উপমহাদেশের ভাওয়াইয়া সম্রাট ও দরদী গানের মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহম্মদ ছিলেন বাংলা লোকসংগীত জগতের এক প্রবাদপ্রতিম উজ্জল নক্ষত্র। যিনি গান গেয়ে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের ঘুমন্ত মুসলমান সমাজের বিবেককে জাগ্রত করেছিলেন। আব্বাসউদ্দীন আহম্মদ ১৯০১ সালে ২৭ অক্টোবর কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের বলরাম পুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আব্বাসউদ্দীন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও মেধা সম্পন্ন ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই একজন সংগীত শিল্পী হিসেবে জনগ্রিয়তা লাভ করেন। সে সময়ে তিনি কারোর কাছে গান শেখার সুযোগ পাননি। গ্রাম্য গায়ক, ক্ষেত মজুর ও কৃষকের মুখের গান শুনে শুনে তিনি গান শিখেছিলেন। তাঁর গ্রামেরই শিল্পী নায়েব আলি টেপুর অনুরোধে তিনি তখন ভাওয়াইয়া শিখেন। কোচবিহারের বলরামপুর স্কুলে পড়াকালীন পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রথম স্থান ছিল তাঁর দখলে। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এখান থেকে বিএ পরীক্ষায় অণুত্তীর্ণ হয়ে তিনি সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করেন। যাত্রা, থিয়েটার ও স্কুল-কলেজের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পডড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন। কলকাতায় বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় সংগ্রামী এক শিল্পী জীবন। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগষ্টের পর তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্থানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। আব্বাসউদ্দিন আহমেদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানিতে দুটি গান রেকর্ডিং করেছিলেন বিমল দাশগুপ্তের সহযোগিতায়। ‘কোন বিরহির নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’ অপরটি ‘স্মরণ পারে ওগো প্রিয়’ গানদুটি সেই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এরপরই শিল্পী কলকাতার বুকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আব্বাসউদ্দীন ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল। তাই অন্যান্য ধর্মের গায়করা মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকে। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও জসীম উদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। এমনকি তিনি সেই সময়ে ইসলামী গানকে কন্ঠে ধারণ করেছিলেন বলেই তৎকালীন মুসলীম সমাজে রেঁনেসার উৎপত্তি হয়েছিল। আব্বাসউদ্দীনের আধুনিক গানের সংখ্যা অজস্র। তিনি অসংখ্য পল্লীগীতি, মুর্শিদী, জারী, সারি, ভাটিয়ালী, হামদ্, নাত ও পালাগান গেয়েছেন। আব্বাসউদ্দীন নজরুল, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, কে. মল্লিক সহ সে সময়ের নামকরা শিল্পীদের সাথে যোগসূত্রতার ফলে উপমহাদেশে সংগীতে একটা জাগরণ সৃষ্টি করতে পিেরছিলেন।

নজরুল-আব্বাসউদ্দীন
নজরুল-আব্বাসউদ্দীন বাংলা সংস্কৃতির নির্মাতা। দু’জনই উপমহাদেশে সাংস্কৃতিক পরিম-লে প্রধান দুই কালপুরুষ। প্রথম মুসলমান কবি যার কবিতা সব ধর্মের লোক পাঠ করতে বাধ্য, তাঁর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম মুসলমান গায়ক যার গান সবার কণ্ঠে, কর্ণে দিয়া মর্মে গাঁথিল। সে হলো আব্বাসউদ্দীন। দু’জনের যখন সম্মিলন ঘটলো বাংলা মুসলমানরা ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জাগ্রত হতে লাগলো। নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন তারা দু’জনে মিলে মুসলমানদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন।
আব্বাসউদ্দীন কুচবিহারে ভর্তি হওয়ায় পর তাঁর জীবনের আরেক সোনালী অধ্যায়ের দ্বার খুলে গেলো। এই সময়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুর ইসলামে সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। নজরুলের অনুরোধে আব্বাসউদ্দীন সেই দিন অনেক সঙ্কোচে গাইলেন একটা রবীন্দ্র সংগীত- ‘সে আসে ধীরে যায় ফিরে লাজে…’। গান শুনে কবি জড়িয়ে ধরলেন আব্বাসউদ্দিনকে। গভীর আবেগে বললেন ‘তোমার গানের গলা অনেক ভালো। তুমি অনেক বড় গায়ক হবে।’ পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতায় যান। কবি নজরুল ইসলামের সাথে দেখা করেন। নজরুলও তাঁকে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। নজরুল কালবিলম্ব না করে আব্বাসউদ্দীনকে নিয়ে যান গ্রামোফোন কোম্পানীতে এবং আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গাওয়া গান রেকর্ড করান। প্রথমে নানা কাব্যসংগীতের মাধ্যমে তাঁর প্রতিভার বিকাশ, বিশেষ করে ইসলামি গান রচনায় তাঁর অনুপ্রেরণা নজরুলের লেখনিতে যে স্ফুর্তি বয়ে এনে দিয়েছিল তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন : ‘কাজিদার লেখা গান ইতোমধ্যে অনেকগুলো রেকর্ড করে ফেললাম। তাঁর লেখা- বেনুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর, অনেক ছিল বলার যদি দু’দিন আগে আসতে, গাঙে জোয়ার এলো তুমি ফিরে এলে কই, বন্ধু আজো মনে রে পড়ে আম কুড়োনো খেলা, ইত্যাদি।’

নজরুলকে আব্বাসউদ্দীন নিয়ে আসেন ছাত্রদের মিলাদ উপলক্ষে, কুচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রাবাসে। আব্বাসউদ্দীন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘দু’দিন রইলেন কুচবিহারে, কিছু গানে গানে কী যে উন্মাদনা সৃষ্টি করে গেলেন! আর তো মনকে কিছুতেই বইয়ের মাঝে আটকে রাখতে পারি না। আমার মনের গহন বলে সুরের পাখি সর্বদাই বিচিত্র সুরকাকলিতে আমায় করে তুলে উন্মাদনা’।
এরপর নজরুলের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় সাক্ষাৎ দার্জিলিংয়ে। তিনি লিখেছেন : ‘তিল ধারণের স্থান নেই হলের ভিতর। কাজিদা তখন আবৃত্তি করছেন তাঁর বিপ্লবী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। পূর্ণ নিস্তব্ধতা কক্ষে বিরাজমান। জলদ্গম্ভীর সুরে আবৃত্তি করে চলেছেন। প্রতিটি শ্রোতা পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন তাঁর মুখের পানে। শেষ হওয়ার সাথে কি বিপুল করতালি। আমার দিকে চোখ পড়তেই তিনি আমাকে ইশারায় ডাকলেন। বলে উঠলেন, ‘কই, কোথায়’? আমি সামনে এসে আদাব করলাম। তিনি দাঁড়িয়ে উঠে ঘোষণা করলেন, ‘এক নতুন শিল্পীর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি- আব্বাসউদ্দীন’। বললাম, ‘আপনার গানই গাই, কেমন’? সানন্দে অনুমতি দিলেন। ধরলাম, ‘ঘোর ঘোররে আমার সাধের চরকা ঘোর’। এক গানেই আসর মাৎ।’ এরপর কাজী নজরুল লিখে চললেন ইসলামি গান। আল্লা-রসুলের গান গেয়ে বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে জাগল এক নব উন্মাদনা। যার গান শুনলে কানে আঙ্গুল দিত তাদের কানে গেল-
‘আল্লা নামের বীজ বুনেছি নাম মুহাম্মদ বোলরে মন, নাম আহমদ বোল’।
বা,
কান থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে তন্ময় হয়ে শুনল
‘এলো আবার ঈদ ফিরে এলো আবার ঈদ, চল ঈদগাহে’
ঘরে ঘরে এলো গ্রামোফোন রেকর্ড, গ্রামে গ্রামে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল আল্লাহ-রসুলের নাম’। কাজী নজরুলের শতাধিক ইসলামি গানের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় হল ‘ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানটি। আব্বাসউদ্দীন আহমদের জীবনী থেকে জানা যায়, সঙ্গীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধেই কাজী নজরুল ইসলাম এ গান রচনা করেছিলেন। তবে আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে রচনা করলেও এই গান নজরুলের জীবনব্যাপী সংগ্রামেরই অংশ যেখানে তিনি স্বজাতির বেদনা ও মুক্তির তাড়নায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টির আনন্দে মেতে ছিলেন। কবি তাঁর কালজয়ী এ গানটি রচনা করেন ১৯৩১ সালে। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ড করার দুই মাস পর ঈদের ঠিক আগে আগে এই রেকর্ড প্রকাশ করা হয়। আব্বাসউদ্দীনের ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পী জীবনের কথা’র এ গান সম্পর্কে আব্বাসউদ্দীন লিখেন, ‘একদিন কাজীদাকে বললাম, ‘কাজীদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল- এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়। এ ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন, কীভাবে কাফের-কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে হেয় করে রাখার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে এক দল ধর্মান্ধ! আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন, তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান’। কথাটা তার মনে লাগল। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না’। আমি ভগবতী ভট্টাচার্য অর্থাৎ গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল-ইনচার্জকে বললাম। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না না না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না’। মনের দুঃখ মনেই চেপে গেলাম।
প্রায় ছয় মাস পর। একদিন দুপুরে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি অফিস থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ঘরে গিয়েছি। দেখি, একটা ঘরে আশ্চর্যময়ী আর ভগবতীবাবু বেশ রসালো গল্প করছেন। আমি নমস্কার দিতেই বললেন, ‘বসুন, বসুন’। আমি তাঁর রসাপ্লুত মুখের দিকে চেয়ে ভাবলাম, এ-ই উত্তম সুযোগ। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে বলি। সেই যে বলেছিলাম, ইসলামি গান দেওয়ার কথা। আচ্ছা; একটা এক্সপেরিমেন্টই করুন না, যদি বিক্রি না হয় আর নেবেন না, ক্ষতি কী’? তিনি হেসে বললেন, ‘নেহাতই নাছোড়বান্দা আপনি, আচ্ছা আচ্ছা, করা যাবে’। শুনলাম, পাশের ঘরে কাজীদা আছেন। আমি কাজীদাকে বললাম, ভগবতীবাবু রাজি হয়েছেন। তখন সেখানে ইন্দুবালা কাজীদার কাছে গান শিখছিলেন। কাজীদা বলে উঠলেন, ‘ইন্দু, তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে’। ইন্দুবালা চলে গেলেন। এক ঠোঙা পান আর চা আনতে বললাম দশরথ থেকে। তারপর দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’।

পরের দিন ঠিক এই সময় আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’। তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন। গান দু’খানা লেখার ঠিক চার দিন পরই রেকর্ড করা হল। কাজীদার আর ধৈর্য মানছিল না। তাঁর চোখেমুখে কী আনন্দই যে খেলে যাচ্ছিল! তখনকার দিনে যন্ত্র ব্যবহার হতো শুধু হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দু’খানা আমার তখন মুখস্থ হয়নি। তিনি নিজে যা লিখে দিয়েছিলেন, মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর ঠিক আমার চোখ বরাবর হাত দিয়ে কাজীদা নিজেই সেই কাগজখানা ধরলেন, আমি গেয়ে চললাম। এই হল আমার প্রথম ইসলামি রেকর্ড। শুনলাম; দুই মাস পর ঈদুল ফিতররের সময় গান দু’খানা তখন বাজারে বের হবে। ঈদের বাজার করতে একদিন ধর্মতলার দিকে গিয়েছি। বিএন সেন অর্থাৎ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানির বিভূতিদার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, আমার দোকানে এস’। তিনি এক ফটোগ্রাফার ডেকে নিয়ে এসে বসলেন, ‘এর ফটোটা নিন তো’। আমি তো অবাক! বললাম, ‘ব্যাপার কী’? তিনি বললেন, ‘তোমার একটা ফটো নিচ্ছি, ব্যস, আবার কী’?
ঈদের বন্ধে বাড়ি গেলাম। কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছি। রাস্তার আশেপাশে আমার ছবি সম্বলিত হাজার হাজার পোস্টার। ট্রামে একটি যুবক আমার পাশে গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আমি একটু অবাক হলাম। এ গান কী করে শুনল! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গিয়েছি, মাঠে বসে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল। ছুটলাম কাজীদার বাড়ি। শুনলাম, তিনি রিহার্সেল রুমে আছেন। দেখি, দাবা খেলায় তিনি মত্ত। দাবা খেলতে বসলে দুনিয়া ভুলে যান তিনি। আমার গলার স্বর শুনে একদম লাফিয়ে উঠে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে-’ আর বলতে দিলাম না, পা ছুঁয়ে তাঁর কদমবুসি করলাম। ভগবতীবাবুকে বললাম, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন’? তিনি বললেন, ‘আরো-আরো গান চাই। বাজার মাত। মশাই আপনারা দু’জন যাদু জানেন। তাড়াতাড়ি গান লিখে সুর করতে বলুন কাজীদাকে-
‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি/এবার মনের মাঠে
ফলবে ফসল বেচব তারে/কিয়ামাতের হাটে’
বা,
‘নাম মুহাম্মদ বোল রে মন/নাম আহেম্মদ বোল
যে নাম নিয়ে চাঁদ সিতারা/আসমানে খায় দোল’
অথবা,
‘আল্লাহ আমার প্রভু/আমার নাহি নাহি ভয়/আমার নবী মোহাম্মদ/যাহার তারিফ জগৎময়’
এবং
‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখ্বি যদি আয়’।৬
এমনিভাবে কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়ে আব্বাসউদ্দীন লিখিয়েছিলেন এ ধরণের অসংখ্য ইসলামি গান। ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগিয়ে তোলার গান শুনিয়ে দিলেন। নজরুলকে চিনলো বাংলার মুসলমানেরা। ডাক পড়তে লাগলো বিভিন্ন সভা সমাবেশ ও সমিতিতে। সাথে যাবেন আব্বাসউদ্দীন। নজরুল লেখেন গান আর আব্বাসউদ্দিন সে গান গেয়ে শোনান জনগণকে। জমে ওঠতে লাগলো মুসলমানদের আসর। সত্যি সত্যি জেগে উঠলো মুসলিম যুব সম্প্রদায় ও মুসলিম সমাজ। বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত হলেন নজরুল সাথে আব্বাসউদ্দীনও।
একদা আব্বাসউদ্দীন আহমদ নজরুলের বাসায় গিয়ে দেখেন, আগে থেকেই কবি গভীর মনোযোগে কী যেন লিখছেন। আব্বাসউদ্দীনকে বসতে ইঙ্গিত দিয়ে আবার মন দিলেন লেখায়। জোহরের সময় হলে আব্বাসউদ্দিন কবির কাছে একটা চাদর চাইলেন, আর বললেন, একটি গজল লিখে দিতে হবে। কবি পরিষ্কার একটি চাদর এনে বিছিয়ে দেন আব্বাসউদ্দীনকে নামাজ পড়ার জন্য। আব্বাসউদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন আর নজরুল গান লিখতে শুরু করে দিলেন। আব্বাসউদ্দিনের নামাজ শেষ হতে না হতেই নজরুল তাঁর হাতে একটা কাগজ দিয়ে বললেন, নাও তোমার গজল। আব্বাসউদ্দীন তো অবাক হয়ে কবির দিকে তাকিয়ে থাকলেন, এই অল্প সময়েই নজরুল চমৎকার ইসলামি গান লিখে ফেলেছেন; তা-ও আব্বাসউদ্দীনের নামাজ পড়ার প্রসঙ্গ এনে। নজরুলের বিখ্যাত সেই গজলটি হলো-
‘হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
দিলাম তোমার চরণতলে হৃদয় জায়নামাজ।’৭
শিল্পী আব্বাসউদ্দীন কাজী নজরুল ইসলামের ৫০ টি ইসলামী গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এদিক থেকে তিনিও কাজী নজরুলের একজন সহযোদ্ধার মর্যাদার দাবিদার। এই সম্মিলনের ফলেই বাঙালি মুসলমান তার ধর্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে আত্তীকৃত করতে পেরেছে।

শেরে বাংলা-আব্বাসউদ্দীন
আব্বাসউদ্দীন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সাথে ঘুরে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিভিন্ন সভা সমাবেশে তিনি গান পরিবেশন করতেন। আব্বাসউদ্দীন আহমেদ বি.এ পড়ার সময় স্বদেশী আন্দোলন পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি আন্দোলনের সুবাদে বাংলার কৃতি সন্তান শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখদের সান্নিধ্যে আসেন। এ সময় তিনি সুকণ্ঠী গায়িকা ইন্দুবালা, কে. মল্লিক ও হিজ মাস্টার ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানীর সংস্পর্শে আসেন। সুযোগ পেলে আব্বাসউদ্দীন পরিবেশন করতেন কাজী নজরুল ইসলামের সেই জাগরণী গান-
‘বাজিছে দামাম বাঁধরে আমামা/শির উঁচু করি মুসলমান
দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার/ভাঙ্গাঁ কেল্লায় ওড়ে নিশান’
অথবা,
‘ত্রি-ভুবনে প্রিয় মুহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়
আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়’
আবার,
‘ভারতের দুই নয়ন তারা হিন্দু মুসলমান
দেশ জননীর সমান প্রিয় যুগল সন্তান/হিন্দু মুসলমান’।
একদা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সাথে আব্বাসউদ্দিনের সাক্ষাৎ ঘটলে শেরে বাংলা আব্বাসউদ্দীনকে বললেন- ‘তোমার গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি। পরশু আমার বাসায় মিলাদ। তুমি আসবে। হামদ, না’ত শোনাবে আমাকে। মৌলভীদের শোনাবে। এতো ভাল কাজ তুমি করেছো, মোলভী সাহেবরা জানেন না। ওদেরও জানিয়ে দেবো। আমি হারমোনিয়াম, তবলা ইত্যাদি সব জোগাড় করে রাখবো। আসবে কিন্তু।’ আব্বাসউদ্দীন বিনয়ের সাথে বললেন, ‘এতো আমার সৌভাগ্য। আপনি বাংলার জন্য-মুসলমানের জন্য এতকিছু করছেন, আর আমি আসবো না? আমিও তো আপনাদের কাজের একজন সামান্য সহযোগী।’
ঠিক সময়ে শেরে বাংলার পুকুর লেনের বাসায় হাজির আব্বাসউদ্দীন। মৌলভী সাহেবরা উপস্থিত হয়েছিলেন আগেই। শেরে বাংলা আব্বাসউদ্দীনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদের। শিল্পীর প্রশংসা করলেন অকুণ্ঠচিত্তে। কিন্তু মৌলভী সাহেবরা তেমন খুশি হতে পারলেন না। কেমন যেন উস্খুশ করতে লাগলেন। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন-গায়ক আবার মুসলমান হয় নাকি? মুসলমানরা কি গান গায়? যথাসময়ে মিলাদ শুরু হলো। শেষও হলো। মোনাজাত শেষ হতেই শেরে বাংলা পাশের ঘর থেকে নিজ হাতে নিয়ে এলেন হারমোনিয়াম। মৌলভী সাহেবদের তো চক্ষু চড়কগাছ। তারা পরস্পরে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলেন। এমন সময় হক সাহেব মৌলভী সাহেবদের উদ্দেশ্যে বললেন- ‘এতক্ষণ আপনারা মিলাদ পড়লেন বিদেশী ভাষায়। অনেক কথাই শ্রোতারা বুঝতে পারেনি। অনেক শব্দের অর্থ তারা জানতে পারেনি। এবার আব্বাসউদ্দীন আমাদের প্রিয় নবী হযরতের গুণগান করবে বাংলা ভাষায়। গানে গানে অভিবাদন জানাবে আমাদের প্রিয় মহানবীকে। আপনারা শুনুন। বুঝতে চেষ্টা করুন। ওর গান আমি শুনেছি। ওর গান শুনলে আমার চোখ দিয়ে পানি আসে। এই ভাবে সে যদি মুসলমানদের কাছে আমাদের প্রিয় নবীর কথা প্রচার করতে পারে তবে বাংলার মানুষ পাক্কা মুসলমান হবে।’ একজন মৌলভী সাহেব বললেন, ‘হুজুর গান শোনা না জায়েজ। বেদাত কাজ।’ শেরে বাংলা রীতিমতো ধম্কে ওঠলেন, বললেন, ‘মিথ্যে কথা। হজরতের আমলেও গানের প্রচলন ছিল। যুদ্ধের ময়দানে গান গেয়ে সৈনিকদের উৎসাহিত করা হতো। বিয়ে-শাদীর মতো অনুষ্ঠানেও গান পরিবেশিত হতো। কাওয়ালী, হামদ, না’ত আসলে তো গান। সুরের ব্যাপার। সুর মনকে গলিয়ে দিতে পারে। আব্বাসউদ্দিন যে গান গাইবে তা আমাদের প্রিয় নবীর বাণী। এতে আপত্তি থাকার কথা নয়। আপনারা তো এতোক্ষণ সুর দিয়ে মিলাদ পড়লেন। ভালো কথায় সুরের শেষ নেই।’ মৌলভী সাহেবরা শেরে বাংলার কথা মানলেন না। তারা জুতো হাতে একে একে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমরা আসি।’ হক সাহেব অনেকটা ক্ষুণ্ন স্বরে বললেন, ‘আসুন। জোর করে শোনাবো না। তবে শুনলে বুঝতে পারতেন কেন আমি মিলাদে মাহফিলে গানের ব্যবস্থা করেছি। বুঝতে পারতেন, আমি বাংলার অশিক্ষিত ইসলাম ভক্তদের কাছে কেমন করে আমার প্রিয় নবীকে পরিচিত করতে চাই। আপনারা এতদিন যা পারেননি-আজ আব্বাসউদ্দীনকে দিয়ে তা আমি পারবো বলে আশা রাখি। আমি চাই মুসলমানদের জাগাতে। নজরুলকে আপনারা কাফের ফতোয়া দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। শুনলে বুঝতে পারতেন, আব্বাসউদ্দীন কি করে তাকে মুসলিম সমাজের জন্য কাজে লাগিয়েছে।’ হক সাহেবের এত বড়ো বক্তৃতায়ও কাজ হলো না। মৌলভী সাহেবরা আসর ছেড়ে বারান্দায় গেলেন। ঠিক এমনি সময়ে আব্বাসউদ্দীনের দরাজ কণ্ঠে ভেসে ওঠলো- ‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে/মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদই দোলে।’ এ গান শোনার পর মৌলভী সাহেবরা একে একে বারান্দা থেকে এসে আবার আসরে বসে পড়লেন। আব্বাসউদ্দিন গাইলেন- ‘এই সুন্দর ফল সুন্দর ফুল মিঠা নদীর পানি/খোদা তোমার মেহেরবাণী।’ মৌলভী সাহেবরা মুগ্ধ হয়ে শুনছেই, উঠছে না আর। আব্বাসউদ্দীন গাইলেন- ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা/শির উঁচু করি মুসলমান/দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার/ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান।’ মৌলভী সাহেবরা আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গান শুনে অভিভূত হয়ে পড়লেন। তারা হক সাহেবের প্রশংসা করলেন এমন আসর করার জন্যে।

কে. মল্লিকের-আব্বাসউদ্দীন
আব্বাসউদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯) ছিলেন কে. মল্লিকের কিছু পরের শিল্পী। তবে গ্রামোফোন কোম্পানিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। শিল্পীজীবনের উন্মেষ পর্বে আব্বাসউদ্দীন এই মহৎ শিল্পীর সহায়তা কী ভাবে লাভ করেছিলেন তার অন্তরঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন তাঁর স্মৃতি কথায় : ‘তখনকার দিনে রেকর্ড হত বেল ঘাটায়। আমার সেদিন রেকর্ড হবে। আলাপ হল কে. মল্লিকের সাথে। আমি মুসলমান এ কথা জানতে পেরে তিনি প্রথম আত্মীয়তার সুরেই আমাকে বললেন, “কী গান রেকর্ড করবে, গাও দেখি একবার।” আমার গান শুনে তিনি বললেন, চমৎকার গলা। কিন্তূ … আজ তো’ এর রেকর্ড হবে না। আমি ভড়কে গেলাম। … “কী ব্যাপার বলে বিমলদা এগিয়ে এলেন। কে. মল্লিক মশায় বললেন, “একে নতুন আর্টিস্ট মশাই, তাতে আবার মুসলমান। দেখুন না গানের উচ্চারণ; আজ থাক। সারাদিনে আমি ওর উচ্চারণগুলো ঠিক করে দিই -কাল রেকর্ড করবেন।” প্রাণে এতক্ষণে জোর এল। বিমলদা বলে উঠলেন, “হবে না – জাতের টান ত।” এ কথার অর্থ আমি বুঝলাম না। জিজ্ঞাসু নয়নে, কে. মল্লিক মশায়ের মুখের দিকে তাকালাম। তিনি হেসে বললেন, “উনি ঠিকই বলেছেন, আমিও ত’ মুসলমান।” আকাশ থেকে ফেরেশতা নেমে এসে হলফ করে বললেও বিশ্বাস করতাম না। কেমন করে করি ? বললাম, “কিন্তু ছেলেবেলা থেকে ত’ শুনে আসছি আপনার গান, ঐ শুধু “আর কবে দেখা দিবি মা”, ওমা অন্তে যেন ও চরণ পাই”- এই সব গান।” তিনি হেসে বললেন, “তাতে কি হয়েছে? গান গানই, তাতে হরিই বা কী শ্যামাই বা কী।” মনের সন্দেহ তবু যায় না, যাক্গে তাঁর অতি যেত্নের রেকর্ডের উচ্চারণভঙ্গীগুলি দু’এক ঘন্টার মধ্যেই আয়ত্ব করে ফেললাম। তাঁর এই অযাচিত উপদেশ ও শিক্ষার জন্য আমি এখনও তাঁকে পরম শ্রদ্ধার সাথে নিত্য স্মরণ করি।”

বিশ্শব সংগীত দরবারে আব্বাসউদ্দিন অনেক কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। এছাড়াও তিনি শিকাগো, লন্ডন, নিউইয়ার্ক, প্যারিস, জাপান, অষ্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশে পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করেছেন। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি, প্রাইড অফ পারফরম্যান্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৮১), আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ডস (২০১৩) মরণোত্তর অর্জন করেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি আব্বাসউদ্দিন আহমেদ অভিনয়ও করেছিলেন। তিনি ‘বিষ্ণু প্রিয়া’ (১৯৩২), ‘মহানিশা’ (১৯৩৬), ‘একটি কথা’ ও ‘ঠিকাদার’ (১৯৪০) ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তার বড় ছেলে মরহুম মোস্তফা কামাল বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ছোট ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসী সংগীত শিল্পী, লোক গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক এবং একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী রহমান উপমহাদেশের খ্যাতিমান ধ্রুপদী, গজল ও লোকসংগীত শিল্পী। পল্লীগীতি ও ভাওয়াইয়া গানের জনক আব্বাসউদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকাবস্থায় ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবরাস্থানে সমাহিত করা হয়।
আব্বাসউদ্দীন আহমেদ বাঙালি মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত। পিছিয়ে পড়া, ঘুমিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে জেগে উঠেছিলেন আব্বাসউদ্দীপনা দরদী কণ্ঠের মরমী সুরে। আব্বাসউদ্দীন এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। তিনি এ দেশের প্রথম জাতীয় কণ্ঠশিল্পী। তাঁর স্বীকৃতি জাতি দিয়েছে। এই জমিনে যতদিন মুসলমান বাস করবে, ততদিন তারা আব্বাসউদ্দীনকে এই স্বীকৃতি দেবেই। আব্বাসউদ্দীন বাঙালির জন্য অপরিহার্য।