আমি ‘সাময়িকী’ নামে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতাম। সেই সময় আমার ম্যাগাজিনে প্রতি মাসেই একটি বিশেষ সংখ্যা করতাম। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আমি একটি সুন্দরবন সংখ্যা করি। অতন্ত দুঃখের বিষয় আমার সাময়িকী ম্যাগাজিনটি অর্থাভাবে চালাতে পারিনি। বর্তমানে আমি ‘মোলাকাত’ নামে সাময়িকী চিন্তারই একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছি। এবারও বিভিন্ন সংখ্যার সাথে সুন্দরবন সংখ্যাটি আবারও করছি। কারণ আগের লেখাগুলো আমার কাছে এখন জমা পড়ে আছে। সেইগুলো এবং বর্তমানে অনেকের লেখা নিয়ে সংখ্যাটি চলবে। আশা করি সর্বাধিক তথ্য সমৃদ্ধ ও ইতিহাস নির্ভর একটি সংখ্যা হবে আপনাদের লেখাগুলো নিয়ে। এটা আমাদের আশা। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আজ প্রকাশ হলো আমাদের সুন্দরবন : পর্ব-২
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চী প ত্র

সুন্দরবন :: মতিউর রহমান মল্লিক
সুন্দরবন :: শাহীন রেজা
সুন্দরবন :: শাহনাজ পারভীন
বিষে ভরা নিঃশ্বাস ছাড়ো :: রানা জামান
স্বপ্নের সমাধি :: মাহবুব খান
শুধু কান্না নয়, বিশুদ্ধ বাংলাদেশ চাই, সত্য দেশপ্রেমিক মানুষ চাই :: রোদেলা নীলা
সুন্দরবনের বিমূর্ত বেদনা :: আবু তাহের বেলাল
রামপাল কেন সুন্দরবনে :: শামসুর রহমান
সুন্দরবন সমাচার :: ইউসুফ কবিয়াল
বাঁচাও মানুষ বাঁচাও সুন্দরবন :: সেলিম আনোয়ার
সুন্দর বনের সুন্দর :: বাউল মজনু
বাঘ মামা :: রাত স্মরণীয়
সুন্দরবনের মোল্লাখালি :: মোকতার হোসেন মন্ডল
সুন্দরবন: ১৯৯৪ :: ইমন জুবায়ের
বাঁচাও সুন্দরবন :: আবু জাফর
সুন্দরবন :: ফয়েজ উল্লাহ রবি
সুন্দরবনে সুন্দরী নেই :: এস এম শাহনূর
সুন্দর বন :: শাহীন খান
মন মাতানো সুন্দরবন :: মুহাম্মদ ইসমাইল
অভয়ারণ্য সুন্দরবন :: এম. তামজীদ হোসাইন

সুন্দরবন
মতিউর রহমান মল্লিক

সুন্দরী গাছে ভরা সুন্দরবন,
ভরে না দু’চোখ দেখে, ভরে নাতো মন;
অগণন সারি সারি সমান সারি-
অনন্তকাল ধরে রয়েছে দাঁড়ি।

চর জুড়ে ‘গোল ঝাড়’ ছড়ানো অঢেল,
বাতাসে পাখার বাড়ি পাতাদের খেল,
কেওড়ার ডাল নাচে ঝাঁকড়া চুলে,
বানরেরা মগডালে দোদুল দোলে।

আঁকা বাঁকা খাল গেছে দূরে পালিয়ে,
নির্জনে গতিধারা দ্রুত চালিয়ে,
যেখানে বনের কালো আরো ঘনঘোর,
কিংবা সবুজ শোভা গাঢ় মনচোর।

মনমোরগের ডাকে সকাল নামে,
বলাকারা উড়ে গিয়ে আবার থামে,
গাঙচিল বকপাখি হাজার হাজার,
মেলায় রূপের হাট, রঙের বাজার।

নদীতে মাছের ঝাঁক করে গিজগিজ,
দু-তীরে পরীর বাড়ি-ঘর-দহলিজ
সেখানে গেলেই ঠোঁটে উঠে আসে গান;
বুকের পায়রা শেখে সুরের বানান।

অগণিত কুম্ভীর ঘোরে ইতিউতি,
সারা দিনমান, সারারাত নিশুতি,
পানিতে লুকিয়ে থাকা হিংস্র কামোট
রাক্ষস যেনো ঘোরে কাঁটা ভরা ঠোঁট।

কোথাও সাপের ফণা ঝুলছে গাছে,
হঠাৎ সে নেমে গেলো ঝোঁপের কাছে,
হয়তো ঝোপের মাঝে বন্য শুয়োর,
শুয়ে আছে হাঁ-টা করে খুলে দাঁতাল দুয়োর।

বাঘের দাপটে সারা বন থরথরে,
মতিগতি ঠিক নেই কি যেনো কি করে,
কাকে মারে কাকে ধরে কাকে দেয় সাজা,
বাঘ হলো বাদাবনে মহান রাজা।

চঞ্চল হরিণেরা বনে আছে বলে
চাঁদনীর রাতে চাঁদ পড়ে গলে গলে,
এই আছে এই নেই এরা অদ্ভূত-
এদের সবার গতি দূত-বিদ্যুৎ।

লাখ লাখ প্রজাপতি বেড়ায় ঘুরে,
প্রাণভরে গান গায় পাখিরা উড়ে,
মধুর চাকের কোন শেষমেষ নেই,
মৌমাছি ফুলে ফুলে নাচে ধেই ধেই।

সুন্দরবন নামে যার পরিচয়
বাওয়ালীরা তারে জানি বাদাবন কয়।
নানারূপে-রঙে-রসে ভরা বাদাবন;
ভরে না দু’চোখ দেখে, ভরে নাতো মন।
বিস্মিত অন্তর গেয়ে ওঠে তাই-
স্রষ্টা মহান, তাঁর তুলনা যে নাই।
…………………………………………..

সুন্দরবন
শাহীন রেজা

হেতাল গরানের মাঝ দিয়ে পালাচ্ছে দুপুর
প্রজাপতিগুলো স্নান সেরে শুকাচ্ছে শরীর
কেওড়ার ঝোপে
হরিণীর চকিত চোখ মেপে নিচ্ছে দূরত্ব রাত্রির
বাওয়ালির নৌকা থেকে রান্নার ধোঁয়া
উড়ে উড়ে মিশে যাচ্ছে গোলের ধূসরে
জল খেতে বুড়োবাঘ চুপচাপ বাদার কিনারে
এইতো রূপের বন; সুন্দরবন
রৌদ্র ছায়ার নীচে মাতামাতি দাপাদাপি
রাত্রিতে ভিজে ভিজে উদাসীন জোছনাবর্ষায়
এই বনে বলো তুমি হারাবে কোথায়
এইখানে সবটাই মায়ের মতো, সবটাই মা
এলে ঝড় আইলা আম্পালা কিংবা
গোর্কি সিডর
সুন্দর দাঁড়িয়ে পড়ে যেন অবিচল
কী কঠিন মূর্তি মায়ের
বুক দিয়ে আটকে রাখে বাতাসের বেগ
দেহ দিয়ে রুদ্র প্লাবন
ছিন্নভিন্ন তবু নির্বিকার
সন্তানের জন্য মা অবিনাশী ঢাল
প্রতিটি আঘাত শেষে লন্ডভন্ড দেহ
ক্লান্ত শ্রান্ত এক প্রসুতি যেন
মায়ের জন্য কাঁদো হে অচিন বিবেক
বাড়াও শ্রদ্ধার হাত তাকে ভালোবেসে।
…………………………………………..

সুন্দরবন
শাহনাজ পারভীন

আমাদের সুন্দরবন স্নেহশীলা, জননী সমান-
বুক পেতে দেয়, সামনে দাঁড়ায়, চিতিয়ে এগিয়ে দেহ।
যখনি ভয়াল ঝঞ্ঝা দানব তাণ্ডব নিয়ে আসে-
নিজ গরজেই রুখে দাঁড়ায়, তাকে দেয় না আদেশ কেহ।

ফালাফালা করে নিজের দেহ, ছিন্নভিন্ন শরীর-
মন্ত্রমুগ্ধ ত্রিমুখী লড়াই, একা লড়ে দিনরাত।
নির্ভয় রাখে, শান্ত রাখে, শোনায় আশার বানী-
সুরক্ষিত, নিশ্চিত রাখে, স্নেহময়ী দুটি হাত।

অথচ আমরা কত ভাবে তাকে বঞ্চনা করে থাকি-
দোহাই মানুষ! এবার থামাও, নিরিবিলি থাক সুখে।
তার গাছপালা, ফুল- ফল, পশু, মধু-মৌয়ালি থাক
ক্ষতি করো না নিয়ত তাহার, বিপদ দেবে সে রুখে!
…………………………………………..

বিষে ভরা নিঃশ্বাস ছাড়ো
রানা জামান

মজার সবে হচ্ছে শুরু
রামপালে বিদ্যুৎ হবে
সবঘরে আলো রবে
সালাম জানাই স্রষ্টার গুরু!

সুন্দরবনে হবে মেলা
রাজত্ব বাঘের শেষ
কুড়াবো সিংহের কেশ!
ভালুক বেটা বুঝবে ঠেলা!

গেওয়া কেওরার মূল্য জিরো
সুন্দরী কাঠের অল্প
গোলপাতা বলুক গল্প
পামট্রি তখন হবে হিরো

উঠবে উঁচু উঁচু দালান
লাগাবো ছাদে চারা
বনসাই ও নয়নতারা
হবে চিপসের বিশাল বাগান

পানি শুকাও বৃক্ষ মারো
পাথরের বাগান গড়ো
কিটানুর জীবন ধরো
বিষে ভরা নিঃশ্বাস ছাড়ো!
…………………………………………..

স্বপ্নের সমাধি
(সেভ দ্যা সুন্দরবন কে উৎসর্গ)
মাহবুব খান

আমার পূর্বপুরুষরা স্বপ্ন দেখেছিল
সবুজ মরূদ্যান হবে তাদের পিতৃভূমি
নোনা আগ্রাসনে তাদের স্বপ্ন
দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে।

আমার পূর্বপুরুষরা স্বপ্ন দেখেছিল
জলের গভীর থেকে তুলে আনা
রূপালি ফসলে সমৃদ্ধ হবে জনপদ
তাদের স্বপ্ন লুট হয়ে গেছে।

আমার পূর্বপুরুষরা ভালোবেসে ছিল
খরস্রোতা নদির পাললিক জল
উজানি দস্যুদের আগ্রাসনে
শুকিয়ে সেও মরুপ্রান্তর হয়ে গেছে।

আমার পূর্বপুরুষদের চাওয়া-পাওয়া
আজ প্রতারিত কন্যার মতো
বানিসান্তার মলিন চরে
ঠিকানা খুঁজে আশ্রয় পেয়েছে।

এখন তাদের স্বপ্নের আকাশে অহর্নিশ
চিমনীর উড্ডীয়মান কালো ধোঁয়া।
শাপমারির বিলে তাদের জন্য
খোঁড়া হচ্ছে সারি সারি কবর।
কফিনে শুয়ে ঘোলাচোখে চেয়ে দেখে
সন্তানদের নীল আকাশে
কার্বন-মনোক্সাইডের বীভৎস আগ্রাসন।
আর স্বাচ্ছন্দে ডানামেলে
ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে
ঝাঁকে ঝাঁকে বিদেশী শকুন।
…………………………………………..

শুধু কান্না নয়, বিশুদ্ধ বাংলাদেশ চাই, সত্য দেশপ্রেমিক মানুষ চাই
রোদেলা নীলা

অশুদ্ধতার ভরা স্রোতে প্লাবন ছড়িয়ে তুমি চলে যাও
তোমরা বিগত হয়ে থাকো
এই তুমি আমি মার্কা মিথ্যে প্রহোসন একদিন থামবে জানি
তবু একদিন
খুব বেশি ঝড় হতে ইচ্ছে করে আবার
প্রলয়ঙ্করী প্রেতাত্মার মতো মোটকে দিতে ইচ্ছে করে কুকুরের হাড় গোড়
ওরাও কি মানুষ ?
দু’চোখ বেয়ে কেবল লালসার লালা খেলা করে বার্ধক্যের মলাট পড়ানো যৌবনে
হাসি পায়, ভীষন হাসি পায়- পাট করা সিঁথিতে সাদা চুলের উঁকি ঝুঁকি খেলা
হয়তো সময় মেনে নিয়েছে আধুনিকতার ডাক
কিন্তু তারপরো কিছু কথা থেকে যায়
থেকে যায় নৈতিকতার সত্য অহঙ্কার যার গলায় মালা পড়ালে কেবল নিজে নয়
চারপাশটাও বড্ড বেশি আলোময় হয়ে ওঠে
হেমন্তের সোনা রোদ ছড়ানো মুক্ত উঠোনে একবার পা ফেলে দেখো-
একটি বার চোখ মেলে তাকাও দিগন্তের পাড় ঘেঁষা নীলান্তে
ওখানে ভালোবাসারা সারাদিন লুটোপুটি খায়
বিশ্বাসে মেঘকে করে আলিঙ্গন
তুমি বা তোমরা; তা যেই হও না কেন
ক্ষমতার শক্ত শৃংখল থেকে বেরিয়ে একবার সবুজ ঘাসে পা ছুঁয়ে দেখো-
কি অপরুপ স্নিগ্ধতার ডালা সাজিয়ে রেখেছেন বিধাতা
ঠান্ডা বাক্সের হীম ঘরে আর আটকে রেখোনা নিজেকে
গাদা গাদা ফাইলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে খুঁজতে চেও না চেনা নোটের হাসি
শেষবারের মতোন শুধু একবার হায়েনার মুখোশটা খুলে ফেলে দেখো
তোমাদের কপোল জুরে নেমে আসবে অবাক মুগ্ধতা।
…………………………………………..

সুন্দরবনের বিমূর্ত বেদনা
(রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদে)
আবু তাহের বেলাল

বাঘের কান্না শোনার কেউ নেই এখানে
বনের দুঃখ বোঝার কেউ নেই এখানে।
কয়লায় পুড়ে যাবে বুক
কয়লায় কালো হবে মুখ-
উথাল পাতাল বেদনা; হাত রাখি যেখানে।।

চিত্রল হরিণের কে বোঝ অভিমান
চঞ্চল সারসের কে খোঁজ অভিমান।
পুড়ে ছাই হলো মমতার অভিধান-
নদীর কষ্ট বোঝার কেউ নেই এখানে।।

পশুর সুন্দরী গেওয়া ও গরান
কাঁদে আনমনে মহুয়া পরাণ।
ইতিহাসে লেখা হোক আর না হোক-
সুসকের বাড়িঘরে আসবে খরান…

উপকূল ছিঁড়ে খাবে জলোচ্ছ্বাসে
কালো মেঘ জড়ো হলো ভাগ্যাকাশে।
কারো মুখে রা নেই কাঁপে গুম ত্রাসে-
মাছের তৃষ্ণা বোঝার কেউ নেই এখানে।
…………………………………………..

রামপাল কেন সুন্দরবনে
শামসুর রহমান

বাঘের রাজ্য সুন্দরবন
বনের রাজাও সুন্দরবন’

এখানে সারি সারি সুন্দরীদের
শীতল ছায়ায়—
ডানামেলা গোলপাতা
রয়েছে কতশত বিচিত্র প্রজাতির মেলা।

মায়াবী হরিণের ছোটাছুটি
রাতের বেলায় মধুর খোঁজে মশাল হাতে
মৌয়ালিদের ঘোরাঘুরি।

মত্স্যভাণ্ডার সুন্দরবন—
কাঁকড়া ধরা আর অবৈধ গাছ কাটা
এসবের জন্যেও বেড়েছে বনদস্যুদের দৌরাত্ম।

সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদের ঊর্বরভূমি
যাতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের করছে আকর্ষণ।

এসব দেখে—
শুকুনের চোখ পড়েছে সুন্দরবনে
ওরা আসলে ফাঁদ পেতেছে লুটের লোভে।

কেন, বুঝেও বোঝে না ওরা—
রামপাল বিদ্যুকেন্দ্র সুন্দরবনে হলে
বাঘ তাড়াবে বনখেকো রাক্ষসের দলে!

নিসর্গ প্রকৃতির প্রাণিকুল ধ্বংস করবে
নির্মল বিশুদ্ধতায় বিষ ঢেলে।

বিশাল বাংলায় কি— জায়গার অভাব?
প্রাণীকুল শ্মশান করে
রামপাল বিদ্যুকেন্দ্র সুন্দরবনেই করতে হবে?

ভাবার সময় যায়নি ফুরিয়ে
ফিরে আসো বিদ্যুকেন্দ্র রামপাল নিয়ে
বাঘকে থাকতে দাও বাঘের রাজ্যে
তবেই রক্ষা পাবে সুন্দরবন আপন খেয়ালে।
…………………………………………..

সুন্দরবন সমাচার
ইউসুফ কবিয়াল

সাবাশ! কাঠুরিয়া, বাহবা দেশের জন
গাছ কেটে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে সুন্দর মন।
চোখ তার সুন্দর বনে
খাল কেঁটে কুমির আনে।
সুন্দর নাকি বান্দর হলো সুন্দর বন?
…………………………………………..

বাঁচাও মানুষ বাঁচাও সুন্দরবন
সেলিম আনোয়ার

প্রকৃতির কোলে জন্মেছে যে মানুষ
সে কি করে ধ্বংস করে তা
কি করে বাসযোগ্য পৃথিবীরে
অশান্ত করে যান্ত্রিকতায় ।
কালো ধোয়া কার্বন ডাইঅক্সাইড আর অশান্ত শব্দে
কি ভাবে হত্যাকাব্য রচনা করে প্রাণের জীবনের।

কোন বিবেচনায় অবিবেচকের মতন করে প্রহসন
আজও দেশ প্রেমিক সাজে ঘুরছে যারা
পনের কোটি মানুষের হৃৎপিন্ডটা উপরে ফেলতে আজ পরম হঠকারীতায়
যারা নিজের বিবেকে চলে না প্রভুদের ধার করা মারণাস্ত্র ধারণ করে
বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নেয় অন্যায্য সব দাবী
তারা কি অন্ধ বধির সবই?
তাদের চোখে কি আজ কালো পর্দা?
যা ভেদ করে সহজ স্বাভাবিক সত্যটি দৃশ্যমান হয় না।

তাদের কর্ণকুহরে কি সীসা ঢেলেছে কেউ?
তাদের বিবেকবুদ্ধি কি কোন কাজ করে না।

বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন
বাংলাদেশের কোটি মানুষের রক্ষাকবচ যেটি
টর্নেডো সাইক্লোনেও অবতার হয়ে ছায়া দেন যিনি
জীববৈচিত্রে ঘেরা প্রাণের আধার
একটু কি ভাবার অবকাশ নেই!
একটু কি তার গুরুত্ব নেই!

কেন সেটি আজ হুমকির মুখে
সুন্দরী গরান গেওয়া
রয়েল বেঙ্গল টাইগার
চিত্রা হরিণ অসংখ্য সব প্রাণী
তাদের কি বাঁচার অধিকার নেই।

রামপাল প্রজেক্টের বিলুপ্তি চাই
সুন্দরবনের প্রতি হুমকির বিনাশ চাই।

বাঁচাও মানুষ বাঁচাও সুন্দরবন
বাঁচাও বৃক্ষরাজি বাঁচাও জীবন
বাঁচাও দেশ বাঁচাও মাটি
বাঁচাও বিশুদ্ধ বায়ু বাঁচাও প্রকৃতি।
…………………………………………..

সুন্দর বনের সুন্দর
বাউল মজনু

যাদের ভাই সুন্দর মন
তারা যায় সুন্দর বন
সুন্দর কিছু দেখতে
সুন্দরী আর কেওড়া
গোলপাতাতে ঘেরা
বিশ্বয় যা জগতে।
ময়ূর হরিণ চিতা
বাঘ ভাল্লুক ভরা তা
বিশ্বয়কর প্রাণীতে
সুন্দর প্রকৃতি জল
জোয়ার ভাটায় টলমল
দাও তারে বাঁচিতে।
দোহাই লাগে যেনো
ক্ষতি না হয় কোনো
সুন্দর আমার এই বন
এটা কারো একার
নয় তো কভু দরকার
সরকার করবে রক্ষণ
…………………………………………..

বাঘ মামা
রাত স্মরণীয়

হালুম হুলুম হালুম হুলুম
ঐ এলো রে মামা
পরেছে সে কালোর সাথে
হলদে ডোরার জামা।

বনের রাজা বাঘ মামা সে
সবচে’ শক্তিশালী
সেলাম ঠোকে সকাল সাঁঝে
মৌয়াল-বাওয়ালী।

সুন্দরবন জুড়ে যতো
বণ্য প্রাণী আছে
সবাই কাবু বনের রাজা
বাঘ মামাটির কাছে।

মামার ডরে দুষ্টু যতো
শিকারীদের দল
বনের থেকে পালায় ছুটে
গুটিয়ে দলবল।

মামা আছে বলেই আজও
সুন্দরবন আছে
তাইতো মামার কদর এতো
বিশ্ববাসীর কাছে।

মোদের দেশের বাঘ মামাদের
রক্ষা মোরা করি
সেই শপথে এসো সবাই
হাতটি তুলে ধরি।
…………………………………………..

সুন্দরবনের মোল্লাখালি
মোকতার হোসেন মন্ডল

এখানে নেই মোটর গাড়ি
এখানে নেই ট্রেন
এখানে নেই মারুতি গাড়ি
এখানে নেই ক্রেন
এখানে আছে জলের সাথে
বড়ো বড়ো সাপ
রাত আসলেই হাজার পোকার
বাড়ছে উপদ্রপ
নেইকো কলেজ পড়ার জন্য
দিনরাত শুধু খাটনি
রোগে শোকে দিন কেটে যায়
ভাতেও নাই চাটনি
নেইকো কোনও সেবাযান
কিংবা চলার রাস্তা
শহর চেয়ে বলতে পারি
দেশি ডিম খুব সস্তা
দুধের শিশু কাঁদায় হাঁটে
নেইকো খেলার মাঠ
নেইকো কোনও গম মসুরি
তিল কলার চাষ
এমনি হাজার গল্প হেথায়
এমনই বহু কষ্ট
আমার তোমার থালার খাবার
দিব্যি হচ্ছে নষ্ট
আসতে দেখি মোল্লাখালি
বিপদ সংকুল পথ
নেইকো কোনও চলার মতো
বিমান কিংবা রথ
বোটে ওঠো ডাঙায় দাঁড়াও
ঘন্টার পর ঘন্টা
দেখলে তুমি অবাক হবে
কুঁড়ো বাড়ির মনটা
চলতে গেলেই হোঁচট খাওয়া
প্রতি পদে পদে
পথ নেইকো,গাড়ি নেইকো
দাঁড়িয়ে তবুও নদে
দৃশ্য দেখে গাছ গাছালির
মনটা ভরে যায়
মোল্লাখালীর চোখের জলে
সিনেমা শুটিং হয়।
…………………………………………..

সুন্দরবন: ১৯৯৪
ইমন জুবায়ের

গলুইয়ে মাছের গন্ধ; মেঘলা একটি দিন
মাছের গন্ধমাখা গলুইয়ের ওপর
শহর ছাড়িয়ে গেলে যতটা জলজ আর অর্ধ-নগ্ন থাকা যায়-
সেরকম উবু হয়ে ছিলাম।
মেঘলা দিনের বিমর্ষ আলোয় আমারে প্রণতি জানায় শিবসার হাসিখুশি শুশুক
নদীর দু’পাড়ে- গেওয়া-গরান-ওড়া ও ধুন্দুল;
তাহাদের পাতার ওপর বৃষ্টির ঝিরঝির ঝিরঝির শব্দ-
শ্রাবণের শেষ জলধারা…
গোলপাতার নীচে ভিজছিল নিঃস্ব মউয়াল
তাহাদের ভয়ডর নাই? চকিতে সরে যায় তুখোর বাগডাস!
রায়মঙ্গল থেকে উঠে আসা মিশমিশে কালো মাঝি
ভাতের হাঁড়ি চাপিয়েছে নৌকায় ছৈয়ের নীচে। কাল রাতে সে বলেছিল
পচাব্দী গাজীর উপাখ্যান। আমারও স্বপ্নে তারপর যথারীতি এসেছিল
হলুদ একটি বাঘ
রাজগোখরাও মিশেছিল ডালে!
পরদিন সকালে আমি উবু হয়ে ছিলাম শিবসার গূঢ়তম জলের ওপরে
কতকাল আগে যেন…
গলুইয়ে মাছের গন্ধ
মেঘলা একটি দিন।
…………………………………………..

বাঁচাও সুন্দরবন
আবু জাফর

আমাদের সুন্দরবন
এযে সাত রাজার ধন
সুন্দরবন বাংলার গর্ব, প্রকৃতির বিশাল অবদান,
এই প্রাকৃতিক বনভূমি শুধু আল্লাহরই দান
সুন্দরবন যেন সোনার খনি
বাঘ সিংহ কতো যে হরিণি
আছে গেওয়া কেওড়া গোলপাতা গজারি সুন্দরি
নদী-নালা পশু-পাখি যা বিশ্বের কাছে গর্ব করি
এযে মোদের অমূল্য সম্পদ
তবে কেন এই ধ্বংসের ফাদ?
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি হয় আত্মঘাতী প্রকল্প
তবে খুজতে হবে এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের বিকল্প
বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমরা চাই
সুন্দরবন ধ্বংস করে নয়
চাইনা আমাদের এই ঐতিহ্য হোক ক্ষতিগ্রস্ত
আর সুন্দরবনের বনভূমির পরিবেশ হোক বিনষ্ট।
…………………………………………..

সুন্দরবন
ফয়েজ উল্লাহ রবি

জন্মেই আলো চায়, এই সৃষ্টির নিয়ম, চলছেই তো ভাল
বৃক্ষ জন্মিতে মৃত্তিকা খুঁজবে, জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ এর আলো।
সেই দিন বেশি দূরে নয়, সুন্দরবন হবে স্মৃতিময় ইতিহাস,
………………………খুঁজে পাবে না এতোটুকু তার আঁশ।

চারপাশে নজর রেখ, খোলা রাখ চোখ
তোমাদের শহরে আসছে বাঘ, ভালু, সিংহশাবক
বনহীন, নীড় হারা পশু-পাখির দল
ঠোঁটে নখে ঘৃণা আর অভিশাপের পাথর।
…………………………………………..

সুন্দরবনে সুন্দরী নেই
এস এম শাহনূর

আজ দেখেছ নীলকমল কাল পাবে দুবলার চর
খানিক বাদে কোকিলমনি কিংবা নলিয়ান
যেথায় পরম শ্রান্তি দিবে গোলপাতার ঘর
উৎসুক পর্যটকের ভিড়ে পেতেও পার করমজলে
দু’চোঁখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে ভাসি অথৈ সাগর জলে
মাঝরাতে কর্ণ কুহরে বাজে জলদস্যুর কোকিল শিস
মজা করে খেলায় মাতে মাথার উপর ফ্লায়িং ফিশ
চোঁখের পরে চোঁখ তুলে চায় অবুঝ মনের হরিণ পাল
কুমির দেখ আসছে নিয়ে গরীব জেলের সুতোর জাল
বাঘ মামার সাথে হয়না দেখা এটাই বড় ভাগ্য
বন্য বাঘের আহার হতে আরও হওয়া চাই যোগ্য!
সুন্দরবনে সুন্দরী নেই,আছে গোলপাতা আর ঝাউবন
তবু বিচিত্র সব পাখপাখালি ভরিয়ে দিবে শূন্য মন
এত বেশী ঘুরাঘুরি আছে নিশ্চিত তার কারণ
সব কারণের খবর বলতে আছে কঠোর বারণ।
…………………………………………..

সুন্দর বন
শাহীন খান

যাকে দেখে কোনদিনই ভরে নারে মন
ভরে নারে বুক প্রাণ এই দু’নয়ন
যার ছবি দেখে দেখে মুখরিত কবি
লেখে গান ছড়া আর কাব্যটা সবই।
যার কোলে ঘুম যায় প্রকৃতি নিতি
যাকে নিয়ে বেড়ে যায় সাম্য ও প্রীতি
হাজার পাখি যেথা করে বসবাস
নির্ভয়ে পশু যতো থাকে বারোমাস।
বন্যা ও বাদলে সে যে নিজেকে দিয়ে
আগলে রাখে খুবই বাংলাকে প্রিয়ে।
যার নদে সাঁতরায় কুমির আর মাছ
যার বুকে আছে শত গাছ আর গাছ
হিংস্রপ্রাণীর মেলা ভুরি ভুরি আছে
যাকে দেখে মন প্রাণ কেবলই যে নাচে।
রূপসী বাংলার বড় সে যে ধন
সব্বার সেরা সে যে মানিক রতন।
যাকে ভেবে কেটে যায় প্রহর আর ক্ষণ
সে যে হলো সখা-সখী সুন্দর বন।
…………………………………………..

মন মাতানো সুন্দর বন
মুহাম্মদ ইসমাইল

মনটা যখন ভীষণ একা
হাঁসফাঁসিয়ে দফারফা
সুন্দর বনের মায়ার ছায়া
নতুন লেখে ভাগ্যরেখা।

সুন্দর বনের রুপের টানে
মন ছুটে যায় ক্ষণেক্ষণে
গুনগুনিয়ে কল্পলোকে
রঙিন চোখে স্বপ্ন বুনে।

দিক জুড়ানো সবুজ বুকে
শুদ্ধতার চিত্র আঁকা
মুক্ত হাওয়ায় নৌকা বাওয়া
রুক্ষ মনে হিমেল হাওয়া।

আঁকাবাঁকা নদী-নালা
জল থইথই ঝোপেঝাড়ে
ডিঙি বেয়ে মাঝি মোল্লা
কাঁকড়া, মাছে জীবন গড়ে।

গরান, গেওয়া,সুন্দরী
রঙ বেরঙের মঞ্জরি
আলতা হাওয়ায় হাত বুলিয়ে
ডাকছে যেনো সোনা ঝুরি ।

চোখধাঁধানো জলের ঢেউ
হাওয়ার সাথে করছে খেলা
জোয়ার-ভাঁটার তালে তালে
প্রেম বিরহের নিত্য মেলা।

তাল হেতালের ঐ যে বন
দেখলে জুড়ায় দুই নয়ন
ডোরাকাটার আসা- যাওয়া
“ঐ বুঝি, ঐ এলো এখন” !

নদীর পাড়ে হেথা সেথা
কুমিরগুলো ছড়িয়ে থাকা
শুকনো গাছের গুঁড়ি যেনো
রোদের তাপে শুকিয়ে মাথা।

ঐ যে ধারে সারি সারি
বল্গা, চিতল… ভালুক, শেয়াল
ছুটছে তারা, খেলছে তারা
খুসির স্রোতে আপন খেয়াল।

অমূল্য রতন বনের ভেতর
কাঠ, মধু আর লতাপাতা
দিচ্ছে ঢেলে প্রাণ খুলে
জীবন চলার নতুন খাতা।

বন্যা খরার প্রকোপ থেকে
স্নেহভরে আগলে রেখে
বিষবাষ্প আপন গিলে
প্রাণের ছোঁয়া ভরিয়ে বুকে।

তবুও মানুষ অবুঝ হয়ে
ধ্বংসে মাতে অবলীলায়
গুপ্তভাবে বাঁধন ছিঁড়ে
চোরাশিকারীর হত্যালীলায়।

দিনে দিনে কমছে আয়ু
সুন্দর বনের জগৎটা
সবুজ ছিঁড়ে কোন জগতে
বাঁচবে তুমি, সভ্যতা ?

তাই তো বলি সবাই মিলে
বাঁচায় চলো সুন্দর বন
সুন্দরীরা রক্ষা পেলেই
বাঁচবে জগৎ, বাঁচবে মন।
…………………………………………..

অভয়ারণ্য সুন্দরবন
এম. তামজীদ হোসাইন

ললিত বনভূমি প্রসিদ্ধ যে নাম সুন্দরবন
সুন্দরী গাছে প্রাচুর্যপূর্ণ চিরশ্যামল বন
বিশ্ব প্রকৃতির বিস্ময়াবলীর এক প্রশস্ত বনভূমি
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি

বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে নোনা পরিবেশে অবস্থিত
বিশ্বব্যাপী ম্যানগ্রোভ বন নামেও সুন্দরবন স্বীকৃত
সুন্দরী-গরান-গেঁওয়া-কেওড়ায় সজ্জিত অরণ্য
গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের বনানী বৈচিত্র্যপূর্ণ

স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল
জোয়ারে ভরা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের প্রিয় নোনা জল
কাছিম-গিরগিটি-অজগরে ভরা চিরহরিৎ সুন্দরবন
হরিণ-মহিষ-গণ্ডার-কুমির আরো কতো প্রাণীর বন

বর্ষায় শামুক-কাঁকড়া-চিংড়িরা গিজগিজ করে
জেলেদের জীবিকা নির্বাহ এসব পোকামাকড় ধরে
বেঁচে থাকতে প্রয়োজন আছে এই অরণ্যভূমি
তবুও কেন ভুল করতে যাচ্ছো প্রিয় স্বদেশ তুমি?

সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান স্রষ্টার এক অপরূপ সৃষ্টি
যার প্রতি রয়েছে বিশ্বের ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি
৬০১৭ বর্গ কি:মি: অভয়ারণ্য বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ
যার জন্য দূর হবে প্রাকৃতিক সমস্ত আপদ-বিপদ।