আমাদের ছড়ার ইতিহাস বেশ পুরনো। সেই আদিকাল অর্থাৎ চর্যাপদের সময় থেকে আমাদের ছড়ার ইতিহাস। এই সূদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আজ যে জায়গায় আমাদের ছড়া সাহিত্য দাঁড়িয়েছে তা ছড়া সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ণ বলে আমি মনে করি না। আমাদের ছড়াকারদের যোগ্যতা বা দক্ষতার কথা বলছি। বলছি তাঁদের মূল্যায়নের ব্যাপারে।

দক্ষতার ১৮৯৯ সালে ছড়াকার ও প্রকাশক যোগীন্দ্রনাথ সরকার সর্বপ্রথম ‘খুকুমণির ছড়া’ শিরোনামে লোকজ ছড়াগুলোকে সংকলিত করে প্রকাশ করেন। ঐ বইয়ের ভূমিকায় সাহিত্যিক রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী প্রথম ছড়াকে বাংলা সাহিত্যের মূল ধারা বলে উল্লেখ করেন। এমন স্বীকৃতির পরও আজ পর্যন্ত তা সবক্ষেত্রে সম্মান পায়নি।

আমরা গণহারে ছড়াকে শিশুসাহিত্যের অংশ বলে মনে করি। আসলেই কী তাই? শিশুরা কোমল, সহজ সরল, ছন্দে ছন্দে থাকতে ভালোবাসে। তাদের খেলায়, চলায়, বলায় একটা ছন্দ পাওয়া যায়। আর তেমনি ছন্দই হল ছড়ার মূল রসদ। ছন্দ বিহীন ছড়া কল্পনাই করা যায় না। ছড়ার সাথে শিশুদের এই মিলটাই হয়ত ছড়াকে শিশুসাহিত্য বলে ভুল করি আমরা। দুঃখটা এখানেই যে এত বছর পর, এত জ্ঞানী গুণী থাকার পরও কেউ ছড়াকে আপন করে, আদর করে আলাদা স্থানে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেনি বলে। তাই ছড়া যেন নিজের পরিচয় হারাতে বসেছে। ছড়াকারদের জন্য বিষয়টাতো আরো কষ্টের। তাঁরা বুঝতেই পারে না নিজের পরিচয় শিশুসাহিত্যিক না ছড়াসাহিত্যিক!

ছড়াকার বললেই আমাদের মনে আসে উঁনি হয়ত ‘আম পাতা জোড়া জোড়া, মারবো চাবুক চড়ব ঘোড়া!’ টাইপের শিশুদের ছড়া লিখে থাকেন। কিন্তু আমার বেমালুম ভুলে যায় যে ছড়ার একটা নিজস্ব শক্তি আছে যা অন্য সাহিত্যধারার নাই। যা অতীত হয় তা-ই ইতিহাস। আজ আমরা বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে আমাদের পুরনো ইতিহাসকে খুঁজচ্ছি। যা সমকালে ঘটছে তাও একদিন ইতিহাসের অংশ হবে। ছড়াকাররা এসব সমকালীন বিষয়কে লিখে রাখছেন তাঁদের ছন্দের তালে তালে। সাতচল্লিশের পরবর্তী সময় থেকে আমাদের রাজনৈতিক ছড়ার যাত্রা শুরু। এরপর ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০’র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব ঘটনা এখনো ঝল ঝল করছে আমাদের ছড়ার মাঝে। তাই ছড়ার সমকালীন ধারাটি যেন ইতিহাসকেই ধারণ করে। এসব ছড়া শিশুদের ভালো লাগলেও তা কখনোই শিশুসাহিত্য নয়।

কবিতা বলতে আমরা বড়দের লেখা, আর ছড়া বলতে নাবালকদের লেখা বলে চালিয়ে দেয়ার যে মানসিকতা আমাদের তৈরি হয়েছে তা ভাঙার সময় এখনই। আবার অনেক সময় দেখা যায় ছড়াকারদের কবি বলে ডাকা, তাঁদের ছড়াকে কবিতা বলার মত অবহেলাও করা হয়। অনেক সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছড়াকে সাহিত্যের অংশই নয় বলে মনে করে সাহিত্যপাতায় তার স্থান হয় না। ছড়ার স্থান যেন শুধুই শিশুসাহিত্য পাতায়। এমনকি অনেক সম্পাদক তাঁদের পাতায় ছড়া ছাপানো হয় না সাফ জানিয়ে দেন।

বাংলা একাডেমিও হয়ত ছড়াসাহিত্যের প্রতি উদাসীন। কারণ তা না হলে কখনোই ছড়াকে শিশুসাহিত্যের অংশ বলে পুরস্কার দিত না। তাছাড়া বাংলা একাডেমি কখনো ছড়াকারদের বই প্রকাশ করে না। আমরা যারা ছড়াচর্চা করি তারা চাই ছড়াকে যেন একটি আলাদা বিভাগ করে মূল্যায়ন করা হয়। ছড়া শুধুমাত্র শিশুদের জন্য নয়। ছড়ার আবেদন সমাজের সব বয়সী মানুষের।ছড়া সমাজকে ধারণ করে, ইতিহাসকে লালন করে। ছড়ার পরতে পরতে, ছন্দে ছন্দে মিশে থাকে এক আবেদন, পরিবর্তনের সুর। ছড়াসাহিত্য তার নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠিত হোক, তার কলঙ্ক হোক গলার হার।