স্বাধীনতা! আমাদের প্রাণের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শব্দটি প্রত্যেকের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। পাখি তার ভূবনে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় প্রত্যেকটি পশুও। এমনকি নদীর মাছও চায় স্বাধীনভাবে জীবন চাকা ঘুরাতে। আর মানুষ?! মানুষ তো আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে স্বাধীন স্বত্ত্বা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। যে কারণে আমাদের শরীরের শিরা-উপশিরায়, রক্তের কণায় কণায়, চিন্তার প্রতেকটি গলিপথে স্বাধীনতার চেতনা আন্দোলিত হয়। কোনভাবে আমাদের স্বাধীনতা ব্যহত হলেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধের দেয়াল, উচ্চারিত হয় সাহসী স্লোগান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আর সেই স্লোগানের পথ ধরেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
উত্তাল স্বাধীনতার মাস মার্চ। ১৯৭১ সালের এ মাসেই স্বাধীনতার পতাকা পতপত করে উড়তে শিখেছে বাংলাদেশের সুনীল আকাশে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ক্লান্তিময় সময়ে সূর্যের আলোর মতো বিকশিত হয়েছিল তৃপ্তির হাসি। তাইতো বাংলাদেশ আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে। ইতিহাসের নতুন সূর্য উদয়ের বছর এটি। হাজারো উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় কেটেছে গোটা বছর। মার্চ মাসের ৭ তারিখের রেসকোর্স ময়দান। লক্ষ জনতার ভিড়ে থৈ থৈ গোটা এলাকা। সবার মুখে মুখে স্বাধীনতার শ্লোগান, চোখের তারায় তারায় আন্দোলনের বারুদ। নতুন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাও তৈরি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করেন অগ্নিঝরা ভাষণ। বইতে থাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাতাল হাওয়া। ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব সে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। স্বাধীন পতাকার পতপত শব্দে সারাদেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রত্যাশায় বুক বাঁধে। অবশেষে ২৬ মার্চে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার থেকে ভেসে আসে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এর কণ্ঠ। উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী শাসকদের লৌহ কারাগারে অন্তরীণ থাকলেও জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর। প্রত্যেকটি সেক্টরে যোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে চলে মুক্তি সংগ্রাম। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মতো অনেক সাহসী প্রাণের গর্জনে কেঁপে ওঠে পাকবাহিনীর অন্তর। জেলে চাষি মুটে মাঝি থেকে শুরু করে দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষেরাও নেমে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। হাজারো প্রতিবন্ধকতা স্বত্ত্বেও ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মুক্তির লাল সূর্য, স্বপ্নের স্বাধীনতা, আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় লাল সবুজের পতাকা।
স্বাধীনতার আন্দোলন কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। ব্যবসার নাম করে আমাদের ভূখ-ে ঢুকে পড়েছিলো অনেক বেনিয়া। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসী, দিনেমার এবং ইংরেজসহ অনেক ধান্দাবাজ গ্রুপ। এদের মধ্যে পর্তুগিজদের হাতে আমাদের অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। আরাকানের মগদের সাথে মিলিত হয়ে তারা আমাদের দেশকে লুট করে নিতো। হাজার হাজার যুবক যুবতিকে অপহরণ করে বহু দূরে নিয়ে দাস-দাসী হিসেবে বিক্রি করতো। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটির প্রচলন হয়ে এসেছে। তবে ওরা অনেক চেষ্টা করেও এদেশের শাসন ক্ষমতা নিতে পারেনি। আমাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল ইংরেজ কোম্পানি। এদের হাত ধরেই আমাদের ঘাড়ে চাপে বৃটিশ শাসন। একশো নব্বই বছর ধরে ওরা আমাদের শোষণ-বঞ্ছনার শিকলে বেধে রেখে ছিলো।
ব্রিটিশরা ছিলো খুব কৌশলী। ওরা নিজেরা কোনো দোষ ঘাড়ে নিতো না। মুসলিম শাসনামলে আমাদের দেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে মিল ছিল। হিন্দু-মুসলমানদের কোন ধরনের রেষারেশি, বিভেদ কিংবা কোনো রকম গ-গোল ছিল না। সবাই মিলে মিশে থাকতো। যার যার ধর্ম সবাই স্বাধীনভাবে পালন করতো। সুখ দুখে সবাই এক হয়ে থাকতো। সুলতান, সম্রাট, কিংবা নবাবরা দেশ পরিচালনা করলেও সাধারণ জনগণ রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করতো না। তারা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে নিজেদের জীবন-জীবিকা পরিচালনা করতো। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম আমরা, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম আমরা…’ এমন গানে সে চিত্রই ফুটে ওঠে। কিন্তু সুকৌশলে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তৈরি করে দেয় ব্রিটিশরা। হিন্দুদেরকে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেবার নামে তাদেরকে মুসলিম বিদ্বেষী করে তোলে। অন্যদিকে মুসলমানদের ক্ষমতাই শুধু কেড়ে নেয়নি, চাকরি-বাকরি ও লেখাপড়ার সুযোগ সুবিধা থেকে শুরু করে সব ধরনের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত করে। সেইসাথে পিছিয়ে পড়া অসহায় মুসলমান জাতির উপর চাপিয়ে দেয় নানা ধরনের খাজনা, ট্যাক্স এবং সেলামি। তখন দাড়ি রাখলে কিংবা টুপি পড়লে কিংবা মসজিদে আযান দিতেও খাজনা দিতে হতো। মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায় করাও কষ্টকর ছিলো। ফলে প্রায় সকল মসজিদেই পাঁচওয়াক্ত নামাজের পরিবর্তে শুধুমাত্র জুময়ার দিনেই নামাজ আদায় করা হতো। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুময়াও আদায় করা হতো ট্যাক্স দিয়ে। ফলে মসজিদগুলো হয়ে নামাজ শূন্য হয়ে পড়ে। আর শুধুমাত্র জুময়ার নামাজ আদায় করা হতো বলে মসজিদকে জুম্মাঘর বলে আখ্যায়িত করা হতো। এখনও উত্তর বাংলার বিভিন্ন জনপদে মসজিদকে জুম্মাঘর নামেই ডাকা হয়। মুসলমান ঘরে সন্তানদের আকিকা দিয়ে মুসলমানি নাম রাখতেও খাজনা দিতে হতো। খাজনা না দিলে মুসলিম ছেলে-মেয়েদের বিয়ে শাদীও দেওয়ার অনুমতি ছিলো না। এভাবে স্বাধীনতা শব্দটি মুসলমানদের জীবন থেকে পুরোপুরিভাবে হারিয়ে যায়। অবশেষে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে গর্জে ওঠেন অনেকেই। মীর নেসার আলী তিতুমীর গড়ে তোলেন ‘বাঁশের কেল্লা’। দলবলসহ শহিদ হয়ে তিনি প্রমাণ করে গেলেন ‘জীবনের চেয়ে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি’। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন হাজী শরীয়তুল্লাহ, ফকির মজনু শাহ, সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীসহ বালাকোর্টের হাজারো শহীদ এবং গাজী। ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় ‘সর্বভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম, যা ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। তবুও স্বাধীনতার সূর্যের দেখা পাইনি আমরা। অবশেষে হাজী মুহাম্মদ মহসিন ও মুন্নুজানের মতো বেশকিছু দানবীরের শিক্ষা বিস্তার প্রয়াস এবং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের মতো বিদুষি নারীদের প্রচেষ্টার পাশাপাশি স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমির আলীর মতো কিছু চিন্তাশীল মানুষের ঐকান্তি সাধনায় আমরা আরো একধাপ এগিয়ে যাই স্বাধীনতার পথে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নামে পরিচিত বাংলা বিভক্তিকরণের মধ্যদিয়ে ঢাকা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র। আবারো জেগে ওঠে মুসলমানরা। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিজেদের অবস্থান ফিরে আনার চেষ্টা চলে প্রাণপণে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বপ্নের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’।
বাংলা বিভক্তি খুব বেশি দিন থাকেনি। পশ্চিম বঙ্গের মানুষের নানামুখি আন্দোলনে ১৯১১ সালেই তা রদ করা হয়। তবে মাত্র ছয় বছরেই বাংলাদেশের মানুষ স্বপ্নকে দৃঢ় করতে পেরেছে। মুসলিম লীগসহ নানা ধরনের রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও প্রতিষ্ঠিা করতে সক্ষম হয়েছে। শের ই বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বাংলার অনেক নেতা গর্জে ওঠেন স্বাধীনতা আদায়ের জন্যে। অবশেষে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষ ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সূর্যের দেখা পায়। প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। নিজেদের বোধ-বিশ্বাস ও সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ ঘটে। কিন্তু অচিরেই পাকিস্তানী শাসকরাও বৈরী আচরণ শুরু করে আমাদের সাথে। প্রথমেই আঘাত হানে আমাদের মাতৃভাষার উপর। আমরা অবশ্য এ বিষয়ে সচেতন ছিলাম শুরু থেকেই। তাইতো পাকিস্তান স্বাধীন হবার সাথে সাথেই বাংলাভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পাকিস্তান তমুদ্দন মজলিস’। ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাাহ, দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ অসংখ্য গুণীবুদ্ধিজীবী এ মজলিসে শরীক হন। দানা বেঁধে ওঠে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, রফিকউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শীর্ষক কবিতা রচনা করেন। নিশ্চিত হয় আমাদের বাংলাভাষার অধিকার। আজ হাজারো ছড়া কবিতা আর গানে মুখরিত আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা।
পাকিস্তান আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটসহ মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অনেক কলেজ, মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্যে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে প্রতিষ্ঠিত করা হয় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে আমাদেরকে শোষণ করতো। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান পদগুলোতে থাকতো পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য শুরু হয় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। স্বাধীন পাকিস্তানে বসবাস করেও আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে পারিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা পূর্ববাংলায় একচ্ছত্র বিজয়সহ সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তারা আমাদের হাতে ক্ষমতা দিতে চায়নি। আমরাও ছিলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাইতো আবারো আমাদের গর্জে ওঠা স্বাধীনতার জন্যে। অবশেষে আমাদের রাজনীতি আর ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। পরিণত হয় স্বাধীনতার সংগ্রামে।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করলাম স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো আমাদের বিজয়। আর থাকলো না কোন পাকিস্তানী দলনপীড়ন, থাকলো না কোন হানাদার, থাকলো না কোন হিংস্র দানব। বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ আমরা হয়ে গেলাম ভাই ভাই। আমরা স্বপ্ন দেখতে থাকলাম ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন জীবন যাপনের। কিন্তু ঠুনকো ও ক্ষুদ্র স্বার্থসংঘাত যেনো আমাদের পিছু ছাড়েনি। স্বাধীন সোনার বাংলাদেশে আবারো বিদেশী আধিপত্য ও ষড়যন্ত্রে ছায়া আবর্তিত হতে থাকলো। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আবারো শুরু হলো বিভাজন; রাজনৈতিক সংঘাত আর দ্বিধাবিভক্তি। অথচ আমরাতো সবাই একই দেশের মানুষ। কেন এ বিভাজন? তাই আমরা কোন বিভাজন চাই না। আমরা একটি সুখি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চাই। যেখানে আমার সন্তান থাকবে দুখে ভাতে, আমাদের সন্তানরা পাবে সোনালি স্বপ্নের ভোর। নিশ্চিত হবে আমাদের নিরাপদ ভষ্যিত। প্রতিষ্ঠিত থাকবে আমাদের বিশ্বাস, বজায় থাকবে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা।
আজ স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পেরিয়েছে। এখনো হতাশাগ্রস্থ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক সিপাহসালার। বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য আমাদের স্বদেশ জুড়ে। টিভি খুললেই ভিনদেশী চ্যানেলের আধিপত্য। বিনোদন মানেই ভিন্ন ভাষার গান-নাটক-সিনেমা। সংস্কৃতি মানেই অবিশ্বাসী ঘরানার মডেল। আজো আমরা তাকাতে পারিনি আমাদের বুকের দিকে। আজো আমাদের শেকড়ের প্রতি আস্থাবান হতে পারিনি। নিজেদের তাহযিব-তমুদ্দুন ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি এখনো আমাদের অবহেলা বিদ্যমান। এখনো আমরা মাথা উঁচু করে ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা বলতে ব্যর্থ হচ্ছি। অথচ স্বাধীনতা মানেইতো ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরে পাওয়া। স্বাধীনতা মানেই তো দেশের কল্যাণে নিজের কল্যাণ খোঁজা। স্বাধীনতা মানেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি। স্বাধীনতা মানেই বিশ্বাসের পতাকা হাতে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে সামনে এগিয়ে চলা। স্বাধীনতা মানেই তো আমার স্বদেশ আমার জীবন। স্বাধীনতা মানেই আমার সবুজ স্বপ্নের বিনির্মাণ। ছেলেহারা মায়ের মতো আজো আমরা দৃপ্ত শপথে সে পথেই চেয়ে আছি।
কষ্টের এ কথাগুলো উঠে আসবে মিডিয়ায়। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চরম উৎকর্ষতার শীর্ষে অবস্থান করছে। পৃথিবী এখন ছোট হতে হতে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এ সময় আমাদেরকেও সংবাদ ও তথ্য প্রযুক্তির দিকে অবশ্যই উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বর্তমানে সংবাদ মাধ্যমে গণসচেতনতা তৈরি যেমন সহজ হয়েছে তেমনি হলুদ সাংবাদিকতায় বিভ্রান্ত হবারও সুযোগ অনেক বেশি। বিভ্রান্ত ও মিথ্যা সংবাদের জন্য ঘটে যায় হাজারো বিবাদ; যা ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীন শাসনামল থেকে অধ্যাবধি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করে অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে। হলুদ সাংবাদিকতা ও বিভ্রান্ত সংবাদ এতটাই মারাত্মক যে, এজন্য সংবাদ সচেতন মুসলিম জনগোষ্ঠীও ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে ধাপে ধাপে বহুমূখী ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। বিশেষ করে অলীদ ইবনে উকবা রা. কর্তৃক প্রেরিত ভুল সংবাদের ভিত্তিতেই মহানবি স. বনি মুস্তালিক গোত্রের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। এছাড়া মারওয়ান কর্তৃক সংবাদ জালিয়াতির কারণে হযরত ওসমান রা. এর হত্যাকান্ড এবং একই প্রক্রিয়ায় কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন রা. এর পরিবারের হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে মিথ্যা ও ভুল সংবাদ পরিবেশনের প্রেক্ষিতে স্পেন বিজয়ী সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর, তারিক বিন যিয়াদ এবং সিন্ধু বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভাগ্যে জুটেছিল নির্মম পরিনতি, যা মুসলিম বিশ্বের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। গ্রানাডার মুসলমানদের নির্মম পরিণতি ও ‘এপ্রিল ফুল’সহ আধুনিক কালের হাজারো দুঃখজনক পরিনতির জন্য তথ্য বিভ্রাট ও হলুদ সাংবাদিকতাই দায়ী। এমনকি পলাশীর প্রান্তরে সিরাজউদৌলার পরাজয়ের মধ্যদিয়ে যেমন আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম তেমনি শহিদ তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, সাইয়্যেদ আহমদ ব্রেলভীসহ দেশপ্রেমিক সিপাহী জনতার হাজারো প্রচেষ্টা এবং গণসচেতনতার মাধ্যমেই এসেছিল ১৯০৫ সালের বাংলাবিভক্তিকরণ, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের স্বাধীনতা। অতঃপর গণমাধ্যমের গণসচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস এবং সচেতন জনগোষ্ঠীর আত্মদানের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। সে বাংলাদেশেকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সামগ্রিক সচেতনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানবিক মূল্যবোধ আর দেশপ্রেমে উজ্জীবিত সত্যিকারের সৎ- যোগ্য নেতৃত্ব। ইতিহাসের ধারাবাহিতকতার সূত্র ধরে আঁধারের ভাঁজ কেটে সে পরিবেশ ফিরে আসবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।