শায়খুল হাদীস ফখরুদ্দীন (রহ) ছিলেন আমার প্রিয় মানুষদের মধ্যে অন্যতম। মনে পড়ে সেই ১৯৯২ ইং আমার বাবা মরহুম মাওলানা ইরশাদ হোসেন ছিলেন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসার হোস্টেল সুপার। সেই সুবাদে আমরা মাদরাসার ভিতরে হোস্টেল সুপারের বরাদ্দকৃত টিন সেডের সেই পুরাতন বাসায় বসাবাস করতে লাগলাম। তখন হতে আল্লামা ফখরুদ্দীন (রহ) চাচার সাথে পরিচয়। তাকে আমি চাচা বলে ডাকতাম। তিনি উত্তম আদর্শ ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী সুমহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। নম্রতা ও বিনয়বনতা, দানশীলতা, তাকওয়া ও পরহেজগারী প্রভৃতি গুণাবলীতে তিনি ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ। ব্যবহার ছিল অমায়িক, সুমধুর এবং নিরহংকার। কোন দিন তাঁকে বংশীয় ঐতিহ্য এবং ইলমের বাহাদুরী করতে শুনি নাই। তিনি সত্য ভাষী, সহিষ্ণু, ধৈর্যশীল এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন। যাই হোক আর তিনি থাকতেন আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষের জন্য বরাদ্দকৃত বাসায় একটি কক্ষে থাকতেন। (তখন তিনি ছিলেন সহকারী অধ্যাপক।) আমি ছিলাম ইন্টারমেডিয়েট ছাত্র। আল্লামা ফখরুদ্দীন (রহ) ছিলেন মাদরাসার বিভিন্ন প্রকার অফিসিয়াল (ক্লারিকেল) কাজে অত্যন্ত দক্ষ কর্মকর্তা।আমার নাম বাছিত। ওনি আমাকে বাসেত বলে ডাকতেন।ওনাকে অফিসিয়াল কাজে সাহায্য করতে আমাকে রাতের বেলা প্রায় সময় ডাকতেন।

মাদরাসার বিভিন্ন আয়-ব্যয়ের হিসাব ওনি চেয়ারে বসে রেজিস্ট্রারে কোথায় এবং কিভাবে লিখতে হবে তা বলতেন। আর খরচের ভাউচার কিভাবে করতে হবে সেইগুলো বলতেন। আমি এসব কাজে প্রায় সময় তাকে সহযোগিতা করতাম। ওনি আমাকে বলতেন “বাসেত এসব কাজ একদিন তোমার কাজে লাগবে “। চাচা হুজুরের কথাগুলো সত্যিই হলো। লেখাপড়া শেষ করার পর যখন সরকারি প্রশাসনিক অফিসে চাকুরী পাই। ১৪ বছর চাকুরী করি। মরহুম চাচার সেই অফিসিয়াল নির্দেশনা মতে আমি দক্ষতার সাথে চাকুরী করি। পরবর্তী জীবনে আমেরিকায় পাড়ি দিই।

আল্লামা ফখরুদ্দীন (রহ) রাতের বেলাও ওনার রুমে হাদীস দরস দিতেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ ও সফল শিক্ষক। শিক্ষক সমাজে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন একজন আদর্শ শিক্ষক। ছাত্র সমাজের কাছে একজন প্রাণপ্রিয় মান্যবর উস্তাদ। অনেক দূর থেকে ছাত্ররা রাতের বেলা শিক্ষা গ্রহণ করতেন। যে কেউ তাঁর সাথে যে কোন ধরনের ইলমী কথা বলতে পারতেন, এতে তিনি বিন্দুমাত্র বিরক্তিবোধ করতেন না। তবে বাজে কথা কম বলতেন। তিনি বেশী পরিমাণ পান খেতেন। একদিন ওনার কক্ষে ৩/৪ জন হাদীস দরস নিচ্ছেন। সেই সময় এক ছাত্রকে বললেন “যাতা” (সুপারী কাটার জন্য ব্যবহৃত হয়) টি দাও। সিলেটী ভাষায় “যাতা” কে “সুরতা” বলি।আর “যাতা” কে বুঝি আমরা ‘নিচের দিক দিয়ে কোন কিছু আটকানো কে’। সেই অনুসারে স্টাপলার মেশিন দিলো। চাচা কিছুটা মুচকি হেসে বলল আরে বোকা সুরতা’র কথা বলেছি।

আমার আব্বা মরহুম মাওলানা ইরশাদ হোসেন (রহ) একজন সরল শিক্ষক ছিলেন। কোন প্রকার সমস্যায় পড়লে ফখরুদ্দীন চাচার কাছে পরামর্শ চাইতেন। চাচা হুজুর খুবই রসিক ছিলেন। চাচা হুজুর কথা বলার সময় ঠাট্টা স্থলে কিছু বললে আব্বা মনে করতেন চাচা ধমক দিয়েছেন। পরদিন ঠিকই দেখা যেতো চাচা বাবাকে পাশে বসিয়ে কথা বলছেন এবং আগের দিন যা বলেছিলো তা কিছুই নয়। চাচা হুজুর আব্বার শুধু কলিগ নয় ভালো বন্ধু ছিলেন। আল্লামা ফখরুদ্দীন (রহ)’র কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, উসুল, আরবী, উর্দু ও ফার্সি ইত্যাদি ইসলামী শিক্ষা সহ ফরায়েজ শাস্ত্রের অগাধ পান্ডিত্যের কথা আব্বা আমাদের সাথে শেয়ার করতেন। এমন কি চাচা হুজুরের প্রশাসনিক দক্ষতা ও আলিয়া মাদরাসার উন্নয়নে ভূমিকা সহ বিভিন্ন স্মৃতিগুলি।

চাচা হুজুর গরমের দিনে পাতলা শাল কিংবা কেতা মুড়িয়ে ফ্যান চালিয়ে ঘুমাতেন। একদিন তাকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেসা করলে চাচা বলেন, “বাসেত এইভাবে না ঘুমালে আমার ঘুম আসে না”। তবে চাচার পাশে সব সময় কিতাব থাকতো। আসলে তিনি কিতাব পড়তে পড়তে ঘুমাতেন।
১৯৯৪ সালে যখন নতুন বাড়ী করে অন্যত্র চলে যায়, তখন থেকেই চাচার আর দেখা কিংবা সাক্ষাৎ হয়নি। অবশ্যই পরে জানলাম চাচা সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি হয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন। সেই ১৯৯২ সাল হতে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত চাচার অনেক মিশার ও জানার সুযোগ হয়েছে। সাত সমুদ্র ও তের নদী পেরিয়ে আমেরিকায় বসে চাচার কথা অনেক মনে পড়ে।

আজ আমার আব্বা ও চাচা হুজুর তারা দুজন আর নেই। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে চিরদিনের জন্য সাড়া দেন। আল্লাহ পাক তাদের দু’জনকে জান্নাতুল ফেরদাউসের আলা ইল্লিয়িনে মর্যাদাপূর্ণ স্থান নসীব করুন।