মানুষ বিশ্ব প্রকৃতিরই একটা অংশ। তাই প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মননে ও জীবনযাপনের মাঝে দেখা দেয় গভীরতর প্রভাব। ষড়-ঋতরু পরিক্রমায় হেমন্তের অবসানে হিমশীতল বাতাসে বাংলাদেশের প্রকৃতিতে আগমন ঘটে শীতঋতুর। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলার দেশ- এই বাংলাদেশের মানুষের জন-জীবনে শীত আনন্দের বারতা বয়ে আনে। ষড়-ঋতুর পালা বদলে শীতঋতু – এদেশের প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে এনে দেয় নিত্য-নূতন রূপবৈচিত্র্য। হেমন্তের অবসানে প্রকৃতির হিমশীতল বাতাসে শীতের প্রথম পরশ অনুভ‚ত হয়। আবার এ যেন হেমন্তেতর প্রগাঢ়তর রূপ। হেমন্তের ত্যাগের ব্রত শীতে যেন পরিপূর্ণতা লাভ করে। কুজ্ঝটিকার ধূসর পর্দায় নিজেকে আড়াল করে প্রকৃতি তখন এক এক করে তার সমস্ত আভরণ খুলে ফেলে দীন-হীন বেশ ধারণ করে। ধরিত্রী যেন রোগ শয্যায় শুয়ে কাঁপতে থাকে। তার শীতল নিঃশ্বাসে আবহাওয়া যেন আরো শীতল হয়ে যায়। সূর্য যেন সুদূর মকরক্রান্তি থেকে তাপ বিকিরণ করতে থাকে। দিন ছোট হতে থাকে , আর সেই সাথে রাত বড় হয়। সবখানে যেন একটা আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ অপরূপ লীলা-বৈচিত্রের কেন্দ্রভ‚মিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের পল্লী-রাণী শীত ঋতুতে নব সাজে সজ্জিত হয়ে আত্মপ্রকশ করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-বিলসিত এদেশের যে নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর রাজশ্রী মহিমা তা জগতের বুকে অতুলীয়; শীতঋতুর প্রভাব এ দেশবাসীর দেহে-মনে-প্রাণে, কাব্যে-সাহিত্যে-ধর্মে-কর্মে, আবহমান কালের বাঙালীর সমগ্র সত্ত্বায় বিশেষ ভাবে পরিদৃশ্যমান হয়। শীত ঋতুতে সাধারণ মানুষের জীবনের এই রূপবৈচিত্র্য আবহমান কালের বাংলা সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে নানা ভাবে ও ব্যঞ্জনায়। কখনো তা প্রত্যক্ষভাবে বিষয়াঙ্গিকে স্থান পেয়েছে। আবার কখনো তা পরোক্ষভাবে প্রতিপাদ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

যড়ঋতুর এই বাংলাদেশে শীতের আগমনে প্রকৃতি ও মানুষ বিচিত্রপূর্ণ জীবন-অভিসারে মেতে উঠে; আবহমান কালের বাংলা সাহিত্যসৃষ্টির প্রেরণা শক্তির অনুসঙ্গ হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে একের পর এক উপকরণ নিয়ে শীতঋতু আমাদের জীবনাঙ্গনের পশরাকে সমৃদ্ধতর করে তোলে। এদেশের মানুষের অন্তরের উপর শীতের একটা চিরন্তন প্রভাব রয়েছে। শীতের আবিভার্বে প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যে সকাল -দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যা- রাত্রি প্রভৃতির স্বতন্ত্র বিশিষ্টতা মানুষের হৃদয়ে নব নব ভাবানুভ‚তির জন্ম দেয়। হেমন্তের পরে শীত এসে যখন বাংলার প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে অধিকার করে বসে, তখন প্রকৃতি যেন এক ধরনের রিক্ততার সন্ন্যাসী রূপ ধারন করে বন-বনানীর বুকে গাছের ঝরা পাতায় বেজে উঠে বিষাদময়তার সুর।এরই মাঝে আবার বিচিত্র ফুল, ফল ও ফসলের ঘ্রাণ নিয়ে শীত তার সৌন্দর্য ও উৎসব পরিপূর্ণ জীবনের পশরা নিয়ে এক মধুময় পরিবেশের সৃষ্টি করে।

মেঘ-মেদুর বিরহী চিত্তহারিণী বর্ষার মতো, কিংবা শরতের শীর্ণমাধুর্যের মতো, কিংবা বসন্তের আনন্দ হিল্লোলের মতোই শীতঋতু আমাদের মনোলোকে এক বিশেষ সৌন্দর্যানুভ‚তির জন্ম দেয়। আপাতদৃষ্টিতে শীত রিক্ত-সর্বত্র, রুক্ষ-কঠোর -শ্রীহীন হলেও কবি হৃদয়ের ভাবনায় ধরা পড়ে তার অনন্য আপন সম্পদ। দিগন্তত বিস্তৃত সরষে ক্ষেতের প্রাঞ্জলতায় আর ফুল-বাগানের মাধুরী, অতসী, গাঁদা, দোপাটি , ডালিয়া প্রভৃতি ফুলের রূপের ডালি, কিংবা তৃণ-শীর্ষের মুক্তোর মতো উজ্জ্বল শিশিরবিন্দুর সৌন্দর্য; শীতঋতুর একাত্র নিজস্ব রূপ-সম্পদ। শীতের সকালের অসাধারণ আমেজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। কি গ্রামে, কি শহরে সর্বত্রই শীতের সৃর্যোদয়ের মাদকতা বিছিয়ে থাকে। অপূর্ব শ্বাশত প্রকৃতি ভোরের আবছা আলো আঁধারিতে যেন রহস্যঘন রূপ ধারন করে। কর্ম-চঞ্চল নতুন দিনের হাতছানি দিতে থাকে। বাংলা গদ্য সাহিত্যের তুলানায় কাব্যসাহিত্যেই শীতঋতুর বেশী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। শীতঋতুর প্রকৃতি ও মানুষকে বিষয় বস্তু করে অসংখ্য কবিতা রচিত হয়েছে।

প্রকৃত পক্ষে শীতে মানুষের মধ্যে এক অভ‚তপূর্ব সাড়া ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। কার্তিক হতেই দিন খুব ছোট এবং রাত বাড়তে বাড়তে পৌষের দিন সবচেয়ে ছোট এবং রাত বড় হয়। সকাল হয়েও যেন হতে চায় না। ভোর হতে জীবজন্তু ,মানুষ পাখ-পাখালী সূর্যোদয়ের প্রত্যাশা করে। ভোরের ভিজে প্রকৃতিকে অনেকটা বিমর্ষ মনে হয়। চারিদিকে কুয়াশা জালে জল-স্থল আচছন্ন হয়ে যায়। টুপ টুপ করে শিশির ঝরতে থাকে। কনকনে ঠান্ডা হিমেল হাড় কাঁপানো বাতাস সমস্ত জগতকে নিষ্ঠুর ভাবে চেপে ধরে। নর-নারী শীতে আড়ষ্ট হয়ে ঝিমোতে ঝিমোতে প্রতীক্ষা করে রৌদ্র করোজ্জ্বল উষ্ণ দিবসের । অনেক পরে পূর্ব আকাশ তার লোহিত রাগে রঞ্জিত হতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে রক্ত সরোবরে স্নান করে সে লাল আগুনের গোলা আর হাসি মুখ নিয়ে শীতার্ত প্রকৃতিকে তাপিত করে চলে। একটু একটু করে ক‚য়াশার জাল ছিন্ন হতে থাকে। বৃক্ষপত্রে তৃণশীর্ষে , ফসলের মাঠে ঘরবাড়ির উচু চালে বা ছাদে সোনালী রৌদ্র ছুঁইয়ে দেয় সোনার কাঠি। চাঙ্গা হয়ে উঠে প্রকৃতি- পৃথিবী জাগে ঘুমের আড়ষ্টতা কাটিয়ে ছল চঞ্চল জীবনে শুর“ হয়ে যায় ছুটাছুটি। কৃষক কোন সে শীতভোরে কাস্তে হাতে গিয়েছে পাকা ধানের মাঠে মাঠে। কৃষাণী সেই শেষ রাত হতেই নতুন ধান সিদ্ধ করতে বসেছিল। ভারে ভারে কাটা ধান নিয়ে কৃষক হাসি মুখে গৃহপানে ফিরে। ঢেঁকিতে ধান ভানার মহোৎসব পড়ে যায় কৃষাণীদের মধ্যে। গান জাগে মানুষের মনে; কবি হৃদয়ে জাগে কাব্য ভাবনার জোয়ার। এভাবে সমৃদ্ধ হতে থাকে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার। শীতের আহবান তাই আপামর বাঙালীর হৃদয়ের বাণীতের পরিণত হয়।
পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে চলে,
আয় আয় আয়।
ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে
মরি হায় হায় রে।

বাংলার গ্রামে গ্রামে শীতের সকাল বড়ই মনোরম। জনজীবনে একে শীত ঋতুর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বলা চলে। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে শীতের সকাল। পথ-মাঠ-ঘাটের শিশির শুকতে থাকে ক্রমশ। রৌদ্র ঝলমল করতে থাকে, ক্লান্ত প্রকৃতি ও মানুষের জগতে সকালের লাল সর্যটা যখন পূর্ব আকাশে উঁকি দেয় তখনও নিদ্রা ছাড়ে না। দিকে দিকে কাজের সাড়া পড়ে যায়। ক্লান্তি শ্রান্তি নিদ্রার দাম নেই আর এই সোনা রঙ সকাল বেলায়। কুয়াশার আচছাদন পালিয়ে যায় উর্ধ্বলোকে সেখানেও ঠাঁই নেই তার। উজ্জ্বল রোদের শাসনে শীতের সকাল নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে থাকে কোন গোপনপুরীতে। প্রতীক্ষা করে যেন রাত্রির নীরব হিমেল স্পর্শের নিমিত্ত। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দের অন্ত নেই। ভোরে কাকের কা-কা ধ্বনি আর মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙ্গতেই সকলেই সকলেই গায়ে কাপড় জড়িয়ে আগুনের পাশে উবু হয়ে খড় বিচালী-পাটখড়ি জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে বসে। গালগল্পে দেহমনে চাঙা হয়ে তারা পরম আলস্যে একে একে প্রাত্যহিক কাজকর্মে নিয়োজিত হতে থাকে। কলাপাতা আর দুর্বা ঘাসের বুকের উপর রাতের শিশির ঝরে। আর সকালের অরুণ রাঙা আলো এসে শিশির বুকে জাগিয়ে তোলে প্রাণের ইশারা; মুক্তার মত ঝলমল হাসি ফুটে উঠে সর্বত্র। মাঝে মাঝে শির শিরে ঠাণ্ডা কনকনে উত্তুরে বাতাসে আমলকি বনে কাঁপন লাগে। প্রকৃতি ও মানুষ সেই নাচনে ঝরাপাতার গান শুনে।
যেখানে গভীর ভোরে নোনাফল পাকিয়াছে
আসে আতাফল;
পৌষের ভিজে ভোরে; আজ হায় মন যেন
করিছে কেমন…

অস্পষ্ট অন্ধকারের মধ্যেও দেখা যায় রাখালেরা চলছে গর“র পাল নিয়ে মাঠ পানে। কাঁপতে কাঁপতে মাঠে রোদের মধ্যে গরু বাঁধতে থাকে। যাবার পথে চোখে পড়ে রাতের প্রহরী কুকুরগুলো ছাইয়ের গাঁদায় কুণ্ডলী পাকিয়ে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাচেছ। ধান কাটা শেষ হলেও চাসীদের কাজের শেষ নেই। তাই রবি ফসলের ক্ষেতে আনাজ পত্রে জমিতে তাদের ব্যস্ততা বাড়ে।চাষী বউ ধান সিদ্ধ করে আর চাল গুঁড়ো করতে মেতে উঠে। কোন কোন বাড়ির দাওয়ায় বৃদ্ধরা হুঁকা হাতে আগুন পোহাতে থাকে। খেঁজুর গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা সুমিষ্ট রস শীতের সকালে আলাদা আবেদন রাখে। এই ঋতুতে হরেক রকমের পিঠা তৈরী করে মেহমানদারী করা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলা যায়।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সমগ্র প্রাচীন ও মধ্য যুগের সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে কবিতাতে। এর একমাত্র কারণ হচেছ ঊনবিংশ শতকের পূর্বে লিখিত ভাষার গদ্যরীতির প্রচলন ছিল না। তাই ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বলতে কাব্য সাহিত্যকেই বোঝায়। এই সময়ে রচিত সাহিত্যে শীতঋতুর প্রসঙ্গ এসেছে মূলতঃ পরোক্ষভাবে। কখনো প্রতিবাদ্য বিষয়ের চালচিত্ত নির্মানে শীত ঋতুর প্রাকৃতিক পরিবেশকে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন চর্যাপদ। চর্যপদগুলো মূলতঃ এক প্রকার ধর্মীয় সাধন সংগীত। ৬৫০ খ্রীঃ হতে ১২০০খ্রীঃ এর মধ্যে রচিত এই সাধন সংগীতগুলোর উদ্দেশ্য হচেছ আলো-আঁধারী ভাষায় রূপকের মাধ্যমে সাধকের ধর্মসাধনার নিগূঢ় তত্ত¡কথা ব্যক্ত করা। এগুলোতে কাব্যরস সৃষ্টির সজ্ঞান প্রয়াস না থাকলেও চিত্রকল্প নির্মানে ও বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তৎকালীন বাংলা দেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন চিত্রের ছায়া পড়েছে। ষড়ঋতুর পালা বদলে এদেশের মানুষের জীবন যাত্রায় যে বৈচিত্র্য আসে; তাদেরে মানসিকতায় যে বিশেষ প্রক্ষেপন সৃষ্টি হয়; তার খন্ড খন্ড নির্দশন বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশণ এই চর্যাপদগুলোতে পরিলক্ষিত হয়।
চর্যাপদগুলোর সাহিত্যমূল্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় রূপক সৃষ্টিতে পদকর্তাগণ যেখানেই লোকায়ত জীবনকে আশ্রয় করেছেন , সেখানেই তা সাহিত্যগুণসম্পন্ন হওয়ার অবকাশ পেয়েছে। বস্তুতঃ এভাবেই তৎকালীন বাঙালীর জীবনের ছবি পদকর্তাগনের ধ্যান তন্ময়তার স্পর্শে বহু স্থানেই সজীব হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিতে শীতের আবির্ভাবে সামাজিক মানুষের হৃদয়ে যে ভাবনার উৎসারণ ঘটে এবং তাদের জীবন যাত্রায় যে রূপবৈচিত্র্য ফুটে উঠে, তা চর্যাপদের ধর্মীয় তত্ত্বকথার পাশাপাশি বিধৃত হয়েছে।
চর্যাপদ আবহমান কালের বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম সংযোজন। চর্যাপদের চিত্রকল্পে এদেশের জনপদের বৈচিত্র্যময়‚ প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলের একদিকে যেমন নদীবিধৌত সমভূমি; অন্যদিকে রয়েছে নাতি-উচচ টিলাময় ভূপ্রকৃতি। আবার একদিকে যেমন চিরসবুজের বনাঞ্চলের বিস্তার; অন্যদিকে কোথায়ও দেখা যায় বালুকাময় ধূসর প্রান্তর। সব মিলিয়েই আবহমান কালের বাংলাদেশ। এরই মাঝে এদেশের মানুষের জীবন প্রবাহ বহমান নদীর মতোই চলমান। প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির এই রূপবৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন প্রবাহ কাব্যভাবনার অনুসঙ্গ হিসেবে শিল্প রূপ লাভ করেছে। প্রকৃতির এই রূপবৈচিত্র্যের মাঝে ষড়ঋতুর পালা বদলে আসে শীতঋতু। বাংলাসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি চর্যাপদগুলোতে পরোক্ষভাবে এই ঋতুর প্রভাবিত জীবনপ্রকৃতির স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।
পদকর্তা সবরপাদ রচিত ২৮নং চর্যাপদটিতে শীতঋতুর প্রকৃতি ও মানুষের বর্ণনা রয়েছে। উচুঁ উচুঁ পর্বত, তার উপরে গড়ে উঠেছে বসতি। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বেড়ে উঠে শবর বালিকা। সেও যেন প্রকৃতির মতোই সুন্দর ও অকৃত্রিম। প্রকৃতির এই কন্যা খোঁপায় ময়ূরের পুচছ গুঁজে নেচে বেড়ায় এক টিলা থেকে অন্য টিলায়। তার গ্রীবায় গুঞ্জরের মালা। শীতঋতৃর শুভাগমনে তার হৃদয়ে লেগেছে প্রণয়ের দোলা। কোন এক শবর যুবক তার প্রণয় প্রার্থী। তাই তার হৃদয়ে আনন্দের নির্ঝর বয়ে যাচেছ। শীতের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে পদকর্তা এই প্রণয়াসক্ত নারীর চিত্র তুলে ধরেছেন। ফুলে ফুলে ভরে গেছে সারা বন। সেই পুষ্পিত বৃক্ষশাখা যেন স্পর্শ করেছে আকাশকে।কানে কুন্ডল পড়ে একাকিনী সেই শবর বালিকা বনমধ্যে বিহার করে। কবির ভাষায়-
“উঞ্চা উঞ্চা পাবত তহি বসই সবরী বালী।
মোরঙ্গ পীচছ পরিহাণ সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী।।
উমত সবরো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহারী।
তোহেরী ণিঅ ঘরিণী নামে সহজ সুন্দরী।।
নানা তরুবর মৌলিল রে লাগেলী ডালী।
একেলী সবরী এ বণ হিন্ডই কর্ণকুন্ডল বজ্রধারী।।”

শবর পাদ রচিত ৫০নং চর্যাপদে শীতের শেষে অরণ্যের প্রাকৃতিক পরিবেশের মনোরম চিত্র ফুটে উঠেছে। অরণ্যের মাঝে টিলার উপরে ছোট ছোট ঘর তুলে বাস করে অরণ্যচারী মানুষ। টিলার উপরে গড়ে উঠা এই সব ঘরবাড়ি দেখে মনে হয় শিল্পির নিপুন হাতে আঁকা আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন ছবি। সেই সব বাড়ির চারিপাশে কাপাস ফুল ফুটেছে। সেই শুভ্র ফুলের সমাহার দেখে মনে হয় সেখানে কে যেন জ্যোস্না-বাটিকা নির্মান করেছে। কিংবা এক রাশ সাদা কাপাস ফুল উচুঁ পাহাড়ের গায়ে ফুটে উঠে, তখন মনে হয় আকাশ ছেয়ে গেছে ধবল মেঘে। আর তার শুভ্রতায় ঘচে যায় রাতের গাঢ় অন্ধকার। এমনি কবিত্বপূর্ণ মনোরম পরিবেশে সবরেরা বাস করে। শীতের সকালে কঙ্গুচিনা ফল খেয়ে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠে। কবির ভাষায়-
“গঅণত গঅণত তইলা বাড়ী হিএ কুরাড়ী।
কণ্ঠে নইরামণি বালি জাগত উপাড়ী।।
ছাড় ছাড় মাআ মোহা বিসমে দুন্দোলী।
মহাসুহে বিলসিত সবরে লইআ সুণ মেহেলী।।
হেরি সো মোরি তইলা বাড়ী খসমে সমতুলা।
সুকল এ মোরে কপাসু ফুটিলা ।।
তইলা বাড়ী পাসেরে জোহ্না বাড়ী তা এলা।
ফিটেলি অন্ধারি রে আকাস ফুলিলা।।
কঙ্গুচিনা পাকেলা রে সবরা সবরি মাতেলা।”

শীত নিবারণের জন্য বাঙ্গালীদের লেপের ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচীন। তাই শীতের আগমনে তুলা দিয়ে লেপ তৈরী করা হয়। এই লক্ষে তুলাকে উত্তমরূপে ‘ধুনা’ হয়। তুলাকে আঁশে আঁশে বিচিছন্ন করা হয়। ২৬ নং চর্যাপদে তুলা ধুনার চিত্র রয়েছে। যেমন-
“ তুলা ধুণি ধুণি আঁসুরে আঁস।
আঁসু ধুণি ধুণি নিরবর সেসু ।।
তউ সে হের“অ ন পাবিঅই।
সান্তি ভণই কিণ সো ভাবিঅই।।
তুলা ধুণি ধুণি সুণে আহারিউ।
পুন লইআঁ আপনা চটারিউ।।”

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের শুরুতেই ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যায় । জীবাশ্ব ও পরমাশ্বর লীলা রহস্য এই কাব্যের আধ্যাত্মীক বিষয়। কিন্তু এই তত্ত্বকথা রাধাকৃষ্ণের লৌকিক প্রেমের বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। শীতঋতু এই কাব্যের প্রাকৃতিক পরিবেশ চিত্রনে সাহায্য করেছে। ১২০০ সালের পর থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত, সমগ্র মধ্যযুগে বিচিত্র ভাব ধারায় বাংলাকাব্য রচিত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের পর থেকে বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণবপদাবলী রচিত হতে থাকে। শীতঋতু এই বৈষ্ণবপদাবলীতে অনেক ক্ষেত্রেই কাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। যেমন লোচন দাস রচিত একটি পদে রাধার বারমাসী বর্ণনা অংশে পৌষ মাসের বৈশিষ্ট্যের কথা উলে­খিত হয়েছে এই ভাবে-
“পৌষে পিষ্টক আদিখায় লোকে সাধে।
বিধাতা আমার সঙ্গে সাধিয়াছে বাদে।।
মাঘের দার“ন শীতে কাঁপয়ে বাঘিনী।
একলা কামিনী আমি বঞ্চিত যামিনী।।”

একই ভাবে বলরাম দাসের একটি পদে রাধার বিলাপের মধ্যে শীতঋতু স্থান পেয়েছে। যেমন:
“পৌষ তুষার তুষানলে গরল জীবন নাহ।
সুধীর সমীর সুধাকর শীকর পরশ গরল অবগাহ।।
অহর্নিশি দহ দহ পিয়া জীউ থির নহ দুঃসহ বিরহক দাহ।
উঠত বৈঠত শোয়াত বোয়াত করে কহব নিরবাহ।।
মাঘহি দিন নিশির শিশিরক নিকরহু অবনী আগোর।
উলটি পালটি অনুশন ছটফট তনুদহে সহচরী কোর।।”

অন্য আরেকটি বৈষ্ণবপদাবলীতে শীতঋতৃর কথা উলে­খ রয়েছে। যেমন:
“আওল পৌষ তুষার সমীরণ হিমকর হিমঅনিবার।
নাগরী কোরে ভবি রহু নাগর করব কোন পরকার।।
মাঘে নিদাঘ গগন পাতিয়াব আতব মন্দ বিকাশ।
দিনমনি তাপ নিশাপতি কোরল কানু সঘন হুতাশ।।”

বাংলা সাহিত্যের মধ্য যুুগের অনন্য সম্পদ লোকগীতিকাসমূহ। বিশেষ করে মৈমনসিংহ গীতিকার সম্ভার আমাদের বাংলা সাহিত্যের লোকজ সম্পদের শ্রেষ্ঠ নির্দশনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে বিভিন্ন কাহিনীতের বিরহানলে দগ্ধ নরনারীর হৃদয় উন্মোচনে শীতঋতুর প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। যেমন: কমলার বারমাসী অংশে কমলার উক্তিতে শীতঋতুর উল্লেখ নিম্নরূপ-
“পোষ গেল মাঘ আইল শীতে কাঁপে বুক।
দুঃখীর পোহায় রাতি হইল বড় দুঃখ।।
শীতের দীঘল রাতি পোহাইতে না চায়।
এই রূপে আস্তে আস্তে মাঘ মাস যায়।।”

মৈমনসিংহ গীতিকার দেওয়ান ভাবনার বিবরনেও শীতঋতুর প্রসঙ্গ রয়েছে। যেমন:
“পৌষ মাসে পোষা আন্ধি অঙ্গ কাপে শীতে।
একেলা শয্যায় শুইয়া বন্ধু বৈদেশেতে।।
পৌষ গেল মাঘরে গেল ফাগুন আইল।
বসন্তে যৌবন জ্বালা দ্বিগুন বাড়িল।।”

মৈমনসিংহ গীতিকার ভেলুয়া সুন্দরী’র বিলাপে শীতঋতুর প্রসঙ্গ চমৎকার কাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। বিরহের কারণে প্রনয়িনীর জীবন যাপন যে কত দুর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে তা ভেলুয়া সুন্দরীর অন্তর যন্ত্রনা থেকে উপলব্ধি করা যায়। যেমন:
“পৌষ না মাসেতে হইল পৌষা শীতের তাড়না।
তোমার বিহনে বন্ধু আমার শীত যে মানে না।।
বাড়ি পিছে লেপ আমার ভরা ছিল রুই।
ফাডা কাঁথা গায়ত দিয়া ঘরর কোনাত শুই।।
চোগর জলে কান্থা ভিজাই ঘটাইলাম জঞ্জাল।
কবর মাঝে ধুনি জ্বালি আউন তাপাই।
ভিতরের আউন আমার বল কেমনে নিবাই ।।”

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানসমূহ। মুসলমান কবি সাহিত্যিকগণ এই ধরনের মানব প্রেম সমৃদ্ধ কাব্য রচনা করেছিলেন। এদের মধ্যে শাহ মুহম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ জুলিখা’ অন্যতম। এই কাব্যে শীতঋতুতের প্রকৃতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে মানব হৃদয়ের প্রেমানুভূতির কথা। যেমন:
“মাঘ হৈল পরকাশ কানন কুসুম হাস
শুভ ছিরি পঞ্চমী পরকাশ।
মউলিত পুষ্পপবন মদন মোহন ঘন
তা দেখিয়া আমার মন উদাস।।
বিকলিত আম জাম ভ্রমর ভ্রমরে কাম
সৌরভ ধাবান্তি চতুর্দিশ।
মলয়া সমীর ধীর হৃদয় অন্তরে নীর
বিরহিনী জন অহর্নিশ।।”

বাহরাম খান রচিত ‘লাইলী মজনু’ কাব্যে মজনুর হৃদয়ে লাইলীর প্রতি প্রেমানুভ‚তির তীব্রতা বোঝাতে শীতঋতুর প্রসঙ্গ উলে­খ করা হয়েছে। যেমন:
“লম্বিত রজনী পৌষ দিবা ভেল ক্ষীণ।
লাগ-এ শরীর অতি অহিম গহীন।।
বরিখ-এ তুষার চৌদিকে অন্ধকার।
বিরহ আনল মোর শান্ত নহে আর।।
শ্রমতি লায়লী সনে না হইল মেলা।
সুখবৃদ্ধি মজনুর সব দুরে গেলা।।
সহজে তুষার অতি বাঘ হস্তে মাঘ।
সতত দার“ন শীত খরতর নাগ।।
সীমান্তিনী লায়লী রহিল দূর দেশ।
শিরপদ মজনুর দহ এ বিশেষ।।”

কবি দৌলত কাজী রচিত ‘সতী ময়না ও লোরচন্দ্রানী’ কাব্য গ্রন্থে শীতঋতুর প্রসঙ্গ প্রেম বিরহের বর্ণনা প্রসঙ্গে স্থান পেয়েছে। যেমন:
“পৌষ মাসেতে ঠাঁই হাম বড় দুঃখ পাই
শীতে জরিযায় মোর জীউ।
না মাগম সুরপদ রাজরানী স¤পদ
যাবত মিলায়ে সেই পিউ।।
প্রাণের দুর্লভ কান্ত দেখিলে হৃদয় শান্ত
আঁখি পিয়ার আনন্দ।
মধুর মুরতি পতি আলোল বিলোল গতি
অমৃত মন্ডলী মুখ চান্দ।।”

কবি শেখ ফয়জুল­ রচিত ‘গোরক্ষ বিজয় ’ কাব্যে শীত ঋতু প্রসঙ্গ এসেছে প্রেমানুভূতির অনুসঙ্গ হয়ে। যেমন:
“পৌষ মাসেত প্রভু পাষাণে কমল।
বিনি কাষ্টে তিহরী জ্বালাহ আনল।।
আকাশের অরুন্ধতি অভয়ারে জানি।
আকাশে থাকিয়া হস্তী পাতালে তোলে পানি।।
মাঘ মাসেতে গুরু হিম খরসন ।
ক্ষেমাইর চাকরী করি রাখহ পরান।।
অনন্ত মহিমা গুরু কি বলিতে পারি।
ধৈর্য হইয়া কর গুরু ক্ষেমাইর চাকরী।।”

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে কবি আলাওল অন্যতম। তাঁর রচিত পদ্মবতী কাব্যে শীতঋতুর প্রসঙ্গ বিরহ বর্ণনা অংশে উলে­খিত হয়েছে। যেমন:
“পৌষেতে প্রবল শীত তরঙ্গ উখার।
সকল জগত দেখি যেন ধূম্রকার।।
হেন কালে প্রভু বিনে বিরহ অনলে।
অবিরত মোর হিয়া ধক ধক জ্বলে।।”

মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি মালে মোহাম্মদ রচিত ‘ছয়ফুল মুল­ক বদিউজ্জামান’ কাব্য গ্রন্থে শীতঋতুর প্রসঙ্গ রয়েছে। শীতের প্রকোপে জর্জরিত জীবন যাত্রার বিবরণ প্রদান করা হয়েছে। যেমন:
“পৌষ মাসেতে হয় হেমন্তের ঝড়।
শীতের তাড়নে লোক অধিক কাতর।।
শীত জাড় কিছু নাহি সেই নারীর অঙ্গে।
অভাগিনী জাড়ে মরে পতি নাই ঘরে।।
মাঘের জাড়ে বাঘের অঙ্গ কাপে থরথর।
পতির বুকে সেই নারী শোয় একান্তর।।
শীত জাড় কিছু নাহি সেই নারীর অঙ্গে।
অভাগিনী মরি জাড়ে পতি নাই সঙ্গে।।”

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে মঙ্গলকাব্যসমূহ। দেবদেবীর প্রশস্তী মূলক এই সব গ্রন্থে নানা ভাবে শীতঋতুর প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। কবি বিজয় গুপ্ত রচিত ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্যে শীতঋতু এসেছে এভাবে-
“এই ত পৌষ মাসে উত্তরিয়া বাও।
পাটন যাইতে চান্দ ডিঙ্গা করে ভাও।।
মায়া রূপে গেলাম মুই সোনাফর গোচর।
ঝালুয়ার মন্ডপে গিয়া দিলাম পুত্রবর।।
এই ত মাঘ মাসে কহে মলয়া পবন।
হরিষে চলিল সাধু দক্ষিণ পাঠন।।
আপনে বসিয়া মুই ধরিলাম কান্ডার।
কপটে ভান্ডিয়া দিলাম রাজার ভান্ডার।।”

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের মঙ্গল কাব্য ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তাঁর রচিত ‘চন্ডমঙ্গল’ কাব্যে ফুল­রার বারমাসী অংশে শীতঋতুর প্রসঙ্গ এসেছে। একজন দরিদ্র ব্যাধের ঘরনীর জীবনের দুঃখের কথা এখানে সকরুণ ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন:
“কার্ত্তিক মাসেতে হৈল হিমের জনম।
করয়ে সকল লোক শীত নিবারণ।।
নিয়োজিত কৈল বিধি সবার কাপড়।
অভাগী ফুল­রা পড়ে হরিণের ছড়।।
মাস মধ্যে মছিকার আপনি ভগবান।
হাটে মাঠে গৃহে গোঠে সবাকার ধান।।
উদর ভরিয়া অন্ন দৈবে দিল যদি।
যম সম শীত তথি নিরামিল বিধি।।
পৌষে সকল ভোগ সুখী সর্বজন।
তুলি পাড়ি পাছুড়ি শীতের নিবারণ।।”

আধুনিক বাংলাকাব্যের যুগন্ধর সাহিত্যিক-কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে কবিতায় শীত ঋতু অসাধারণ কাব্যিক ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। প্রকৃতির কবি রবীন্দ্রনাথ শীতের আবির্ভাবে মানুষের হৃদয়ে যে আনুভূতিক পরিবর্তন ঘটে, তার স্বরূপ উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর ‘উদবোধন’ কবিতায় কবি শীতকে মানব জীবনের আনন্দময় অধ্যায়ের পূর্বরাগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন:
“ডেকেছ আজি, এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু-
শীতের রাতে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু!
ভাবিয়াছিনু গীতবিহীন
গোধুলিছায়ে হল বিলীন
পরান মম, হিমে-মলিন আড়াল তারে ঘেরি-
এমন ক্ষণে কেন গগনে বাজিল তব ভেরি?

      উতরবায় কারে জাগায়, কে বুঝে তার বাণী-
      অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর হানি।
               কাঁদিয়া কয় কাননভ‚মি,
               ‘কী আছে মোর,কী চাহ তুমি?
      শুষ্ক শাখা যাও যে চুমি, কাঁপাও থরথর-
      জীর্ণ পাতা বিদায়গাথা গাহিছে মরমর।’
      বুঝেছি তব এ অভিনব ছলনাভরা খেলা,
      তুলিছ ধ্বনি কী আগমনী আজি যাবার বেলা?
               যৌবনের তুষারডোরে
               রাখিয়াছিলে অসাড় করে
      বাহির হতে বাঁধিলে ওরে কুয়াশাঘন জালে-
      ভিতরে ওর ভাঙালে ঘোর নাচের তালে তালে\

      নৃত্যলীলা জড়ের শিলা করুক খান্ খান্ ,
      মৃত্যু হতে অবাধ স্রোতে বহিয়া যাক প্রাণ।
               নৃত্য তব ছন্দে তারি
               নিত্য ঢালে অমৃতবারি,
      শখ কহে হুহুংকারি বাঁধন সে তো মায়া--
      যা- কিছু ভয়, যা-কিছু ক্ষয়, সে তো ছায়ার ছায়া\

      এসেছে শীত গাহিতে গীত বসন্তেরই জয়-
      যুগের পরে যুগান্তরে মরণ করে লয়।
               তান্ডবের ঘূর্ণিঝড়ে
               শীর্ণ যাহা ঝরিয়া পড়ে ,
      প্রাণের জয়তোরণ গড়ে আনন্দের তানে--
      বসন্তের যাত্রা চলে অনন্তের পানে\]

      বাঁধন যারে বাঁধিতে নারে বন্দী করি তারে
      তোমার হাসি সমুচ্ছ্বাসি উঠিছে বারে বারে।
               অমর আলো হারাবে না যে,
               পালিছে তারে আঁধার মাঝে-
      নিশীথনাচে ডমরু-বাজে, অরুণদ্বার খোলে-
      জাগে মুরতি, পুরানো জ্যোতি নব ঊষার কোলে\

      জাগুক মন, কাঁপক বন, উড়ূক ঝরা পাতা-
      উঠুক জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়গাথা।
               ঋতুর দল নাচিয়া চলে
                ভরিয়া ডালি ফুলে ও ফলে,
      নৃত্যলোল চরণতলে মুক্তি পায় ধরা-
      ছন্দে মেতে যৌবনেতে রাঙিয়ে ওঠে জরা\

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপর শীতঋতু বিষয়ক কবিতা ‘বোধন’। কবি এখানে শীতের আবির্ভাবে প্রকৃতি যে রূপ বৈচিত্র্য লাভ করে তার নিখুঁত চিত্র এঁকেছেন। বনমধ্যে শীতঋতু বরণের যে আয়োজন চলে কবিতাটি কবি আবেগঘন ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। একদিকে শীতের রিক্ততা অন্য দিকে মানব হৃদয়ে তার চিরন্তন আবেদন কবিতাটিতে স্থান পেয়েছে। কবি শীতের জীর্ণতার খোলসমুক্ত করে নতুনের জয়গান গেয়েছেন। কবির ভাষায়-
“মাঘের সূর্য উত্তরায়ণে পার হয়ে এল চলি;
তার পানে, হায়, শেষ চাওয়া চায় করুণ কুন্দকলি।
উত্তরবায় একতারা তার
তীব্র নিখাদে দিল ঝংকার,
শিথিল যা ছিল তারে ঝরাইল, গেল তারে দলি দলি\

      শীতের রথের ঘূর্ণিধূলিতে করে স্নান,
      তাহারি আড়ালে নবীন কালের কে আসিছে সে কি জানো।
      বনে বনে তাই আশ্বাসবাণী
      করে কানাকানি কে আসে কী জানি।
      বলে মর্মরে অতিথির তরে অর্ঘ্য সাজায়ে আনো\

      নির্মম শীত তারি আয়োজনে এসেছিল বনপারে,
      মার্জিয়া দিল শ্রান্তি ক্লান্তি- মার্জনা নাহি কারে।
      স্নান চেতনার আবর্জনায়
      পান্থের পথে বিঘ্ন ঘনায়,
      নবযৌবন দূতরূপী শীত দূর করি দিল তারে\

      ভরা পাত্রটি শূন্য করে সে ভরিতে নূতন করি,
      অপব্যয়ের ভয় নাহি তার পূর্ণের দান স্মরি।
      অলস ভোগের গাানি সে ঘুচায় ,
      মৃত্যুর স্নানে কালিমা মুছায়,
      চিরপুরাতনে করে উজ্জ্বল নূতন চেতনা ভরি\

      নিত্যকালের মায়াবী আসিছে নব পরিচয় দিতে,
      নবীব রূপের অপরূপ জাদু আনিবে সে ধরণীতে।
      লক্ষ্মীর দান নিমেষে উজাড়ি
      নির্ভয়মনে দূরে দেয় পাড়ি ,
      নববর সেজে চাহে লক্ষ্মীরে ফিরে জয় করে নিতে\

      বাঁধন ছেঁড়ার সাধন তাহার, সৃষ্টি তাহার খেলা-
      দস্যুর মতো ভেঙেচুরে দেয় চিরাভ্যাসের মেলা।
      মূল্যহীনেরে সোনা করিবার
      পরশপাথর হাতে আছে তার
      তাই তো প্রাচীন সঞ্চিত ধনে উদ্ধত অবহেলা \
      বার্তা ব্যাপিল পাতায় পাতায় করো ত্বরা, করো ত্বরা।
      সাজাক পলাশ আরতিপাত্র রক্ত প্রদীপে ভরা।
      দাড়িম্ববন প্রচুর পরাগে
      হোক প্রগলভ রক্তিম রাগে,
      মাধবিকা হোক রুভিসোহাগে মধুপের মনোহারা!
      কে বাঁধে শিথিল বীণার তন্ত কঠোর যতন ভরে-
      ঝংকারি উঠে অপরিচিতার জয়সংগীতক্ষরে ।
      নগ্ন শিমুলে কার ভার
      রক্ত দুক‚ল দিল উপহার-
      দ্বিদা না রহিল বকুলের আর রিক্ত হবার তরে।
      দেখিতে দেখিতে কী হতে কী হল, শূন্য কে দিল ভরি।
      প্রাণ-বন্যায় উঠিল ফেনায়ে মাধুরীর মঞ্জুরি।
      ফাগুনের আলো সোনার কাঠিতে
      কী মায়া লাগলো , তাই তো মাটিতে
      নবজীবনের বিপুল ব্যথায় জাগে শ্যামসুন্দরী\”

আধুনিক বাংলা কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অনস্মীকার্য। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষ একাকার হয়ে শিল্পমাধুর্য লাভ করেছে। অসংখ্য কবিতায় কবি শীক ঋতুকে নানা উপমার অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই উপমা কখনো প্রেমতাপিত হৃদয়ের বিরহানুভ‚ তির সঙ্গে, কখনো নুতনের আবহন রূপে শীতঋতুকে উলে­খ করেছেন। পৌষের আগমনে প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে যে পরিবর্তন সূচিত হয় কবির কবিতায় তার কাব্যিক উপস্থাপন ঘটেছে। তাঁর রচিত ‘পউষ’ কবিতাটি এপ্রেক্ষিতে উল্লেখ যোগ্য। যেমন:
“পউষ এলো গো-
পউষ এলো অশ্রু পাথার হিম পারাবার পারায়ে।
ঐ যে এলো গো-
কুজ্ঝটিকার ঘোমটা পরা দিগন্তের দাঁড়ায়ে।
সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়
বিদায় ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়;
অন্ধবধূ মলিন চোখে চায়
পথ চাওয়া দীপ সন্ধ্যা তারায় হারায়ে।
পউষ এলো গো-
এক বছরের শ্রান্তি পথের, কালের আয়ুক্ষয়।
পাকা ধানের বিদায় ঋতু, নতুন আসার ভয়।
পউষ এলো গো-পউষ এলো-
শুকনো নিশাস্, কাঁদা ভারাতুর
বিদায় ক্ষণের ভাঙা গলার সুর
ওঠ পথিক! যাবে অনেক দূর
কালো চোখের করুণ চাওয়া ছাড়ায়ে।”

বিশিষ্ট কবি ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় শীতঋতুর আগমনে উৎসবমুখর বাংলাদেশের চিত্র ফুটে উঠেছে। কবি পৌষের আগমনে আমাদের পরিবারে যে পিঠা তৈরীর ধুম পড়ে যায় কবির কবিতায় তার কাব্যিক বর্ণনা রয়েছে। তাঁর ‘পৌষপার্বন’ কবিতাটি এক্ষেত্রে স্মরণ যোগ্য। যেমন:
“সুখের শিশির কাল সুখে পূর্ণ ধরা।
এক রঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা।।
ধনুর তনুর শেষ মকরের যোগ।
সন্ধিক্ষণে তিন দিন মহা সুখভোগ।।
ঘোর জাঁকে বাজে শাঁখ যত সব বামা।
কুটিছে তন্তুল সুখে কবি ধামাধামা।।
মেয়েদের নাহি আর দিবারাত্রি ঘুম।
গড়া গড়ি ছড়াছড়ি বন্ধনের ধুম।।
অবকাশ নাই মাত্র এলোচুল বাঁধে।
ডাল-ঝোল-মাছ ভাত রাশি রাশি রাঁধে।।
কত তার থাকে কাঁচা কত যায় পুড়ে।
সাধে রাঁধে পরমান্ন নলেনের গুড়ে।।
আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর।
গড়িতেছে পিঠেপুলি অশেষ প্রকার।।
বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ কুটুম্বের মেলা।
হায় হায় দেশাচার ধন্য তোর খেলা।।
ধন্য ধন্য পল্লীগ্রাম ধন্য সব লোক।
কাহনের হিসেবেতে আহারের ঝোঁক।।”

কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্যে বাংলার প্রকৃতি একটি বিশিষ্ট রূপ লাভ করেছে। কবি প্রকৃতির রূপরস আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে তার কাব্যের বিষয় বস্তু ও ভাববস্তু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। শীতঋতু কবির কাব্যে পেয়েছে সর্বত্র আবেদন। শীতের ঋতুর আগমনে মানুষের মনে যে বিচিত্র ভাবে সমাবেশ ঘটে এবং যা তাদের জীবনাচরণের মধ্যে প্রষ্ফুটিত হয়, তা কবির কাব্যে অসাধারণ ভাবসম্পদরূপে বিরাজমান। তাঁর রচিত ‘শীত শেষ’ কবিতাটি উলে­খ করা যেতে পারে। যেমন:
“আজ রাতে শেষ হয়ে গেল শীত- তারপর কে যে এলো মাঠে মাঠে খড়ে
হাঁস গাভী শাদা -পে­ট আকাশের নীল পথে যেন মৃদু মেঘের মতন,
ধানের সোনার ছড়া নাই মাঠে- ইঁদুর তবুও আর যাবে নাকো ঘরে
তাহার রূপালি রোম জ্যোৎস্নায় একবার সচকিত করে যায় মন
হৃদয়ে আহদ এলো ফরিঙের কীটেরও যে ঘাস থেকে ঘাসে ঘাসে তাই
নির্জন ব্যাঙের মুখে মাকড়ের জালে তারা বরং এ অধীর জীবন
ছেড়ে দেবে তবু আজ জ্যোৎস্নায় সুখ ছাড়া মাঠ ছাড়া আর কিছু নাই
আছে নাকি আর কিছ? পাতা খরকুটো দিয়ে যে আগুন জ্বেলেছে হৃদয়
গভীর শীতের রাতে ব্যথা কম পাবে বলে- সেই সমারোহ আর চাই?
জীবন একাকী আজো- ব্যথা আজো- এখন করি না তবু বিয়েগের ভয়
এখন এসেছে প্রেম; কার সাথে? কোনখানে? জানি নাকো; তবু সে আমারে
মাঠে মাঠে নিয়ে যায়- তারপর পৃথিবীর ঘাস পাতা ডিম নীড়; সে এক বিস্ময়
এ শীরর রোগ নখ মুখ চুল- এজীবন ইহা যাহা -ইহা যাহা নয়;
রঙিন কীটের মতো নিজের প্রাণের মাঠে এক রাত মাঠে জেগে রয়।”

কবি জীবনানন্দ দাশের অপর একটি শীতঋতু বিষয়ক কবিতার শিরোনাম ‘শীতরাত’। এই কবিতাটিতে কবি অন্ততেরর অনুভূতির আলোকে শীতের আবেদনকে উপস্থাপন করেছেন। এখানে শীতঋতু তাই অনেক খানি রহস্যময়তার আবরণে পাঠকের চিত্তাকর্ষণ করেছে। যেমন:
“এই সব শীতের রাতে আমার হৃদরে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা;
কিংবা প্যাঁচার গান; সেই শিশিরের মতো হলুদ পাতার মতো।
শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুংকার শোনা যাচেছ-
সার্কাসের ব্যথিত সিংহের
একদিকে কোকিল ডাকছে- পউষের মধ্য রাতে;
কোনো একদিন বসন্ত আসবে বলে?
কোনো একদিন বসন্ত ছিলো- তারই পিপাসিত প্রচার?
তুমি স্থবির কোকিল নও? কত কোকিলকে স্থবির হয়ে যেতে দেখেছি
-তারা কিশোর নয়।
কিশোরী নয় আর;
কোকিলের গান ব্যবহৃত হয়ে গেছে-
সিংহের হুংকার করে উঠেছে;
স্থবির সিংহ এক আফিমের সিংহ অন্ধকার।
চারদিককার আবছায়া সমুদ্রের ভিতর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে
মৃত মাছের পুচেছর শৈবালে, অন্ধকার জলে-
কুয়াশার পিঞ্জরে হারিয়ে যায় সব।”

শীতের অপরাহ্নে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে কিরণ দেয়, তখন সোনালী রোদের তাপ যায় কমে। সে রোদে প্রকৃতি যেন আনন্দমুখর হয়ে উঠে। মানুষের হৃদয়ে তার ছোঁয়া লাগে। এক ধরনের ভাল লাগা সমস্ত অন্তর ভরে উঠে। কবি নিয়ামত হোসেন রচিত ‘শীতের বিকেলে’ কবিতাটিতে শীতের অপরাহ্নের চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমন:
“শীতের বিকেলে এক আশ্চর্য মধুর সুখে ভরে যায় মন
আকাশ যেখানে ঠিক বিরাট উপর করা বাটির মতন
ঢেকে আছে পুরো গ্রাম ধান খেত পুস্করিনী বাড়ি ঘর বিল
যেখানে ছবির মত সব কিছু স্থির যেন সারাটা নিখিল।
দক্ষরের মাঠের থেকে গোরু ফেরে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠে ধুলো
নাড়া জ্বারে মাঠে কারা মনে হয় কেউ যেন জ্বালিয়েছে চুলো।
প্রজাপতি মাঝে মাঝে ডানা নাড়ে সরষের ফুলে বাসা তার
খেয়াঘাটে নৌকা নিয়ে মাঝি করে সারাদিন এপার ওপার।
নৌকার খুঁটিতে বসে মাছরাঙা ঘমিয়ে পড়েছে বেচারা কি?
মাষকলায়ের খেতে ছাগল ঢুকেছে তার পিঠে ফিঙে পাখি।
হিমেল বাতাস ছাড়ে, সূর্য যেন বড় ব্যস্ত, তাই তাড়াতাড়ি
পশ্চিম আকাশটুকু কোনো মতে পাড়ি দিয়ে পৌছে যাবে বাড়ি।
সকলেই ফিরে যাচেছ ছেলে বুড়ো হাট থেকে ফিরে আসে লোক
শিমুলগাছের ডালে লক্ষ্মীপেঁচা চেয়ে দেখে পিট পিট চোখ।
খেঁজুরের গাছে গাছে হাঁড়ি বাঁধা ছিল বসে শালিকের দল
কিছুক্ষণ আগে ছিল চারপাশে শিশুদের কল কোলাহ।
মিটি মিটি আলো দেখি ছেঁড়া ফুটো অন্ধাকার মলিন আকাশে।
সকলেই ঘরে ফেরে, চোখের নিমিষে যেন সন্ধ্যা হয়ে আসে
কুয়াশা দখল নেয় মাঠে ঘাটে জনপদে বড় চুপি চুপি
সুবিশাল অন্ধকারে জ্বলে উঠে দু‘চারটে ম্রিয়মান কুপি।”

নাগরিক কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় শীতঋতু বহুমাত্রিক কাব্যভাবনার উৎস হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। কবি নাগরিক জীবনের নানা পরিবেশ পরিস্থিতির উপর শীতের প্রভাবের কথা ছন্দোবদ্ধ করে তুলেছেন। তাঁর রচিত “পড়েছে শীতের হাত” শিরোনামযুক্ত কবিতাটি এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। যেমন: “ফ্লাট বাড়িটাকে মৃদু চাবকাচেছ ঘন ঘন এই
শীত, পঞ্চাশোর্ধ ত্বকে দাঁত
বসায় তাতার হাওয়া। গৃহিণীর হাতে বোনা সোয়েটার গায়ে,
খাঁজময় গলায় জড়ানো
প্রেমিকার আদরের মতো কম্ফার্টার, বারবার
হাত ঘষে খানিক আরাম
পেতে চাই। সে কখন থেকে রোদ্দুরের প্রত্যাশায়
বসে আছে, জেগে আছি না কি
তন্দ্রার গুহায়
ঢুলছি একাকী ক্রমাগত? বয়ে যায় চারপাশে
স্রোতের ধরনের কিছু। প্রাগৈতিহাসিক
পানি প্রত্যুষের
গাল বেয়ে নামে আর গাছের সবুজ
চোখ থেকে খ্রীষ্টপূর্ব রূপসীর অশ্রুর মতোই
টপটপ করে পড়ে শিশিরের জল।
হাওয়া বয়, হাওয়া বয়, বড় কষ্ট হয়
দু‘পায়ে মাড়িয়ে যেতে ভোরের শিউলি,
মমতা জড়িয়ে আছে ঝরেপড়া শিউলির ঘ্রাণে।
আশেপাশে আড় চোখে তাকিয়ে ঈষৎ
কে বালিকা বধূ
কুড়ায় শিউলি তার সলজ্জ আঙুলে,
যেন সে নিঃশব্দে নিচেছ তুলে নিরিবিলি
নিজেরই শৈশব।
টিনের পাতের মতো কুয়াশা রয়েছে
পাতা এক ফালি মাঠে আর
ফুটপাত ঘেঁষা ঘাসে কে যেন দিয়েছে রুয়ে টলটলে ফুল,
কী শুভ্র জলজ। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একা একা হেঁটে যেতে
আজো ভালো লাগে। এ-রকম ভোরবেলা
শাল মুড়ি দিয়ে একা নিঃশব্দে কে যায়?
তুখোড় ঘাতক না কি হঠাৎ শহরে চলে আসা
দেবদূত, খেয়ালি, অপটু। হয়তো-বা
পেটরোগা, স্বাস্থ্যা প্রৌঢ় কোনো, ঘরে যার আছে
আইবুড়ো মেয়ে… আল্লা যার
চোখে ঢেলে দেন
ঘড়া ঘড়া পানি, স্বপ্ন যার সেরামিক
তৈজসের মতো হয়ে যায় খান খান।
শিশির-নিমগ্ন ঘাসে রোদের ঝিলিক দেখে তার
মনে পড়ে শৈশবের গ্রাম।
স্মৃতি ওড়ে ঝাঁক ঝাঁক, যেন
অন্তহীন পথ
নির্ভুল পেরিয়ে আসা পরিয়ারী সবুজ খঞ্জনা। মনে পড়ে
শীতভোরে ফজরের নামাজের পরে
নানা ভাই রেহেলে কোরান রেখে ঘন কুয়াশার
নেকাব-সরানো
প্রথম আলোর মতো আয়াতের শুদ্ধ উচচারন
দুলে দুলে কোঠাবাড়িটাকে
কেমন সঙ্গীতময় করে তুলতেন,
আমার রূপসী নানা হ্যারিকেন নিবিয়ে যেতেন
রান্নাঘরে, টাট্কা পিঠের ঘ্রাণে জিভে
ঝর্ণাধারা যেতো বয়ে আর মাতামহের পবিত্র
আয়াতের সুরে সুরে আমার চোখের পাতা জুড়ে
সাইবেরিয়ার
সোনালী বাটান পাখি বসতো কোমল, আজ আমি
মেই সুর ধেতে দূরে, বহুদূরে। শুধু মনে পড়ে
সেকালে হিমেল
সকালে কবিতা তার কুম্কুমের দাগ আগোচরে
আমার কপালে রেখে গ্যাছে।

আধুনিক বাংলা উপন্যাসে শীতঋতু এসেছে পরিবেশ বর্ণনার মধ্য দিয়ে। ঘটনা বিবরণ কিংবা কোন বিশেষ চরিত্রের মানসিক অবস্থা বিশে­ষণ করার প্রয়োজনে কথা সাহিত্যিকেরা শীতঋতুর প্রাকৃতিক অবস্থার চালচিত্ত্য উপস্থাপন করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্রপাধ্যায় বাংলা আধুনিক উপন্যাসের রূপকার বলা যেতে পারে। তাঁর সাহিত্যসম্রাট উপাধী মূলত উপন্যাস রচনার শিল্পোৎকর্ষতার মাধ্যমে অর্জিত। “কপালকুন্ডলা” তাঁর রচিত একটি উলে­খযোগ্য উপন্যাস। এই উপন্যাসে পরিবেশ চিত্রনে শীতঋতরু একটি বিশেষ ভ‚মিকা প্রদান করা হয়েছে। যেমন:
“প্রায় দুই শত পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে এক দিন মাঘ মাসের রাত্রি শেষে এক খানি যাত্রীর নৌকা গঙ্গা সাগর হইতে প্রত্যাগমন করিতেছিল। পর্তুগীজ ও অন্যান্য নাবিক দস্যুদিগের ভয়ে যাত্রীর নৌকাদলব্ধ হইয়া যাতায়াত করাই তৎকালে প্রথা ছিল। কিন্তু এই নৌকারোহীরা সঙ্গিহীন। তাহার কারণ এই যে, রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়াছিল নাবিকেরা দিকনিরূপন করিতে না পারিয়া বহর হইতে দূরে পড়িয়াছিল। এক্ষণে কোন দিকে কোথায় যাইতেছে, তাহার কিছুই নিশ্চয়তা ছিল না। নৌকারোহিগণ অনেকেই নিদ্রা যাইতেছিলেন। একজন প্রাচীন এবং একজন যুবা পুরুষ, এই দুইজন মাত্র জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন।
-কিন্তু যুবক উত্তরের প্রতীক্ষা না করিয়া বাইরে আসিলেন। বাহিরে আসিয়া দেখিলেন যে, প্রায় প্রভাত হইয়াছে। চতুর্দিকে অতি গাঢ় কুজ্ঝটিকায় ব্যাপ্ত হইয়াছে। আকাশ, নক্ষত্র, চন্দ্র কোন দিকে কিছুই দেখা যাইতেছে না। বুঝিলেন নাবিকেরা দিগভ্রম হইয়াছে।……..
-নবকুমার দেখিলেন যে, গ্রাম নাই, আশ্রয় নাই , লোক নাই, আহার্য্য নাই ,পেয় নাই, নদীর জল অসহ্য লবনাক্ষ; অথচ ক্ষুধা তৃষ্ণায় তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছিল। দুরন্ত শীত নিবারণ জন্য আশ্রয় নাই, গাত্রবস্ত্র পর্যন্ত নাই। এই তুষার শীতল বায়ু সঞ্চারিত নদী তীরে, হিমবর্ষী আকাশ তলে, নিরাশ্রয়ে নিরাবরণে শয়ন করিয়া থাকিতে হইবেক। রাত্রি মধ্যে ব্যাঘ্র ভল্লুকের সাক্ষাৎ পাইবার সম্ভবনা! প্রাণ-নাশই নিশ্চিত।
-মনের চাঞ্চল্য হেতু নবকুমার একস্থানে অধিক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারিরেন না। তীর ত্যাগ করিয়া উপরে উঠিলেন। ইত্তত ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। ক্রমে অন্ধাকার হইল।শিশিরাকাশে নক্ষত্রমন্ডলী নীরবে ফুটিতে লাগিল। অন্ধকারে সর্বত্র জনহীন। আকাশ, প্রান্তর, সমুদ্র সর্বত্র নীরব। কেবল অবিরল কল্লোালিত সমুদ্রগর্জন আর কদাচিৎ আকাশ তলে বালুকাস্তুপের চতুঃপার্শ্বে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। কখনও উপত্যকায় ,কখনও অধিত্যকতায়, কখনও স্তুপতলে কখনও স্তুপ শিখরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।”

বাংলা উপন্যাসের অপর দিকপাল লেখক অপরাজেয় কথা শিল্পি শরৎচন্দ্র চট্রপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসে শীতঋতুর প্রসঙ্গ এসেছে চরিত্রের মানসিক অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে। আবার চরিত্র হীন উপন্যাসের শুর“তেই শীত প্রসঙ্গ এসেছে । যেমন:
“পশ্চিমের একটা বড় শহরে এই সময়টায় শীত পড়ি পড়ি করিতেছিল। পরমহংস রামকৃষ্ণের এক চেলা কি একটা সৎকর্মের সাহায্যকল্পে ভিক্ষা সংগ্রহ করিতে এই শহরে আসিয়া পড়িয়াছেন। তাঁহারই বক্তৃতা সভায় উপেন্দ্রকে সভাপতি হইতে হইবে এবং তৎপদমর্যাদানুসারে যাহা কর্তব্য তাহারও অনুষ্ঠান করিতে হইবে। এই প্রস্তাব লইয়া একদিন সকালবেলায় কলেজের ছাত্রের দল উপেন্দ্রকে ধরিয়া পড়িল।”
অন্যত্র শীতের প্রসঙ্গ এসেছে মধ্যাহ্নের অলস প্রহরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে। যেমন:
“আজ শীতের মধুর মধ্যাহ্নে বাসা নির্জন ও নিস্তব্ধ। এ বাসার সকলেই কেরানী। তাঁহারা অফিসে গিয়াছেন। বামুনঠাকুর বেড়াইতে গিয়াছে, বিহারী বাজার করিতে গিয়াছে, সাবিত্রীরও কোন সাড়া-শব্দ পাওয়া যায় না। সতীশ নিজের ঘরে প্রথমে দিবানিদ্রার মিথ্যা চেষ্টা করিয়া এইমাত্র উঠিয়া বসিয়া যা-তা ভাবিতেছিল। তাহার শিয়রের দিকের জানালাটা বন্ধ ছিল। সেটা খুলিয়া দিয়া সম্মুখে খোলা ছাদের দিকে চাহিয়াই তৎক্ষনাৎ বন্ধ করিয়া ফেলিল। ছাদের একপ্রান্তে বসিয়া সাবিত্রী চুল শুকাইতেছিল এবং ঝুঁকিয়া পড়িয়া কি একটা বই দেখিতেছিল। জানালা খোলা দেওয়ার শব্দে সে চকিত হইয়া মাথার উপরে আঁচল তুলিয়া দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া দেখিল জানালা বন্ধ হইয়া গিয়াছে।”
‘গৃহাদাহ’ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র শীতের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানব হৃদয়ের বিচিত্র অনুভ‚তির উন্মোচন করেছেন। যেমন:
“শীতের দিন, মধ্যাহ্নের সঙ্গে সঙ্গেই একটা স্নান ছায়া যেন আকাশ হইতে মাটির উপরে ধীরে ধীরে করিয়া পড়িতেছিল এবং সেই মালিন্যের সহিত তাহার সমস্ত জীবনের কি একটা অজ্ঞাত সম্বন্ধ অন্তরে গভীর তলদেশে অনুভব করিয়া তাহার সমস্ত মন যেন এই স্বল্পায়ু বেলার মতই নিঃশব্দে অবসন্ন হইয়া আসিতেছিল। তাহার চক্ষু যে ঠিক কিছু দেখিতেছিল তাহাও নহে, অথচ অভ্যাসমত উপরে নীচে, আশেপাশে কিছুই তাহার দৃষ্টি এড়াইতেছিল না। এমনি একভাবে বসিয়া বেলা যখন আর বাকী নাই সহসা দেখিতে পাইল, সুরেশের গাড়ি তাহাদের বাটীতে প্রবেশ করিতেছে। চক্ষের পলকে তাহার সমস্ত মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল এবং সে জানালা হইতে ছুটিয়া আসিয়া একেবারে খাটের উপর শুইয়া পড়িল।”
এই উপন্যাসের অপর স্থানে শীতের অপরাহ্নের বর্ণনা দেয়া হয়েছে জীবনের রিক্ততার উপলব্দির পরিচয় দান প্রসঙ্গে। যেমন:
“শীতের সূর্য অপরাহ্ন বেলায় ঢলিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছিল এবং তাহারই ঈষৎ তপ্ত কিরণে শোন নদের পার্শ্ববর্তী সুদূর বিস্তীর্ণ বালু-মরু ধু-ধু করিতেছিল। এমনি সময়ে একটা বাঙলোবাটির বারান্দায় রেলিং ধরিয়া অচলা সেই দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। তাহার নিজের জীবনের সঙ্গে ওই দগ্ধ মরুখন্ডের কোন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল কি না, সে অন্য কথা , কিন্তু ঐ দুটি অপলক চক্ষুর প্রতি পলকমাত্র দৃষ্টিপাত করিলেই বুঝা যাইতে পারিত যে, তেমমন করিয়া চাহিয়া থাকিলে দেখা কিছুই যায় না, কেবল সম¯ত সংসার একটা বিচিত্র ও বিরাট ছায়াবজিীর মত প্রতীয়মান হয়।”

বাংলা কথা-সাহিত্যের অন্যতম বাস্তববাদী লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর উপন্যাসে শীতের প্রসঙ্গ এসেছে নানা ভাবে। উপন্যাসে বিধৃত জনজীবন ও জনবসতীর বর্ণনা করতে গিয়ে শীতকালীন প্রকৃতির রূপ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের শরীরে উপর শীতের প্রভাব বর্ণনা করা হয়েছে ।যেমন:
“রীতিমত শীত পড়িয়াছেএখন। জেলে পাড়ার ছেলেবুড়ার শরীর রুক্ষ হইয়া খড়ি উঠিতে আরম্ভ করিয়াছে। মালার চামড়া কি›তু চিরদিন মসৃণ, হাজার শীতেও কখনও তাহার গা ফাটে না। কপিলারও বুঝি ফাটে না। যে তেলটাই কপিলা খরচ করে শরীরের পিছনে! মাঠে পালং শাকের পাতাগুলিতে যে সরল লাবণ্য ফুটিয়া আছে, কপিলার হয়তো তার অভাব নাই।”
“কেতুপুর গ্রাম ও জেলেপাড়ার মাঝামাঝি খালটা শুকাইয়া গিয়াছে। পদ্মার জলও কমিয়াছে অনেক। ক্রমে ক্রমে মাঠগুলি ফসলশূন্য হইয়া খাঁ খাঁ করিতে লাগিল, পায়ে চলা পথগুলি স্পষ্ট ও মসৃণ হইয়া আসিয়াছে অনেকদিন আগে।আমগাছে কচিপাতা দেখা দিয়াছে। দেখিতে দেখিতে পাখির সংখা বাড়িয়া গিয়াছে দেশে। ঝাঁক বাঁধিয়া বুনো হাঁসের দলকে উড়িতে দেখা যায়। উত্তরাভিমুখী নৌকাগুলি দক্ষিণের জোরালো সমগতি বাতাসে বাদাম তুলিয়া তরতর করিয়া ভাসিয়া যায়, দূরে গেলে অতিথি হাঁসগুলির মতই রহস্যময় মনে হয় তাদের। মাছ দুধ সস্তা হইয়াছে, পদ্মার চর হইতে কলসী ভরা দুধ আসিয়া বাজারে চার পয়সা সের বিকাইয়া যায়।”

বাংলা কবিতা ও উপন্যাসের পাশাপাশি নাট্য সাহিত্যের শীতঋতুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে শীতঋতু মূলতঃ পরিবেশ চিত্রনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো কখনো তা প্রতীকী ব্যঞ্জনা লাভ করেছে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপক ও সংকেতিক নাটকে শীতঋতৃ এসেছে নানা অর্থব্যঞ্জনার প্রতীক হয়ে। শীতঋতুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে কবিগুরু তার নাট্যসৃষ্টিতে সুগভীর ভাবসম্পদ ও অর্থব্যঞ্জনা দানের প্রয়াস পেয়েছেন। ১৯১৫ সালে রচিত ‘ফাল্গুনী’ নাটকে শীত ঋতুকে কবি প্রবীণের প্রতীকে উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে বসন্তেকে নবীনের প্রতীকে নাট্যিক দ্বদ্বে দেখানো হয়েছে। শীতের জরা ও জীর্ণতায় পৃথিবীতে যে শূণ্যতার সৃষ্টি হয়, ঐ শূণ্যতাই পৃথিবীর চরম রূপ নয়। এরূপকে নবীন এশ্বর্যে প্রাণবস্ত করে তোলে বসন্ত। প্রকৃতি জগতের এই সত্যরূপকে রবীন্দ্রনাথ মানব জীবনের প্রতীকরূপে চিত্রিত করেছেন। শীত ও বসন্ত যথাক্রমে মানব জীবনের জরা ও মহত্তর যৌবনেরই বিকল্প। কবির মতে বিশ্বপ্রকৃতি তে অন্তলীন এক যৌবশক্তি জরা- জীর্ণতা-রিক্ততাকে বার বার পরাজিত করে জয়লাভ করছে। প্রকৃতির নবীনতাকে সংরক্ষণ করছে। কবির মতে মানবজীবনও মহৎ শিল্পস্রষ্টার বৃহৎ রচনারই অবিচেছদ্য অঙ্গ এবং মানব জীবনেও প্রকৃতির অনুরূপ নবায়ণ সাধন করা যেতে পারে। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। এই নাটকের প্রথম দৃশ্যের গীতিভ‚মিকায় শীতঋতুতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান বেণুবন, ফুলগাছ, পাখির নীড় প্রভৃতির কথা বলা হয়েছে। নতুনের সন্ধানে একদল যুবক ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়ে। তাদের অন্তর শীতের জরতা মুক্ত। নবযৌবনের গান তাদের প্রাণের আহস্থান। কবির ভাষায়-
“আমরা নূতন প্রাণের চর।
আমরা থাকি পথে ঘাটে
নাই আমাদের ঘর।
নিয়ে পক্ক পাতার পুঁজি
পালাবে শীত ভাবছ বুঝি।
ও সব কেড়ে নেব , উড়িয়ে দেব
দখিন হাওয়ার পর।”

এনাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে প্রবীণ শীতের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। বসন্তের প্রাণবন্ত রূপ দেখে কম্বলবস্ত্র শীত পালাতে চায়। কিন্তু নবীন প্রাণের চরেরা- নবপল­ব ও পুষ্পপকুঁড়ির দল তাকে নতুন সাজে সাজাতে চায়। কবির ভাষায়-
“ছাড়গো তোরা ছাড় গো-
আমি চলব সাগর পার গো
বিদায় বেলায় এ কী হাসি,
ধরলি আগমনীর বাঁশি।
যাবার সুরে আসার সুরে
করলি একাকার গো।
সবাই আপন পানে-
আমায় আবার কেন টানে
পুরানো শীত পাতা ঝরা
তারে এমন নূতন করা,
মাঘ মরিল ফাগুন হয়ে
খেয়ে ফুলের মার গো।।”
এ নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে শীতের সঙ্গে বসন্তের, প্রবীণের সঙ্গে নবীনেরর আসন্ন মিলনাভাস সূচিত হয়েছে।কোন অদৃশ্য যাদুকরের অঙ্গুলি স্পপর্শে শ্বেতশুভ্র শীতবুড়ো শ্যামল তরুণে পরিণত হয়েছে। যার ফলে জরাজীর্ণতার সঙ্গে যৌবনের দ্বদ্বের অবসান ঘটেছে।এভাবে রবীন্দ্রনাথ ফাল্গুনী নাটকে শীতঋতুকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।
‘রক্তকরবী’ নাটকেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রূপকের আড়ালে শীতঋতুর ‘পৌষালী ফসলের’ প্রতীকী অর্থের ব্যঞ্জনা দান করা হয়েছে। রক্তকরবী নাটকের ঘটনাস্থল যক্ষপুরী। প্রকৃতপক্ষে এ নাট্যে এর কোনো ভৌগোলিক অবস্থান নেই। যক্ষবাদ ও ধনবাদ অধ্যুষিত নগর জীবনের যে অব্যবস্থিত রূপ, যক্ষপুরী তারই প্রতীক। যক্ষপুরীর বিপরীত বৃত্তে পৌষালি ফসল ভরা মাঠের রূপকটি সাংকিতিক ব্যঞ্জনার মাধ্যমে উপস্থাপিত করে কবি মাটির তলাকার সোনার নেশা থেকে সোনালী ধানের নেশার দিকে যক্ষপুরীর মানুষের মন ফিরিয়ে নেবার প্রয়াস নিয়েছেন।এই নাটকের কাহিনীটি শীতের রিক্ততার পরিবর্তে ফুল-ফসলে-পরিপুর্ণ প্রকৃতিকে উদ্দিষ্ট করে গড়ে তোলা হয়েছে।
যক্ষপুরীর রাজা থাকে পাতালে এক রহস্যাবৃত জালের আড়ালে। সর্দার ও মোড়লরা রাজার হয়ে যক্ষপুরীর প্রশাসনযস্ত্র চালায়। খোদাই করা পাতালের তল থেকে তাল তাল সোনা তুলে রাজভান্ডার পূর্ণ করে তুলছে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিচিছন্ন। একদিন এই নিয়মের রাজ্যে নন্দিনী এল। সে তার সঙ্গে করে নিয়ে এল পৃথিবীর মুক্তজীবনের ছন্দ ও সৌন্দর্যের বাণী।তাকে পেয়ে যক্ষপুরীর অধিবাসীদের জীবনে নতুন ছন্দ যুক্ত হল। রাজা নন্দিনীকে ভেতরে আসাতে বারণ করে। নন্দিনীও রাজাকে জালের বাইরে আসার আহস্থান জানায়। কিন্তু রাজা সে প্রস্তব মেনে নেয় না। বরং বিপ­বী যুবক রঞ্জনকে নন্দিনী ভালবাসে। সে তার প্রতীক্ষয় থাকে। কিশোর বিশু যক্ষপুরীর নিয়মের বির“দ্ধে কথা বলে। এতে সর্দাররা অস্পোষ্ট হয় তার প্রতি এবং তাকে অন্যন্ত্র সরিয়ে দেয়। তারা রঞ্জনকে হত্যা করে। এই সময়ে রাজার বিবেক জেগে উঠে। সে মুক্তজীবনের মর্ম উপলব্দি করতে পারে এবং মুক্তির পথে বেরিয়ে আসে। বিশুকে কারামুক্ত করা হয়। নন্দিনী শেষমুক্তির পথে বেরিয়ে পড়ে। দূর থেকে তখন ভেসে আসে “পৌষালী ফসল” কাটার আনন্দ সংগীত। এ নাটকের মূল বক্তব্য শীত ঋতুর পরিপুর্ণতার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে।এভাবে নাট্যরূপকের বাহ্যিক কাহিনী, নাটকের মূল উপাদান এবং নাট্যকার কল্পিত চরিত্রগুলোর সংলাপের অন্তব্যর্ঞ্জনা আধুনিক যন্ত্র শিল্পভিত্তিক নাগরিক সভ্যতারই একটি চিরকালীন জটিল সমস্যাকেই উপস্থাপিত করেছে।
পরিশেষে বলা যায় আবাহমান কালের বাংলা সাহিত্যের সূচনাতে যে চর্যাপদের সাক্ষাত পাওয়া গিয়েছে, সেখানে শীতঋতুর প্রতিফলন ঘটেছে কাব্যের চিত্রকল্প ও উপমা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে; মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে শীতঋতু কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে। আর আধুনিক যুগে শীতঋতু শুধু কাব্যের আঙ্গিকেই স্থান পায় নাই; বরং সাহিত্যে সব শাখাতেই সগৌরব আসন পেতে নিয়েছে।
শীতঋতুকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যসৃষ্টির প্রবাহ নিরন্তর থাকবে… এটাই আমদের প্রত্যাশা।