[আজ ১৭ মার্চ মঙ্গলবার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী। সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে মুজিব জন্মশতবর্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশ্য করোনাভাইরাস সংক্রমণের বৈশ্বিক শঙ্কার প্রেক্ষাপটে আজকের প্রধান অনুষ্ঠানসহ জনসমাবেশ সম্পৃক্ত অনুষ্ঠানগুলো স্থগিত করতে হয়েছে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি বই প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এর নাম ‘আমার দেখা নয়াচীন’। তার জন্মদিবসে বইটি থেকে একাংশ উদ্ধৃত করা হলো।]

“প্লেনগুলো ছোট হলেও বেশ আরামদায়ক। ২১ জনের বসার ব্যবস্থা আছে। আমাদের খাওয়ার বন্দোবস্ত প্লেনের মধ্যেই ছিল। আমরা মাঝে মধ্যে চা ও শরবত খেতে খেতে বেলা ৫টার সময় পিকিং অ্যারোড্রামে পৌঁছলাম। সেখানেও আমাদের অভ্যর্থনা করা হলো, ছোট ছেলেমেয়েরা আমাদের ফুলের তোড়া উপহার দিলো। পশ্চিম পাকিস্তানের মাজাহার, লাহোরের দৈনিক পাকিস্তান টাইমস কাগজের সম্পাদক, আগেই পিকিং পৌঁছেছিলেন। তিনিও আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য উপস্থিত ছিলেন। তাকে দেখে আমরা খুব আনন্দিত হলাম। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যারা আমরা গেছি তার মধ্যে আমার সাথেই তার পরিচয় ছিল।
আমাদের অ্যারোড্রামেই চা খাওয়ান হলো। তারপর গাড়িতে চড়ে আমরা পিকিং শহরে চললাম। দুনিয়ার নামকরা এই শহর। বহু ঝড় গেছে এর ওপর দিয়ে। বহু রাজার রাজধানী ছিল এই শহর। বহু বিদেশী এই শহরটি অনেকবার অধিকার করেছে। শেষবারের মতো জাপানিরা এই শহরটা অধিকার করে- যখন চীন-জাপান যুদ্ধ হয়। তারপর চিয়াং কাইশেকের হাতে ছিল। শেষে, নয়াচীন সরকার মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে এই শহরটা অধিকার করে রাজধানী বানায়। দেখার আকাক্সক্ষা বেড়ে চলল, মনে হলো কখন পৌঁছব, আর তো দেরি সয় না! সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় আমরা পৌঁছলাম। আমাদের জন্য কামরা ঠিকই ছিল। পিকিং শহরের শ্রেষ্ঠ হোটেল- যার নাম ‘পিকিং হোটেল’, সেখানে আমাদের রাখা হলো। ভারত থেকে যারা যোগদান করতে গেছেন তারাও ওই হোটেলে আছেন। হোটেলটা পাঁচতলা, খাবার ব্যবস্থা উপর তলায়। আরো অনেক দেশের ডেলিগেট এই হোটেলে ছিলেন। পীর মানকি শরিফকে এক রুম দেয়া হয়েছে। আর প্রায় সবাই দুইজন করে এক রুমে। আমরা ইচ্ছা করেই তিনজন এক রুম নিলাম। আতাউর রহমান সাহেব, মানিক ভাই ও আমি। আমাদের কামরায় আমাদের মালপত্র হাজির। যার যার বিছানায় বসলাম।
রাতে আমাদের পাকিস্তান ডেলিগেটদের সভা হবে, খাবার পরেই। পীর সাহেব বলে দিয়েছেন- মুসলমানের পাক খাবেন, তাই আমাদের জন্য এক মুসলমান হোটেলে খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। রাতে সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের, ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভ্যর্থনা জানাল। আমরা ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’ বলে উত্তর দিলাম। তাদের সাথে গল্প শুরু করলাম, মনে রাখবেন- দোভাষী আমাদের সাথে আছে, না থাকলে আমরা বোবা।
আমাদের টেবিলে সাংহাইয়ের দৈনিক ইংরেজি খবরের কাগজের সম্পাদক বসলেন। তিনি আমাদের কথা ওদের বুঝিয়ে দেন। আবার ওরা যা বলে তা আমাদের বুঝিয়ে দেনÑ এক কথায় তারা বলল, আমরা খুব ভালো আছি। এখন আর অত্যাচার হয় না। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হয় না। পরে আলোচনা করা যাবে। খাবার যখন আমাদের সামনে হাজির করা হলো তখন আমাদের অবস্থা কাহিল। কী করে এগুলো খাবো! পাক প্রায় সব সম্প্রদায়ই নিজেদের মতো করে। কেউ গরু খায়, আর কেউ শুয়োর খায়। আমাদের জন্য গরুর গোশতের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কিন্তু খেতে পারলাম না। যা খেলাম তার জন্য সারারাত পেটে তেল লাগাতে হলো। মাঝে মধ্যে পেটের ভেতর গুড়ুম গুড়–ম শব্দ শুরু করতে আরম্ভ করল, আর চাপা চাপা বেদনা শুরু হলো। যা হোক, ফিরে এসে টেবিলের উপর দেখি কিছু ফল আর সিগারেট। ফল ও সিগারেট খেয়ে শুয়ে পড়লাম। অনেক কষ্টে রাত কাটল। আমাদের কনফারেন্স পরের দিন থেকে শুরু হবে।
সকালে রুমেই নাশতা করলাম। ডিম-মাখন-রুটি-চা, ফলফলাদি। দুপুরে আবার সেই হোটেলে নিয়ে যাওয়া হলো। আবার সেই দশা। খোঁজ নিয়ে জানলাম, আমরা যে হোটেলে থাকি তার উপরেই ভারতীয়দের জন্য খাবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের লোকও সেখানে খায়। উপরে ইউরোপীয়ান খাবার দেয়া হয়। যার জন্য যা বলা হয় তাই রান্না করে দেয়। এর মধ্যে ভারতীয় প্রতিনিধিদের অনেকের সাথে আমাদের আলাপ হলো; বিশেষ করে বিশিষ্ট লেখক মনোজ বসুর সাথে। লেখক মানুষ, ব্যবহার অতি চমৎকার। কথায় কথায় ‘ভাই’ ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করে, পরে আমার সাথে খুব ভালোবাসা হয়ে গেল। দূর দেশে বাঙালি, আবার লেখক, গুণী মানুষ, তার কাছে বাংলা ভাষার মতো ভাষা দুনিয়ায় আর নেই। তার কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘দাদা, আপনারা কোথায় ভাত খান?’ তিনি বললেন, ‘কেন, উপরে, চিংড়ি মাছ পাক করে দেয়। ডিম, মুরগির গোশত, সমুদ্রের মাছ, ডাল যা বলবেন সব দেয়।’ মানিক ভাই আগেই বলে দিয়েছেন, আমি আর ও হোটেলে খেতে যাবো না, উপরে খাবো। আস্তে আস্তে আমরা সবাই পীর সাহেবের কাছ থেকে কেটে পড়লাম। পরে দেখা গেল, পীর সাহেব ছাড়া আমরা সবাই উপরে খাওয়া আরম্ভ করলাম। উপরে ভারতীয় ও পাকিস্তানি পাক শুরু হয়ে গেল। ফলের অভাব নেই, যথেষ্ট আয়োজন আমাদের জন্য চীন শান্তি কমিটি করেছে।
মানিক ভাইয়ের কথা কিছু না বললে অন্যায় হবে। মানিক ভাই যে, এত খেতে পারেন সে ধারণা আগে আমার কোনো দিন ছিল না। হয়তো কোনোদিন একটা মুরগিই খেয়ে ফেলে, সাথে সাথে ডিম, মাছ, ফলফলাদি, বসে বসে শুধু খায় আর খায়। মানিক ভাই বলেন, ‘বেশি কথার কাম নাই। খাবার সময় গোলমাল করো না। চুপচাপ খাও, সময় পাওয়া গেছে। দেশে লীগ আমলে কী খেতে পাই, মনে নেই।’ রুমে ফিরে এসে আমি, আতাউর রহমান সাহেব ও মানিক ভাই খুব হাসাহাসি করতাম, মানিক ভাইয়ের খাওয়া নিয়ে। আমি আর আতাউর রহমান সাহেব মানিক ভাইয়ের পেছনে লেগেই থাকতাম।
“শান্তি সম্মেলন শুরু হলো। প্রথমেই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ম্যাডাম সেন তার বক্তৃতা পড়ে শোনালেন। নয়াচীনের পিতা সান ইয়াৎসেনের নাম আপনারা জানেন, যিনি দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেন। বিদেশীদের দেশ থেকে তাড়াইয়া দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু গড়ে যেতে পারেন নাই। তার পূর্বে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। ম্যাডাম সান ইয়াৎসেন তারই স্ত্রী।
চিয়াং কাইশেকের নাম আপনারা সকলে জানেন- যিনি সান ইয়াৎসেনের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। এবং দুই নেতা দুই বোনকে বিয়ে করেছিলেন। ম্যাডাম সান ইয়াৎসেন, চিয়াং কাইশেকের স্ত্রীর বড় বোন। দুঃখের বিষয়, দেশের সাথে স্বামী-স্ত্রী বেইমানি করেছিল বলে আর দেশে যেতে পারে না। জনগণ তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই ফরমোজা দ্বীপে আমেরিকান সাহায্য নিয়ে কোনো মতে বেঁচে আছে। মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়ে, কিন্তু কেহ গ্রাহ্য করে না। কারণ, সকলেই জানে, দেশের থেকে বিতাড়িত আমেরিকার দালাল।”
“ম্যাডাম আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি জানালেন, আমরা শান্তি চাই। বহু ঝড়ঝাপটা আমাদের দেশের ওপর দিয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ লোক যুদ্ধে মারা গেছে। সোনার দেশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আরো বললেন যে, আপনাদের জন্য বিশেষ কিছু করতে পারি নাই। সে জন্য ক্ষমা করবেন। আরো অনেক কিছু বললেন।”
“আমি ভাবলাম, এত যত্ন তবু যদি ‘কিছু’ না হয় তবে আবার কী? একটা কথা আপনাদের বলতে ভুলে গেছি। আমরা ৩৬৭ জন ডেলিগেট, ৩৭ জন পর্যবেক্ষক, ২৫ জন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধি ৩৭টা দেশের থেকে সেখানে যাই। কিন্তু এত লোকের থাকার জায়গা হঠাৎ দেয়া কষ্টকর মনে করে চীন সরকার জনসাধারণকে অনুরোধ করল যে, বিদেশ থেকে তোমাদের অতিথি আসবে তাদের জন্য একটা চারতলা দালান করতে হবে। সমস্ত লোক ঝাঁপাইয়া পড়ল, ৭০ দিনে বিরাট চারতলা এক দালান করে ফেলল। তা দেখে তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! আমরা দেখি, সরকারি কাজ কন্ট্রাক্টার সাহেবরা আস্তে আস্তে করেন। অনেক কিছু কারুকার্য হয়। যত অল্প পয়সায় কাজ হবে ততই তাদের লাভ হবে ইত্যাদি।
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, জনসাধারণ ঝাঁপাইয়া পড়ল কেন? জানলাম, জনগণ ভাবে, এটা তাদের কাজ। তাই তারা যে যতদিন পারে খেটে দেয়, কারো ওপর জোর নাই। আমাদের রাষ্ট্রদূত বললেন যে, সাত দিন তার কোনো চাকর ছিল না। কারণ জাতীয় সরকার ডাক দিয়েছে, দেশের কাজে তাদের সাহায্য করা কর্তব্য। তাই তারা রাষ্ট্রদূতকে বলে চলে গেল। রাষ্ট্রদূতের বেগম সাহেবার নিজেরই রান্না করে খেতে হয়েছে।
কনফারেন্সে ম্যাডাম সান ইয়াৎসেনের বক্তৃতার পরে চীন শান্তি কমিটির সভাপতি কমরেড কো. মো. জোর লেখা বক্তৃতা পড়লেন। আমাদের ‘কানফোন’ ছিল। তিনি যদিও চীনা ভাষায় বক্তৃতা করছেন আমরা কিন্তু ইংরেজিতে শুনছি। তাহার বক্তৃতার সারাংশ হলো- ‘যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই’। সাম্রাজ্যবাদীরা যুদ্ধ করবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোরিয়া, ইন্দোচীন, মালয়, জাপান সকল জায়গায় জাতীয় আন্দোলনকে দমন করার জন্য সৈন্যবাহিনী দিয়ে যা-তা অত্যাচার করছে।
আরো বললেন, যুদ্ধ চাই না, তবে যদি কেহ যুদ্ধ করতে আসে তবে যুদ্ধের সাধ আমরা মিটাইয়া দেয়ার ক্ষমতা রাখি। চীনের ৬০ কোটি জনসাধারণ আজ শান্তি চায়। আর যে সমস্ত দেশ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে তাদের ওপর আমাদের সহানুভূতি আছে। কোরিয়া যুদ্ধ সম্বন্ধেও অনেক কিছু বললেন, জীবাণু যুদ্ধে কীভাবে সাধারণ মানুষ শৃগাল কুকুরের মতো রাস্তাঘাটে অসুস্থ অবস্থায় মরছে তারও করুণ কাহিনী শোনালেন।
তারপর অনেক রিপোর্ট, বক্তৃতা আর বক্তৃতা চললো। চারটা সাব কমিটি প্রস্তাব লেখার কাজে লেগে গেল। আমরা সকলেই ভাগ ভাগ হয়ে সাব কমিটিতে যোগদান করলাম। আলাপ করে জানা গেল যে, প্রায় অর্ধেকের বেশি ডেলিগেট কম্যুনিস্ট নহে। আমাদের স্বতন্ত্র মতবাদ। সেভাবেই প্রস্তাব করা হলো। এক পয়েন্টে আমরা সকলে একমত, শান্তি চাই। ভারত থেকে কংগ্রেস, কম্যুনিস্ট পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ও বহুদলের লোক প্রায় ৬০ জন গেছে। আমাদের দলের মধ্যে ২/৪ জন কম্যুনিস্ট থাকলেও ৩০ জনের মধ্যে প্রায় ২৫ জন আমরা কম্যুনিস্ট নই। চীন শান্তি কমিটি নিজেদের ইচ্ছামতো প্রস্তাব পাশ করাতে চেষ্টা করেন নাই, আমরা আলোচনা, ডিবেট করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।
কাশ্মির প্রস্তাব আমরা উত্থাপন করতে চাইলাম, কারণ ভারত জোর করে কাশ্মির দখল করে রেখেছে। কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ হলে বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। গণভোট হলে কাশ্মিরের জনগণ নিশ্চয় পাকিস্তানে যোগদান করবে। ভারতীয় ডেলিগেটদের মধ্যে একদল কাশ্মির সম্বন্ধে আলোচনা করতে প্রথমে রাজি হলো না, তারপর অন্যান্য দেশের চাপে পড়ে রাজি হলো। ডা. সাইফুদ্দিন কিচলু যিনি ভারতবর্ষের ডেলিগেটদের নেতা, তিনিও চেষ্টা করলেন। আমরা দু’দেশের ডেলিগেটরা এক জায়গায় হয়ে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটা প্রস্তাব নিলাম। তার সারাংশ, কাশ্মিরে গণভোটের দ্বারা ঠিক হবে তারা কোন দেশে যোগদান করবে! কোনো বিদেশী সৈন্যবাহিনী সেখানে থাকতে পারবে না। চীনের শান্তি কমিটি প্রস্তাব পাশ করতে খুবই সাহায্য করেছিল। এই প্রস্তাবে দুনিয়ার কাছে প্রমাণ হয়ে গেল, ভারত জোর করে কাশ্মির দখল করে রেখেছে। কারণ পাকিস্তান বারবার গণভোটের দাবি করেছে। ভারত বাহানা করে গণভোট হতে দেয় নাই। এই প্রস্তাবও সভায় পাশ হলো। আমাদের পক্ষ থেকে পীর মানকি শরিফ, আতাউর রহমান খান ও আরো কয়েকজন দস্তখত করলেন। ওদিক থেকে ডা. কিচলু ও অনেকে দস্তখত করলেন। সভায় বেশ ভালো ভাবের সৃষ্টি হলো। কারণ এই নিয়ে খুব আলোচনা চলছিল। এও হতে পারতো, আমরা এক প্রস্তাব ও ভারত আর এক প্রস্তাব হাজির করলে সভায় খুবই হৈ চৈ হতো। যা হোক, দুই দেশের ডেলিগেট একমত হয়ে প্রস্তাব করাতে সকলেই আনন্দের সঙ্গে প্রস্তাবটা গ্রহণ করলো। এইভাবে প্রস্তাবগুলি এক এক করে পাশ হয়ে গেল। যদিও প্রত্যেক প্রস্তাব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। কারণ নানা মতের লোক সেখানে গিয়াছে। কেউ কম্যুনিস্ট, কেউ কংগ্রেস, কেউ মুসলিম লীগ, কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ সোস্যালিস্ট। কেউ আবার ডেমোক্র্যাট, কেউবা ইমপোরিয়ালিস্ট।
আমাদের দেশ থেকে অনেকেই বক্তৃতা করলো, অনেক দেশের লোক তাদের দেশের অবস্থা সম্বন্ধে জানালো। অনেক করুণ কাহিনিও বললো-কী করে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দেশকে শোষণ করছে। তুরস্ক থেকে দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নাজিম হিকমতও সভায় উপস্থিত হয়েছেন। তিনি প্রথমেই একটা কবিতা শোনালেন, তারপর বক্তৃতা শুরু করলেন। তুরস্কের অবস্থা আমরা যা জানতে পারি, তার চেয়ে অনেক খারাপ। শতকরা ২৫ জন লোক যক্ষ্মা রোগে ভোগে। আরো নানা বিষয়ে জানালেন।
ইরানের থেকে তিন-চারজন যোগদান করেছিলেন। একজন বক্তৃতায় বললেন যে, সমস্ত ইরানের সম্পত্তির মালিক এক হাজার ফ্যামিলি। আর সকলে দিনমজুর। দেশের অবস্থা ভয়াবহ। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দেশকে শোষণ করে শেষ করে দিয়েছে।
এমনিভাবে ইন্দোনেশিয়া, ব্রহ্মদেশ, সিংহল, থাইল্যান্ড, ইন্দোচীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি, কানাডা, জাপান যার যার দেশের অবস্থা জানালেন। এও জানালেন যে, তারা শান্তি চান। বাঁচবার জন্য শান্তি চান। নর্থ কোরিয়ার ডেলিগেটরা জানালো, কীভাবে তাদের ওপর জীবাণু বোমা ছেড়েছে আমেরিকানরা। জাপান বললো, ‘লক্ষ লক্ষ জারজ সন্তান পয়দা করেছে আমেরিকানরা। তাদের হাতে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আজ পর্যন্ত আমেরিকান সৈন্য আমাদের দেশে পড়ে আছে, আমাদের দেশকে রক্ষা করার নামে আমেরিকানদের যাবতীয় খরচ জাপানি জনসাধারণকে বহন করতে হয়। ঘরে-বাইরে যাবতীয় কাজে আমেরিকানরা হস্তক্ষেপ করবে। যত সৈন্য জাপানে আছে তাদের প্রত্যেকের জন্য গড়ে পাঁচশত টাকা মাসে আমাদের খরচ করতে হয়। আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে বাঁচতে চাই, তাই শান্তি চাই’। জাপানিদের পাসপোর্ট দেয়া হয় নাই। তারা নৌকায় সমুদ্র পার হয়ে পালিয়ে এসেছে, তাও আবার ৫০ জনের মতো। আর ফিরে যাওয়ার উপায় নাই। গেলেই জেলে পচতে হবে, তবুও তারা বললো, আমরা যাবো। দেশেই মরবো। বীরের জাত আজ বিপদে পড়েছে। দুঃখ হয়।
ভিয়েতনাম থেকে যারা এসেছিল তার মধ্যে একটা মেয়েও ছিল। তার পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো। এই মেয়েটি ‘মেয়ে গেরিলা বাহিনী’র একজন ক্যাপ্টেন। একাই ফ্রান্সের ৮০ জন সৈন্যকে গুলি করে হত্যা করেছিল। দেখতে মনে হলো, কত নিরীহ বেচারি। মেয়েটা যখন বক্তৃতা করলো তখন বললো, দেশের স্বাধীনতার জন্য ইন্দোচীনের প্রত্যেকটা নরনারী আজ ক্ষেপে উঠেছে; যে পর্যন্ত ফ্রান্স আমাদের দেশ ছেড়ে না যাবে সে পর্যন্ত আমাদের বিশ্রাম নাই। আমেরিকা থেকে প্রায় ৩০ জন এসেছিলেন। তাদের নেতা ছিলেন একজন নিগ্রো। কেমন করে সাদা চামড়াওলারা নিগ্রোদের ওপর অত্যাচার করে তার কাহিনি প্রকাশ করলেন। তবে একজন সাদা চামড়া আমেরিকান এও বললেন, দেশের লোক আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে, এটা কত বড় অন্যায়। নিগ্রো ছেলেমেয়েরা সাদা চামড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে মিশতে পারে না, এক স্কুলে পড়তে পারে না, বিবাহ তো দূরের কথা! চিন্তা করুন, ‘স্বাধীন দুনিয়ার নেতার’ দেশের এই অবস্থা! তিনি দুনিয়ায় গণতন্ত্র কায়েম রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে কোরিয়ায় সৈন্য পাঠান, চিয়াং কাইশেককে সাহায্য দেন। ইরানে ইংরেজকে সাহায্য করেন।
নিগ্রো নেতা বললেন যে, আমেরিকার জনসাধারণ আজ আর যুদ্ধ চায় না, তবে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থের জন্য যুদ্ধ বাধাতে ব্যস্ত। কিন্তু আমরা দেশের মধ্যে শান্তির পক্ষে এমন আন্দোলন করবো যাতে সরকার বাধ্য হয় শান্তি চাইতে। এ কথাও বললেন, যদি সরকার জানতে পায় যে, আমরা শান্তি চাই, তবে ছলে-বলে-কৌশলে খতম করে দেবে বিচারের নামে প্রহসন করে।
ভারতীয় দল থেকে ডা. কিচলু, কম্যুনিস্ট নেতা মি. গোপালন বক্তৃতা করলেন। প্রত্যেকেই তাদের নেতা মি. জওহরলাল নেহরুর প্রশংসা করলেন এবং বললেন, ভারতের জনসাধারণ শান্তি চায়। বর্তমান কংগ্রেস সরকারও শান্তি চায়। পণ্ডিত নেহরু দুনিয়ার শান্তির জন্য সংগ্রাম করবেন। কোনো ব্লকেই তিনি তাঁর দেশকে যোগদান করতে দেবেন না।
কম্যুনিস্ট নেতা মি. গোপালন বললেন, আমেরিকা বা কোনো সাম্রাজ্যবাদী সরকার যদি চীন দেশের ওপর আক্রমণ করে, তবে ৩০ কোটি ভারতবাসী চীনকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে। আরো অনেক কিছু বললেন, যা এখন আমার মনে নাই। কংগ্রেসীদের মধ্যে থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। মনে হলো, একই সুরে গাঁথা। অনেকে আবার মহাত্মা গান্ধীরও প্রশংসা করলেন। মহাত্মা গান্ধীর এক শিষ্য গিয়েছিল ঐ নেংটি পরে। তিনিও বক্তৃতা করলেন, খবর নিয়ে জানলাম, তিনি দাক্ষিণাত্যের এক বিখ্যাত নেতা।
সকল দেশের নেতারা বক্তৃতা করলেন। কয়েকদিন শুধু বক্তৃতাই হলো। মাঝে মাঝে রাতে থিয়েটার, নাচ হতো; আমরা দেখতে যেতাম। ভারতীয়রা প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। তারা গায়ক, নৃত্যশিল্পী নিয়ে গিয়েছিল। মানিক ভাইয়ের এক বন্ধু পিরোজপুর বাড়ি, তখন কলকাতায় থাকেন, তিনি খুব ভালো গায়ক মাঝে মাঝে গান গেয়ে মুগ্ধ করে দিতেন। একজন মহিলা গিয়েছিলেন; তিনি নেচে নাম করেন। সত্যই তিনি খুব ভালো নাচতে পারেন। ভারতীয়রা অনেক জিনিসপত্র উপহার দেয়ার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে আমাদের আব্বাসউদ্দীন সাহেবের কয়েকখানা রেকর্ডও ছিল। সে-সব চীন শান্তি কমিটিকে উপহার দিয়েছিলেন।
আমরা পাকিস্তানিরা কিছুই নেই নাই। কী করবো? পীর সাহেবকে বললাম। তার সাথে পরামর্শ করে কয়েকখানা পাকিস্তানের পতাকা বানিয়ে তাই উপহার দিলাম। পাকিস্তান থেকে পীর মানকি শরিফ, আতাউর রহমান সাহেব, সরদার শওকত হায়াত, খান গোলাম মহম্মদ খান লুন্দখোর ও আমি বক্তৃতা করলাম। মহিলাদের পক্ষ থেকে বেগম মাজহার এবং শওকত হায়াত খানের বোনও বক্তৃতা করলেন। চমৎকার বক্তৃতা করেন ভদ্রমহিলা। সকলেই মুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনলেন। আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, আর ভারত থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়।
বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই, আতাউর রহমান খান ও ইলিয়াস বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়েছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।
পাকিস্তানের কেহই আমরা নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপার বক্তৃতায় বলি নাই। কারণ মুসলিম লীগ সরকারের আমলে দেশের যে দুরবস্থা হয়েছে তা প্রকাশ করলে দুনিয়ার লোকের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাবো। অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী? আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। আমি দেখেছি ম্যাডাম সান ইয়াৎসেন খুব ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু তিনি বক্তৃতা করলেন চীনা ভাষায়। একটা ইংরেজি অক্ষরও তিনি ব্যবহার করেন নাই।
চীনে অনেক লোকের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলবেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলবেন। আমরা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। দোভাষী আমাদের বুঝাইয়া দিলো। দেখলাম তিনি মাঝে মাঝে এবং আস্তে আস্তে তাকে ঠিক করে দিচ্ছেন যেখানে ইংরেজি ভুল হচ্ছে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপরে দরদ।
আমাদের সভা চললো, বক্তৃতা আর শেষ হয় না। এত বক্তৃতা দেওয়ার একটা কারণ ছিল। প্রত্যেক দিন সভায় যে আলোচনা হয় এবং যারা বক্তৃতা করেন তাদের ফটো দিয়ে বুলেটিন বাহির হয়। এই লোভটা অনেকেই সংবরণ করতে পারেন নাই। আর আমার বক্তৃতা দেয়া ছিল এই জন্য যে, বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেবো।
যে হলে আমাদের সভা হয় তাহা বড় চমৎকার। কলকাতা কাউন্সিল হাউসের মতো, বুঝি একটু বড়ই হবে। একদিকে সভাপতিমণ্ডলীরা বসেছেন, আর সামনে ডেলিগেটরা বসেছেন। সভাপতিমণ্ডলীর ঠিক পিছনে ৩৭টা দেশের পতাকা একইভাবে উড়ছে। হলের গেটেও ৩৭টা পতাকা লাগাইয়া দেওয়া হয়েছে। আমাদের পাকিস্তানের পতাকাটা খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সিল্কের কাপড় দিয়ে করা ভারতের ও আমাদের পতাকা পাশাপাশি। হলের ভিতর ফ্ল্যাশ লাইট মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে-যখন ফটো নেওয়া হয়। ১০-১৫ জন ফটোগ্রাফার অনবরত ফটো নিচ্ছে। পাশ দেখাইয়া হলে ঢুকতে হয়। পাশের রুমে চা খাবার বন্দোবস্ত আছে। দরকার হলেই যেয়ে খেতে পারেন। পেছনে ফুলের বাগান ও মাঠ রয়েছে, রয়েছে বসার জায়গা। যখন বিশ্রামের জন্য সভাপতি সময় দেন, তখন একে অন্যের পাশে বসে আলাপ করে ওই ফুলের বাগানে যেয়ে।