দক্ষিণ আমেরিকার চিলির প্রখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা (১৯০৪-১৯৭৩) তাঁর নোবেল ভাষণে বলেছিলেন: ‘কবিতা লেখার কোনো ফর্মুলা আমি কখনো কোনো বইয়ে পাইনি, অগত্যা আমি লিখিতভাবে উপদেশসূচক একটি শব্দও কি কোনো পদ্ধতি বা কোনো শৈলীর কথা উচ্চারণ করার ইচ্ছা পোষণ করি না যাতে তরুণ কবিকুল আমার নিকট থেকে প্রত্যাশিত জ্ঞানের ছিটেফোঁটাও পেতে পারেন।… দূরগামী যাত্রাপথে কবিতা রচনার ব্যবস্থাপত্র আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। মৃত্তিকা ও আত্মার ভিতর থেকে উৎসারিত দান আশিষ হিসেবে আমার ওপর অর্পিত হয়েছিল। আমার বিশ্বাস এই যে, কবিতা হলো এক পবিত্র ক্ষণস্থায়ী কর্মানুষ্ঠান, যার ভিতরে নৈঃসঙ্গ্য ও ঐক্য, আবেগ ও সকর্মতা, কারো একান্ত পৃথিবী, মানুষের একান্ত পৃথিবী ও প্রকৃতির গোপন উন্মোচন সমভাবে সমপরিমাণে অংশ নিয়ে থাকে। অনুরূপভাবে আমি সংশয়হীন এই ধারণায় উপনীত হয়েছি যে, এসব কিছুই- মানুষ ও তার অতীত, মানুষ ও তার অঙ্গীকার, মানুষ ও তার কাব্য সংরক্ষিত হয়ে থাকে সর্বদা প্রসারমান জনগোষ্ঠীর ভিতরে, এমন এক কর্মপ্রণোদনার মধ্যে যা কোনো একদিন বাস্তবতা ও স্বপ্নকে এক অখ- সমগ্রতায় গেঁথে নেবে, কারণ এভাবেই তো তারা পরস্পরে মিলিত হয়।’ (নোবেল ভাষণ: বাক্ থেকে পামুক, ভূমিকা ও সম্পাদনা: হায়াৎ মামুদ, ২০০৮, ৭৩-৭৪)- বাঙালির ঐতিহ্য এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের চেতনা ধারণ ও লালনকারী কবি আবদুল হাই শিকদার (জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৫৭, কুড়িগ্রাম) কোন পরিবেশ-প্রতিবেশে বেড়ে উঠেছেন, কী পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যচর্চা করছেন এবং তাঁর চিন্তা সমকালে কীভাবে আমাদের জন্য আগ্রহ ও প্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে, তা অনুধাবন করতে হলে কবির প্রতিবেশের ভেতর দিয়ে আত্মার আলোড়ন ও বেড়ে ওঠার সমগ্রতার ছবি পাঠ করাটা অত্যন্ত জরুরি। আবেগ ও বাস্তবতাকে স্বীকার করে শিকদার ক্রমাগত যে অর্পিত কাজের বয়ান ও বয়ন অব্যাহত রেখেছেন, সে বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এখন সময়ের প্রয়োজন।

কবি আবদুল হাই শিকদার যে-রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কালপর্বে পরিভ্রমণ করছেন, সেখানে রয়েছে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতা লাভের সংগ্রাম, সেনা-অভ্যুত্থান, হত্যা-গুম, স্বৈরশাসন, গণতন্ত্রের ওপর উপর্যুপরি আঘাত প্রভৃতি ঘটনার দায় ও দাগ। ভারত-বিভাগ কিংবা ভাষা-আন্দোলন তিনি দেখেননি বটে। দেশবিভাগের ১০বছর পর তাঁর জন্ম। তখন বাংলা ভাষার মর্যাদাও সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান নামক আলাদা দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তার ব্যর্থতা এবং পূর্ব-পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়েওঠা সংগ্রামের বিষ ও বাষ্প তখন এই ভূ-খণ্ডের সমাজ-রাজনীতির বিষয় ছিল। শিকদার তাঁর কবিতার উপাদান সংগ্রহ করেছেন রাজনীতির ভেতরপাঠ থেকে, কথামালা সাজিয়েছেন আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ডানায় ভর করে। তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আমাদের কাছে খুব চেনা। সমকালকে তিনি বর্ণনার চাতুর্যে ও কৌশলে পৌঁছে দিতে পেরেছেন উত্তরকালের উদার বারান্দায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরাট-বিপুল ক্যানভাস তাঁর ভাবনাবলয়কে প্রসারিত করেছে। পাশাপাশি, স্বাধীন বাংলাদেশে লুটপাটের রাজনীতি, ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে আবদুল হাই শিকদার বলিষ্ঠ কণ্ঠ। সবখানে সক্রিয় এই কবি সাংবাদিকতা, সংগঠন-সভা-সমিতি প্রভৃতিতেও বেশ সোচ্চার। অবিভক্ত ভারতের একমাত্র ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং ইরানের কবি হাফিজ কবি শিকদারের প্রেরণা হয়েছেন নানান কারণে। চেতনায় প্রতিবাদ ও রোমান্টিকতা ধারণ করেছেন শিকদার। অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলা আর সৌন্দর্য ও সত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে আবদুল হাই শিকদার তৈরি করে চলেছেন কবিতার এক নিজস্ব ভুবন।

একজন কবি সমকালকে ধারণ করবেন এটাই সত্য। একাত্তরের নয়টি মাসে বিভীষিকাময় যুদ্ধের নানা উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের মানুষ গৃহে ফিরেছিলেন, কিন্তু তখনও অশনি ঝড় কেটে যায়নি। গণতন্ত্র হয়েছিল সুদূর পরাহত। জীবনের সংশয় তাঁর পিছু পিছু। আমরা জানি আশির দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা ছিল। সামরিক অভ্যূত্থান, স্বৈরতন্ত্রের দুঃশাসন, গণতন্ত্রের দাবী, রাজনীতিবিদদের দল বদলের পালা, ছাত্র-আন্দোলন সব কিছু মিলে এক নৈরাজ্য জাতীয় জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। জাতি ক্রমান্বয়ে যেন হতাশার গহীন নদীতে নিমজ্জিত হতে চলেছিল। চারদিকে আন্দোলন, মানুষের রক্তে নদীর জলধারা সিক্ত হয়। এই সমকালকে কবি-মানসে ধারণ করে আবদুল হাই শিকদার লিখলেন কবিতার কথামালা। একটি উদ্ধৃতি নিচ্ছি:
আবার জয়নাল মরে তাজুল কাশেম
চানমিয়া বাবুল ও নূর হোসেন
এক এক নাম যেন এক এক বিশাল মিনার
এক এক বাংলাদেশ বুলেটের ক্রুর কামড়ে
যেন কোন রাজপথে একা পড়ে থাকে
বিষণœতার মেঘ খুব লাল অন্তরের নির্জনতায় মেখে
আর শোক চোখ মুখ জিহ্বাহীন ঢুকে পড়ে বিরাণ শিবিরে
আবলুস পাহাড়েরা সখিনা ও শাহের বানু
বসে থাকে বাষ্প শূন্য ফোরাতের তীরে
(‘আরেক হোসেন’: আশি লক্ষ ভোর)
কবি ফোরাতের তীরকে ব্যবহার করেছেন যেখানে মুসলিম জাহানের গণতন্ত্র অন্তমিত হয়েছিল, শোকার্ত মানুষ হতবিহ্বল হয়েছিল, তা আমাদের বাংলাদেশের বিনষ্ট গণতন্ত্রের সময়ের ছবিই বহন করে। ফোরাতের সঙ্গে পদ্মা যমুনা বিধৌত জনপদের ভাগ্যলিপি সময়ের ব্যবধানে একই ধরনের। গণতন্ত্রের দাবীতে জীবন্ত পোস্টার নূর হোসেনের মৃত্যু ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে করুণ পরিণতির শিকার ইমাম হোসেনের গণতান্ত্রিক চেতনায় একাকার হয়ে গেছে। কবি বলছেন: ‘আদিগন্ত বাংলা আজ হতভাগ্য ইমাম হোসেন’। সমাজ-রাষ্ট্র আর মানুষ শিকদারের কবিতার বিষয়-আশয়। মানুষের জন্য কল্যাণচিন্তা আর রাজনীতিতে সুবাতাস প্রবাহিত করার বোধ তাঁর কবিতাকে করেছে উজ্জ্বলতর এবং স্বচ্ছ। তিনি তাই সমকালের উজ্জ্বলতা আর স্বচ্ছতা বিবরণের কবি।

কবিতার পথ কারো জন্য বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আঙিনা, কারো কাছে তা বাদল দিনে প্রথম কদম ফুল। কবিতার উঠানে কেউ খোঁজে শান্তির সুবাতাস, কেউ ছড়ায় অবিরাম সুফলের বীজ। আনন্দ-অভিজ্ঞান আর আত্ম-বিবরণের জন্য কাব্যকলা কালে কালে কদর কম পায়নি। আবার কেবল যাতনা-পরিভ্রমণের বিষাদঘেরা সময় পার করতেও কবিতার দ্বারে হেলান দিতে হয়েছে কোনো কোনো ক্লান্ত জীবন-পথিককে। আর তাই কবির কলম ও অনুভবের জায়গাটি ভিন্ন ভিন্ন থেকেছে বরাবর। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবের বাইরে কবিতার কলসে প্রবেশের কার্যকারণ এবং ফলত লাভ-লোকসানের কথাও মাঝে মধ্যে যে ওঠেনি, তাও কিন্তু নয়। দক্ষিণ এশিয়ার এক গরীব দেশে নোংরা প্রাণীসম বুদ্ধিজীবীদের কাতারে যখন নিজেকে আবিষ্কার করেন কোনো এক কবি, তখন তিনি আপন অবস্থানের জন্য লজ্জা বোধ করেন এবং তখন এক ‘মহাবৈশ্বিক কুইজ’-এর ছল সৃষ্টি করে নিজের অভিমুখে ছুঁড়ে দেন সামান্য কয়েকটি অসামান্য প্রশ্নের অমীমাংসিত সৌন্দর্য ও ছলাকলা। দুধকুমারের তীরের গোপালপুরের ওয়াজেদ-হালিমার নয়নের ধন ‘মরে বেঁচে’থাকা কবি আবদুল হাই শিকদার নিজেকে ‘গাধা’ বলে অভিহিত করে তাঁর পাঠককেও দাঁড় করিয়েছেন কিছু প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসার সামনে। প্রিয় পাঠক, শিকদার এভাবেই ‘পাছার নিচে সংসদীয় গণতন্ত্রের পোঁতা পেরেক’, ‘কালো পর্দা’ আর ‘উৎকট গন্ধের কোলাহলে’ নিজেকে হাজির রাখেন কবিতার কোলে ও কাঁখে।

শিকদার সত্যি সত্যিই শব্দের শিল্পী। শব্দ নিয়ে খেলতে গিয়ে শিল্পের উদার দরোজার সন্ধান পেয়েছেন। জীবনের নানান অভিজ্ঞতার মিশেলে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন আপন কবিতাভুবন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন- শিল্পের সাধনা সবাইকে দিয়ে হয় না; এ এক ধরনের বিরল প্রতিভা আর কী! কাজেই অটোমেটিকেলি পাওয়া এই প্রতিভার লালন আর প্রতিপালনে শিকদার সতর্ক সাধক হয়ে নিজেকে ধরা দিয়েছেন সাহিত্যের বাজারে। আলো ও সম্ভাবনা শিকদারের কবিতার গায়ে লেগে আছে মমতার প্রলেপ হয়ে। তাঁর কবিতাগ্রন্থাবলির নামকরণের মধ্যে সে রকম ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। প্রথম কবিতার বই ‘আশি লক্ষ ভোর’ (অক্টোবর ১৯৮৯) এবং পরবর্তীকালের ‘আগুন আমার ভাই’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), ‘রেলিঙ ধরা নদী’ (জানুয়ারি ১৯৯২), ‘মানব বিজয় কাব্য’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯২), ‘এই বধ্যভূমি একদিন স্বদেশ ছিল’ (সেপ্টেম্বর ১৯৯৮) প্রভৃতি নামের আড়ালে বিচিত্রভাবে ধরা পড়েছে কবির সমাজকল্যাণ-ভাবনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চিত্রাবলি।

আবদুল হাই শিকদারের কবিতায় জীবনচেতনার প্রতিফলন বেশ স্পষ্ট। মৃত্যুভাবনারও। বাসা বদলাতে যেমন আমাদের খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হয়, তেমনি পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে জীবনের সব লেনদেন শেষ করে পরপারের দিকে পারি দিতেও আমাদের খুব বেশি সময় লাগে না- এ কথা বিশ্বাস করেন কবি শিকদার। তবে মৃত্যুর জন্য সবাই প্রস্তুত থাকে না। সংসারের ভার বেড়ে গেলে, মানুষের প্রতি মমতা জন্ম নিলে আমাদের মনে মৃত্যুভয় বাসা বাঁধে। আর যাদের সংসারের চাপ কিংবা জীবনের মায়া আচ্ছন্ন করতে পারে না, তারা জীবনাবসানকে মানতে পারে অন্য সব সরল সত্যের মতো। আমরা জানি, আসবাব, কাজ-কারবার প্রভৃতির দায় মাথায় নিয়ে সামাজিকের দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বাঁধা-ঝাদার দায় থাকলে দেরি লাগে কাজে বেরুতে। কাজেই জীবনকে ভারমুক্ত করার দিকে শিকদারের সতর্ক নজর প্রসারিত। তাঁর কবিতার জমিনেও আছে এসবের প্রমাণ। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা আনোয়ার হোসেন একবার টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘আমার মা যাবার জন্য প্রস্তুত। আমার বড় ভাইও রেডি। কেবল আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারলাম না। এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে কিছুতেই মন চায় না।’ কিন্তু শিকদার প্রস্তুত। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণাÑ ‘মাত্র তিরিশ মিনিট মানুষের চলে যেতে সময় লাগে।’

শিকদারের রক্তে আছে সাংবাদিকতার নীতি¯্রােতের প্রবাহ। পরিশ্রম আর দায়িত্বের ভারে নির্মিত যে পেশাদারিত্ব, সাংবাদিকদের জীবনে তার সত্যতা মেলে। আছে চ্যালেঞ্জ আর রোমাঞ্চ। এসব জানেন, মানেন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শিকদার। খবরের ভেতরের খবর আর পেছনে লুকিয়েথাকা যাবতীয় রহস্যের জাল উন্মোচনের যে গুরুভার কাঁধে নিয়েছেন পৃথিবীর তাবৎ সংবাদকর্মিরা, তার একটি সরল বিবরণ পাঠ করা যায় শিকদারের কবিতার এই পঙক্তিগুলোয়- প্রকৃতির নিরেট বাস্তবতার আড়াল থেকে:
খুব নিচু হয়ে আকাশ এখানে ঝুঁকে
সার্বক্ষণিক রিপোর্টার কেউ ওঁৎ পেতে বসে আছে
একটা কিছুও ফসকাতে দেবে না সে
(‘শীত’)
ঐতিহ্য-অন্বেষায় শিল্পী-গবেষকদের মন থাকলে ভালো। কবিরাও ইতিহাস, জাতীয় ঐতিহ্য আর সাহিত্যের সম্ভার থেকে সংগ্রহ করেন নানান তথ্য ও প্রেরণা। নিজের ভাষার প্রতি, ওই ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্যের আগ্রহ থেকে বোঝা যায় অভিজাত শিল্পীর প্রবণতা ও জীবনবোধের গভীরতা। এটা একধরনের স্বদেশপ্রেমও বটে। জাতীং সংকটকালে বিপদাপন্ন মানুষ কখনো কখনো ঐতিহ্যের ডানায় ভর দিয়ে খুঁজে ফেরে স্বস্তির বারান্দা। আশাবাদের আলো বুকে ধারণ করতে হলে নিজদেশ ও ভাষার ভাবসম্পদের ওপর অনেক সময় নির্ভর করতে হয়। শিকদারও তাই, স্বভাব-বণিক প্রেমের যুগে, হৃদয়ের মিথ্যা অভিযানের অন্তরালে চতুর্দিকে যুদ্ধময়তার ভেতরে, প্রেমহীন অসহনীয় সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন ভোরের বাতাস। মধ্যযুগের কবি গরীবুল্লাহর সোনাভানের স্বপ্নময়তা আর বটতলার সঙ্গীতসন্ধ্যার উদারতার মধ্যে তিনি ভাসাতে চেয়েছেন ভালোবাসার সাম্পান। কেন এতদিন পর একালের কবি আবদুল হাই শিকদার সোনাভানকে খুঁজে মরছেন (না, ঠিক মরছেন না; বাঁচবার পথ খুঁজছেন হয়তো) তার খানিকটা ব্যাখ্যা নেওয়া যাক তাঁরই বিবরণ থেকে:
আশি মণ খানা তুমি খেয়েছিলে কি না
গরীবুল্লাহ জানে তা আমি তো জানি না
ঘোড়া তরবারি আমি এখনো মানি না
তবুও নারীই তুমি আর কিছু কিছুতেই না
টঙ্গীর সোনাভান বিবি
বিকেলে পাহাড় নেই মাটির ঢিবি
মাটির রহস্য ঘেঁটে দুই চোখে ঘোর
মাটিতেই জন্ম নেয় আশি লক্ষ ভোর।
(‘সোনাভানান্বেষণ’)
বাংলা সাহিত্যের প্রবল আশাবাদী কবি আহসান হাবীব (জন্ম: ২ জানুয়ারি ১৯১৭; মৃত্যু: ১০ জুলাই ১৯৮৫) বলেছিলেন- ‘নাইলের প্রান্তরে এসে ভোর হলো।’ তার মানে তিনি ঐতিহ্যের ডানায় ভেসে ভেসে ভোরের সন্ধান করেছেন। কবি শিকদারও ওইরকম কোনো আশাবাদী ভাবনা মনে পুষে রেখেছেন। তাই তো সোনাভানকে খুঁজবার ভান করে আসলে খুঁজছেন ভোরের শিশির আর দুর্বা ঘাসের সবুজাভ সরবত- চোখ জুড়ানোর আর পেট জুড়ানোর বাসনা থেকে বোধহয়।

ইতিহাস থেকে তিনি নিয়েছেন সিরাজদৌলার অনুভব; উমিচাঁদ আর মীরনের আচার ও আচরণ। বিশ্বসাহিত্য ঘেঁটে ঘেঁটে বের করেছেন লোরকার জীবনবোধ। নবাব সিরাজদৌলার জীবন, শাসনকাল, চরিত্র ও চলাচল নিয়ে আজও আমাদের মাঝে ছড়িয়ে আছে নানান রহস্য। প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করবার জন্য প্রচেষ্টা চলেছে বহু। সমকালে যেমন তিনি পাননি উপযুক্ত কোনো সহচর বা উপদেষ্টা, তেমনি মরবার পরেও তিনি পাননি সুদৃষ্টি; তাঁকে অনেকে দুর্বলচিত্ত ও লোভী মানুষ হিশেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। ইতিহাসের মারপ্যাঁচে সুবিচার বঞ্চিত এই সম্রাট। বাংলার ও বাঙালির ইতিহাস বিষয়ে অভিজ্ঞ পরিব্রাজক কবি শিকদার সিরাজকে খুঁজেছেন সত্যের আলোকে। তিনি দেখেছেন ‘মেঘের আড়ালে চাঁদ নয় উমিচাঁদ’। সম্রাট সিরাজদৌলার জীবনকে ঘিরে নানান ষড়যন্ত্র আর প্রতারণা-বিশ্বাসঘাতকতার আড়াল থেকে প্রকৃত মানুষটিকে বের করে আনতে চেয়েছেন। সিরাজ যে তাঁর উদারতার জন্যই পরাজিত হয়েছেন, চারিত্রিক দুর্বলতার জন্য নয়- সে কথাই বোধকরি শেষত এই ইতিহাসলগ্ন কবি প্রকাশ করতে প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি বলছেন:
লোরকার মতো ওখানে কে পড়ে আছে
লোকটার বুকে একলা সূর্য বহুবিধ নীরবতা
স্বপ্নের সব মশকপূর্ণ চন্দ্রিমা ঝলোমলো
ডালিমের দানা গলে গলে তার লেবাসের কারুকাজ
পঙ্খীরাজের পাখার আওয়াজে শুনবার ছিলো তারই
চোখ দুটো ছিলো বন্ধ
-অন্তর ছিলো হাজার দুয়ারে খোলা
(‘সিরাজদৌলা’)
সমাজ আর রাষ্ট্রের অলি-গলি পার হতে হতে কবি আবদুল হাই শিকদার কেবল সাজিয়ে তুলেছেন কবিতা-বাগান; প্রকাশ করেছেন অনুভবে জেগেওঠা কথামালা। রেলের পাটির মতো শব্দ বুকে নিয়ে আবদুল হাই শিকদারের কবিতার রেলগাড়ি হু হু করে ছুটে চলে। এই চলাতেই তাঁর আনন্দ। এই শব্দের ঘূর্ণন অনুভূতিতে, এর পরিণতি অনন্তে। শিকদারের জীবনের পা-ুলিপি ঘিরে আছে শব্দপ্রেম। কবিতা তাঁর কাছে নেশা-লাগা, ক্ষয়ে যাওয়া কুয়াশার কান্না। তাই কবি আত্মার বড় প্রিয় হয়ে উঠে, কৈশোর উপচানো সিংহের মতো গর্জে উঠতে দেখেন গভীর নিঝুম বনরাজি। চাঁদের জোছনার আড়ালে মানুষের শরীরে অনেক ক্ষত, অনেক কলংক। এই চাঁদ কবির বয়স থেকে অনেক রাতের ঘুম আর অনেক স্বপ্ন গ্রাস করেছে। মানুষ দেখতে এসে মানুষই কবিকে বিপাকে ফেললো:
অস্পষ্টতার ঘনপর্দা সরিয়ে আমি আঁকুপাঁকু
একজন মানুষের মুখ দেখার জন্যে ভিতরে যে কি
তাড়া
কিন্তু আমি কিছুই দেখি না
মানুষের জন্য আমি কিছুই ভালো দেখি না
(‘মানুষ মঙ্গল’: আশি লক্ষ ভোর)
যাবতীয় ক্লান্তি আর হতাশার বারান্দা পেরিয়ে গ্রহণযোগ্য বিস্ময়ের ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কবি আবদুল হাই শিকদার। দিগন্তের দিকে ছুটে চলেন তিনি। মাঝে মধ্যে নিজেকে দেখে নিজেরই অচেনা মনে হয়। মনে হয় নিজেরই প্রতিরূপ। কবি তাঁর সমস্ত অভ্যাস, আচার-আচরণকে ছাপিয়ে ওঠেন কবিতায়। এক পরি্রুত জীবনের নিত্যসঙ্গী এই কবি জীবনের আধুনিক প্রসঙ্গ সমূহের প্রাত্যহিক বিচরণশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন প্রতিনিয়ত। আবদুল হাই শিকদারের অনেক কবিতা অনাস্বাদিত মৌলিক পংক্তির বিভায় উদ্ভাসিত। আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবিত জীবন তৃষ্ণার বিপুল আয়োজনের সাক্ষাৎ মেলে তাঁর কবিতায়। শিকদারের কাব্য-ভাবনায় এই সত্যটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে যে, মানুষের বিচিত্র স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের জন্যই মানুষকে কোনো স্থির সংজ্ঞায় ধারণ করা সম্ভব নয়। কবি জানেন, অদ্ভূত কামনা-বাসনায় মানুষের জীবন এক সীমাহীন রহস্য। আর সে রহস্যের ভেতরে মানুষ অতি সামান্য বিষয় মাত্র। শিকদার মননবিশ্বের এক পুরুষার্থ কবি। নিরংকুশ সত্যানুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে তিনি কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতায় সত্য উদ্ভাবনের পাশাপাশি একাধিক সত্য সমান্তরালভাবে ভিড় করে। আধুনিক মনন বিশ্বের ব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে তিনি বাস্তবকে, তার নগ্ন-অনগ্ন গ্রন্থিকে উন্মোচন করেন। বস্তুবিশ্ব, পরিপ্রেক্ষিত, জীবনের, পশ্চাদভূমি তাঁকে অধীর করে, কাতরতা এবং চঞ্চলতায় তিনি সংশয় বিদীর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী হয়ে পড়েন। শিকদারের কবিতায় আবেগ আছে। কিন্তু আবেগের চাল অনিয়ন্ত্রিত নয়। জীবন গভীরতাই তাঁর অনিষ্ট।

আবদুল হাই শিকদারের কবিতায় সমাজপ্রেম, জাতিপ্রেম, দেশপ্রেম এবং বিশ্বপ্রেমেরও পরিচয় দিয়েছেন। তিনি জ্ঞানের বিশাল বৃত্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেননি। আজ অত্যাচারীদের যে-অত্যাচার, দিকে দিকে সন্ত্রাসের পাখা মেলে দিয়েছে, তা কেবল বাংলাদেশের ঘটনা নয়, তা গোটা শতাব্দীর ঘটনা, সারা জগতের সংগ্রামের ইতিহাস। এই সংগ্রাম কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সকল, সমতল ভূমি ও পাহাড় এবং তার ব্যাপৃতি ও বিস্তৃতি। এমনকি তা শুধু এই শতাব্দীরও নয়। গত শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদ, সামান্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গেও জড়িত। তাই সিপাহী বিদ্রোহের মহানয়ক চট্টগ্রামের বজুব মালী, বলিভিয়ায় নিহত চেগুয়েভারার মত অসংখ্য বীর যোদ্ধাদের কাতারে দাঁড়ানো কবি। শত্রু কবলিত দেহে তার হৃৎপিন্ড যেন আরও দৃঢ় ইতিহাসের আজাদীর নায়ক সিরাজ-উদ-দৌলার হৃৎপি-। তাঁর অনুভব তাই কারবালাকেও ছাড়িয়ে হজরত ইউনুস এবং হজরত ইব্রাহীম (আ.) পর্যন্ত প্রসারিত। এই বিশাল ক্যানভাসে, কবি আবদুল হাই শিকদার তাঁর কাব্যের ডালি সাজিয়ে জাতিকে উপহার দিয়েছেন। একজন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী কবিরূপে তার এ উপহার অনন্য। তিনি মাত্র পঁয়তাল্লিশটি ফুল দিয়ে সাজিয়েছেন এ ডালি। যেন কোনো পাঠক এ ডালি হাতে তুলে নিয়ে, এর রঙে রেখায়-ই কেবল মুগ্ধ হবেন না মোহিত হবেন ফুলগুলোর সৌরভেও। ফুলগুলো সবই এক জাতীয় নয়, নানা জাতীয়। শ্রেণি ভাগ করলে দেখা যায়-কবি আবদুল হাই শিকদার কয়েক রকম কবিতার ফুল দিয়ে এ ডালি সাজিয়েছেন। শিকদারের কবিতায় ফুলের পোশাকে ধরা দিয়েছে ব্যক্তি-স্থান-ঘটনা; প্রেম ও প্রকৃতি।

বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখা যায়, আবদুল হাই শিকদারের কবিতায় প্রবল দেশাত্মবোধ, ঐতিহ্যপ্রীতি, ধর্মভীতি এবং মানবতাবাদ সক্রিয় থাকলেও প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই তার সঙ্গে মিশে আছে রাজনীতি। কখনো স্থুল, কখনো সূক্ষ্ম আকারে। কিন্তু রাজনীতি যে আকারেই থাক তা অপরাজনীতিতে পর্যবসিত হয়নি। এজন্য তাকে কোন রকম কৃত্তিমতার আশ্রয় নিতে হয়নি কিংবা বিসর্জন দিতে হয়নি কাব্যকলাকেও। তিনি যে, রাজনীতি এবং কাব্যকলাকে একই মুঠোয় সফলতার সাথে বন্দি করতে পেরেছেন, তা সত্য। সে-পরিচয় তার কবিতায় উৎকীর্ণ হয়ে আছে।