সাহিত্য নিরলস সাধনার বিষয়। সংগীত, অভিনয় ইত্যাদিও অনুশীলনের ক্ষেত্র তবে, এদুু’টি শাখা সরব। মঞ্চে ও মিডিয়ায় অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি এবং নিজেদের ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ থাকে। ফলে তাদের পরিচিতি গড়ে ওঠে সহজেই। কিন্তু সাহিত্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
লেখককে একা একা চর্চা করতে হয়। নিভৃতে আপন সৃষ্টিকর্ম খাতা কলমে প্রকাশ করতে হয়। এখানে হৈচৈ-ডামাডোলে ভেসে যাওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না। ফলে, কবি-সাহিত্যিকের কাজগুলি পাঠকদের মনোলোক আলোড়িত করলেও পাঠকের কাছে তার প্রত্যক্ষ পরিচিতি সেভাবে গড়ে ওঠে না।
অবশ্য, ইদানীং টেলিমিডিয়ার বিকাশের ফলে টকশো এবং নানা অনুষ্ঠানাদিতে একশ্রেণির লেখক নিজেদের সৃষ্টির চাইতে নিজের প্রচারেই বেশি উৎসাহী। এতে অবশ্য তারা লাভবানও হন- তাদের মিডিয়াপরিচিতি লেখকপরিচিতি দ্রুত পাঠকমহলে ছড়িয়ে পড়ছে।
না, সবাই নয়, হয়তো অনেকেই। যারা সে সুযোগ বা সৌভাগ্য অর্জন করেন তারাই।
তবে, এমন লেখকও আছেন যাদের মধ্যে মিডিয়াভীতি বা নিজেকে প্রকাশের অনীহা কাজ করে। এমন লেখকের সংখ্যা আমাদের সমাজে কমই। এমনই একজন সৎ ও নিরলস সাহিত্যসাধক সাজজাদ হোসাইন খান।
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের শেষার্ধে দেশের পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখালেখি প্রকাশ পেতে থাকে, তবে সাতের দশকে তিনি নিরলসভাবে লিখতে শুরু করেন।
নানা বিষয়ে লিখলেও শিশু-সাহিত্যের সবুজ-পেলব-আলোকিত উঠোনেই তার বিনম্র বিচরণ।
না, লেখার জন্য লেখা নয়। রাতারাতি নিজেকে প্রকাশের আকাঙ্খাও তার মধ্যে দেখা যায়নি, এবং প্রচারের ডামাডোলে ভাসতেও চাননি কোনোদিন- এজন্য তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাহ্যিকভাবে না ছড়িয়ে পাঠকের অন্তর্লোকে স্থান করে নিয়েছে।
আমি নিজেও তাঁর একজন ভক্ত পাঠক। সাতের দশকের রৌদ্রকরোজ্জ্বল প্রভাত থেকেই তার স্নিগ্ধ সোনালি শব্দ-ভাবনার ছড়া-পদ্যগুলি আমাকে আবেগাপ্লুত করে চলেছে। বস্তুত, ব্যক্তি সাজজাদ হোসাইন খান আর লেখক সাজজাদ হোসাইন খানের মধ্যে কোনো পৃথকতা নেই। তাঁর সাথে পরিচয় সেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে। এতোটা সময় তাঁর সাথে সম্পর্ক অথচ কখনোই তাঁকে উদ্ধত,
উচ্চকিত দেখিনি। তাঁর আচরণ অনেকটা শরতের শিশির-স্নিগ্ধ প্রকৃতির মতো। মৃদু-মন্দ তাঁর বিচরণ। হাসি-আনন্দ এবং বেদনা প্রকাশেও এক ধরনের বিনম্র অভিব্যক্তি।
হ্যাঁ, কবি, শিশু-সাহিত্যিক, ছড়াকার ইত্যাদি যে কোনো নামেই তাকে অভিষিক্ত করিনা কেন- তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিক্ষেত্রেই বিনম্র-বোধের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়।
তিনি আমাদের শিশুর ভাবনাকে কখনোই মেকি কথার ভারে পথচ্যুৎ করেননি। যা সত্য, যা সুন্দর, যা ভালো, সৎ এবং নির্মল ও শোভনীয় তেমনটিই তিনি তার সৃষ্টিতে প্রকাশ করেছেন।
তিনি শিশুকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছেন কিন্তু উদ্ধত-উদ্ভিন্ন করেননি। আমাদের মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, মৃত্তিকা, মায়াবী প্রকৃতি এবং মানবিক প্রসঙ্গ তাঁর শিশুতোষ কবিতায় নানাভাবে এসেছে।
একঘেয়ে-সাদামাটা ভাবনা বা পূর্বসুরির চিন্তা বা কথাকল্পনার পুনরাবৃত্তি তাঁর ছড়া-কবিতায় দেখিনি। পাশাপাশি অনেক গভীর ও বিস্তৃত ইতিহাস-তথ্যও তার শিশুতোষ সৃষ্টিতে সহজ প্রাঞ্জলভাবে ফুটে ওঠে। এ-রকম অসংখ্য কবিতার মধ্য থেকে একটি উদাহরণেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে-
কেমন ছিলো বঙ্গভাষা দূর অতীতে
পন্ডিতেরা ঘাটল পাতা খবর নিতে।
মিলল খবর চর্যাপদের ধূসর পাতা
আমজনতা খুলতো নাকি মনের খাতা।
কান্নাহাসির পৃষ্ঠাগুলো ছড়িয়ে দিতো
আদর সোহাগ দিয়েই তারে বক্ষে নিতো
সন্ধ্যাভাষার মন্দা বায়ে উড়তো ঘুড়ি
কাব্যকথায় লতিয়ে দিলো স্বপ্নপুরী
(ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা)
এই সুন্দর ছন্দনির্ঝর অন্ত্যমিলে কত সহজভাবে তিনি আমাদের মাতৃভাষার শেকড়সংবাদটি শিশু-কিশোর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এমনটি সাজজাদ হোসাইন খানের
পক্ষেই সম্ভব।
আগেই বলেছি, তিনি শিশু-সাহিত্যকে চাঁদের স্নিগ্ধ কিরণেই রাখতে চেয়েছেন, সূর্যের প্রখর তাপে তাকে ঝলসে দেননি।
‘নীল সবুজের হাট’ এবং ‘মেঘের খামে চুমকিদানা’ তার দুটি মনকাড়া কিশোর
কবিতার বই।
এছাড়া ছড়াসমগ্র তাঁর এযাবতকাল প্রকাশিত ছড়া-কবিতার সংকলন। ‘সোনালী শাহজাদা’ তাঁর অসাধারণ একটি গদ্যগ্রন্থ। ‘স্বৈরাচারের ঐরাবত’ একটি সমাজ-মনস্কার ছড়ার বই। অবশ্য, সাজজাদ হোসাইন খানের এ বইটি তাঁর নাগরিক ভাবনার প্রকাশ।
আমাদের প্রিয় শিশু-সাহিত্যিক সাজজাদ হোসাইন খানের জন্ম ১৬ মে ১৯৪৮।
তাঁর শুভ জন্মদিনে প্রার্থনা তিনি আরো অনেক অনেক বছর, অনেক অনেক যুগ আমাদের শিশু-কিশোরদের মনোলোক তাঁর স্নিগ্ধ-আলোকোজ্জ্বল সৃষ্টিতে প্রদীপ্ত করে যাবেন। তাঁর জন্য আমার-আমাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। সুস্থ-নির্মল-সুন্দর সৃজনশীল সুদীর্ঘ জীবন তিনি অর্জন করুন- পরম করুণাময়ের কাছে এই কামনা শুধু।