প্রথমদেখা ও শেষদেখার মধ্যেও এক অনন্তগামী আকাশ আমার মাথার উপর উদ্ভাসিত হয়েছিল। আমি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছিলাম। দীক্ষা নিচ্ছিলাম। আমার বোধের জাগরণ ঘটছিল মানবজীবনের বহুমুখী দরজায় উপনীত হওয়ার।
হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলতে চেয়েছি যিনি চলে গিয়েও থেকে গেলেন। আমরা যতদিন পৃথিবীতে আছি, ঠিক ততদিনই।

হাইস্কুলের গণ্ডি তখনও পেরোইনি। “কাফেলা” পত্রিকার পুরোনো সংখ্যা এবং নতুন সংখ্যা জোগাড় করে পড়ছি। যতই পড়ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। হ্যাঁ, মুগ্ধ হবার ওই একটিই কারণ— আবদুর রাকিব। তাঁর গল্প, তাঁর গদ্য, তাঁর আলোচনা আমাকে বিস্মিত করে তুলছে। শব্দ ও ভাষা ব্যবহারের জাদুতে আসক্ত হচ্ছি। বাংলাসাহিত্যকে ভালবাসতে শিখছি।

জীবনের প্রথম থেকেই চোখ খুলে দেখার এবং হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করার পথটিতে তো তাঁর কাছেই দীক্ষা নিয়েছি। প্রথমত বুঝেছি, তিনি একজন বড়ো মানুষ ; দ্বিতীয়ত মরমি লেখক। মানুষের মূল্যবোধ কীভাবে রক্ষা করা যায়, বা কীভাবে মূল্যবোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলা যায় তা তাঁর প্রতিটি গল্পেরই বিষয় ভাবনা। মানুষকে ভালবাসতে ধর্মাচরণ যে কোনোমতেই অন্তরায় নয়, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক অবক্ষয়, অন্ধকুসংস্কার যতই মানবজাতির সততা ও সহিষ্ণুতাকে হত্যা করুক না কেন, তার মধ্যে যে ভালো গুণও বর্তমান এটাই দেখাতে পেরেছেন। তাই সর্বহারার মধ্যেও কোথাও কিঞ্চিৎ শুভবোধ জেগে ওঠে। আবার সে মহান মানবিকতার মূলস্রোতে ফিরতে চায়। এগুলিই তো পড়েছিলাম আমার স্কুলজীবনের দিনগুলিতে।

প্রথম দর্শনেই মানুষটিকে দেখেছিলাম স্নেয়ময় আন্তরিক এক পিতার মতো। একটি কবিতার খাতা নিয়ে গেছিলাম তাঁর কর্মস্থল বোখারা হাজি জুবেদ আলি বিদ্যাপীঠে। অচেনা, লাজুক, ভীষণ কাঁচা এক কিশোরের প্রায় কুড়িখানেক কবিতার খাতাটি তিনি আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করে কয়েকদিন পরেই ফেরত দিয়েছিলেন। প্রতিটি কবিতার নিচে মন্তব্য লিখে, কয়েকটি শব্দ পাল্টানোর পরামর্শ দিয়ে নতুন কী শব্দ লিখলে ভালো হয় তাও উল্লেখ করতে ভোলেননি। খুব মনে পড়ছে, আমি একটি কবিতায় লিখেছিলাম এরকম একটি লাইন:
“রাধিকার অশ্রু ঝরে বৃন্দাবন জুড়ে”
তিনি মন্তব্যে লিখে দিয়েছিলেন:
“সকিনার অশ্রু ঝরে মরু-কারবালায়”
আর একটি কবিতায় শীতের পটভূমিতে একটি চিত্রকল্পের কথা এভাবে লিখেছিলাম:
“চাঁদ একা ডুবে যায় কুয়াশায়
রাস্তায় শুধু ঘেউ ঘেউ”
তিনি পরিবর্তন করে লিখে দিয়েছিলেন:
“চাঁদ ডুবে গেলে অন্ধকার
রাস্তায় কুকুর কুণ্ডলী”

কবিতার খাতাটি ফেরত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। অনুভব করার এবং দেখার যে একটা নিজস্বতা আছে তা বলেছিলেন। এই সম্ভাবনা যে একদিন পূর্ণতা পাবে এই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎবাণী।

সেই আশির দশক থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর সঙ্গে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান। নানা বিষয়েই তাঁর অভিমত বা সম্মতি জানতে চাইতাম। কবিতা তিনি লিখতেন না ঠিকই, কিন্তু কবিতা বিষয়ে শেষকথাটি তিনিই বলতে পারতেন। দশটা কবিতা পড়ে একটা কবিতা লিখতে বলতেন। ছন্দ বিষয়ে পরিপক্ক হতে বলতেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শোষণ ক্ষমতা ও ধারণ ক্ষমতা কতখানি তা জানতে সাহায্য করতেন। বীরভূমের সমসাময়িক কবিদের কথাও তুলে ধরতেন। বেশ কয়েকটি সভায় তাঁর মুখ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। রাজগ্রাম, মুরারই-এর সাহিত্য অনুষ্ঠানে তিনি বেশিরভাগ সময়ই উপস্থিত থাকতেন। যে-কোনো বিষয়ে অনর্গল বলার ক্ষমতা দেখে অবাক হতাম। শেষ অনুষ্ঠানটি ছিল জয়দেব-কেন্দুলির ভক্তিভবনে। বিষয় ছিল : “লোকগানে লোকশিক্ষা”। এ-বিষয়টিও এমন তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি তুলে ধরেছিলেন যে, একজন গবেষককেও তাঁর বক্তব্যের কাছে শিশু মনে হয়েছিল। কোনো তথ্যপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয়ও তিনি সহজ ও সাবলীলভাবে তুলে ধরতে পারতেন। তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্রটির বিশাল ব্যাপ্তি উপলব্ধি করতাম। শব্দের ব্যুৎপত্তি, ব্যঞ্জনা, বিদেশি শব্দের প্রয়োগ প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যাখ্যা করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক কাজি নজরুল ইসলাম বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন “সাহিত্য অনুরাগী নজরুল” নামে। এটি দেখেই তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেননা, নজরুল একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক; সাহিত্য অনুরাগী নন। এইরকম বিভ্রান্তিমূলক অযোগ্যতায় ভরা আজকের সাহিত্যজগৎ। বাংলা শব্দের বানান ও প্রয়োগ বিষয়ে তিনি ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিলেন। অনেক প্রুফরিডার তা বুঝতে পারতেন না। পুনরায় তাঁর দ্বারস্থ হতেন। তাদের দীনতা ছিল হাস্যকর। এসবও অনেক সময় আমাকে বলতেন। তিনি একবার বললেন : “’শা-লা’ শব্দটি আমি জীবনে উচ্চারণ করিনি।” নিজেও এভাবে বানান করলেন : “তালব্য শ-এ আকার ল-এ আকার।” শুধু একটি বিষয়েই তাঁর আফসোস ছিল, নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি প্রবন্ধের বই লিখেছিলেন। তার পাণ্ডুলিপিটি হরফপ্রকাশনী থেকে হারিয়ে যায়। তা আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

শ্বেতশুভ্র মানুষটি ছিলেন আগাগোড়া এক পবিত্রতম দেবদূতের মতো। কখনও মালিন্যের চিহ্ন তাঁর চেহারায় ফুটে ওঠেনি। পার্থিব আসক্তি তাঁর ছিল না বলেই খুব বিষয়ীও হতে পারেননি। আত্মীয়স্বজনদের মৃত্যুশোক লুকিয়ে রেখেই নিজেকে প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করতেন। তবে মরমি হৃদয়ে যে ক্ষরণ হত না তা নয়। তাঁর গল্পগুলিতে তা টের পেতাম। নিজের লেখাগুলি বা বইগুলি প্রচারের মোহ তাঁর ছিল না বললেই চলে। কখনোই বলতেন না তাঁর বই কাউকে কেনার জন্য। শুনেছি “প্রতিকূলে একজন” বইটি প্রকাশের পর কিছু কপি সঙ্গে এনে তিনি পরিচিত জনদেরও দিতে চাননি। “চারণকবি গুমানি দেওয়ান” বইটি আমার খুব ছোটবেলায় পড়া একটি বই। বাড়িতে বইটি সংরক্ষিত ছিল না বলে ২০১২ সালে তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম বইটির খোঁজে। মাত্র একটিই কপি তাঁর কাছে ছিল। সেটি নিয়ে “আমার জীবনের পঠিত সেরা বই” নিয়ে লেখার উদ্দেশ্য ছিল। লিখেছিলামও দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ “পূর্ব” পত্রিকায়। কিন্তু আবদুর রাকিব সাহেবের “ছায়ানট” বাড়ির আতিথেয়তা ভুলতে পারব না। সমস্ত কুশল জিজ্ঞাসা করা এবং বর্তমানে আমি যে তাঁরই বিগত কর্মস্থলে শিক্ষকতা করছি তা শুনে তিনি ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন। প্রায় সারাদিনই তাঁর সঙ্গে ছিলাম সেদিন। পেয়ালা ভরা ফিরনি খাওয়া, চা পান করা এবং শেষে একসঙ্গে বসে ভাত খাওয়া যে কত আনন্দের ছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। বহুবার তাঁর বাড়ি এসেছি, কিন্তু একসঙ্গে বসে এভাবে খাওয়া দাওয়া করিনি। মনটা সেদিন যেন অনেককিছু পেয়েছিল। এক অদৃশ্য শক্তির স্পর্শ উপলব্ধি করেছিলাম। আর একদিন, মৃত্যুর প্রায় সপ্তাহখানেক আগে জয়দেব-কেন্দুলি একসঙ্গে যাওয়ার সময় পথে মহম্মদ বাজারে একটি মিষ্টির দোকানে বসে ক্ষীরমালাই খেয়েছিলাম। খেতে খেতেই তিনি আমাকে আশ্চর্য সংবাদটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন :
“এ বছর নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছ, আর আমার হাত দিয়েই এই পুরস্কার দেওয়া হবে তোমাকে।”
আনন্দে আমার মুখটি রাঙা হয়ে গেছিল। বাক্-রুদ্ধ হয়ে গেছিলাম। মিনমিন করে বলেছিলাম:
আমি তো পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নই! কী এমন লিখেছি যে আমাকে ওরা নির্বাচন করেছেন?
রাকিব সাহেব হাসি হাসি মুখে বলেছিলেন:
“আরও আগে এই পুরস্কার তোমাকে দেওয়া উচিত ছিল। তোমার “আত্মক্ষরণ” ও “আত্মসংগ্রহ” পড়ে আমি চমকে গেছি।” নিজের সম্পর্কে আর বেশি কিছু শুনতে চাইনি আমি। শুধু বলেছিলাম: একসাথে যাব কলকাতা নতুন গতির অনুষ্ঠানে। ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠব। কিন্তু দুর্ভাগ্য ততদিন তিনি আর এই পৃথিবীতে রইলেন না।

মানুষের পরিচয় তার জাত-ধর্মে নয়, মানবিকতায়; দেশকে ভালবাসায়; অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোতে এটাই তিনি বার বার বলতে চেয়েছেন। একনিষ্ঠ ধর্ম পালন করেও তিনি কখনোই সংকীর্ণ মনোভাব পোষণ করেননি। বৃহত্তর মানব কল্যাণের ব্রত ছিল তাঁর। আর সেই কারণেই তিনি সকলেরই প্রিয়জন, নমস্যব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। চাকুরি জীবনের প্রথম দিকে তিনি যখন একেবারে তরতাজা যুবক, তখন একদিন বিদ্যালয়ে ক্লাস করা কালীন একজন অতি সাধারণ মানুষ ঘাড়ে গামছা নিয়ে গেটের কাছে হাত জোড় করে দাঁড়ান। রাকিব সাহেব জিজ্ঞাসা করেন: “এসময় কেন এসেছেন?”

লোকটি নত মস্তকে বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা করেন কয়েক মিনিট সময়ের জন্য। বলেন: “আমার ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে। সাতদিন থেকে স্কুল আসতে পারে না। জ্বরের কারণেই তার অবস্থা খুব খারাপ। শুধু বার বার আপনার নাম করছে একটিবার দেখার জন্য।”

রাকিব সাহেব সেদিন খুব অবাক হয়েছিলেন। অসুস্থ হলে মানুষ তার মা, বাবা, ভাই, বোন ইত্যাদি প্রিয়জনদের দেখতে চায়। কাছে পেতে চায়, কিন্তু একজন শিক্ষককে কেউ কি দেখতে চায়?

যাইহোক, সেদিন বিকেলেই তিনি একখানা সাইকেল নিয়ে পাঞ্জাবি ও পা-জামা পরে বের হন ছেলেটির বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু একী! মুর্শিদাবাদের এই গ্রামটিতে এত গরিব মানুষ বসবাস করে তা তাঁর ধারণার বাইরে ছিল। শীতের সময় সব নারী-পুরুষ রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে চট পেতে বসে বিড়ি বাঁধছে। অধিকাংশ ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করছে। তাদের কারও পরনে সামান্য পোশাক, কারও তা একেবারে নেই। উসকো খুসকো ম্লান চেহারা। তাঁকে দেখে সবাই কৌতূহলী হয়ে ছুটে আসছে। তাদের সামনে দিয়ে তিনি আর সাইকেল চালাতে পারলেন না। পা-জামা, পাঞ্জাবি পরা পোশাকে তিনি লজ্জা বোধ করতে করতে সেই ছেলেটির ভগ্ন মাটির বাড়িটি খুঁজে পেলেন। গিয়ে দেখলেন, ছেলেটির গায়েও ভীষণ জ্বর। হয়তো সে কিছুক্ষণ পরেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। তবু তার প্রিয় স্যারকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে বললে : “জানেন স্যার, কতদিন থেকে আপনাকে দেখার জন্য আমি ছটফট করছি। আজ না এলে আর দেখতে পেতাম না!”

রাকিব সাহেব ছেলেটির কপালে ও মাথায় হাত দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা আর খুঁজে পেলেন না। তাঁর চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শুধু বললেন: “আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন!” তাঁর মুখে এসব কথা শুনতে শুনতে আমরা স্থির থাকতে পারিনি। আর একদিন বললেন : “মানুষের অভাব কী তা আমি দেখেছি। ষাট-সত্তরের দশকে আমাদের গ্রামে এত অভাবী মানুষ ছিল যে, সারাদিন অনাহারেই তাদের থাকতে হত। দিনান্তে হয়তো একটি পাকা তালের আঁঠি চুষেই কাটাচ্ছে ।”
কিন্তু সেই অভাব যে আর নেই তা আমরাও জানি। তবু যে মূল্যবোধ, যে মনুষ্যত্ব তিনি সে যুগে দেখেছিলেন, এযুগে তা বিরল বইকি!

সৌভাগ্যবশত আমি তাঁর কর্মস্থল বোখারা হাজি জুবেদ আলি বিদ্যাপীঠের সহশিক্ষক হিসেবে ২০১২ থেকে যোগদান করি। প্রায় ২৪ বছর বয়স থেকেই তিনি এই বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক ছিলেন। এখান থেকেই প্রথম যৌবনের সংরাগে “চারণকবি গুমানি দেওয়ান” বইটি রচনা করেছিলেন। যে বইটি আজও বাংলা সাহিত্যে একটি অদ্বিতীয় সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হবে। এই বইটির উপাদান সংগ্রহ করতে তিনি ১৯৬৪ সাল থেকেই চারণকবি গুমানি দেওয়ানের কাছে যেতেন। জিনদিঘি গ্রামটি ছিল গুমানি দেওয়ানের গ্রাম। স্কুল ছুটির পর ঘাড়ে একটি ব্যাগ নিয়ে আর একটি সাইকেল চেপে রওনা দিতেন। কোনো কোনো সময় উপস্থিত হতেন চারণকবির গানের আসরেই। সবকিছু লিখে আবার কবির কাছে গিয়ে শোনাতেন লেখাটি ঠিক হয়েছে কিনা। এইভাবেই কঠোর পরিশ্রমে বইটি প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে হরফ প্রকাশনী থেকে। তিনি ওই সময়ে গুমানি দেওয়ানের তেজস্বিতা বাগ্মিতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তা বোঝা যায়। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বললেন : “সেই সময়ে কীভাবে যে বইটি লিখেছি আজ তা ভেবেও অবাক হই। রসদ সরবরাহ করার জন্য আমি রাত জেগেছি। নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত ভুলে গেছি। গুমানি দেওয়ানের সুরের লহরি আমার হৃদয়কেও উদ্বেল করে দিত। জানি না বইটি এত জনপ্রিয় হবে!”

এসব কথা বলতে বলতে তাঁর মুখখানা রাঙা হয়ে যেত। বাংলা সাহিত্যে এরকম বই আর দ্বিতীয়টি নেই বলেই আমার মনে হয়। আমি স্রষ্টার কথা শুনতে শুনতে পুলক অনুভব করতাম। রাকিব সাহেবের সহকর্মীদের মুখে তাঁর শিক্ষকজীবনের অনেক কথা শুনতে পাই। ক্লাস করার সময় ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে তিনি নিত্য নতুন অভিনব পন্থা অবলম্বন করতেন। যে বিষয়টার পাঠদান করতেন তা বইয়ে পড়ার দরকার হত না। এখনও বহু ছাত্রছাত্রী তাঁদের প্রিয় শিক্ষককে মনে রেখেছেন। আমিও এই বিদ্যালয়ে তাঁর অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করি। যে চেয়ারটিতে তিনি বসতেন, যে ব্ল্যাকবোর্ড তিনি ব্যবহার করতেন, যে ক্লাসরুমে বেশি সময় কাটাতেন তা প্রতিটি মুহূর্ত আমি যাপন করি। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অভয় দিচ্ছেন। উৎসাহিত করছেন। তাঁর এই ছায়াময় নিঃশব্দ চলাচল আমাকে সচকিত করে। সত্য ও ন্যায়ের, শ্রম ও নিষ্ঠার কাছে দায়বদ্ধ করে। তিনি বলতেন : “আমার শিক্ষকসত্তাকেই আমি সর্বদা এগিয়ে রাখি। লেখকসত্তা তারই বাইপ্রোডাক্ট।” একথা আমিও বিশ্বাস করি। বাতাসে শ্বাসপ্রশ্বাস চলাকালীন মনে মনে ভাবি : এই বায়ু তো রাকিব সাহেবও গ্রহণ করেছিলেন। কবিতার শব্দ ও ছন্দ উচ্চস্বরে পড়ার সময় মনে হয় : এসব তো তিনিও পাঠ করেছিলেন। চোখের সম্মুখে তাঁকে পাই না, কিন্তু উপলব্ধির জগতে তাঁর অবাধ এই গতিসঞ্চার ঘটেই চলে।

মৃত্যু কতদূর নিয়ে যায় মানুষকে জানি না, কিন্তু মৃত্যুর পরই একজন স্রষ্টার পথ চলা শুরু হয়। রাকিব সাহেব তাঁর গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ এবং প্রবন্ধ যা লিখে গেছেন, সেগুলির যথাযথ মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। তাঁর ভাবনা ও বিশ্বাসগুলি আমরা তাঁর সৃষ্টিতেই খুঁজে পাব। তাঁর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, যাদের আমরা নানা স্মৃতিচারণা করতে শুনি, তারা এখনও তাদের রাকিব সাহেবের ছাত্রছাত্রী বলেই মনে করেন। সমাজে সংসারে পথে ঘাটে এখনও তারা রাকিব সাহেবকেই মনের মন্দিরে পেয়ে যান —এটা কি কম কথা? শিক্ষক হিসেবে তো তখনই সফল হতে পারেন, যখন ছাত্রছাত্রীরা তাদের জীবনযাপনে আদর্শ করে তোলেন। যে শিক্ষক চরিত্র গঠনে, সামাজিক মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে এবং সংসারে আদর্শ অভিভাবক হয়ে উঠতে সাহায্য করেন এবং অনুকরণযোগ্য করে তোলেন —এটাই হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষাদান এবং তিনিই প্রকৃত শিক্ষক। রাকিব সাহেব তা পেরেছেন, বলেই জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তিনি তাঁর শিক্ষকজীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা স্মরণ করেছেন। শিক্ষক হিসেবেই পরিচিতি পেতে চেয়েছেন। “পথপসারীর পত্রোত্তর” বইটি সেই মূল্যবোধেরই আকর বলা যেতে পারে। তাঁর আদর্শ, তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর মনুষ্যত্বের পরিমাপ করা সহজ হয় পাঠকের কাছে।