জীবনযাপন

তুমি আগের মতোই
তীর্যক বাক্যবাণের চাবুকে
কাবু করে নিপাট আনন্দে দুলে ওঠো;
মেতে ওঠো অলৌকিক সুখে-
ঠোঁটে ঝুলে থাকে গৌরবর্ণ হাসি
চোখে চন্দ্রের ঝিলিমিলি রোশনাই-
তোমার ঘর্মাক্ত সৌন্দর্য ভিজে দেয়
তৃষ্ণার্ত দু’চোখ।

তুমি আগের মতোই
টিপ্পনীর দাঁড়ি-কমায় সাজাও
অনুরাগের পঙিÍমালা
ঘোরতর গৃহিণীর বেশে
হেঁসেলে কাটাও সন্ধ্যা-রাত।
পাঠদানের কোলাহলে কাটাও
সূর্যকান্ত দিন।
মাষ্টারিটা এতদমই পছন্দ
ছিলনা তোমার; মাষ্টারকেতো নয়ই-
অথচ কী বিপুল বিষ্ময়!
তুমিও লেখালে নাম সে পেশাতেই।

দশক পেরিয়ে গেছে-
এখনও আমার চোখের নোনাজল
ভেজাতে পারেনা কারো কম্পিত ঠোঁট-
উন্মাদ ঝর্ণা ভেজাতে পারেনা
কারো অবিন্যস্ত শাড়ির আঁচল;
এখন নির্ঘণ্টের ঘেরাটোপে
বন্দী সকাল-দুপুর-রাত।
এখন বিদেশ বিভূঁইয়ে ঘুরে বেড়ায়
পলাতক প্রেম-

বুক ভাঙা অভিমান প্রলয়ংকারী দীর্ঘশ^াস,
আমি বারুদের সাথে করি নিত্য বসবাস।
১২.১০.২০১৭
……………………………………………

ফ্যান্টাসি

আমি তোমার ঘুমের ভেতর
হেঁটে বেড়াই স্বপ্নের মতো,
অনন্ত অম্বরে তোমাকে ব্যপ্ত দেখি
নীল চোখের সমুদ্রে ভাসাই
প্রেমের সাম্পান।
বাজুবন্দ-জড়োয়া সজ্জিত
সামনে দেখি এক অগ্নিদেবীকে;
তোমার হাসির গিটারে যখন
টুং টাং সুর,
আমার ভেতর তখন বেহাগ-ভৈরব
নিজেকে আবিস্কার করি
তোমার কোমল বাহুর মুগ্ধ আলিঙ্গনে
আমি তোর গ্রীবায় খুঁজি তখন
সুখের নাগোরদোলা-আনন্দ আশ্রম।
হে নারী-
তুমি কি কেবলই ফ্যান্টাসি?
নাকি কবির শব্দরাজির শিল্পীত সৌরভ?
মগ্ন বসন্তে কেবলই কল্পনার ফানুস?
১৫.০৭.১৯৯৬
……………………………………………

ভ্রাম্যমান সুখ

মুলত: আমি একজন মানুষ
মানুষের ভেতরই পুঞ্জিভূত থাকে
কষ্টের মেঘ
সুখের বৃষ্টি
অভিমানের জমা-খরচ।
হঠাৎ মন খারাপ হলে
নিজেকে আবিস্কার করি শশ্মানের চিতায়-
মাতৃগর্ভ সেতো এক বন্দিশালা
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে
দরকারি কিছু ফরমায়েস সারতে
এসেছি পৃথিবীতে;
দিনকয়েক হেসে খেলে নৃত্য করে
ফিরে যাব অনিবার্য ঠিকানায়-
সবাই যেমন যায়।

স্বপ্নভঙ্গের মুহূর্মুহু বেদনায়
নীল হয়ে আসছে পৃথিবী আমার;
যারা কাছে আসার কথা ছিল
তারা অনায়াসে কেমন দূরে চলে যায়,
নিটোল বন্ধুত্বের আহবান
পায়ে মাড়িয়ে যায় কেমন বীরদর্পে।
অভিমানের ভাষা বোঝেনা যে
তার ভালোবাসা সাজেনা।
শশ্মানযাত্রী এক ভগ্ন মানুষকে
কেউ কি ফেরানোর জন্য
উন্মুখ হয়ে আছে বাড়ির দরজায়?

ভীষণ ঈর্ষায় পুড়ি!
যারা সুখের সাম্পান ভাসায়
হৃদয় সমুদ্রে।
অনন্ত দু:খের বর্ণমালায় ভরে গেছে
আমার ব্যক্তিগত অভিধান;
অনর্গল আত্মনাদ আর কষ্টের ভেতর
হেঁটে বেড়ায়
আমার ভ্রাম্যমান সুখ।
১০.১০.১৯৯৫
……………………………………………

একটি কবিতার জন্ম

আসরে মগ্ন দর্শক হয়ে
মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম
গান, তাল-শব্দের বোলচাল-
তুমি কখনও এ-ঘর ও-ঘরে চঞ্চলা হরিণীর মতো
ছুটাছুটি করছিলে কারণে-অকারণে।
ক্ষাণিক বাদে দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে
উদাস স্টাচু হয়ে দাঁড়ালে তুমি।
আমি তোমার চোখে তখন
কবিতার উপাদান খুঁজছিলাম হন্য হয়ে
লোভী শৃগালের চোখে লেহন করছিলাম
তোমার সর্বাঙ্গ, ঘরভর্তি শ্রোতার চোখ
ফাঁকি দিয়ে, চোরাগোপ্তাভাবে।
শব্দচয়ন, বুনন আর বাক্য বিন্যাসে-
তুমি তখন আমার হৃদয় পটে
ক্রমশ: একটি কবিতা হয়ে উঠছিলে।
২৫.০১১.৯২
……………………………………………

সংশয় এবং বিরহ গাথা

ক.
শক্তি পলাতক
মন উচাটন
সামনে শত্রুর খঞ্জর
ধূর্ত সে সন্ধানী,
আমি কেমন করে পেরুবো
প্রেমের বৈতরণী।

খ.
ভালবাসা নাকি পাপ!
সমাজের রক্তচক্ষু
দিন-রাত অগ্নিঝরায়-
নিষেধাজ্ঞার বেড়িকেট ধুনে
আমি যাবই যাব তোমার বাহুবন্ধনে
বেহুলার বাসরে হয়ে সাপ।

গ.
প্রেম মানে বিরহ মিলন খেলা
সোহাগ বিহনে তৃষ্ণা জমেছে মেলা।
০১.১২.৯২
……………………………………………

শ্যামকথন

তোমার রুপনদীতে চৈতিদশা
মরুর টান
তবু দম্ভ তোমার উছলে পড়ে
অটুট মান
তোমার স্বপ্ন সুখের সোনার হরিণ
অনেক দূরে
তুমি বাজাও যত মোহন বাঁশি
মধুর সুরে
তোমার দিনযাপনে বাড়ছে শুধু
শ্যাম তালিকা
তবু আসল শ্যামের পাওনি দেখা
রইলে একা।
২৪.০২.৯৩
……………………………………………

বৃন্দাবনে কৃষ্ণলীলা

তোমার প্রেম তপোবনে
আমি বনোয়ারী, খুঁিজ আশ্রম;
তোমার বুনো হৃদয়ের
আদিম উষ্ণতায়
বিগলিত হবো আমি সফেদ সমুদ্র।
কতকাল আর চষে বেড়াবো
বৃন্দাবনে, একাকি-
অভয়াণ্যের নিরন্ধ আঁধার ভেঙে
তুমি এসো ব্রজেশ^রী-
জো¯œার উজ্জ্বলতা গায়ে মেখে
সুডৌল যুগল নিয়ে দাঁড়াও তুমি
নি:শ^াসের কাছাকাছি:
অত:পর-
এক ঝাঁক বুনো কোকিলের
কোরাস গীতে মোহিত হয়ে
আমরা দু’জন মেতে উঠবো
গোপন লীলায়।
২৫.০২.৯৩
……………………………………………

প্রেম: তিনপর্ব

প্রথম পর্ব
তুমি আমার ভালোবাসার দুর্বার প্রণোদন
প্রেমের বাজারে তুমি লোভনীয় বিপণন।
আচরণে প্রগলভ, হন্তা হৃদয়
নিয়েছো দিবস-রাত, আমাকে নাও সমুদয়।

দ্বিতীয় পর্ব
করতলে চিবুক রেখে ভাবুক আমি
ভাবি দিনমান, অনন্ত ভাবনা
তোমার পুরুষ্ঠু ঠোঁটে নিভৃতে আঁকি
ভালোবাসার আলপনা।

তৃতীয় পর্ব
আমার হৃদয়ে জলস্রোতে ভাসে
একঝাঁক বুনো হাঁস
চাওয়া না পাওয়ার মোহনায় আমার
সমুহ সর্বনাশ।
১২.০২.৯৩
……………………………………………

যুবক তোমার দু:খ কিসের?

সেদিন দিবসের শেষভাগে
সোনাঝরা রোদের ডানায় ভর করে
এক ঊর্বসী সটান চলে এলো আমার কাছে।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ঝরবে বলে
কষ্টের মেঘ জমেছে তখন
আমার হৃদয়ে।
একুশ জোড়া নীল কবুতর বাকুম বাকুম
রব তুলে কাঁছে আমার শোনিতে;
যুবতি আমার চোখে চোখ রেখে
অপলক তাকিয়ে বলে উঠলো
:যুবক তোমার এতো দু:খ কীসের?
হায়! একথায় কীযে হয়-
আকস্মিক জলচ্ছ্বাসে ডুবে যায়
হৃদয় ক্যাম্পাস। ঢেউয়ের তালে তালে
দুলে ওঠে তাবৎ স্বপ্ন, বর্ণালী বিশ^াস।
তাকে কী করে বলি যে-
আমার সামনে বিশাল সমুদ্র
আমি সাঁতার জানিনা।
আমার দু’চোখ জুড়ে ধবল জোছ্না
আমি অন্ধ, দেখতে পারিনা।
আমার চৈতন্যের নদীতে ভাসে
পবনের নাও-
আমি অক্ষম, বইতে জানিনা।
আমার দু:খটাযে কী-
তাতো আমি নিজেই জানিনা।
২৫.০৫.১৯৯৪
……………………………………………

আয়নাভীতি কৃষ্ণপ্রীতি

ইদানিং আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই না।
দেহের ভাঁজে ভাঁজে পৌঢ়ত্বের ছাপ
পড়লো কীনা-তা ভেবে নয়;
আয়নায় নিজেকে ছোঁয়ালে
স্বপ্নের ললাটে জমা হয়
হৃদয়জাত কান্নার ঘাম।
শ্রাবণের বিধূর ভোর বিন্দু বিন্দু শিশিরের
ব্যাকুল প্রার্থনায় উন্মিলীত হয়-
সকালের সূর্যালোকের প্রতীক্ষায়।

আয়নায় নিজেকে ছোঁয়ালেই
আমার ভেতরে তোমাকে দেখি
সূর্যাস্তের আবীর রাঙানো রক্তিম পদ্ম।
আয়নায় আজকাল নিজেকে ছোঁয়াইনা,
দিগম্বর স্বপ্নের মমিতে কী করে
ফোটাই বলো বিশ্বাসের প্রাণ?

আয়নায় নিজেকে ছোঁয়ালেই
লোভাতুর দু’চোখে কামনা দেখে
আৎকে উঠি,
বিভ্রমে ভেঙে ফেলি নিজেকে।
কৃষ্ণকায় চাঁদ তখন
হৃদয়ের মধ্যগগনে
উঁকি মারে-আনমনে
লহমায় উবে যায় রাত্রির রোদ্দুর,
চন্দভুক অমাবশ্যার সাথে
কী করে যে সখ্যতা হয়-
আমি অসময়ে হয়ে যাই
জোৎস্না বিদ্বেষী বিরোহী পুরুষ।
২০.০৮.১৯৯৪