চিলির কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল (১৮৮৯-১৯৫৭) রচনা করেছিলেন ‘শিল্পীর জন্যে দশ আদেশনামা।’ আট নম্বর আদেশ ছিলো, ‘মা যেমন নিজের রক্ত থেকে, অন্তর থেকে সন্তানের জন্ম দেয়, তুমিও শিল্পের জন্ম দেবে সেভাবে।’ মিস্ত্রাল বলেছেন বলে নয়, চিরকাল থেকেই জননীর বেদনা, ব্যাকুলতা ও মমতায় শিল্পকে জন্মদান করছেন নিবেদিত কবি, শিল্পী। আপন সত্তার স্বেদ ও হৃদিরক্ত দিয়ে তারা গড়েন উচ্চারণের শব্দআয়না। যাতে নিজের যাপন ও অনুভবের তন্তু দিয়ে অঙ্কন করেন আপন কাল ও কালান্তরের যাপনচিত্র। এ অঙ্কনের পেনসিল,তুলি, রঙ, রেখা, ক্যানভাসসহ সবকিছুই তার হৃদয় থেকে উrসারিত। কিন্তু এ দিয়ে তিনি অঙ্কন করেন চারধারের জীবনকে, সবাইকে। অঙ্কণ করেন নিজেকে গলিয়ে। তার এই গলনের সুরে ও রূপে উপচে পড়ে দেহ ও আত্মা, ইহ ও পর, ব্যষ্টি ও সমষ্টি, প্রাণ ও প্রকৃতি এবং আবহমান জীবনের বাণীভাষ্য। কবি তখন কেবলই নিজের নন, সবার। তার উচ্চারণ ও যাপনে লগ্ন থাকে সবাই; স্বদেশ, গোলার্ধ, নিসর্গ …
অতএব একজন আবদুল হাই শিকদার; কবি- যখন বাড়ী ফেরেন, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল হাতে’ ‘পৃথিবী তোলপাড় করে নগ্ন পায়ে’ ‘নিসর্গ ঝলসে দেবার মতো প্রেম ও কাম নিয়ে’ বাড়ী ফেরেন,যখন ‘কৃষকের গরু মরে গদার আঘাতে’ এবং ‘মেঘের আড়ালে চাঁদ হয় উমিচাঁদ’। কবি দেখেন ‘আগ্রাসী জ্বরে বাতাস বেহুঁশ’ ‘বুদ্ধিজীবীর লেজ নড়ে চড়ে’, ‘আমাদের ঠোঁটে তালা’ ‘সকাল মানে কৃমির জটিলতা মাংস ও পুঁজে যাত্রার প্রস্তুতি, সন্ধ্যা ও রাত আসে অজগরের উদরের মতো ভয়াবহ স্থুলতা নিয়ে’। এর মধ্যে মাটির ভেতর থেকে নব উদ্ভবের প্রত্যাশা ও অনুসন্ধান জারি থাকে। কারণ ‘মাটির রহস্য ঘেঁটে দুই চোখে ঘোর/মাটিতেই জন্ম নেয় আশি লক্ষ ভোর।’
আবদুল হাই শিকদার খোলামেলা। নিজেই নিজেকে বয়ান করেছেন তিনি। তার ভাষায় ‘আবদুল হাই শিকদার-এই নাম শোনেনি কে?/মমতার রেণু দিয়ে মানুষ ও মাতৃভূমি বুনেছে যাকে/যুদ্ধ যার নিত্য সাথী প্রেম যাকে করেছে আকুল/আনন্দ ও অশ্রুতে ভেজা এমন গভীরতর নাম/ যার ঠোঁট সর্বদা শুকরিয়ারত নিজ মাবুদের।’ প্রেমে মথিত, বিরহে কাতর, ঐতিহ্যবোধে সটান, আত্মবোধে প্রখর এবং তারুণ্যে-দ্রোহে চিrকৃত তার কাব্যে বিশ্বাস ও প্রগতির দৃষ্টিসম্পন্ন অভিভাষণ রয়েছে। যে ভাষ্যে প্রকৃতি ও আন্তর্জাতিকতা, রাজনীতি ও মনোঅধ্যয়ন, সংগ্রাম ও স্বকীয় খনন সোচ্চার উদগতি লাভ করেছে। শোষণ ও বন্দিত্ব, অবনমন ও অবক্ষয়ের বিপরীতে সংক্ষোভ ও স্পষ্ট ইশতেহারের ভাষা অনুসন্ধান করেছে তার কাব্য। রাজনীতি ও সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সংস্কৃতির গণচর্চাকে নিজস্বতার বিশেষ মাত্রার দিকে প্রণোদিত করার পথে তার কাব্য ও সাহিত্যযাত্রা স্থিরলক্ষ্য থেকেছে। যার কেন্দ্রে আছে জাতিসত্তা ও মানবিকতা।
বিগত শতকের আশির দশকের প্রতিনিধিত্বশীল এই কবি রাজনীতি আর রাজনীতি উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কবিতা করে তুলেছেন সৌন্দর্যবোধ ও নিজস্বতার পৌরুষ দিয়ে। তার ভাষা ও ভাষ্য স্বাপ্নিক, যা বসত গেড়েছে অগ্নিদগ্ধ বাস্তবতায়, চিরায়ত জীবনোপকরণকে সঙ্গী করে। জীবনময় মানুষের নিরন্তর সংগ্রাম, তাদের প্রগতি, নানা মাত্রিক আশা ও নির্বেদ, বিরহ ও প্রেম, ক্ষোভ ও কান্না, স্মৃতি ও স্বপ্ন, জন্ম ও মৃত্যু তার কবিতায় গণভাষ্যের আত্মীয়তায় উল্লসিত। অপরদিকে সৃষ্টিশীল কাব্যিকতায় তা মনোজ্ঞ নন্দনের অভিগামী। এর স্বাক্ষর বহন করে তার প্রথম কাব্য ‘আশি লক্ষ ভোর’ (অক্টোবর ১৯৮৯) ‘আগুন আমার ভাই’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯১), ‘রেলিঙ ধরা নদী’ (জানুয়ারি ১৯৯২), ‘মানব বিজয় কাব্য’ (ফেব্রুয়ারি ১৯৯২), ‘এই বধ্যভূমি একদিন স্বদেশ ছিল’ (সেপ্টেম্বর ১৯৯৮), লোডশেডিং নামিয়াছে’ (ঢাকা বইমেলা,২০০১) ‘দুধকুমারের জানালাগুলি’ (একুশে বইমেলা,২০০২)’ ‘সুন্দরবন গাথা’ (মার্চ,২০০৩) ‘হাফিজ, এই যে আমার দরখাস্ত’ (ফেব্রুয়ারি,২০০৭) ‘কে সিরাজদৌলা কে মীরজাফর’ (সেপ্টেম্বর,২০১০) ‘মেঘমাত্রিক ধাতুতান্ত্রিক’ (ফেব্রুয়ারি,২০০৪) ‘অতি মুরগী হইল’ (ফেব্রুয়ারি,২০০৭) ‘তারাউজিয়াল গ্রামে বৃষ্টি নামলো’ (একুশে বইমেলা,২০১৬) গ্রন্থের দীপিত পঙক্তিমালা। এমনকি কিশোরকাব্য ‘গানপাখিদের দিন’ ( একুশে বইমেলা,২০০১) ‘ইউলিয়ারা পথ হারালো’ (একুশে বইমেলা,২০০১) শিকদারের নিজস্বতার সিগনেচার নিয়ে বিশিষ্ট।
শিকদারের কাব্যিক ও সাহিত্যিক জার্নির রক্তে আছে আত্মআবিষ্কারের মাধ্যমে আত্মসংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের আর্তি। যা একই সাথে আমাদের কবিতাকলাকে নিজস্ব যাত্রা পথের বিভূতি দিতে চায়। শিকদার এ পথে নিজেকে ধনুকের ছিলার মতো সটান রাখেন, কী তrপরতায়, কী শিল্পমগ্নতায়। তার ঋজুতা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রকটনকে ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেকে সামষ্টিক চিন্তা ও বাস্তবতার প্রবাহে উত্তীর্ণ করতে চায় । ফলে এ কবি ইতিহাস-মিথ, বৃহত্তর লোকজীবনাচার এবং বিশ্বাস ও আত্মবোধের লৌকিক অনুষঙ্গ এবং সাংস্কৃতিক উপাদান-উপকরণকে অঙ্গীভূত করেছেন আপন কবিতায়। সমানভাবে বিশ্ববাস্তবতার জটিল সমীকরণকে উচ্চারণ করেন। সাম্রাজ্যবাদ, বশীকরণ, হত্যা-মারতাণ্ডব, নিখিলমানবের রক্তরোদন, প্রকৃতির কান্না, নিসর্গ ও নৈতিকতার মৃত্যুদশা, মনুষত্যের অবক্ষয় ও জীবনের অপচয় তার কবিতা সড়কে সংক্ষোভের পতাকা উড়িয়েছে। অনর্গল বর্ণনা বা বাক্যস্রোতে থাকে তার প্রেমময় চেতনার একধরনের প্রকাশ, যা বৃহত্তর জীবনের বেদনা, ক্লেদ ও রক্তক্ষরণে দুর্ভাবনাতাড়িত এবং এতে নিখিল পরিবেশ তার নির্মলতা নিয়ে উপস্থিত।চলমান এই ধারার ভেতরে আত্মদর্শনের একটা ফাঁদ আছে শিকদারে, যার মাধুর্য সহজ আর সাবলীল চেতনারই প্রকাশকে বাঙ্গময় করে।
আপন উন্মোচনে কবি প্রায়ই নিরাবরণ। যেন চরমপত্র উচ্চারিত হচ্ছে। কবিতা বরাবরই তার কাছে কবিতাকলার নির্মাণ কৌশলে নতুন প্যাটার্ন, স্ট্রাকচারাল ও উপমা উৎপ্রেক্ষা, ইমেজারি ইত্যাদি নবীকরণের দাবি জানিয়েছে। কবি কি সাড়া দেননি? সাড়া দেয়ার বহুবিধ মনোজ ফসল জমা আছে তার কাব্য গোলায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবিতাদেহে আছে প্রকরণের ঋদ্ধ পোশাক । ‘মহাবৈশ্বিক কুইজ’ কবিতায় সহজতার মধ্যে একটি নমুনা পাঠ করা যেতে পারে, যেখানে প্রশ্ন ও উত্তরের প্রক্রিয়ায় হয়েছে বয়ানের উদগতি :
‘সবচেয়ে বড় আনন্দের সংবাদ?
-এখনও মানুষ এরিয়েল শ্যারন হয়ে যায়নি।
কষ্টের কারণ সম্পর্কে সবাই কি বলে?
-পৃথিবীতে এখনও ইসরাইল নামে একটি দেশ আছে।’
এভাবে জটিল জিজ্ঞাসার আপাত সহজ কিন্তু দুরূহ – ভারি জবাবে উন্মোচন হয় বৈশ্বিক দুঃসহতা ও দুঃখভার। কবি প্রশ্ন করেন তাদের সম্পর্কে, যারা মহাবিশ্বের সবচেয়ে নোংরা প্রানী। জবাবে জানান, তারা হলো, ‘দক্ষিণ এশিয়ার এক গরীব দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়।’

শিকদার দেখান, ‘গ্রামে ঢুকে গেছে করপোরেট লিপস্টিক’ , ’দুবলার চরে অপেক্ষা করে ক্রীতদাসের জিন্দেগী’, ‘সমুদ্র আর সৈকত এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ আগলে বেয়াক্কেলের মতো তোতলাচ্ছে’, ‘বঙ্গোপসাগরের অনন্ত ক্রন্দনের মধ্যে প্রাকৃতিক অশ্রুর রিংটোন’, ‘শিশুর খাবার নিয়ে জমে ওঠে মুনাফার পাহাড়’, ‘যুদ্ধাহত একাত্তর হেঁটে যায় ক্রাচে ভর দিয়ে’, ‘রান্না ঘরের কড়াইয়ে গণতন্ত্রের তীব্র শীrকার’, ‘অপমানে মাথানত করে দাঁড়িয়ে আছে তোমার শ্বেত শুভ্র শাপলা’, মধ্যাকর্ষণকে আরও একবার ধন্যবাদ জানিয়ে পড়ে যাচ্ছে বসন্তের সর্বশেষ জোছনার নীল রাত’, ‘সমস্ত আকাশ ঈগলের নখে ছেয়ে আছে’, ‘ক্যারাভান ভুল পথে সম্মুখে শুধু ধু ধু ফোরাতের তীর’ ‘জায়নামাজ লাল হয়ে গেছে শরাবে’ ‘প্রেমের পথকে নিরঙ্কুশ করার জন্যই ফুলের মৌসুমেও হাতগুলোতে উঠে আসছে তরবারি’, ‘দুধকুমারের চরে কাশফুল রুমী’, ‘স্তূপ স্তূপ কষ্টের নিচে ইরাকের ব্যথিত মৃত্তিকা চাপা পড়ে কাঁদে’, ‘বুড়ো পাণ্ডুর চাঁদ /উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করছে আকাশে/ যেন ইবরাহীম আদহামের ছাদে/ভেড়া খুঁজে বেড়াচ্ছে প্রাচীন রূপকথা’!
নদী ও পানি কবির শব্দবিশ্বের প্রাণে বহমান। আপন কবিতাসমগ্রকে তিনি উrসর্গ করেছেন ‘বাংলাদেশের আহত, নিহত, নির্যাতিত,ব্যথিত, অসুস্থ্য, শুকিয়ে যাওয়া সকল নদীর উদ্দেশ্যে।’
নদী মরে যাচ্ছে। কিন্তু নদীতে ভাসছে লাশ, নদীতে ভাসছে রাষ্ট্র। কিন্তু নদী নাকি লাশ কোনটা ভাসছে, হাঙ্গামা করে কষ্ট! কবির প্রিয় নদী দুধকুমার। দুধের মতই তার মধুময় জলের স্মৃতি/ আবেগমথিত মাখন চরাচরে ছড়ায় প্রীতি।

সেই প্রীতি পলি হয়ে লোকজীবন ও চাষার নয়নে নতুন শস্য-স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। কিন্তু পলি আর বালির দুঃশাসনে নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নদীগুলো দড়ি হয়ে গেছে।নদীর প্রতি কবির প্রেম অগাধ। তিনি স্থির করতে পারছেন না- ‘আমিই কি দুধকুমার নাকি নদী আমাতে মিশেছে? তার প্রেম ও একাত্মতা নারীর প্রতিও। আপন কবিতা দিয়ে শীতার্ত করবেন তাকে, কিংবা ভিজিয়ে দেবেন বৃষ্টিতে। যদি তা না পারেন, কবিতার খাতায় আগুন দিয়ে দেবেন। কবিতাযাত্রার ঊষাবেলায় কবির পরিচয় হয় সন্ধ্যার ছাদের সাথে। রোমান্টিক প্রাণময়তায় বর্ণিলতা লীলায়িত হয় সেখানে, যখন ‘টব যাচ্ছিলো সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ছাদে/লাল দুটো টবে দু দুটো গোলাপ ছিলো/পিছনে পিছনে আহা উহু করতালি/ঘ্রাণানুপ্রাণিত ছুটে যাচ্ছিলো ছাদে।’

কাব্যযাত্রার শুরুতেই সোনাভানের অন্বেষণে চারদিকে বজ্রপাতের আওয়াজের মধ্যে প্রাচীন পুঁথির কবি গরীবুল্লাহর বটতলায় যান শিকদার। এই যে বেরুলেন, ইতিহাসের গোপন, গভীর অস্থি-সন্ধিতে জীবনভর অনুসন্ধান জারি রেখেছেন হৃদিরক্তের জন্য। ঐতিহ্যজাত সেই সোনাভানকে জানিয়েছেন ‘আমার হৃদয় ফেটে চৌচির কেবল তোমার মায়ায়।’ সোনাভানকে খোঁজতে বেরিয়ে কেবল অতীতকে খোঁজেননি কবি, তালাশ করেছেন নিসর্গের ভেজা ঘ্রাণকে, টানটান সিনাকে, অযুদ্ধ অভিযানকে। এমনকি মনের প্রয়োজন আর পেটের প্রয়োজনকে। স্বজাতি, স্বদেশ ও আপন সংস্কৃতির নির্দেশে অনুসন্ধান করেছেন, কে সিরাজদৌলা, কে মীর জাফর? স্বাধীন বাংলাদেশ তার ঠিকানা, এখানেই তার লড়াই। তার আকুতি-
‘আমার শরীর থেকে প্রত্যাহার করো না দক্ষিণের মেঘলা দ্বীপ
নারকেল বীথিদের এই ছায়া গাঙচিল দীর্ঘ সমর্থন
তাহলে রৌদ্র খরা -পুড়ে যাবে মানুষের প্রিয় পুরোহিত
সরিয়ে নিও না এই জলজ বাতাস সংসারে।’
এই দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না কবি। তার সত্তায় বইছে এই ভূমির জলধারা।তার এক পা নদীর ওপারে, এক পা এপারে।হাঁটুতক দেবে গেছে তুমুল কাঁদায়। অতএব –
‘দেশান্তরী যে হতে চায় হোক,
আমি তো ভাই বাংলাদেশের লোক।
দিল্লী লাহোর নিউইয়র্ক নয়,
আমার ভিতর মেঘনা প্রাণময়,
জলের ধারা সকাল সন্ধ্যা বয়।’
কবি পারবেন না উত্তরের ভাওয়াইয়ার আকাশকে বদলাতে, মমতাময়ী মায়ের নাম বদলাতে, শৈশবের গায়ের নাম বদলাতে । আর কবি কোনোভাবেই নিতে পারবেন না ষাট গম্বুজের বদলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে। মহান পূর্বপুরুষদের ত্যাগ ও সংগ্রামের শপথ করে কবির উচ্চারণ ‘আমি মায়ের বদলে মাসি কিনতে পারবো না’, ‘আমি পানির বদলে জলপান করতে পারবো না’, ‘আমি ঢাকার বদলে দিল্লিকে প্রণাম করতে পারবো না।’
এই যে আত্মবোধ, এই যে সচেতন প্রতীতি, এজন্য তার কলমের বিরুদ্ধে কণ্ঠার উপর উদ্ধত বল্লম যখন ধরে রাখা হয়, তখনও কবি আপন চেতনাকে সর্বশেষ বারের মতো একাগ্র রেখে ছড়িয়ে দিতে চান প্রিয়তম স্বদেশের পরতে পরতে। কবি দাঁড়ান, আর কবির দাঁড়ানো মানেই ‘নারিকেলবাড়িয়ার মতো মহিমান্বিত হয়ে যায় জনপদ’, ‘শরীয়তুল্লাহর শুভ্রতা চাঁদোয়ার মতো দুলতে থাকে আকাশে।’
দিন শেষে শিকদার সমর্পিত পরম প্রার্থনায়। সওয়াবগুলোতে কামনা করেন বারুদ ও গোলাপের গন্ধ। ফরমালিনের মিশ্রণ থাকলে চান এর পরিশুদ্ধি ও আহারউপযোগ। কবি নিজেকে প্রার্থনা ও নিবেদনের ধারায় আবিস্কার করেন। পরমায়ুর সবগুলো ভাঁজ থান কাপড়ের মতো খুলে খুলে ঘরময় বিছিয়ে দিয়ে মহানবীর সা. আদর্শময়তায় তালাশ করেন উrক্রান্তি, উদ্ধার। যখন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে সিদ্ধান্তহীন বন কাটতে কাটতে স্তব্ধ, নিথর অতিকায় যন্ত্রমানব হিসেবে নিজেকে প্রত্যক্ষ করছিলেন কবি, তারপর আবিস্কার করেন, মহানবীর সা. ‘নক্ষত্রের আকাশ অযুত সৌরলোকের চেয়েও গভীর’, যা অনায়াস অধিকার করে আছে আমাদের আঙিনার সবটুকু আকাশ, যে আকাশের আশ্রয় পরিত্যাগ করা যায় না। অতএব , কবির প্রতীতি : আমার পরমায়ুর সমূহ সীমাবদ্ধতায় মুহম্মদ/ কেবলমাত্র আপনার নামের বাতিঘর/প্রলুব্ধ মক্ষিকার মতো আমার গহন রক্তে ও ঘুমে/ উন্মাতাল আলোর নাচনে আমাকে অস্থির করে শুধু/ এই অস্থিরতার বাইরে আমি কোথায় যাবো।/আপনার অধিকৃত ভূভাগ থেকে বেরুবো কেমন করে।’
না, বেরুবার ঠিকানা নেই। এই মহাকাশের বাইরে মুক্তির চাতাল নেই, প্রশান্তির মোহনা নেই।