আমি ‘সাময়িকী’ নামে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতাম। সেই সময় আমার ম্যাগাজিনে প্রতি মাসেই একটি বিশেষ সংখ্যা করতাম। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আমি একটি সুন্দরবন সংখ্যা করি। অতন্ত দুঃখের বিষয় আমার সাময়িকী ম্যাগাজিনটি অর্থাভাবে চালাতে পারিনি। বর্তমানে আমি ‘মোলাকাত’ নামে সাময়িকী চিন্তারই একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছি। এবারও বিভিন্ন সংখ্যার সাথে সুন্দরবন সংখ্যাটি আবারও করছি। কারণ আগের লেখাগুলো আমার কাছে এখন জমা পড়ে আছে। সেইগুলো এবং বর্তমানে অনেকের লেখা নিয়ে সংখ্যাটি চলবে। আশা করি সর্বাধিক তথ্য সমৃদ্ধ ও ইতিহাস নির্ভর একটি সংখ্যা হবে আপনাদের লেখাগুলো নিয়ে। এটা আমাদের আশা। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আজ প্রকাশ হলো আমাদের সুন্দরবন : পর্ব-৩
আফসার নিজাম, সম্পাদক

সূ চী প ত্র

সুন্দরবনের গান :: যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
রক্ষককে ভক্ষনের মহোৎসব :: রহমতুল্লাহ লিখন
বনের পাশেই থাকি :: তারিকুল ইসলাম সুমন
সুন্দরবন :: মুজাহিদুল ইসলাম
আমাদের সুন্দরবন :: আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন
সুন্দরবন :: শঙ্খশুভ্র পাত্র
সুন্দরবন :: শেখ একেএম জাকারিয়া
বাংলাদেশকে করছে রক্ষা :: রানা জামান
সুন্দরবন ও ধূসর কথা :: নিমাই জানা
সুন্দৱবন :: রেজা ফারুকী
আমাদের সুন্দরবন :: মাহমুদ মুযযাম্মিল
লোনা জলের ঝাপটা :: শুভ্রাশ্রী মাইতি
দাও ফিরে সুন্দরী অরণ্য অধিকার :: বিকাশ চন্দ

সুন্দরবনের গান
যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত

প্রেমের লাগি দেশ ছেড়েছি শোন বন্ধুবর।
প্রিয়ার সাথে বেঁধেছি ভাই সুন্দরবনে ঘর।
সুন্দরবনে বাস আমাদের, সুন্দরবনে বাস;
ভেড়ি বেঁধে নোনাপানি ঠেকাই বারোমাস।
সুন্দরবনের চর গো বন্ধু, নুন-দরিয়ায় ঘেরা,
তারি মাঝে মিঠে পানি সকল পানির সেরা।
‘গেঁয়ো’র খুঁটি, ‘বাণী’র রুয়ো, ‘হাঁতাল’ কেটে ছড়,
উলুখড়ের ছাউনি চালে, উলুখড়ের ছাউনি,
তারি তলে কেঁপে জ্বলে পিয়ার চোখের চাউনি।
বনে জ্বলে বুনো আগুন কালা-জঙ্গল পার,
পিয়া করে আমার তরে শনিমঙ্গলবার।
‘সুন্দরী’ গাছে মাচান বেঁধে কাটাই চৈতী রাতি,
দখিনহাওয়ায় নেবে জ্বলে দূর দরিয়ার বাতি।
বনে ডাকে বনের বাঘা আগা-গোড়া ডোরা;
হাঁতাল-ঝোপে ময়াল সাপে ধরে ‘দাঁতাল বোরা’।
চরের পাখি হঠাৎ ডাকি ঘুরে উড়ে যায়।
সাঁতার কেটে কুমির উঠে জোচ্ছনা পোহায়।
চম কে চেয়ে থম কে দাঁড়ায় ভীতু হরিণ-দল,
দুড়-দুড়িয়ে ছুটে পালায় কাঁপিয়ে জঙ্গল।
চাঁদের ঝোঁকে জোয়ার ঢোকে সোঁদর গাঙে গাঙে,
ভাঙ্গন-মুখে সুন্দরী গাছ কেঁপে কেঁপে ভাঙে।
দখিন হাওয়ার জোয়ার লাগে জংলা গাছের তল
তটের বুকে ঢেউ-এর সুখে তল-তলাতল-তল।
হেথা, পাপিয়া পিক কাদায় না দিক চাঁদনি আকাশ ভরে,
সাগর-কূলে আগড় খুলে দখিন হাওয়াই ঘোরে।
সাগর-পারের স্বপন এনে গাঙে সে ভুলায়;
গাঙ-কপোতীর সাথে সাথে সোঁতে ভেসে যায়।
দখিন হাওয়া, দখিন হাওয়া, মাতাল হয়েছে রে!
পালের তরীর আঁচল ধরি গাঙে গাঙে ফেরে।
কাঁচা বনের সবুজ কাঁচল টানে দখিন হাওয়া;
পিয়ার পিঠের এলোকেশে আমার তনু ছাওয়া।
দেশের শেষে সুন্দরবন রে, দখিন হাওয়ার দেশ,
চোখে মুখে ঝাপটা লাগে পিয়ার এলোকেশ।
সুন্দরবনের খোলা চরে নাচে খঞ্জন পাখি,
সোনারই পিঞ্জরে নাচে দুটি পোষা আঁখি।
এদেশের মৌমাছি কেবল পদ্মমধুই খায়,
পিয়াসী আমার পিয়া অধর পিয়ায়।
লোলুপ দিঠি পিয়ার মুখে উড়ে পাকে-পাক,
পদ্মবনের মৌমাছি বা পদ্মে বাঁধে চাক।
সুন্দরবনে বাস গো বন্ধু, সুন্দরবনবাসী,
নোনাপানি ঠেকিয়ে মোরা এক ফসলের চাষী।
মিছে আমায় ডাকো বন্ধু, মিছে ফিরে ডাকো,
তার চেয়ে ভাই তুমিই মোদের অতিথ হইয়ে থাকো।
তোমার সাথে বাইনু প্রাতে গাইনু কাঁদন-গান,
টানা পথের বাঁকে বাঁকে ছিল ভাঁটার টান।
মোহানাতে দেখি – একি উজান বহে বারি!
সাধে কি হইনু রে বন্ধু সুন্দরবনচারী!
ফিরিতে কোয়োনা গো আর, ফিরে যেওনাকো;
দুখের বন্ধু সুখের ভাগী অতিথ হইয়ে থাকো।
থেকে যেও, দেখে যেও ভাদর অমা-রাতে;
ষাঁড়াষাঁড়ির বানে সাগর গাঙে যখন মাতে
আমি দাঁড়ে পিয়া হালে, থাকবে না আর কেউ,
এই সুন্দরী কাঠের নায়ে কাটবো কালাপানির ঢেউ!
…………………………………………..

রক্ষককে ভক্ষনের মহোৎসব
রহমতুল্লাহ লিখন

ট্রপস্ফিয়ারে ত্রিবায়ুর অন্তরঙ্গ আলোচনা
অভিযোগ মনকষ্ট ক্রোধ সমালচনা,
প্রকৃতির বিপরীতে প্রকৃতির অবস্থান
বাঙালীকে বাঁচাতে নিজেই নিজেরে করছে গোরস্থান।

তারে নিয়ে কুলসিত উচ্চশ্রেনির মন
তবুও অসহ্য হয়ে উঠা প্রকৃতির বিপরীতে
সম্মুখ দেয়াল ভালবাসার সুন্দরবন।

জোয়ার ভাটার মন মাতানো মৃদু শব্দ
চারিদিকে আলো আধারের নয়নাভিরাম খেলা,
নানা প্রকার পাখির ডাকে বিনিদ্র শত অব্দ
এই যেন এক ঢেউ খেলানো সবুজ চাদরের ভেলা।

উন্মুক্ত শ্বাসমূলে ছানাবড়া শিল্পের বিন্যাস
আঁকি বুকিতে শিল্পী কাকড়া,
সযতনে বেয়ারা ঝোপঝাড় ঝাঁকড়া
চারিদিকে সকাল সন্ধ্যা স্বর্গীয় কর্দমাক্ত আশ্বাস।

কখনো এ এক একক নিসঙ্গ বন
কখনো থই থই জল রাশির মাঝে দ্বীপ
কখনো গুঞ্জরিত, কখনো নির্জন।

সুন্দরী, কেওড়া,বাইন, গরান
আরও কত তার নাক উচু সন্তান
সাথে আছে গলপাতা, হারগজা,
ফার্ন, চরগাদার মত সব সরল সোজা
কোথাও তারা কাঁটার খোচায়
কোথাও তারা আদুরে ছোয়ার গালিচাময়।

ক্ষয়ে ক্ষয়ে তার জাতীয় উন্নতিতে অবদান
মানুষের সাথে নেই কোন আদান শুধুই প্রদান
নিজেকে ভালবেসে হলেও বাঁচাও তার প্রাণ।

ক্ষমা করো না আমাদের,
ধ্বংস হোক আধুনিকতার মহা ত্রাস
হয়ে উঠো জীবনানন্দের আকাশলীনা
বাতাসের উপর বাতাস, আকাশের উপরে আকাশ।
…………………………………………..

বনের পাশেই থাকি
তারিকুল ইসলাম সুমন

বনটা আমার সবুজ ঘেরা বনের পাশেই থাকি
বন যে আমি ভালোবাসি তাইতো ছবি আঁকি।
চিত্রা হরিণ মায়া হরিণ বন্ধু ভীষণ ওরা
ওটাও প্রিয় জন্তু আমার হলদে-কালোয় ডোরা।

বেসাস বানর ঝুলতে থাকে কেওড়া গাছের ডালে
ঘোলা জলে কুমির ভাসে সব মোহনার খালে।
বনবিড়ালে সুযোগ বুঝে দেয় শিকারে হাঁনা,
নলখাগড়ার ঝাড়ে খেলে বনশূকরের ছানা।

কেউটে সাপে ডিমের খোঁজে পাখির বাসায় চলে
জোয়ার হলে লাল কাঁকড়ায় ডাঙ্গায় ফেরে দলে।
উদ্বিড়ালে মুখটা উচায় হরগোজারই ফাঁকে
গাছের ডালে মৌমাছি দল জমায় মধু চাকে।

গাছে গাছে নানান পাখি সারাটা দিন ডাকে
সারস শালিক ফিঙ্গে পেঁচা উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে।
মদনটাকের শরীর বড় ঝিমায় বসে গাছে
মাছরাঙা অনেক জাতের পেটটা থাকে মাছে।

মাছের কথা বলব কিআর হরেক মাছে খালে
টেংরা বেলে ভেটকি ওঠে ধরলে পাতা জালে।
চিংড়ি আছে কয়েক জাতের ভিন্ন সবার স্বাদে
ঢগরা জাবা স্বাদে ভীষণ মনটা আজো কাঁদে।

গেওয়া গরান ধুঁদুল গাছে বাতাস পেয়ে দোলে,
গোলের ঝাড়ে সুস্বাদু ফল দিনকে দিনে ফোলে।
কাঁকড়া সিঁদুর পশুর পাতা একটু থাকে পুরু
বেত হেঁতালে উঁচু পেলে বাড়তে করে শুরু।

ভালোবাসার বনটা আমার ভীষণ ভালো মন
নানান ঝড়ে আগলে আমায় বাঁচায় সারাক্ষণ।
…………………………………………..

সুন্দরবন
মুজাহিদুল ইসলাম

সোনার দেশে সুন্দর বন
রূপের কিবা জুড়ি
সুন্দরী গাছ সাজুগুজু
টাটকা ছায়া পরী।

পাতায় বুনন পাখির বাসা
নানান প্রাণীর বাস
মধু মাছি ব্যাস্ত থাকে
যেথায় বারো মাস।

নাম না জানা কত পাখি
ঠোঁটে মধুর শিস
গাছগাছালি রক্ষা কবজ
দিচ্ছে মোদের দিশ।

বৃক্ষ বলি তবু কেন
বন পুড়িয়ে শেষ
সুন্দর সুন্দর বন সৃজিলে
বাঁচবে পরিবেশ।
…………………………………………..

আমাদের সুন্দরবন
আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

দেশের গর্ব দেশের সম্পদ আমাদের সুন্দরবন,
গঙ্গা মেঘনার কূল ঘেঁষে
ছায়ায় মায়ায় ঘেরা সবুজের হাতছানি সেথা-
রয়েছে- প্রকৃত সোনালী রূপের কন্যার অন্তরন।
পশুর রাজা বনের রাজাদের রাজত্বে প্রজারা সুখী,
লেকের কূল ঘেঁষে বয়ে গেছে স্বচ্ছ পানির স্রোত ধারা নদী,
সুন্দরী গাছেরা হাতছানি দেয় ভ্রমণ পিয়াসু লোভীদের।
সেখানে দুদন্ড শান্তির বাতাস বয়ে চলে নীরবে,
নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মন রাঙে,
ছোট ছোট ঢেউয়ে রংধনুর সাত রং ধরা দেয়,
দেখে মনে হবে পাহাড়ি সুন্দরীরাও ফেল।
মায়াবী হরিণ গুলো কাছে এলে,
পাতার ফাঁকে পাখির কুহু কুহু ধ্বনি পেলে,
হাজার বছরের দূঃখ ভুলিয়ে দিলে,
সৌরভে সুশোভিত স্নীগ্ধ নীলাম্বরী দেখে –
সাঁকো ফেরিয়ে অচেতন হয়ে বলবেন,
আহা! এইতো আমাদের সুন্দরবন।
…………………………………………..

সুন্দরবন
শঙ্খশুভ্র পাত্র

ঘরে বসে বসে জেরবার তুমি
হতাশা-ক্লান্তি দমনে,
সব কাজ ফেলে যেতে পার আজ
সুন্দরবন ভ্রমণে ৷

সুন্দরবন গাঙ্গেয়দ্বীপে—
কথাটি মোটেই ভুল না,
তোমাকে ডাকছে সাতক্ষীরা আর
বাগেরহাট ও খুলনা ৷

ঘনঘোর ওই ম্যানগ্রোভ জুড়ে
সুন্দরী আছে দাঁড়িয়ে,
গরান, গেঁওয়া, ক্যাওড়া সবাই
দেখছে যে মুখ বাড়িয়ে ৷

বিখ্যাত সেই বাংলার বাঘ
শুনলেই বুক কাঁপে যে !
দেখি দূর থেকে বনের রাজাকে
ভয় তুলে রেখে লাগেজে ৷

চিতল হরিণ, রকমারি পাখি —
কুমির-কামট খাঁড়িতে,
চাক থেকে মধু সংগ্রহ করে
কেউ-বা রাখছে হাঁড়িতে৷

আছে বনবিবি, পূজা-অর্চনা—
লোকায়ত কত নিষ্ঠা,
“সুন্দরবন” নিয়ে লিখলেই
ফুরোবে না এই পৃষ্ঠা ৷
…………………………………………..

সুন্দরবন
শেখ একেএম জাকারিয়া

আমাদের একটাই সুন্দরবন,
দেখলেই গাছপাতা ভরে ওঠে মন।
বনে আছে পশুপাখি আছে লতা-গাছ,
আঁকাবাঁকা খালে থাকে কুম্ভীর-মাছ।
দুই পাড়ে মোষ-মৃগ খায় পাতা ঘাস,
সুযোগ পেলেই বাঘ সব করে নাশ।
বানরেরা গাছে থেকে করে ক্যাঁচক্যাঁচ,
কাঁদাজলে পশুপাখি হাঁটে প্যাচপ্যাচ।
মৌ-য়ালে মধু খোঁজে বৃক্ষের ডালে,
মৌ-মাছি নেচে ওড়ে ছন্দের তালে।
ফণা তুলে কত সাপ কী দারুণ খেলে!
বাঁধা পেলে কামড়ায় বিষ দেয় ঢেলে।
বাঘের কবলে পড়ে মরে কত জন,
কতকিছু ঘটে যায় সুন্দরবন।
…………………………………………..

বাংলাদেশকে করছে রক্ষা
রানা জামান

সুন্দরবনের সৌন্দর্য তো
আছে সুন্দরবনে
হরেক রকম গাছের বাহার
ডাকে সর্বক্ষণে

সুন্দরী গাছ গেওয়া চাপ্লাস
ম্যান্গ্রোভ এটা জাতে
নানা গুষ্ঠির জন্তু বেরোয়
দিনে কিংবা রাতে

সুন্দরবনের আসল বাহার
হরিণ এবং শার্দুল
এতো সুন্দর দেখায় বলো
কোন দেশের কার দুল?

সুন্দরবনে খাদ্য কুড়ায়
জন্তুর সাথে লোকে
বাংলাদেশকে করছে রক্ষা
সাইক্লোন আটকে বুকে।
…………………………………………..

সুন্দরবন ও ধূসর কথা
নিমাই জানা

গঙ্গা মেঘনার আঁচল জড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ রোদ
ঘুমিয়ে আছে নিঃসহ, কুহেলিকার মত প্রচ্ছন্ন ছায়া।
গভীর ক্ষত নিয়ে গাছের বাকলে ক্যানেস্তারা পিটিয়ে চলে হ্যামিলটন ,বেকন সাহেবের কাঠ বাংলো
পটাশিয়াম নিয়ে নিমরোদে নোঙ্গর ফেলেছে যত জলজ ,জীবজঙগল, পতঙ্গ রাশি
গাছের শিকড়ে আটকে আছে শ্বাস। ম্যানগ্রোভ প্রতিটি মানুষ ।
সুধন্য খালির ওয়াচ টাওয়ারে মৃত মৃত মানুষের ঢেউ গুলো দেখা যায়
দু পায়ের গোড়ালিতে ভর করে ফিরে আসে মূল ভূখন্ড ।
ক্ষয়ে যাচ্ছেপ্রতিটি গাছের শিকড় । সুন্দরীর ধূসর ছায়া পড়ে আছে , আঙ্গুলের মত বিছানো শিকড়ে
নোনা জল , জঙ্গল মানুষের মুখে বড়োই নোনা খাবার তুলে দেয়।
চোখের জল মিশে থাকে দোবাঁধির সাদা রঙের কোর এরিয়ায়।
ক্রমশ বিধবা পাড়ার পরিধি বেড়ে যায়। এখানে দয়াপুরের কোনো বালাই নেই।
বনদেবী বসে থাকে ভয়ঙ্কর প্রাণীটির স ওয়ারী হয়ে। পাশে মকরের বড় ভুরিভোজ।
দিনদিন ভিক্ষায় বের হয় সনকা সরকার, রেনুকা মন্ডল।
মোটা কাঁচে চোখের জল ফেলছে মন খারাপ করে।
মৃত স্বামীটি আর ফিরে আসেনি। মাছ, কাঁকড়া আর হেতাল জঙ্গলে হিসেব করছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৌনঃপুনিক আর প্রকৃত ভগ্নাংশের।
গৌর সর্দার বাবার মত আলো-আঁধারির শিকারী নয়।
শববাহী গাড়ি নেই বলে ত্রিপল নৌকায় ফিরে আসে রণজিৎ মিস্ত্রী।
বুকের গভীরে ক্ষত। ছাপা পলেস্টার জামা। জনতা ইন্স্যুরেন্স।
লোকগীতি গাইছে সুন্দরবনের আদিবাসী বেটি। বীণা সর্দার দাওয়া য় বসে আম কুটছে বর্গাকার, ত্রিভুজাকার দুঃখের যতসব বহুভুজ।
সীমাহীন সবুজ পাতা , ধুসর গার্হস্থ্য এক একটা কৃষ্ণ গহ্বরের ভেতরে ঢুকে যায়।
নোনা জলের ঢেউ ভাঙে নোনা বাঁধে।
লাল পলিথিন ঘর আর শুকনো মজ্জা খড়ের ঘরে ফিরে যাচ্ছে অনিমা মিস্ত্রি

প্রতিটি দিন ও প্রতিটি রাতে গাছের শিকড় গুলো ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে।।
…………………………………………..

সুন্দৱবন
রেজা ফারুকী

সুন্দরবন-সুন্দৱবন
এ ধরায় অনন্য উদাহৱন
তোমাতে নীড় বাঁধে
সুন্দরী, গোলপাতা, রয়েল- টাইগার,
চিত্রাহৱিণ ময়ূর ময়ূরী, সাপ পতংগ, বিরল প্রানী যত ,

তোমাৱ লাবন্যময়
দেহ সৌষ্ঠবে
চাঁদের বুড়িও ওঁকি দেয়
ৱবিও পেখম মেলে ধরে
বুনো হাঁস পাখা ঝাপটায়, ময়ূরী পাখামেলে নূপুরের ৱিনিঝিনি নৃত্যে ৱত হয় পরম তৃপ্তকে অবগাহনে,

তুমিতো রুপ কথার কালু গাজীকেও
বক্ষে ধাৱন করেছো
কালেৱ সাক্ষী হয়ে,

ওয়ার্ল্ড হেৱিটেজ –
ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট
কত অভিধায় তোমায় সম্বোধন-!

অকস্ষাৎ আড়ি !
বেলে ,দোঁয়াশ ,পলির রস
মাতাল করা ঘ্রান
তোমাৱ গুনেৱ হাঁড়ি
সহিতে নাহি
হয়েছে বৈরী
তুমি মান কি ?

তোমায় অপরুপ লীলা
এ কি করুণাৱ ?
ইচ্ছে করলেই বহাইবে সিডৱ
লন্ড ভন্ড করবে পিঞ্জর-!
শত ছল তত বল
প্রিয়াৱ কমল অলিন্দ ঐ সুন্দরবন
তুমি জিঁয়ে ৱবে নিযুত কাল ৷৷৷
…………………………………………..

আমাদের সুন্দরবন
মাহমুদ মুযযাম্মিল

এককালে সাধনার পাদপীঠ ছিলো বন-জঙ্গল
বনের গাছালি আর পাখপাখালি ছিলো শিক্ষাগুরু
দীর্ঘ অমাবশ্যায়—
পূর্ণিমার আলোধোয়া রাত্তিরে বসতো পাঠের জলসা
সাধনার নিরব ধ্যানমগ্নতা
ব্রতের অনন্ত দরবেশি
তপস্যার ঔদার্যে কতো যে পাঠ
প্রকৃতির বিপুল শিক্ষা-সনদ
কতো যে মহাকালের মহানায়ক হয়ে ওঠা

সুন্দরের মাঝে প্রকৃতির সাজে কেটে যায় দেশের রুক্ষতা
পথের জরাজীর্ণ দু’ধার
বহুকালের সহস্র আবিলতা
বাড়ে নির্ভরতার পরিসর
রুটি-রুজির আয়োজনও
কে নেবে এই নসিহত
শুধু কাটবে গাছ
উজাড় করবে বন
পাখিদের নিবাস
আমাদের সুন্দরবন
…………………………………………..

লোনা জলের ঝাপটা
শুভ্রাশ্রী মাইতি

হাওয়া বইছে শন্ শন্ করে সবুজ ম্যানগ্রোভের ধূসর শ্বাসমূল ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
মিষ্টিজলের পুকুরের পাশে ত্রস্ত হরিণজীবন। ঝোপের আড়ালে জ্বলজ্বলে দুটি মৃত্যু চোখ।
একটা মদনটাক এখনও বসে ঝিমোয় পূর্বপুরুষের শোকে।
রায়মঙ্গলের যুবতী শরীর জুড়ে এখন শুধু অশান্ত ঢেউয়ের আনাগোনা।
লোনাজলের ছলাৎছল ঢেউয়ে জেলে ডিঙির ভেজা পাটাতনের দুলুনি
সানকির লবণমাখা পান্তাভাতের জলে।
লঙ্কা,পেঁয়াজ আর কুচোচিংড়ির ক্ষিদের আগুনে
জিভের টাকরায় তখন জলজীবনের লোনা স্বাদ।
পাতা ছাওয়া হোগলার ঘরে একটা ঘেমো সিঁদুরে হাড়জাগা কপাল আর
গন্ডাচারেক ল্যাংটো বাচ্চার ঢুকে যাওয়া পেটের খোঁদলে
বনবিবির নির্বিকার পাথুরে মুখ।
সুন্দরী,হেঁতাল আর গরানের বুনো গন্ধ পেরিয়ে
মৃত্যুগন্ধমাখা অমৃতের সন্ধানে দূর থেকে দূরে
হেঁটে চলে ঘরের মরদ দখিন রায়ের দেশে।
ফিসফিস সুরে বাতাসের কানে চোখের জলের আর্জি–রক্ষে কর মা,রক্ষে কর।

তাও ফি হপ্তায় লোনা জলের বুক চিরে বসে গঞ্জের বিকিকিনি বাজার।
বেড়াজালের ভিজে শরীরের সাথে রোদ্দুরে শুকায় চোখের জল।
গোল জালে আবার খলবলিয়ে ওঠে জীবনের ডুরে শাড়ী।
পাড় ভাঙে,ঝড় আসে আর যায়,বেনো জল শুষে নেয় মন আর মাটি।
সাপ,কুমীর,কামটের ক্ষিদের হাজার ফাঁসে জড়ানো জলজীবনে
লাগে ঘাঘরামারি,ঢাংমারির লোনা জলের ঝাপটা।
আবার জেগে ওঠে জীবন রাতের ঝঞ্ঝাটুকু পেরিয়ে…
…………………………………………..

দাও ফিরে সুন্দরী অরণ্য অধিকার
বিকাশ চন্দ

এপারেতে নোনা জল থৈ থৈ ও পারেতে পানি-
সুন্দরী বনের সবুজ পালনে
লোনা জলের অন্তর লালনে
হাজারো পাখির কুজন জানে এতো তাদের রানী।

কতনা আছে সাঁড়ি খাল কত নদী কলকল মোহনা
কাল গর্ভ জন্ম দিয়েছে যাকে
পরম প্রীতির উষ্ণতায় তো তাকে
পূব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কি মায়া সাগরে বহনা।

বনচারী বাঙলার রাজা বাঘ সুন্দরী গাছেদের শোভা
পরম প্রীতি জানে আহা হরিণ হরিনী
নদী সমূহ ঘিরে আছে সে অঙ্গ ভরণী
বন দেবী ওলাই চণ্ডী দক্ষিণ রায়ের হৃদয় মনোলোভা।

রামধনু রঙ কতবারই রাঙিয়েছে অজস্র গাছের সবুজ
বর্ষায় কতবার আদর অশ্রু মোচন
তবু অচলা সময়ে কেন বৃক্ষ নিধন
কত না প্রাণীর অজনা মরমি ব্যথার কথা শতত অবুঝ।

গ্রামের বধূ সঙ্গে পুরুষ প্রাণ সোহাগে জানু ডোবা জলে
চিংড়ি মীন আরও কাঁকড়া খোঁজে
এ যাতনা জীবন শুধু ক্ষিদেই বোঝে
এসব কষ্ট দেখে কেবল নানান গাছ ফুল পাখি আর ফলে।

সুন্দরী হেঁতাল গরান আড়ালে মৌচাক মধু কুঞ্জ বনে বনে
নদী সমূহে উজান সময় সে কি কলতানে
প্রাণ বাজি রেখে হাতে যারা মধু বয়ে আনে
সবুজ সুশোভন বিশ্ব জোড়া খ্যাতি সে প্রাণের আবাহনে।

প্রিয়তমা সে প্রাণের প্রতিমা ফুলে ফলে হিরণ্ময় একাকার
অজস্র প্রাণী ভালোবাসা চুম্বন যত
বারোমাসই বিলাসী রূপের বসন্ত
কথাগুলো ভেসে আসে দাও সে অরণ্য সুন্দরী অধিকার।