বিজয় দিবস নেই এমন দেশের পরিমাণ পৃথিবীতে খুবই অল্প। মানুষ যেমন জন্মগতভাবে স্বাধীন তেমনি পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল বা ভূখণ্ডও স্বাধীন। অর্থাৎ প্রতিটি অঞ্চল বা ভূখণ্ডের অধিবাসীরা স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার সর্বধর্মকর্তৃক স্বীকৃত। তথাপিও বিশেষ বা শক্তিধর কোনো জনগোষ্ঠী যখন অন্য কোনো জাতি, বর্ণ বা ভূখণ্ডের উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের খড়গ নিরীহ জনগণের উপড় উঁচিয়ে ধরে তখনই প্রশ্ন ওঠে স্বাধীনতার। ফুসে ওঠে নির্যাতিত জনগণ। ফলশ্রুতি অনিবার্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত। পরিশেষে জালেমের উপর মাজলুমের বিজয়। পরাধীনতার শৃঙ্খল অপসারণ। যার আরেক নাম “স্বাধীনতা”। প্রতিটি দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আত্মত্যাগের, আত্মমর্যাদার এবং আনন্দের।
স্বাধীনতা যুদ্ধের ধর্মীয় গুরুত্ব যুদ্ধ ছাড়া স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস খুবই বিরল। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সকল দিক থেকেই স্বাধীনতাযুদ্ধ নিশ্চয়ই সম্মানের। মর্যাদার। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ স্বাধীনতা যুদ্ধের গুরুত্ব কতোটুকু? ইসলামে যুদ্ধের স্বীকৃতি রয়েছে। ইসলাম যে সকল যুদ্ধকে বৈধ ঘোষণা করে, পূন্যের কাজ মনে করে স্বাধীনতার যুদ্ধ তার মধ্যে পড়ে না। বরং এমন যুদ্ধ যা বর্ণ, অঞ্চল কিংবা উদ্দেশ্যহীনভাবে পরিচালিত হয় তাকে ইসলাম যুদ্ধ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না। তবে জালেমের বিরুদ্ধে মাজলুমের যুদ্ধ, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের যুদ্ধ অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণ। ইসলামে এর যথাযথ স্বীকৃতি রয়েছে। এর ততোধিক গুরুত্ব, মর্যাদা ও ফজিলত হাদীসে সুস্পষ্টরূপে বিধৃত রয়েছে। হাদিস শরিফে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হয়েছে জালেম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম যুদ্ধ। এ দিক থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ইতিহাস এবং ইসলাম উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে যথাযথ গুরুত্বের দাবিদার। কারণ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত শাসক গোষ্ঠীর নির্যাতনের প্রতিবাদ। ভাষার অধিকার হরণ, মত প্রকাশের অধিকার হরণ, মানবাধিকার হরণ ইত্যাদিসহ নানাবিধ জুলুম ও নির্যাতনের প্রতিবাদে যে সংগ্রাম তাই মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করে। সুতরাং বলা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধর্মীয় গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশী। যেহেতু এটি ছিলো জালেমের বিরুদ্ধে মাজলুমের যুদ্ধ, শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের যুদ্ধ।
পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই কিছু স্বতন্ত্র অনবদ্য বাংলাদেশেরও এমন কিছু মর্যাদার স্বীকৃতি রয়েছে। যেমন বাংলাদেশের মাতৃভাষা দিবস রয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোনো দেশের নেই। ভাষার জন্য রক্তদান বাঙালির এক অনুপম নজির বটে। অনুরূপভাবে সকলদেশেরই জাতীয় দিবস থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের একই সাথে দু’টি দিবস রয়েছে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস। আমাদের জানা মতে পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এমনটি নেই। এটিও নিশ্চয়ই আমাদের স্বাতন্ত্রতা।
ইসলামে দিবস উদযাপন: বিশ্বের সর্বত্র নানা উপলক্ষকে সামনে রেখে নানান দিবস উদযাপন করা হয়ে থাকে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এসব দিবসের আয়োজন ও উদযাপন করা হয়ে থাকে। বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এ প্রশ্নের উদয় অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, এর ধর্মীয় ব্যাখ্যা কী? এ প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে আমরা বিদ্বিষ্ট ইসলামী বিশেষজ্ঞ পন্ডিতদের দরবারে ধর্ণা দিলে সেখান থেকে যা পাওয়া যায় তা অনেকটা এরূপ।
একদল ইসলামী পণ্ডিত মনে করেন- ইসলামে বিজয় দিবস বা এমন কোনো দিবস পালনের যৌক্তিকতা নেই। কারণ ইসলামের এতে কোনো কল্যাণ সাধন হয় না। তারা মনে করেন- মহানবী স. মদিনায় হিজরতের পর সেখানে কোনো কোনো বিশেষ দিবস পালনের রীতি লক্ষ্য করেন। রাসূল স. তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। তারা জানায় যে আগে থেকেই তারা এ দু’টি দিবস পালন করে আসছে। মহানবী স. বলেন- আল্লাহ তাদেরকে এর চেয়েও ভাল দু’টি দিবস উপহার দিয়েছেন যা তারা উদযাপন করতে পারে। তাহলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসলামে এমন দিবস পালনের কোনো সুযোগ নেই। অন্তত ধর্মীয় দিক থেকে।
আরেকদল পণ্ডিত মনে করেন এসব দিবস পালন অপসংস্কৃতির অংশ। কারণ তদানীন্তন পারস্য সমাজে নাওরোজ বা নববর্ষ উদযাপন করা হতো। ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম ইবনু তাইমিয়া সহ প্রায় সকল ইমামই এটিকে শরিয়তসিদ্ধ মনে করেন নি। তবে শরিয়তসিদ্ধ মনে না করার কিংবা তাকে অপসংস্কৃতির অংশ মনে করার কারণ কী? বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে। যথার্থ গবেষণায় প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হবে।
এখানে একটি বিষয় সর্তকতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা জরুরী যে, ইসলামে বিজয়ের ইতিহাস অনেক এবং অসংখ্য। অনেক বড়ো বড়ো বিজয়ের র্কীতি গাথায় ইসলামের ইতিহাস ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ। এ ক্ষেত্রে আমরা ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় ও কুরআন স্বীকৃত হুদাবিয়ার সন্ধির মতো মহান বিজয়ের কথা উল্লেখ করতে পারি। শুধু তাই নয় উপর্যুক্ত দু’বিজয়ের ধারাবাহিকতায় আরো অনেক বিজয়ের সূচনা করেছে মুসলমানরা তৎপরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে। তবে উল্লেখিত বিজয়ের দিন ক্ষণ হিসেব করে ঘটা করে উদযাপনের কোনো বর্ণনা আমাদের জানা নেই। আজকের পৃথিবীর বিজয় দিবস উদযাপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের বিজয় উদযাপন যথাযথ গুরুত্বের দাবি রাখে বৈকি। বিশেষত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশে বিজয় দিবস উদযাপনের গুরুত্ব ততোধিক। আমরা মনে করি ইসলামপ্রিয় জনগণই সর্বাধিক দেশপ্রেমিক হয়ে থাকে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে তারাই সর্বাধিক তৎপর থাকে। সেজন্য বাংলাদেশের বিজয় দিবস উদযাপনে দেশের তৌহিদি জনতা দেশপ্রেমিক বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে।
ইসলামি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী জনগণ বিজয় দিবসে যে সব আনুষ্ঠানিকতা করতে পারে:
১. দেশরক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের জন্য দোয়া করা। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা।
২. দেশরক্ষার যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের বীরোচিত আলোচনায় সভা অনুষ্ঠান করা।
৩. দেশের স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
৪. শহিদানদের জন্য কুরানখানি করা।
৫. বেশি বেশি দান সাদাকা করা।
৬. দেশপ্রেম সৃষ্টি হয় এমন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
৭. ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে দেশ বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
৮. দেশগান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।
৯. দেশরক্ষায় শহিদদের অবদান, আমাদের করণীয়, ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিঁ ইত্যাদি বিষয়ে ডকুমেন্টরি প্রকাশ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
১০. এছাড়াও দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগ্রত করে এমন যে কোনো ইতিবাচক কর্মসূচী পালন করা যেতে পারে।
বিজয়ের মাসের প্রাক্কালে বিজয় দিবসের আলোচনার শেষে এসে আমরা বলতে পারি, বিজয় দিবস উদযাপন ইসলামে নেই। এটি বিজাতীয় সাংস্কৃতির অংশ। এর কোনো ফায়দা নেই এ সব কথা বলে ইসলামী দাওয়াহ ও সম্প্রসারণের মূল্যবান সুযোগ হাতছাড়া করা নিতান্তই বোকামী। বরং বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানটি ইসলামিকরণের মাধ্যমে দেশ জনতার মাঝে ইসলামকে প্রিয় করে তোলা ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ গ্রহণ করা ইসলাম প্রিয় জনগণের একান্ত কর্তব্য বলে মনে করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবশ্যই এ দেশের স্বাধীনতাকে দীর্ঘায়িত করবেন। বিজয়কে সুসংহত করবেন। ইসলামের গোড়া পত্তন ক্রমশ মজবুত করবেন। সে প্রার্থনা সর্বক্ষণের।

লেখক:
সহযোগী অধ্যাপক, আরবী বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।