আমার আব্বা পান খেতেন। একটু বেশীই খেতেন। আম্মা বলতেন “পানির রস খেয়ে তোমার পেট ভরে যায়, ভাত খাবে কি? “আব্বার ক্ষুধা মন্দা ছিলো।সারাদিন পান খেতেন বলেই ভাত খাবার আগ্রহ কম, এটা আম্মার ধারনা ছিলো। আব্বার জিহ্বা পান খেয়ে কতকটা ব্রাউনিশ হয়ে গেছিলো। আব্বার দাঁত ছিলো ঝকঝকে। দাঁত মাজন করতেন রেগুলার সাথে নিমের দাঁতন! আব্বার মুখ দিয়ে অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ পেতাম। উনি যখন মুখে আদর দিতেন আমাদের তাঁর পানের গন্ধ আমাদের ব্যাকুল করে দিতো।

সেই পান পান গন্ধটা ছিলো আমাদের কাছে আব্বা সুগন্ধি! তো আব্বা দিনে তিনবার খাবারের আগে পরে পান খেতেন। তার ফাঁকে ফাঁকে খেতেন। প্রতিদিন সকালে আব্বা যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস নিতে যেতেন তাঁর একটি বক্স ছিলো দশ পনের টা পান বানাতে হতো আম্মাকে। বিকেলে যখন বাইরে যেতেন তখন বাক্স সাজিয়ে দিতে হতো। আব্বার যেখানেই যেতেন সন্তর্পণ সযতনে সেই ডিব্বা পকেট থেকে বার করে প্রত্যেকেই অফার করতেন, এবং পান খাওয়াতেন। আব্বা কি দিয়ে পান খেতেন? তাঁর একটা কাঁসার পানবাটা ছিলো, লোহার জাঁতি যেটা দিয়ে সুপারি কাটা হতো। আর ছিলো চূন, জর্দার কৌটা। আম্মার ম্যানোলা স্নোর পরিত্যাক্ত কৌটায় রাখা হতো চূন। সেই চূন আনা হতো সাহেব বাজার থেকে। সেসময় কলার পাতায় মোড়ানো থাকতো চূন।

রাজশাহীর পান দেশ বিখ্যাত পান প্রেমিদের কাছে। বাজার থেকে সে মিঠা পান আসতো বিড়ায় বিড়ায়। আনা হতো শুকনো সুপারি। বিড়া হিসাবে আনা পান আম্মা একটা ছোট বালতিতে অনেক পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতেন। তারপর সেই পান ধোয়া হতো কলতলায়। কল ছেড়ে দুইটা পান একটার সাথে আরেকটা পান ঘসে ঘসে ধোয়া হতো। তারপর বোটার আগ্রভাগ একটু ভেংগে ফেলে সেই পান ঝাঝরে পানি ঝরিয়ে পান বাটায় রাখা হতো। তার ওপরে পাতলা সুতি কাপড় ভিজিয়ে ঢেকে দেয়া হতো আব্বার সাধের পান! আব্বা প্রথমে শাহি জর্দা খেতেন। ডক্টর নিষেধ করে দিলেন জর্দা খেতে। আব্বার খুব মন খারাপ পানে মজা পাচ্ছেননা কিছুতেই। শুরু হলো আব্বার অভিনব পানমশলা বানানো। মৌরি, জাওন, ষষ্ঠিমধু, আলাপাতা, এলাচ, গরম মশলা দিয়ে পাটায় বেটে তা দিয়ে পান খাওয়া।আব্বা সত্যিকার অর্থেই একজন পান রশিক ছিলেন। কালক্রমে আমিও পান বানাতে আরম্ভ করলাম। আমার কাছে পান বানানোটা একটা কলা মনে হতো। আব্বার পান খাওয়া দেখে নিজেও কেমন পানের প্রতি আগ্রহ বোধ করতাম। মাঝে মাঝেই ভাত খাবার পর একখিলি পান মুখে পুরে দিয়ে কিযে তৃপ্তি পেতাম। আর জিহ্বা উল্টিয়ে দেখতাম কতটা লাল হয়েছে তা। মুখভরা পানরস নিয়ে আব্বার সাথে পাল্লা দিয়ে কথা বলতাম। আমি খয়ের খেতাম, আব্বা খেতেননা। আব্বার জিহ্বা তবুও লাল দেখাতো।

আজ আব্বা নেই, তার মুখে রসভরা পানের সুগন্ধটা খুব মিস করি। তার সেই কাঁসার পানবাটা পড়ে আছে এককোণে। আমরা এখন কেউ আর পান সাজানো নিয়ে প্রতিযোগিতা করিনা। আম্মার পান নিয়ে ব্যতিব্যস্ততা হারিয়ে গেছে…