আমার মহান বাবার নাম বীর মুক্তিযুদ্ধা আমির উদ্দীন।মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সাহেবের পিঠ চাপরানো বন্ধু।আমরা দুই ভাই এক বোন।আমি সবার বড়। ছোট বোন আসমা ক্লাস ফোরে।ছোট ভাই আফসর তিন ক্লাস পড়ে দুই বছর থেকে বেকার। পরিবারের আমিই একমাত্র রোজগার।বাবা নেই। নেই বলতে যা বুঝেছেন তা নয়। কোনো এক অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে আমাদের সাথে নেই। জীবিত আছেন। তাগড়া শরীর নিয়ে মাটি কামলা খাটেন।
লেগুনার কন্ট্রাকটরের চাকুরি আমার মা-ই আমাকে ধরিয়ে দিয়েছেন। প্রথম দিন এক থাপ্পড় ছাড়া ভালোই কেটেছে। প্রতিদিন ত্রিশ পঁয়ত্রিশ টাকা ইনকাম মন্দ না।সকাল আট টা থেকে রাত আট টা পর্যন্ত নিরন্তর ডিউটি। দুপুরে হোটেলের কী মজাদার খাবার। কোনোদিন ডাল,কোনোদিন সবজি,কোনোদিন ডিম। মাঝে মাঝে মাছভাতও খাই। এভাবে চলতে চলতে একদিন আমিও ড্রাইভার বনে গেলাম। ওস্তাদজীর স্নেহছায়াও আমার উপর বাড়তে লাগলো। প্রতিদিন গাড়ি বের করি আমি। সারাদিন টিভ দিয়ে ইনকাম করে রাতে ওস্তাদজীর জুয়ার আসরে টাকাগুলো সমজিয়ে পকেট ভারি করে মনানন্দে বাড়ি ফিরি। মা প্রচণ্ড খুশি। খুশি পাড়াপড়শি। আমাদের জয় এখন ড্রাইভার। ভালো ইনকাম। চাল-ডালের অভাব নেই। বড় বড় মাছ তরিতরকারি আনতে পারি, পারি আমারমতো অসহায় অনাতদের হাতে দিতে কিছু টাকা।
২০০৭ সাল।আমি এখন সিএনজি ড্রাইভার। সমাজের এলিট শ্রেণীর সবার কাছে আমার মুবাইল নাম্বার। আমি এখন ভীষণ ব্যস্থ মানুষ।সবাই ভালোবাসে।বাবার কাছে যাই। সাধ্যমতো সহযোগিতা করি। বাবাকে মাটির কাজ ছেড়ে দিতে বলি। বাবা পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। এ কান্না শোকের নয় সুখের।
প্রেম ভালোবাসা মানুষের জীবনে একসময় আসে। আমিও গুণবতী এক নারীর প্রেমে পড়ি।
সপ্তাহে একবার সিএনজির ইনকাম দিতে হতো।বাজারেও দেওয়া যেতে পারতো। কিনতু আমি বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসতাম। বন্ধুর পথ।কষ্ট হতো। তবুও যেতাম। বিস্কুট, পান, জর্দা থাকতো পুরো সপ্তাহের। যদিও এসবে লোভ ছিলো না তাদের। তবুও নিতাম। যত বেশি নিতাম তত বেশি ভালোলাগতো। একসময় প্রেম হলো স্থায়ী। বেচারি আমাকে বিশ্বাস করলেন। একটা মুবাইল কিনে দিলাম। ফোনে ফোনে কেটে যায় বেলা। এভাবে চলল প্রায় সাড়ে তিন বছর। আমার প্রেমিকা তখন বাইশ পারা কুরআনের হাফেজা। আমি আর পারছি না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। কাছে পাওয়ার সুখানুভূতি বারবার তাড়া করছে। তাকে বললাম, এভাবে আর কতো? ফোনে ফোনে কথা ভাল্লাগে না। সে উত্তর দিল, ভালো। আমিতো এটাই চাই। আপনার মুবাইল নিয়ে নিয়েন। আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন করতে পারছি না। আমার পড়ারও খুব ক্ষতি হচ্ছে। এতোদিনে আমার হিফজ শেষ করার কথা। ফোনের যন্ত্রনায় পারছি না। আমাকে মুক্তি দিন প্লিজ। আমিতো হতবাক। আমি কি বলি আর বেহেলা কি বলে?রাগ চরমে উঠে গেছে। সংযত হয়ে বলি, তোমার কান ঠিক আছে তো? না। আমার কান ঠিক নাই। তিন-চার বছর নিরন্তর ফোন করে কার কান ঠিক থাকে বলুন? আমি আর পারছি না। প্লিজ আমাকে মুক্তি দিন। আমি প্রেম-ট্রেম বুঝি না। হুজুরগণ আমার প্রতি বিরক্ত। আমি নিয়মিত পড়া শিখে যেতে পারি না। মাদরাসার সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তিত। এতো ভালো ছাত্রী এই অবস্থা কেন? চিৎকার দিয়ে ফোন রেখে দিই। সারারাত ঘুমহীন কাটে।ফোন নিজেও দিই না, তাঁর কাছ থেকেও আসে না।
সৌভাগ্য আমার। পরদিন সুলতানে সিলেট হযরত শাহজালাল র.এর মাজারে আমার টিভ। নিয়ে গেলাম। মাজারের গেটে নামিয়ে দিয়ে তাঁদের কতো সময় লাগতে পারে বলতেই সাহেব বললেন, নূন্যতম তিন চার ঘন্টাতো লাগবেই। জিয়ারত শেষে শিরনি বিতরণ করে আরো কিছু কাজ আছে। তুমি গাড়ি কোথাও রেখে হোটেল একটা বুকিং করে রেস্ট নাও। কিছু টাকা নিয়ে সালাম দিয়ে গাড়ী স্টার্ট দিই। পার্কিংয়ে রেখে চলে আসি মাজার মসজিদে। জুহরের নামাজ পড়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করি প্রভূর দরবারে। দোয়া শেষে শাহজালাল র.এর কবরের পাশে গিয়ে নিথর হয়ে বসে পড়ি। চোখের পানি মানছে না কোন বাঁধ।হাজার হাজার মানুষ। কে কোন বেদনা নিয়ে আসছে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
মনেপড়ে জাকারিয়া নবির গল্প।হযরত জাকারিয়া আ. একজন নবি।হযরত দাউদ ও সুলায়মান আ.এর বংশধর। তিনি ছিলেন হযরত মারইয়াম বিনতে ইমরানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। জীবনসন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান। জীবনের সব সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেও সন্তানের জন্য কোনো দোয়া করতে পারেননি বা করেননি লজ্জায়।
বায়তুল মুকাদ্দাসের যে কক্ষে মারইয়াম আ. থাকতেন, সে কক্ষে যাকারিয়া আ. যখনই যেতেন, দেখতেন ভিন্ন মৌসুমের পর্যাপ্ত ফল মারইয়ামের পাশে মওজুদ রয়েছে। এটি ছিল আওলিয়াদের কারামতের একটি নিদর্শন। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে মারইয়াম, এসব তুমি কোথায় পেলে? তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “আল্লাহর নিকট হতে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান করেন”। তখন হযরত যাকারিয়ার অন্তরে এ কথার উদয় হল যে, যে সত্তা মারইয়ামকে ভিন্ন মৌসুমের ফল দান করছেন, তিনি আমাকে এই বৃদ্ধ বয়সে সন্তানও দান করতে পারেন। সেখানেই যাকারিয়া আ. তাঁর পালনকর্তার নিকট প্রার্থনা করলেন, “হে আমার পালনকর্তা, আপনার নিকট থেকে আমাকে পূত পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী”।
“হে আমার প্রতিপালক, তোমাকে আহ্বান করে আমি কখনও ব্যৰ্থ হইনি। আমি আশংকা করি আমার পর আমার স্বগোত্রীয়দের সম্পর্কে। আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। সুতরাং তুমি তোমার নিকট হতে আমাকে দান কর উত্তরাধিকারী। যে আমার উত্তরাধিকারিত্ব করবে এবং উত্তরাধিকারিত্ব করবে ইয়াকুবের বংশের এবং হে আমার প্রতিপালক, তাকে করো সন্তোষভাজনক”।
আল্লাহ পাক জাকারিয়া আলাইহিস সালাম এর দোয়া কবুল করলেন। ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামকে দিয়ে তাঁর বংশের সিলসিলা জারি রাখলেন। জাকারিয়া নবির মতো ওয়াসিলা নিয়ে আমিও প্রার্থনা শুরু করি। নিথর নিস্তব্ধ হয়ে কাঁদি। সমস্থ শরীরে প্রশান্তি ভাব চলে আসে। প্রার্থনায় মন ভালো হয়।হৃদয় শান্ত হয়। যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর হয়।
মনে হচ্ছে আমার যেন কিছুই হয়নি। কিচ্ছু হারাইনি।সব আগের মতো ঠিকঠাক। প্রফুল্ল মনে নিচে নেমে আসি। রেস্টুরেন্টে ঢুকে ইচ্ছামতো খাই। খুশিমনে বাড়িতে আসি। হরেকরকমের ফল দেখে ছোটবোন বেজায় খুশি। হাতমুখ ধুয়ে রাতের খাবার খেয়ে আম্মার কাছে টাকা দিয়ে মালিকের বাড়ি যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে বলে বেড়িয়ে পড়ি। রাত এগারোটায় তাদের বাড়ি পৌঁছি।আমার মালকিন দরজা খুলে দিলেন। সালাম দিয়ে ফলের ব্যাগ উনার হাতে দিই। আশ্চর্য হয়ে উনি বললেন আজ কেন বাবা? সপ্তাহ পুরো হবার তো আরো দুদিন বাকি। এতো ফলমূল কেন? না, খালাম্মা। আজ হযরত শাহজালালের মাজারে গিয়েছিলাম। এই পাঁচদিনে খুব ভালো রুজি হয়েছে। তাই ভাবলাম আপনার জন্য আর সারার জন্য কিছু ফল নিই।সারাতো আমারই বোনের মতো। তাই আম্মাকে বলে আপনাদের জন্য ফল নিয়ে আসা। আম্মা খুশি হয়েছেন।
সারা কোথায়? পড়াশোনা কেমন চলছে?
ভালো চলছে বাবা। আজ কিছুটা অসুস্থ। মাদ্রাসায় যেতে পারেনি।আমরা তোমার কথা ভাবছিলাম। এইমাত্র চা খেয়েছি। তুমি চা খাবে না ভাত?
না খালাম্মা। বাড়িতে ভাত খেয়ে আসছি। চা খাবো।
চা পান করে করে মনের সমস্থ আবেগ ঢেলে আলোচনা করছি। খালাম্মা পুরোপুরি আবেগাপ্লুত। আমারমতো ছেলেই হয় না।এতো সুন্দর গোছানো কথাবার্তা। কথায় কথায় ছন্দের ফুলঝুরি। শিক্ষিত- ভদ্র, মার্জিত, পরোপোকারি, দেশপ্রেমিক। প্রশংসা শুনতে অব্যস্থ না হওয়ায় লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। বলি, খালাম্মা আমি এক চিরদুঃখি মানুষ। এতো প্রশংসা আমাকে মানায় না। আজ ওঠা যাক।আপনারা ঘুমুন। ভাই বাড়িতে আসলে আমার সালাম দিবেন। দুদিন পর তো আসছি-ই। দেখা হবে।
বাড়িতে এসে আম্মাকে আমার মনের সম্পূর্ণ লুকানো কথা বলি।আম্মা ভীষণ ক্ষেপে যান। পরদিন মামাকে সবকথা বলে দেন। আমার তেজোদীপ্ত মামা রেগেমেগে আগুন। দুপুরে মামার ফোন। ভয়ে ভয়ে ফোন ধরতেই হুংকার। তুই কই?বাড়িতে আস। লাইন কাটা। বাড়িতে যাই। আঙিনায় যেতে না যেতেই মামার হাত আমার ঘাড়ে। কিছু বলার আগেই কিল- ঘুষি, লাথি-মুখর। মারতে মারতে ভাই -বোন ক্লান্ত। আমিতো নির্বাক পাথর।
লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছে। অনেকক্ষণ বসে রইলাম।বসতে বসতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছি মনেই নেই। রাত আটটার দিকে ঘুম ভাঙলে সারা শরীরে ব্যথা অনুভব করি। দৌড়িয়ে ঘর থেকে বের হই। গাড়িতে গিয়ে ঠিকঠাক আছে দেখে দুঃখের মাঝেও হালকা সুখ অনুভব করি। প্রেমিকার বাড়ির গাড়ি বলে কথা। ফার্মেসি থেকে কিছু ঔষধ নিয়ে বন্ধু দূর্জয়কে ফোন দিই।তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে হালকা নাস্তা সেরে ঔষধগুলো সেবন করে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলি। সে সান্ত্বনা দেয়। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই যার জন্য এতো মার খেলাম, তাকে আমি বিয়ে করবোই।যেমন কথা তেমন কাজ। সপ্তাহের মধ্যেই সারাকে নিয়ে আসি।
বিপদ যখন আসে তখন চৌদিক থেকেই আসে। চাকরি নাই। থাকার জায়গা নাই। এদিকে আমার শাশুড়িকে উনার ছেলে ঘরের বাহির করেছে। উনিও আমার সাথে। যেখানে আমার থাকার জায়গা নেই, সেখানে আরো দুইজনকে কোথায় রাখি?এদিকে আব্বাও এসেছেন। জমানো টাকাগুলোও আম্মার কাছে। ভীষণ বিপদ। দূর্জয়রও তো পরিবার আছে। তার মা বাবা কতোদিন এভাবে থাকতে দিবেন। বাবা ছেলে বসে সিদ্ধান্ত নিই আলাদা একটি বাসা নেবো।আব্বা পকেট থেকে দুই হাজার টাকা বের করে দিয়ে বললেন, রাখো। টুকটাক খরছ করো।যেহেতু আমার সাথে যাবে না সেহেতু আজই একটা গাড়ি নাও। আমি রাতের গাড়িতে চলে যাবো।আগামিকাল আমাদের ইউএনও মহোদয়ের সাথে একটা মিটিং আছে। মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার হিসাবে আমাকে থাকতেই হবে।
এতোবড় কাজ ভেবে চিন্তে সময় নিয়ে করা উচিত ছিলো। মায়ের রাগ পড়লে এমনিই তোমাকে ডাকবে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমি যেতাম। কিচ্ছু করার নাই আমার। আমি ব্যর্থ।আল্লাহ তোমার সাহায্যকারী হোন।
আব্বা চলে গেলেন। আমি আবারও একা হলাম।আমাকে কেউ গাড়ি দেবে না।সবার সাফ কথা। তোমার মামা না বললে গাড়ি দিতে পারবো না। আমি বুঝে গেলাম। মামার কড়া নিষেধ, তাই কেউ গাড়ি দিয়ে ঝামেলায় জড়াতে চাইবে না। রাতে দু’জন মিলে সিদ্ধান্ত নিই এখানে আর থাকবো না। ঢাকা চলে যাবো।আমার সরল সহজ শাশুড়ি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। উনার হাতে টাকা ছিলো হাজার পাঁচেক।আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো দিয়ে দেখো ছোটোখাটো কিছু করা যায় কি না। উনাকে বুঝালাম, দেখুন মামার রাগ না কমা পর্যন্ত এই এলাকার কেউ আমাকে স্থান দেবে না। বরং ঢাকা গেলে আমরা ভালো থাকবো। সেখানে আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আছে।একটা কিছু হবে ইনশাআল্লাহ। উনি রাজি হলেন। পরদিন আমরা ঢাকা। বস্তিতে থাকি। কাজ খুঁজি। কাজ তো মেলে না।নিরুপায় হয়ে রিকশা নিই।পারি না। তবুও চালাই। এভাবে আর পারছি না। একদিন আমার এক বড়ভাই ফোন দিলেন, তুমি কোথায়? প্রান্থপথ আসো। গাড়ি পেয়েছি। গেলাম। পরিচয় পর্ব শেষে চাকরি হলো এবং এই মুহূর্তেই যেতে হবে শরিয়তপুর। আমিতো কাঁপছি। সিএনজি, লেগুনা ব্যতিত কোনো প্রকারের গাড়ি চালাবো তো দূরে থাক ছুঁয়েও দেখিনি কোনোদিন। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বিসমিল্লা হির রাহমানির রাহীম বলে এক্স করোলায় উঠি।ভাই একটু দেখিয়ে দিলেন, স্ট্রাট দিয়ে বন্ধ করি। গাড়ি থেকে নেমে ভাইকে বলি পারবো ইনশাআল্লাহ।
এডভান্স ৫০০ টাকা নিয়ে প্রথমেই বউকে ফোন দিই আমার চাকরি হয়েছে। ৫০০টাকা বিকাশ করছি উঠায়ে নিও। এক দুই পেকেট বিস্কুট এনে বস্তির বাচ্চাদের হাতে তুলে দিও। আমি অনেক দূরে যাচ্ছি নামাজ পড়ে দোয়া করিও। ফিরতে দেরি হবে।
শরিয়তপুরের জাজিরা উপজেলা ঘুরে রাত ১০ টায় ঢাকা পৌঁছি। আল্লাহর রহমতে আমি পারছি। এতো এতো বিপদসঙ্কুল রাস্তা হওয়ার পরও কোনো সমস্যা হয়নি। রাত এগারোটায় বস্তিতে গিয়ে সালাম দিয়ে ঘরে ঢুকি। দিনের সম্পূর্ণ গঠনা বর্ণনা করি। বউ খুশি, খুশি আমার শাশুড়িও। এতোদিন পরে একটা সম্মানজনক পেশা পেয়ে আমিও খুশি।
আমাদের মেয়ে হলো।বাড়ির সবার সাথে মোটামুটি সম্পর্ক জোড়া লাগলো।শাশুড়ি বাড়িতে গেলেন। আম্মার সাথে যোগাযোগ বাড়লো। ছোটভাইকে ড্রাইভারি শেখাই।বোনকে বিয়ে দিই। আব্বাকেও দেখি।চারদিকে সুখ আর সুখ। আবার জয়ের জয় জয়কার। আবার মানুষের কলকাকলিতে ভরে উঠেছে আমার হৃদয়ের সমস্থ উঠোন।
এ সুখও বেশিদিন স্থায়ী হলো না। পাঁচ বছরে ডিসি, এসপি, রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী অনেক রতি মহারতিদের গাড়ি চালিয়েছি।সবার সাথে এখনো ভালো সম্পর্ক আছে। কেউ তাড়িয়ে দেননি। বরং আমিই চাকরি ছেড়ে এসেছি। শেষদিকে আবার চাকরি নেই। বাংলা একাডেমির পরিচালক রাহিমা আক্তারকে জানাই খালাম্মা, কয়েকদিন হলো আমি বেকার। আমার জন্য একটা চাকরি দেখেন। উনার একবন্ধু মিঞা মুহাম্মদ কুতুবুর রহমান এডিশনাল এসপিকে ফোন দিয়ে সাথে সাথেই চাকরির ব্যবস্থা করলেন।মৌলভীবাজারি মানুষ। সিলেটি ড্রাইভার পেয়ে তারাও যেন চাঁদ হাতে পেলেন।স্যার ও ম্যাডাম খুব আদর করতেন। স্যারের বদলি জনিত কারণে একবছর পর এখানেও শেষ। চাকরি ছাড়া তিন মাস। শূণ্য। এদিকে বউ প্যগন্যান্ট। চলে আসি নিজ এলাকায়। বাসায় উঠি।ঘরে চাল ডাল কিছুই নেই। গাড়ি পেয়েও যেতে পারছি না।বউয়ের সমস্যা। রাত গভীর।আম্মাকে নিলাম। আল্লাহপাকের অপার মহিমায় এক ছেলে হলো। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেজদায় লুটিয়ে পড়ে মনমতো কাঁদলাম।মন কিছুটা হাল্কা হলো। ফজরের নামাজ পর বন্ধু দূর্জয়কে ফোন দিই। সে আসে। তার গাড়ি চালাই।চাল-ডাল ঔষধপথ্য কিনে বিকেলে ঘরে ফিরি। পরদিন আম্মা, মামানি ও মামাতো ভাই এসে আমার বউ বাচ্চাকে নিয়ে গেলেন চিরচেনা সেই জন্মভিটা মামার বাড়ি। আজ আমি তিন সন্তানের জনক।আমার মা যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযুদ্ধার গর্বিত স্ত্রী।আমার ভাই বিয়ের উপযোগী। বিয়ে পাচ্ছে না বা কেউ দিচ্ছে না! কারণ আমাদের নিজস্ব কোনো ভিটা নেই।
ছেলেমেয়ের পড়া লেখার জন্য আমি এখনো ভাড়াটিয়া থাকি। আমার বড় মেয়ে প্রায়ই প্রশ্ন করে, আব্বু আমাদের বাড়ি নেই কেন?
বি.দ্র.(সত্য ঘটনা অবলম্বনে।)