‘অনেক সময় পাড়ি দিয়ে আমি অবশেষে কোন এক বলয়িত পথে
মানুষের হৃদয়ের প্রীতির মতন এক বিভা
দেখেছি রাত্রির রঙে বিভাসিত হয়ে থেকে আপনার প্রাণের প্রতিভা
বিচ্ছুরিত করে দেয় সঙ্গীতের মত কণ্ঠস্বরে।’
(রবীন্দ্রনাথ : জীবনানন্দ দাশ)

জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রনাথের আচ্ছন্ন কুহক, ছায়া কু-বাতাস নিরালোকে সঞ্চারিত হতে দেখেছেন। জড়ত্বের ভেতর সেই প্রাণময় বিভা সর্বদা সর্বত্রগামী হয়ে এক বলয়িত পথ সৃষ্টি করে। যে বোধের দ্বারা প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র, নিজের নিজের জগৎ নির্মাণে ব্যস্ত, কেমন করে সেখানেও মর্মরিত করে দেয় এক অলীক যাপন? এই কথাটিই আজ ভাববার বিষয়। আধ্যাত্মিকতা নয়, আবেগদীপ্ত কল্পনার শিহরনও নয়, প্রেম ও শরীরী বিভাসে রোমান্টিক কোনো যাত্রাও নয়। আত্মক্ষয় ও যন্ত্রণার যুগে পোস্টমডার্ন ও বিনির্মাণে বেঁচে থাকার এক ভিন্নতর সন্ধান চলছে, তখন রবীন্দ্রনাথ অপঠিত থাকলেও কারও কিছুই যায় আসে না। দিব্যি পথ হাঁটা যায়, এগিয়ে যাওয়া যায়। চূড়ান্ত ভাঙনের কালে যে আত্মমুক্তি ও বিচ্ছিন্নতার দুর্মর গ্রাস চলছে সেখানে প্রতিটি ব্যক্তিই ছিন্নমূল (Rootlessness) । তারা শেকড় সন্ধানে যেমন ব্যস্ত, তেমনি শিল্পীর কলাকৌশলী হতে বহু দূরে। ঐতিহ্য ও পরিশীলিত পারিপাট্য ধরে রাখা তাদের কাছে সম্ভব নয়। এই কারণে রবীন্দ্রনাথকে শুধু অস্বীকারই নয়, তাঁকে না জানলেও তাঁরা অপরাধী হবেন না। এ যুগের একজন তরুণ কবির কাছে নারী যেমন ঈশ্বর, শরীরী আশ্লেষ যেমন মুক্তি, জীবিকা ও যান্ত্রিক বেঁচে থাকাই একমাত্র কাম্য, কবিতা বা সাহিত্যও সেখানে স্বচ্ছন্দ প্রকাশ। নীতি-আদর্শ বহির্ভূত এক গতিময় আত্মসন্ধান। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ‘অরূপরতন’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:
‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি
অরূপ রতন আশা করি;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর
ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয় রে এবার
ঢেউ খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,
সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে
অমর হয়ে রব মরি।’

এই ‘অরূপরতন’ খুঁজে-খুঁজে রবীন্দ্রনাথ অমরতা প্রার্থনা করে গেছেন। সংসার সমুদ্রের বাইরে যেতে চেয়ে জীবন দেবতার সন্নিধানে রবীন্দ্রনাথ সমগ্র সৃষ্টিতেই এই আকাঙ্ক্ষাটির বিস্তার ঘটিয়েছেন। এই কারণেই তাঁর সমগ্র সৃষ্টি ঊর্ধ্বমুখী জীবনের প্রশ্রয় বলা যায়। ‘একলা চলো’র ডাকটি কখনো কখনো আমাদের কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে পৌঁছায় না। কেননা আমরা তো একলাই (Aloneness), সমস্ত আবেগ ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে মেধাবী নীলিমায় বিচ্ছিন্ন আমাদের জীবনচর্যায় মেশে প্রাগৈতিহাসিক ধুলোবালি, যার ফলে সৃষ্টিতে পরিপাটি রূপটি খুঁজে পাওয়া যায় না। মূল উৎসে ফিরে যাবার ক্রিয়াটিই প্রাণধর্মকে রক্ষা করে। সুতরাং সবকিছুই কোনো ছন্দ-প্রকরণ মেনে, শব্দ-ক্রিয়ায় পারম্পর্য বজায় রেখে চলা সম্ভব হয় না। যে বিশ্বাস, যে তাৎপর্য, যে জীবন দর্শন নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে রবীন্দ্রনাথ অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন, উত্তরাধিকারে, অন্বয়ে সেই পথ আজ আর কেউ গ্রহণ করেননি। তাই পঁচিশে বৈশাখ এবং বাইশে শ্রাবণ নতুন কোনো পথের পদধ্বনিও শোনায়নি। ব্যক্তিক অনুবৃত্তেই পাক খাওয়া জীবনের ভাঙনে তলিয়ে যাওয়া এ যুগের এক তরুণ কবি লিখেছেন :
‘অগ্রাহ্য করেছি পা মেপে পা মেপে চলা
জীবনযাপন। দৃষ্টিটি হারিয়ে ফেলা
গোধূলিবেলায় অস্ত আর নৌকা দেখে
মুগ্ধ চোখে। ঘর-সংসার পিছনে রেখে
হারিয়ে যাওয়া উজান গাঙের টানে
ডুব দিই ভরসা বিহীন ২২শে শ্রাবণে।’
( মার ২২শে শ্রাবণ: অশোক ঘোড়ই)

ভরসা বিহীন বাইশে শ্রাবণ যেমন, তেমনি পঁচিশে বৈশাখও। আর সেই স্পন্দন নেই, আকাশ নেই, আশার আলো জ্বালাবার আগুনও নেই। শুধু হতাশা আর হতাশা। কেরিয়ার সর্বস্ব জীবনের দৌড়ে কোথায় রবীন্দ্রনাথ ? শুধু দেওয়ালে ক্যালেন্ডার হয়ে ঝুলতে থাকেন। পুরনো হয়ে যান। আবার নতুন বছরে ছাপানো হয়। এই ভাবেই তিনি পূজিত। সামনের অন্ধকারে মরণঝাঁপ দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় আঁধারেই আজকের তরুণকে। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়তে হয় রবীন্দ্রনাথকে। ‘আলো জ্বলবে, আলো জ্বলবে’ এই আশাতেই ছুটতে হয়, কিন্তু ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ এখনো ঘিরে থাকে। প্রাপ্তি হয় শূন্য। ‘শূন্য তালু ঝাপসা রেখা’ তবু রক্ত দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ব্যথার নৈবেদ্য সাজাতে হয়। আর তাতেই জীবনের পূজা, ব্যথার পূজা। রবীন্দ্রনাথ ‘আত্মত্রাণ’ কবিতায় লিখেছেন :
‘দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।’

অর্থাৎ ‘আত্মত্রাণ’ (গীতাঞ্জলি) এসেছে বিশ্বাসে, ঈশ্বরে এবং ভরসায়; কিন্তু আজকে কি আত্মত্রাণ আছে? ভরসা, বিশ্বাস, ঈশ্বর কোনো কিছু আছে? এক চরম সংশয়, অবিশ্বাস, চূড়ান্ত ধ্বংস নিয়ে আমরা বসবাস করি। হত্যার রাজনীতি, সন্ত্রাসের গর্জন, অস্থির জীবনযাত্রা, মৌলবাদী উত্থান, ধর্ম-জাতপাতের নিত্য নতুন ফতোয়া এবং অচরিতার্থ জীবনের ভিড় আমাদের প্রতিমুহূর্তে বিমর্ষ ও ক্লান্ত করে তুলছে। তারই ছাপ পড়ছে সর্বত্র শিল্প-সৃষ্টিতে-স্বপ্নে এমনকী আমাদের জীবনযাপনেও। আর একজন তরুণ কবি সে কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন:
‘এই সেই রাত্রি যার আঁধার
পলকে পলকে ছুঁয়ে যাচ্ছে
শিল্পবাসর, রবীন্দ্রসদন
এই সেই রাত্রি যার কাছে
বন্ধক রাখছি মেধা, বোধ
এই সেই রাত্রি যার সাপফণা
একে একে শুষে নিচ্ছে
সাদা জল নীল জল শিশিরের
স্বপ্নমাখা রোদ্দুরের কণা
এই সেই রাত্রি যার হাঁ-মুখে
উবে যাচ্ছে আমাদের সুখ
আমাদের পিতৃদলিল, সময়ের
উজ্জ্বল প্রদীপ, ঘিয়ে পোড়া
যজ্ঞের কাঠ, স্বপ্নআলাদিন
এই সেই রাত্রি যার ছোবলে ছোবলে শতধারা বিষ !’
(রাত্রি কথা : শীতল চৌধুরী)

‘রাত্রি’ শব্দটি আমাদের সভ্যতার এক দুঃসময় এবং সংকটময় মুহূর্তের নির্দেশ দিচ্ছে। অপরদিকে ‘আঁধার’ শব্দটি সবকিছু অবাঞ্ছিত, শূন্য, ক্লেদাক্ত ও হতাশাগ্রস্তকেই বোঝাচ্ছে। আমাদের আবেগ-কল্পনা, মেধা-মনন এবং অতীত-উত্তরাধিকার যাবতীয় প্রবৃত্তি ও আকাঙ্ক্ষাগুলি অন্ধকারাচ্ছন্নো। সুতরাং আমাদের দৃষ্টিও অন্ধ। ‘বিষ’ শব্দটা সংশয় ও সমাপ্তি জ্ঞাপক অর্থাৎ ধ্বংসময়তার প্রতীক। এখানে দাঁড়িয়ে কোথায় রবীন্দ্রনাথ ? মাথার ওপর সেই আকাশ নেই, সেই জ্যোৎস্নার কারুকাজ নেই। শুধু ছোবল খাওয়া পোড়া শতকের যজ্ঞভূমি। যাবতীয় সুখ ও স্বপ্নকে খেয়ে ফেলছে হাহাকার। শিল্প বাসর, রবীন্দ্রসদনও আচ্ছন্ন করে নিয়েছে। দেড়শো বছর উত্তীর্ণ রবীন্দ্রনাথ মানুষকে সেই প্রত্যয়স্নিগ্ধ বাতাবরণে বেঁধে রাখতে পারেননি। ভবিষ্যতের প্রেরণাও হতে পারেননি। প্রকৃতি আর তাঁর হৃদয়ের সেতু বেঁধে যে পথ তিনি তৈরি করে গেছেন সে পথে কোচিং ক্লাস দাঁড়াতে পারেনি। যে কবিতা পাগল সংসারকে পেছনে ফেলে ছুটে এসেছে, সে-ও নুন-পান্তার অভাব বোধে ফিরে গেছে শূন্য হাতে। রবীন্দ্রনাথ একাই গ্রহ হয়ে বিরাজ করেছেন। তাঁর উপগ্রহ হবার মতো সময় আর হাতে নেই কারও। যুগের প্রবহমান স্রোতে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আর পেছনে তাকানোর এবং নিজেকে ভোলানোর উচ্ছ্বাস কোথায়?

বরং এক জটিল ও বহুমুখী আয়নার সামনে প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে আত্ম-অন্বেষণ করতে চেয়েছি। সেখানেই নীরব ও নিস্তব্ধতা এসে প্রহর গুনছে। সৃষ্টিতে মিশে গেছে Space, প্রসঙ্গচ্যুতি এবং তখন কবি লিখতেও বাধ্য হন :
‘সময়ের এই ফাটল, দেখ, এখন অনেক রক্ত …’
এবং
‘কোনও উচ্চারণ নেই : একা একা হেঁটে আসা
পথ পার হওয়া
কোনও কন্ঠ নেই ।’ (সঞ্জীব নিয়োগী)

রক্ত, উচ্চারণ নেই, একা একা হেঁটে আসা, পথ পার হওয়া, কন্ঠ নেই—সমস্তই তখন Time. এই জীবনই বহন করে চলেছি আমরা। অবশ্য বহু আগেই এই জীবনের সূচনা হয়েছিল। টি এস এলিয়ট The Waste Land এ লিখেছেন : ‘A heap of broken images, where the sun beats,
And the dead tree gives no shelter, the cricket no relief,
And the dry stone no sound of water.’

এরকমই আশ্রয়চ্যুত মরীচিকাময় জীবনে পতিত হয়ে, শিল্প সৌন্দর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, মৃত্যু ও যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটাই। প্রেম নেই, হিংসা-বিদ্বেষ-রক্তপাতে জীবনের আয়ুক্ষয় করি। রবীন্দ্রনাথ ‘হবে হবে জয়’ বলে একদিন যে নব উত্থানের কথা বলেছিলেন, আজ তার উচ্চারণও আমরা ভুলে যাচ্ছি। কুচক্রী মানবহন্তারকের ভিড়ে সভ্যতা ভরে যাচ্ছে। কার কাছে শুনব আর কবিতার অমৃতবাণী?

তবু কোথাও মনে হয় এই বলয়িত জীবনে আমাদের ভেতর রবীন্দ্র-শিখা জ্বলে উঠেছে। আমরা জানি না, আমাদের চেতনায়ও তা ধরা পড়ে না। অথচ কোথাও থেকে গেছে যেন পঁচিশে বৈশাখের ডাক। বাইশে শ্রাবণের আহ্বান। অজান্তেই বয়ে নিয়ে যাচ্ছি তাঁকে। প্রাচীন কোনো ঋষির মতো তিনি রয়ে গেছেন আমাদের সমীহ আদায়ের নান্দনিক প্রত্যুষে। তাই আঁধারে ও আলোয়,দুঃখে ও আনন্দে, জীবনে ও মৃত্যুতে তিনি উঁকি দেন সরবে ও নীরবে, দৃশ্যে ও অদৃশ্যে। আমরা ছুঁয়ে ফেলি তাঁকে —স্বীকার এবং অস্বীকারেও।