ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট ও বিশ্বে জীববৈচিত্র্যের অন্যতম বৃহত্তম আধার ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন অক্সিজেনের ভান্ডার। বাংলাদেশের ফুসফুস এই সংরক্ষিত বনে সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাত হানার পরে তার প্রাণপ্রকৃতি কি অবস্থায় রয়েছে? নিজের বুক পেতে আমফানের গতিকে কমিয়ে দিয়ে লোকালয়ের কোটি মানুষের জীবন আবারো বাঁচিয়ে দেয়ার পর সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা জানতে উদগ্রীব দেশ-বিদেশের লক্ষ-কোটি মানুষ।

সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা গবেষক ও বন বিভাগ বলেছে, সুন্দরবনকে তার মতো করে থাকতে দিলে আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এই বনটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। প্রাণ ফিরে পাবে সুন্দরবন।
বন সন্নিহিত এলাকা লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ১ লাখ বছর আগে হিমালয়ের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে সুন্দরবনের গোড়াপত্তন হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনে আয়তন ছিল দ্বিগুণ। কমতে-কমতে বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন হচ্ছে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারে ঠেকেছে। যা দেশের সংরক্ষিত বনভূমির ৫১ ভাগ।

একশ্রেণীর ক্ষমতাবান অসৎ মানুষের কারণে অস্তিত্ব সঙ্কটে থাকা সুন্দরবনের কাছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ‘আর্শিবাদ’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত ২৬ মার্চ গোটা সুন্দরবনে বন্যপ্রাণীর করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সব ধরণের পর্যটকসহ জেলে-বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সর্বোচ্চ সর্তকতা ‘রেড এলার্ট’ জারি করে বন অধিদপ্তর।
২৪ ঘন্টায় ২ বার সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে প্লাবিত এই লবণাক্ত এই বনভূমিতে পর্যটকসহ জেলে-বনজীবীরা না থাকায় ছিল না কোন কোলাহল। র্নিভয়ে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সুন্দরবনে প্রকৃতির পাহারাদার রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল ও মায়া হরিণসহ সব বন্যপ্রাণী। এখন প্রায় প্রতিনিয়তই শোনা যাচ্ছে বাঘসহ বন্যপ্রাণীর ডাক। সহজেই চোখে পড়ছে বাদরের বাদরামী। বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন দল বেঁধে পানির ওপর খেলা করেছে। সহজেই দেখা মিলছে কুমির ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বাটাগুল বাচকা কচ্ছপের। র্নিভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অজগর, কিংকোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি কিচির-মিচির শব্দ করে গাছের এ ডাল থেকে ও ডালে উড়ে ফিরছে।

বহুকাল পর যেন সুন্দরবন স্বাভাবিক রূপ ফিরে শুরু করেছিল। কিন্তু গত বুধবার রাতে সুপার সাইক্লোন আম্পানের প্রলংকরী ছোবল ক্ষত-বিক্ষত করলো সুন্দরবনকে।

বাগেরহাটের পূর্ব ও খুলনার পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের ৪টি রেঞ্জের বিভিন্ন ফরেস্ট অফিস, টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইটের পাশাপাশি বিশে^র অন্যতম বৃহৎ জলাভূমিও। সুন্দরবনের জলভাগের পরিমান ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গ কিলোমিটার। যা সমগ্র সুন্দরবনের ৩১ দশমিক ১৫ ভাগ। এছাড়া, সুন্দরবনের সমুদ্র এলাকার পরিমান ১ হাজার ৬০৩ দশমিক ২ বর্গ কিলোমিটার। এই জল ভাগে ছোট বড় ৪৫০টি ছোট-বড় নদী ও খালে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ইরাবতীসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা ও ১ প্রজাতির লবস্টার। সুন্দরবনের মোট আয়তনের ৬৮ দশমিক ৮৫ ভাগ অর্থাৎ ৪ হাজার ২৪২ দশমিক ৬ বর্গ কিলোমিটার হচ্ছে স্থল ভাগ। সংরক্ষিত এই বনের ৩টি এলাকাকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো ৭৯৮তম ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট ঘোষণা করে। যা সমগ্র সুন্দরবনের ৩০ ভাগ এলাকা।

সুন্দরী, গেওয়া, গড়ান, পশুরসহ ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদরাজি রয়েছে। এছাড়া ৩৭৫ প্রজাতির বন্য প্রাণীর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হরিণসহ ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, লোনা পানির কুমির, গুইসাপ, কচ্ছপ, ডলফিন, অজগর, কিংকোবরাসহ ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৩১৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। ইতিধ্যেই সুন্দরবন থেকে হারিয়ে গেছে ১ প্রজাতির বন্য মহিষ, ২ প্রজাতির হরিণ, ২ প্রজাতির গন্ডার, ১ প্রজাতির মিঠা পানির কুমির। গোটা সুন্দরবনের ৪টি রেঞ্জর ১৮টি রাজস্ব অফিস, ৫৬টি টহল ফাঁড়িতে সর্বমোট জনবলের সংখ্যা ৮৮৯জন। এই অপ্রতুল জনবল দিয়ে বিশাল এই সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিকে দেখভাল করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। দেশে করোনাকালে সুন্দরবনে রেডএলার্ট জরির পর সুপার সাইক্লোন আম্পান আঘাত হানার আগ পর্যন্ত ভালোই ছিলো এই বনটি।

সুন্দরবন নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনকে তার মতো করে থাকতে দিলে আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এই বনটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। গত দেড়শত বছরে ৭৫টি প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সুন্দরবন। তার পরও সুন্দরবন বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই, নিকট অতীতে সুন্দরবন সুপার সাইক্লোন সিডর, আইলা, বুলবুলের ক্ষত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন বন বিভাগকে প্রাথমিক অবস্থায় দ্রুত দু’টি কাজ করতে হবে। গাছগুলো ভেঙ্গে যে অবস্থায় আছে সেভাবেই রেখে দিতে হবে। জলোচ্ছ্বাসে বন অভ্যন্তরে বন্যপ্রাণীর খাবারের উৎস্য মিঠাপানির পুকুরগুলোতে যে লবণপানি ঢুকেছে তা দ্রত পাম্প করে বের করে দিতে হবে। বৃষ্টির পানিতে দ্রুত পুকুরগুলোতে আবার পানি জমবে।

প্রতিবারই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে সুন্দরবন উপকূলের কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে চলেছে। এখন সময় এসেছে সুন্দরবনকে রক্ষায় সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সুন্দরবনের সব বন অফিসের ভবন ও জেটি ঘূর্ণিঝড় সহনীয় করে নির্মাণ, আগুনের হাত থেকে বাংলাদেশের এই ফুসফুসকে রক্ষায় এই বনের জন্য নিজস্ব ভাসমান অগ্নির্নিবাপক নৌযান ক্রয়, বনের লোকালয় সন্নিহিত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, জেলে-বনজীবীদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান, বন্যপ্রাণীর খাবারের মিঠা পানির জন্য পর্যাপ্ত পুকুর খননসহ সুন্দরবন সুরক্ষায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যেসব প্রকল্প আটকে রয়েছে, সেসব প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদন দিয়ে অর্থ ছাড় করার দাবি জানান এই পরিবেশবিদ।

বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, উদ্বিগ্ন হবার কোন কারণ নেই। সুন্দরবনকে তার মতো করে থাকতে দিলে আগামী ৬ মাসের মধ্যে এই বনটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। এখন বন বিভাগ ঝড়ে বিধ্বস্থ গাছপালা সুন্দরবনে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায়ই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিঠা পানির পুকুরগুলোতে জলোচ্ছ্বাসে ভরে যাওয়া লবন পানি দ্রুত পাম্প করে অপসারণের কাজ শুরু হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ অবকাঠামোসহ ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত অবস্থা জানতে ৪টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৪টি রেঞ্জের এসিএফদের প্রধান করে ৭ সদস্যে বিশিষ্ট এসব কমিটিকে ৩ কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিনে সুন্দরবনের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করে তারা রিপোর্ট দেবে। তখন সুন্দরবনের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানা যাবে। প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, রাতভর ঘূর্ণিঝড় আম্পান সুন্দরবনে তান্ডব চালালেও শরণখোলা, চাঁদপাই ও খুলনা রেঞ্জের চেয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।