ছায়া যামিনী

আঁকড়ে আছ মায়ায় পড়ে
এই ছায়া যামিনী,
অসুর সেও ধ্বংস নিশ্চিত
জেগে তবুও কামিনী।
আসবে ধেয়ে একদিন নিশ্চয়
নিষ্ঠুর মৃত্যু বাঘিনী,
মিছে তব এ সব তোমার
ধরীত্রি রাগরাগিণী।

জগৎ খেলাঘর অলীক ছায়া
রেখে যাবে তুমি,
পড়ে রবে স্মৃতির কায়া
তাকিয়ে রবে ভূমি।
জলরাশির কলধ্বনি বজ্রনিনাদে
প্রমত্ত জাগিয়ে প্রলয়,
সমুদ্র ভেদিয়া জাগে ছেদিয়া
আগ্নেয়গিরি ভষ্ম বলয়।

থেমে থেমে কেঁপে উঠে
ধরণী পর্বত চূড়া,
জাগে তব ধ্বংসের অনুভূতি
ভূকম্পনে এই ধরা।
কিসে শংসয় কিসে এতো ভয়
ধরীত্রে এ আকুল,
স্থায়ী নিবাস সেতো পরপারে
ধরণীতে মিছে ব্যাকুল।
…………………………………………..

অচিনপুর
নির্বাক রুদ্ধশ্বাসে থেমে গেছে জীবনযুদ্ধ,
এ পোড়ামন অবহেলায় ক্ষত-বিক্ষত
ঝরায় খরায় উপেক্ষায় জর্জরিত।
চলার পথে গৌরবগাঁথা উজ্জল দিনগুলো
আজ উপেক্ষিত প্রত্যাখ্যাত,
যে অর্জন গেছে হারিয়ে সোনালি জীবন থেকে
জানি আসবেনা ফিরে কোনক্ষণে।

গড়িয়েছে দেড়যুগ তপ্ত নোনাজল
যুগল আখিঁতে; গড়িয়েছে তা ঝর্নায়।
নিরব নিষ্ঠুর নিয়তি, যাতনার দাবানল
ছড়িয়েছে দূর সীমানায় দ্রাঘিমা জুড়ে,
সেটি অতিক্রম দুঃসাধ্য নির্মম।

দরিত্রি আঙিনা ছাড়িয়ে এ ক্ষুদ্রক্ষণে
গুটিয়ে গুটিয়ে সময়ের কাছেই
সমর্পিত ছিল জীবনের গতিপথ।
অনেক আগে হারিয়ে ফেলেছি
লালিত স্বপ্নের ইচ্ছে নদী।

হারাধনের হারাবার কিছুই আর নেই বাকী
কী বা থাকবে বাকী, জীর্ণশীর্ণ দেহে?
অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবি গেছে ছুটে
জগৎ সংসার স্নেহ-মায়া সেটাও গেছে টুটে।

অচিন পাখিটি খাঁচা ছেড়ে একদিন যাবে ছুটে,
সেদিন হবে নিথর নিঃস্তব্ধ
ধরনীর শীতল ছায়ার বাঁধন,
থেমে যাবে জীবনে বয়ে যাওয়া
উল্থান পতন কষ্ঠের সারণী।

সেদিন হয়তো খুঁজবে আমার
লীন হয়ে যাওয়া দুঃখ কষ্টগুলো,
হয়তো পাবে। খুঁজে কী লাভ তখন?
সকল লাভ লোকসান সেতো
অবহেলা অনাদরে নিমর্জিত
অচিনপুর শিউলি তলায়
মায়াভরা মাটি চাপায় চিরনিদ্রায়।
…………………………………………..

ম্রিয়মান

বেঁচে আছি বলে
গরব মোদের এত,
জানিনা তব জীবনের
আছে দাম কত।
মিছে এত টানাটানি
এত কানাকানি,
সব হবে একদিন
জগতে জানাজানি।
গোপন বলে কিছু
নেই তা জানি,
দিবালোকে সত্য আসবেই
তাও মোরা মানি।
যেদিন দেহ ছেড়ে
যাবে চলে প্রাণ,
আঁখি পাতে সব
হবে চিরতরে ম্রিয়মান।
…………………………………………..

চৌচির

কাঁদেনা আর এই পোড়ামন,
কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গেছে
কাদম্বিনি দিঘির জল।
কষ্টের নীল পাহাড় ঠেলতে ঠেলতে
নুয়ে পড়েছে অবসন্ন দেহ,
স্লথ হয়ে গেছে পদযুগল
বড়ই ক্লান্ত আজ।

হেটেছি বহুদূর পাতা ঝরা নীল গগণ তলে,
থামিনি কভু হইনি সংকিত
অমসৃন খেলাঘর বড়ই নিষ্ঠুর ,
কাউকে নিয়েছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে
কাউকে দিয়েছে ঠেলে নিছক অবহেলায়
দূর অমানিশা আস্তাকুড়ে।

ছুটেছি জলে স্থলে খুঁজেছি অনেক,
সুখের সোনার হরিণ আতœগোপনে
আলোর শুকতারা সেও লুপ্ত
অবগুন্ঠন টানি। সেটাও নিয়েছে দখল
কালো মেঘের ঢেউ।
তৃষ্ণার্ত চাতকের মত তাকিয়েও
মেলেনি দেখা সে স্বপ্ন সুখের।
ক্ষুধার জঠর জ্বালায় চৌচির,
নিদারুন নিষ্ঠুর যাতনায়।
জেগেছে উত্তাপ জীর্ণ শীর্ণ দেহে
আর কতদিন অপেক্ষার হবে শেষ?
হাভাতের কঠিন সংগ্রাম।
…………………………………………..

প্রভাত ফেরি

সেদিন ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি,
ওরা সংখ্যায় ছিল কতজন
আজও অজানা।
কারণ হানাদার ঘাতকেরা লুকিয়েছিল
রক্তরঞ্জিত কিছু লাশ।
ইতিহাস ওদের জায়গা করে দিতে পারেনি
তবুও থাকবে তারা
অমলিন স্মৃতির পাতায়,
ওরাতো আছে; থাকবে চিরকাল
আমাদের হ্নদয় জুড়ে।
জানাই তাঁদের ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তাঁদের আতœার শান্তি কামনায়
নিয়ে যাই লাল গোলাপ পাঁপড়ি
কোয়াশা ঘেরা প্রভাত ফেরিতে,
জানাই প্রার্থনা বিধাতা যেন
ছড়িয়ে দেন আত্মার নির্মল শান্তি।

তাঁদের আতœত্যাগ ও রক্ত স্নাতে
পেয়েছি প্রাণের ভাষা মাতৃভাষা,
যে ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল ঘাতক দল,
কেড়ে নিতে চেয়েছিল
বাঙালী জাতির জাতিসত্ত্বা ও চেতনার উন্মেষ ।
ওরা বার বার হেনেছে আঘাত
নিয়েছে শাণিত রক্তে ভেজা নদী।

কেড়ে নিতে পারেনি সেই চেতনা
পারেনি ওরা উর্বর বাঙালি জাতিকে
দাবিয়ে রাখতে বারুদের গন্ধে।
একুশের সেই চেতনায় আজও
আমরা উজ্জীবিত উন্মীলিত,
সেই উজ্জীবনী চেতনাই
আমাদের প্রেরণা, আমাদের শক্তি
সে শক্তিই সমৃদ্ধির বাতা বরণ।

প্রাণের ভাষা মাতৃভাষার আলো,
সারা বিশে^ আজ ছড়িয়ে আছে
গভীর শ্রদ্ধায় মমতার আদর জড়িয়ে।
…………………………………………..

হিয়ার মাঝে

কেঁপে উঠে হিয়া মাঝে
অজানা এক শংসয়,
সাঁজে বজ্রনিনাদ অমানিশা
কালবৈশাখী চমকায়।
মহামিলন মেলায় তব কেন
আজ করুণার ছায়া
পড়ে আছে শুন্য বিরানভুমি
নেই কোন মোহমায়া।

চেয়ে আছি, আছি বসে
যদি তব কাছে আসে,
সোহাগ ভরা আখিঁ মেলে
যদি একবার মৃদু হাসে।
অব্যক্ত ব্যথাতুর মন চিত্ত
হবে তৃপ্ত যাবে তব ভুলে,
আনন্দে উঠিবে নেচে
এই পোড়ামন হেলেদুলে।
…………………………………………..

স্নেহদান

খোকা থেকে ধীরে ধীরে উঠেছি বেড়ে
কখন যে এসেছি পূর্ণতায় বুঝতেই পারিনি,
বাবার আদর সোহাগে ছিলাম নিরাপদ
লাগেনি ঝড়ের ঝাপটা দেখেছেন তিনি।

পিতার স্নেহ ছায়া সেতো ছিল বটবৃক্ষ সম
আসেনি তাহা বুঝে কভু কোনক্ষণে,
হারালাম আদর সোহাগভরা ছায়বিথী
বেদনার পাহাড় জমা আজ মনে।

হেসে খেলে দায়হীন জীবনের কথা ভেবে
করেছি ক্ষয় কত অপচয় তার দায় কে নেবে?
এত অবদান চায়নি কভু কোন প্রতিদান
বিলিয়েছে অকাতরে হ্নদয় নিঙড়ানো স্নেহদান।

ক্ষমার দুয়ারে দাড়িয়ে আজ করি মোনাজাত
মহান আল্লাহ যেন তারে নসিব করেন জান্নাত।
…………………………………………..

অনাথ

জন্মের পর বছর না পেরোতেই
মা বাবা হয়েছে গত,
দুঃখ কষ্ট ভর করেছে
নিত্যদিনের মত।

বাবার বাড়ি হয়নি ঠাঁই,
নানার বাড়ি নানাও বেচেঁ নাই।
বৃদ্ধা নানি দুঃখের মাঝেও
কোলে তুলে নেয়,
কেমন করে করবে লালন
একটু ভেবে নেয়।

সন্ধ্যা হলেই থালা হাতে
বাড়ি বাড়ি যায়,
চেয়ে চিন্তে যাহা জুটে
দিনাতিপাত করে তায়।

স্বজন বলতে কেবল মাত্র মামা,
অতিকষ্টে সেও হয়েছে তামা।
ছোয়াল ছাড়া ভরণপোষণ
কোন উপায় নেই,
দুঃখ নামের অথই জলে
অবগাহনেই।

বাগুমিয়া নাম যে তার,
খবর রাখেন কেবল রহিম ঝাড়–দার।
ষোলটি বছর কেটেছে তার
অপর ঘরের অন্নে,
আল্লাহ তারে বাঁচিয়ে রেখেছেন
অন্যের দানের জন্যে।

বিধির বিধান কেমন
তাহা আমরা বুঝিনা,
শৈশব কালে পা রেখে তার
মারা গেলেন নানি ছকিনা।
…………………………………………..

শব্দরা নির্বাক

শব্দরা নির্বাক অনুভূতি গুলো নিঃতেজ,
জঙ্গলের দুষ্ট বানর গুলো গুটিয়েছে লেজ।
থেমে গেছে চঞ্চল পাখিদের কলরব,
বাঘ সিংহ সেতো কবেই পালিয়েছে সব।

শেয়ালের ডাক সেতো সিকায় তোলা,
ছুটছে কাবুলিওয়ালা ঝুলিয়ে তার ঝোলা।
সন্মুখ সারিতে হাতি সেতো হুকুমের গোলাম,
হুকুম তামিল করে ঠুকে কেবল সালাম।

জলের ধারা সেতো চলে নিরবদি সাগর টানে,
চলার পথে ভাসিয়ে যায় প্রান্তর প্রবল বানে।
ভীরু মন ত্যাগিয়া তুমি দাড়াও শক্ত পায়ে,
তবেই বাড়িবে শক্তি দীপ্ত ত্যাজে গায়ে।

মনে বল তেজদ্বীপ্ত গায়ে প্রতিবাদি হও,
ঝেড়ে ফেলে দুর্বল ছায়া বিজয়ের গান গাও।
…………………………………………..

বনফুল

বনফুল অবহেলায় অনাদরে তার
জন্ম জঙ্গল পতিত ভূমে,
পাখপাখালি কীটপতঙ্গ জোনাকি
আলিঙ্গনে যাচ্ছে তারা চুমে।

নেই তো বালাই আদর যতœ
নেই তো সুষম খাদ্য পানি,
সেই কথাটি জগৎ জুড়ে
আমরা সবায় জানি।

নামি দামি কতই না ফুল ফোটে
সাজানো ফুল বাগে,
সেই না ফুলের বাহারেতে
মেটায় তৃষ্ণা অনুরাগে।

তার পরেও তো কৃষ্ণকলির খোঁপায়,
ফুলটি তব আদরে যে শোভা পায়।
বনফুলের গন্ধ সুভাস নেই তো জুড়ি,
চিত্রপটে ফুটিয়ে তোলে আকাশ ফুড়ি।