুজ্জামান ও কবি হাসান রোবায়েত। পাঠকরা নিশ্চয়ই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হবেন। কোনো না কোনোভাবে তারা আমাদের পরিবারেরই অংশ। আসুন তবে পাঠ শুরু করা যাক—
চোখ বুঁজে ফুঁ দিচ্ছেন অন্তর্গত, নিবিড় মৌলবি :
সৈয়দ, গভীরতম, আমার অন্বিষ্টা পেনেলোপি ॥