‘স্বাধীনতা’ ও ‘সংস্কৃতি’ দু’টি আলাদা ও স্বতন্ত্র অর্থবোধক শব্দ। স্বাধীনতা শব্দের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, সংস্কৃতি শব্দের সাথে মানুষের জীবনদৃষ্টি, রুচিবোধ, শিল্প-সাহিত্য ও পরিশীলিত-পরিমার্জিত জীবনাচারের সম্পর্ক বিদ্যমান। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তার মধ্যে একটি বিশেষ ঐক্যসূত্র রয়েছে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের সাথে সাথে এ দেশের মুসলমানরা এক স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে গড়ে ওঠে। ইসলামই এ স্বতন্ত্রজাতিসত্তা বিনির্মাণের একমাত্র উপাদান। ইসলাম গতানুগতিক কোন ধর্ম নয়, এটি এক পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের পর সে বিশ্বাসের দাবি হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা। আল্লাহর সে নির্দেশের পরিপূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন ও রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহতে। তাই ইসলাম যেখানেই প্রচারিত হয়েছে সেখানেই মুসলমানদেরকে এক স্বতন্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছে। বিশ্বাসের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমল ও আখলাকের পরিবর্তন ঘটেছে। আচার-আচরণে, পোষাক-আশাকে, খাদ্য-খাওয়া, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, সামাজিক রীতি-নীতি, উৎসব-আনন্দ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পরিবর্তন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশ-কাল-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বত্র এটা ঘটেছে।

বাংলাদেশেও এর কোন ব্যকিক্রম ঘটেনি। বলা হয়ে থাকে যে, এ দেশের নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই বেশির ভাগ ইসলাম গ্রহণ করেছে। জাতিভেদ প্রথার কারণে হিন্দুধর্মে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুগণ নানাভাবে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত-নির্যাতিত হয় দীর্ঘকাল থেকে। উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের নিকট সমমর্যাদা দূরে থাক, ন্যূনতম মানবীয় মর্যাদাও তারা কখনো পায়নি। উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের সেবা-যতœ করার দায়িত্ব পেলেও তাদের নিকট থেকে মানবীয় আচরণ থেকে তারা সর্বদা বঞ্চিত থেকেছে। কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, ধোপা-নাপিত, মিস্ত্রী-জেলে ইত্যাদি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুরা সর্বদা উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের জীবন-যাপনকে আরামপ্রদ করার কাজে ব্যাপৃত থাকলেও বিনিময়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবহেলা-অবজ্ঞা এমনকি, লাঞ্ছনা-দুর্গতিই তাদের অনিবার্য ভাগ্যলিপিতে পরিণত হয়। সাম্য-ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক ধর্ম ইসলাম তাই তাদেরকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। ফলে দলে দলে তারা ইসলাম কবুল করে মানবিক মর্যাদাপূর্ণ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সমঅধিকারপূর্ণ শাশ্বত, সুন্দর জীবনের অধিকার লাভ করে। এর ফলে অত্যল্পকালের মধ্যেই এদেশ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা থেকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হয়।

ইসলাম গ্রহণের পর নব-দীক্ষিত বাঙালি মুসলমানের আমল-আখলাক, আচার-আচরণ, পোষাক-আশাক, খাদ্য-খাওয়া, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে। মন্দিরের পরিবর্তে গড়ে ওঠে মসজিদ। এটা যে শুধু স্থাপত্য-কলার ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এনেছে তা নয়, বরং এ পরিবর্তনের মূলে যে বিশ্বাস কাজ করেছে সে বিশ্বাস নবদীক্ষিত মুসলমানদের সমগ্র জীবনায়নে, চিন্তা-চেতনায়, কর্মে-সাধনায় ও প্রাপ্তিতে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এনেছে। এ পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর জীবনে পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে উপমহাদেশের মুসলমানদের জীবনধারায় এক তাৎপর্যপূর্ণ বিবর্তন ঘটেছে।

তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার পাশাপাশি উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পূজা-পার্বণ ও মূর্তি পূজার পাশাপাশি নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী, ঈদ, শবে মেরাজ, শবে কদর, শবে বরাত, মিলাদুন্নবী ইত্যাদি চালু হয়েছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী জšে§র পর শিশুর কানে আযান দেয়ার রীতি চালু হওয়া থেকে আকীকা, খৎনা, বিসমিল্লাহখানি, আক্দ-রুসুমত, শাদী-তালাক জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে এসব রীতি-রেওয়াজ চালু হয়, যা হিন্দু সমাজে প্রচলিত রীতি-রেওয়াজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

মৃত্যুর পর মুখাগ্নি, শবদাহ, পৈতাধারণ ইত্যাদির পরিবর্তে মুসলমানরা মৃতদেহের ওজু-গোছল করিয়ে, আতর-লোবান-সুগন্ধি মাখিয়ে জানাযা, দাফন-কাফন, কুলখানি, চল্লিশা ইত্যাদি চালু করেÑ যা হিন্দুরীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলমান হওয়ার পর সামাজিক রুসুম-রেওয়াজ, আদব-কায়দা, রীতি-নীতিও সম্পূর্ণ বদলে যায়। নমস্কার বা সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাতের পরিবর্তে সালাম, যে কোন কিছু শুরু করার সময় ইষ্ট দেবতার পরিবর্তে আল্লাহর নাম স্মরণ করা বা বিসমিল্লাহ বলা, আপদে-বিপদে, হর্ষে-বিষাদে বিভিন্ন অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানআল্লাহ, না’উজুবিল্লা ইত্যাদি বলা, নানা কুসংস্কারের পরিবর্তে সংস্কারমুক্ত, স্বচ্ছ, সুন্দর তৌহিদী চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া, নানা ছুঁৎমার্গের পরিবর্তে সাম্য-ভ্রাতৃত্বপূর্ণ উদার মানবিক আদর্শে জীবন পরিচালনা করা, কুরআনের বিধান অনুযায়ী ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিবেশী তথা সমাজের প্রতিটি মানুষের হক আদায় করা, বিচার-সালিশ, বিবাহ-তালাক, সম্পত্তির অধিকার, ঈদ, কুরবানী ও অন্যান্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সকলকে সমভাবে অংশীদার করা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে এক সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নতুন জীবনধারার বিকাশ ঘটে। এমনকি, মুসলমানদের আচার-আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-খাওয়া, চলাফেরা, ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি সবকিছুই হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এভাবে ইসলাম-পূর্ব বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ইসলাম-পরবর্তী বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির ফারাকটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। এককথায়, একটিকে পৌত্তলিক বা মুশরিকী সংস্কৃতি অন্যটিকে তৌহিদী বা ইসলামী সংস্কৃতি নামে আখ্যায়িত করা যায়। এ দু’য়ের মধ্যে বিশ্বাসগত মৌলিক পার্থক্যের সাথে সাথে বাহ্যিক পরিবর্তন বা পার্থক্যটাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বাস বা ধর্মের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের উদ্ভব। এ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের কারণে একই ভৌগোলিক এলাকায়, অভিন্ন জলবায়ুর অধীনে বসবাস করা সত্ত্বেও বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমানের জীবনধারা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। এ ভিন্নতা বা স্বাতন্ত্র্য শুধু ইবাদত-বন্দেগী, আমল-আখলাক বা সামাজিক রীতি-নীতি, রুসুম-রেওয়াজের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, আইন-কানুন, অর্থনৈতিক বিধি-বিধান, রাজনৈতিক পদ্ধতি, জীবনের চরম লক্ষ্য বা পরিণতি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। ফলে মুসলমানরা কালক্রমে এক স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে গড়ে ওঠে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যাদের আদর্শ ছিল বেদ-উপনিষদ, হিন্দু মুণি-ঋষী ও অগণিত দেব-দেবীর আদর্শ এবং ঐতিহ্য ছিল প্রাচীন ভারতীয়, ইসলাম গ্রহণের পর তাদেরই আদর্শ হলো ইসলাম, নবী-রাসূল-সাহাবায়েকেরামের শিক্ষা ও ঐতিহ্য হলো পবিত্র কুরআন-হাদীসে বর্ণিত মহীয়ান জীবনের কাহিনী, ঘটনা ও শাশ্বত জীবনাদর্শÑ যার মুলভিত্তি তৌহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। এভাবে ইসলাম গ্রহণের পর বাঙালি মুসলমানগণ সবদিক দিয়েই এক স্বতন্ত্র জাতিতে পরিণত হয়। অভিন্ন ভাষাভাষী, অখণ্ড জনপদ ও একই জলবায়ুর অধীনে দু’টি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান জাতির উদ্ভব ঘটে। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য থেকে এর উদ্ভব ঘটলেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য-চিন্তার মধ্যে এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।

ফলে বৃটিশের অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার সময় ভারতীয় মুসলমানরা নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। মুসলমানদের ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যই মূলত এ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে বলিষ্ঠতর করে। অবশ্য মুসলমানদের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এ দাবি একদিনেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। ইংরাজ আমলে হিন্দুরা শাসক-শ্রেণীর আনুকূল্য পেয়ে একে একে জমিদারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী-বাকুরী সবকিছু হস্তগত করে সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে বঞ্চিত করে। অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা দিন দিন নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়। সমাজের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানরা অবহেলিত ও উপেক্ষিত হয়। এ ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও উপেক্ষার ফলে মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্য গড়ার ক্ষেত্রে স্বাধিকার অর্জনের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করে।

ফলে মুসলমানগণ এক স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। কেননা অবিভক্ত ভারতে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে তাদের ন্যায্য দাবি সর্বদাই উপেক্ষিত হতো। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদ্বিষ্ট হিন্দুদের দ্বারা তাদের ভাগ্যোন্নয়ন কখনো সম্ভব ছিল না। সামাজিক মর্যাদা ও সমঅধিকার লাভের কোন সম্ভাবনাও ছিল না। এটা কোন ধারণা ও কল্পনাপ্রসূত ব্যাপার নয়, বর্তমান ভারতের দিকে তাকালেই আমরা এ কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারি। ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ভারতীয় মুসলমানরা সর্বক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও পদানত। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, চাকুরী-বাকুরী ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে তারা কোণঠাসা হয়ে আছে। এমনকি, সেখানে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিলোপ করা হয়েছে, মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির করা হচ্ছে, অসংখ্য মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে, মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সামান্য কারণে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে, মুসলমান নারীদেরকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, নারী-শিশুদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কালের গুজরাটের ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এবং পরে এ রকম হাজার হাজার নৃশংস ঘটনা সেখানে সংঘটিত হয়েছে। এ দুর্বিসহ অমানবিক অবস্থা থেকে বাঁচার জন্যই বৃটিশ-ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকা নিয়ে স্বতন্ত্র, স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়। ভারতীয় মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং অধঃপতিত অবস্থা থেকে উন্নতি লাভের জন্য এছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না।

তাই দেখা যায়, হিন্দু-কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ যখন স্বাধীন ভারতে রাম-রাজত্ব কায়েমের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, হিন্দু কবি-সাহিত্যিকগণ যখন ‘ভারত-মাতার’ বন্দনা-গীতি গেয়ে সকল ভারতবাসীকে ‘একদেহে লীন’ হবার আহ্বান জানালেন তখন ভারতীয় মুসলমানগণ আপন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এ সংগ্রামে মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় ও ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসক। কিন্তু সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফলে শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও মুসলমানরা জয়ী হয়।

১৯৪০ সনে মুসলিম লীগের গৃহীত ‘লাহোর প্রস্তাব’ অনুযায়ী ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে দু’টি স্বতন্ত্র স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র কায়েমের দাবি ছিল বাস্তবভিত্তিক ও ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ বিশেষত মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী ও পণ্ডিত জওয়াহারলাল নেহেরু ভারতের পূর্বাঞ্চলে বঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলে পাঞ্জাব বিভক্ত করার জন্য জেদ ধরেন। তাছাড়া, আসাম, মেঘালয় তথা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাকে পূর্ববঙ্গ থেকে আলাদা করে ভারতীয় ডোমিনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করার সকল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়। অন্যথায়, অবিভক্ত বাংলা, আসাম তথা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হওয়া ছিল তখনকার বাস্তবতার অনিবার্য দাবি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎ বোস সেই পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছিলেন এবং মুসলিম লীগ নেতা কায়দে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহরও তাতে পূর্ণ সম্মতি ছিল। কিন্তু তদানীন্তন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এবং ইংরেজদের ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশলে তা বাস্তবায়িত হতে পারে নি।

যাহোক, উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় দু’টি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম না হলেও ১৯৪৭ সনের ১৪ আগস্ট উভয় এলাকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে ‘পাকিস্তান’ নামে একটি রাষ্ট্র কায়েম হয়। ইতিহাসের এ ছিল এক নির্মম পরিহাস ও নিষ্ঠুর প্রতারণা। কিন্তু ইংরাজ ও হিন্দু এ দুই প্রবল প্রতিপক্ষের বিরোধিতা সত্ত্বেও উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য যে একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল সে সাফল্য ও অর্জনকেও কোনমতেই ছোট করে দেখার উপায় নেই।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানদের প্রত্যাশা আংশিক পূরণ হয়েছে মাত্র। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি মুসলমান অন্য আরেক ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। প্রথমত, যে ইসলামের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা, যে পাকিস্তানে মুসলিম ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়ে সুন্দর, কল্যাণময়, আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাক্কালে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তা কখনো পূরণ করা হয় নি। বরং তার বিপরীত কাজই আনজাম দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের তেইশ বছরের ইতিহাসে। ফলে আশা-ভঙ্গের বেদনায় বিক্ষুদ্ধ হয় জনগণ।

দ্বিতীয়ত, যে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক শোষণ-পীড়ন থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় বাঙালি মুসলমানগণ নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে একাধারে শাসক ইংরাজ ও উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাদের সে প্রত্যাশাও পূরণ হয় নি। এক্ষেত্রে ইংরাজ আমলে শাসক শ্রেণী ও বিদ্বিষ্ট হিন্দুদের যে ভূমিকা ছিল, পাকিস্তান আমলে সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পশ্চিম পাকিস্তানী এক শ্রেণীর কুচক্রী রাজনীতিক, আমলা, সামরিক জান্তা ও পুঁজিপতি শোষক শ্রেণী। যে আদর্শ ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়, তা জলাঞ্জলি দিয়ে এ শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থের ধ্বজাধারী লোকেরা ব্যক্তি, গোষ্ঠি ও আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণে তৎপর হয়ে ওঠে। ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এদেশের আপামর জনসাধারণ।

এ বিক্ষোভের মূলে ঘৃতাহুতির মত কাজ করলো বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা না করার ষড়যন্ত্র। ফলে এ দেশের জনগণের ধূমায়িত অসন্তোষ ক্রমান্বয়ে বিদ্রোহের দাবানলে পরিণত হয়। পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, স্বায়ত্ত-শাসন, ছয়-দফা, এগারো-দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সে বিদ্রোহেরই যৌক্তিক পরিণতি হিসাবে দেখা দেয়। এর ফলে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪০ সনে ‘লাহোর প্রস্তাবে’র মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের মনে যে স্বপ্ন-কল্পনার উšে§ষ ঘটেছিল, বিলম্বিত ও খণ্ডিত আকারে হলেও ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র জাতিসত্তা গড়ে তুলেছে এবং যে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ-স্বাবলম্বী সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাঙালি মুসলমানদেরকে ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, ১৯৭১ সনে সেই দুর্মর স্বপ্নই স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে আমাদেরকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, আমাদের স্বাধীনতার মূলভিত্তি হলো সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। আর এটা বলাবাহুল্য যে, এ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের মূল উৎস হলো ইসলামÑ বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র ইতিহাস-ঐতিহ্য ও স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার দীর্ঘদিনের লালিত আকাংক্ষা। তাই এ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তি-ভূমিকে যত মজবুত করা সম্ভব হবে স্বাধীনতার অঙ্গীকারও তত সুদৃঢ় হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা এক ধরনের মানসিক অনুভূতি, এক ধরনের অঙ্গীকার। এ মানসিক অনুভূতি ও অঙ্গীকারের সাথে ব্যক্তি, সমাজ ও একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার অবিভাজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। এ মানসিক অনুভূতি ও অঙ্গীকারকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থায়ীভাবে দাঁড় করাতে হলে চাই একটি প্রাণবন্ত আদর্শ, গৌরবদীপ্ত ঐতিহ্য ও সুস্পষ্ট মানবিক মূল্যবোধ। আমাদের বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক সত্তার মধ্যেই রয়েছে তার সমুজ্জ্বল উপস্থিতি।

স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, এ আদর্শ-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার পথ কণ্টকমুক্ত নয়। দীর্ঘ দিনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তপিচ্ছিল পথে এর অভিযাত্রা। এর বিরুদ্ধে আগেও ষড়যন্ত্র ছিল এখন সে ষড়যন্ত্রের জাল আরো নানাভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে দেশী-বিদেশী নানা স্বার্থান্বেষী আধিপত্যবাদী মহলের কূট-চক্রান্তের অপতৎপরতা। কিন্তু এ বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক সত্তা নসাৎ করার সকল দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকে যে কোন মূল্যে বানচাল করে দিতে হবে, একে লালন করতে হবে অকৃত্রিম মমতায়, অনবদ্য আবেগ ও অতন্দ্র প্রহরায়। কেননা, এটা আমাদের জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি।

১৯৪৭ সনে স্বাধীনতা অর্জনের সময় আমাদের জাতীয় আদর্শ সম্পর্কে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। কারো মনে কোনরূপ দ্বিধা থাকলেও বা জাতীয় আদর্শ বাস্তবায়নে কেউ উদ্যোগী না হলেও প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে কথা বলার হিম্মত কারো ছিল না। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ‘নারায়ে তকবীর’ ‘আল্লাহ আকবর’ ধ্বনি উচ্চারণ করেই নিরস্ত্র-প্রায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, তৌহিদি চেতনা ও ঈমানী তাকাজা তাদের মধ্যে অদম্য সাহস সঞ্চার করেছে, অকুতোভয়ে যুদ্ধ করে নিজ মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর এক অশুভ শক্তি আমাদের জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তখনকার নাজুক পরিস্থিতিতে বিদেশী আশীর্বাদপুষ্ট সে অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস সাধারণ মানুষের ছিল না। কিন্তু সাধারণ গণ-মানুষের সে অনুচ্চারিত প্রবল প্রতিবাদের ভাষা ধূমায়িত হয়ে অচিরেই অগ্নিগিরির ন্যায় ফেটে পড়ে। ১৯৭৫ সনে সিপাহী-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আবার ‘নারায়ে তকবীর’, ‘আল্লাহ আকবর’ ধ্বনিতে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। সে কম্পনের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত। দুঃশাসন, অনাচার, বিশৃঙ্খলা, দুর্ভিক্ষ আর জাতিসত্তার বিরুদ্ধ-শক্তির চক্রান্ত কালরাতের অবসান ঘটে ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট এবং তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭৫ সনের ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে। এভাবে সমূহ সংকট কাটলো বটে, কিন্তু চক্রান্ত শেষ হলো না। ভিন্নরূপে, বিচিত্র কৌশলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আবার চক্রান্ত শুরু হলো এবং তা অব্যাহত রয়েছে আজো।

ফলে বিগত প্রায় দুই যুগ ধরে অসংখ্য পত্র-পত্রিকা, বই-পুস্তক, রেডিও-টিভি, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সভা-সেমিনার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় আদর্শ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। এ প্রচেষ্টা শুদু দেশে নয়, বিদেশ থেকেও করা হয় নানাভাবে। দেশী চক্রান্তকারীদেরকে নানাভাবে মদদ যোগানো হয় বিদেশ থেকে। ফলে তারা বর্তমানে এক সুসংগঠিত শক্তিশালী চক্র। আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে এ চক্রান্ত সমূলে উৎখাত করা প্রয়োজন।

এ কথা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, একটি জাতি বা রাষ্ট্র গঠনের মূলে যেমন কতকগুলি সুস্পষ্ট নীতি ও আদর্শ অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে, সে জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও তেমনি সুনির্দিষ্ট নীতি ও আদর্শ অপরিহার্য। ধার করা নীতি বা আদর্শ দিয়ে কোন জাতি বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না এবং টিকেও থাকে না। নিঃসংশয়িতভাবে সকলকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, আমাদের শাশ্বত আদর্শ ইসলাম, ইসলামের চির কল্যাণকর মানবিক আদর্শে সমুজ্জ্বল আমাদের ঐতিহ্য ও পরিচ্ছন্ন উন্নত সাংস্কৃতিক জীবনধারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার অপরিহার্য তাগিদে আমাদের ভৌগোলিক সীমানা রক্ষা যেমন জরুরী, আমাদের আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণও তেমনি সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যে জাতির কোন মহৎ আদর্শ নেই, নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য ও সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয় নেই সে জাতি কখনো আপন অস্তিত্ব ও মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে না। সেদিক দিয়ে আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, আমাদের রয়েছে ইসলামের অতুলনীয় প্রাণবন্ত মহান মানবিক আদর্শ, হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য এবং এক সুস্পষ্ট পরিশীলিত উন্নত সাংস্কৃতিক জীবনধারা। তাই পৃথিবীতে সগৌরবে আপন স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকার উপযোগী সবকিছুই আমাদের রয়েছে। এ আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা একে নস্যাৎ করার অর্থ আমাদের জাতিগত পরিচয় ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব তথা অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলা। এ আত্মঘাতি প্রবণতা সম্পর্কে যতই সচেতন থাকা যায় ততই দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর।