১৬ মার্চ বৃহস্পতিবার
আজ প্রায় সারাদিনই ঘরে সময় কাটালাম। দুপুরে ও বিকালে প্রায় তিন চারঘন্টা সময় ধরে হাল্কা বৃষ্টি ও তুষারপাত হলো। বাইরে বের হওয়া নিরাপদ নয়। তাই ঘরেই টিভি দেখে, গল্প-গুজব করে সময় অতিবাহিত করলাম। আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হলেও ঘরে বসে তুষারপাতের দৃশ্য ভালোই লাগলো। এরকম দৃশ্য তো আমরা সচারচর দেখতে পাইনা। তাই স্থানীয় লোকদের নিকট এ দৃশ্য বিরক্তিকর হলেও আমার কাছে তা উপভোগ্য মনে হলো। বাইরে ঝম ঝম বৃষ্টি, সর্বত্র সফেদ তুষার বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে, সবুজ ঘাসের উপর তা শুভ্র চাদর বিস্তৃত করে দিচ্ছে, এমন দিনে রহস্যের দ্বার উম্মোচন করে মনের অনেক কথা বেরিয়ে আসতে চায়।
দুপুরে নিউইয়র্ক থেকে কাজী শামসুল হক টেলিফোন করে আমার মেইলিং এড্রেস জেনে নিলেন। তার সম্পাদিত ‘এখন সময়’ পত্রিকা আমার ঠিকানায় পাঠাবেন। আমেরিকায় আসার পর বাংলা পত্রিকা হাতে পাইনি। তাই নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলাপত্রিকা পাবো জেনে মন খুশীর দোলায় উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। বিকালে আশরাফ-উয-যামান খানকে টেলিফোন করে জানলাম, তিনি আমার পাঠানো বায়োডাটা যথাসময়ে পেয়েছেন। আমার নিউইয়র্কের কর্মসূচি নিয়ে তার সঙ্গে আর একবার আলাপ হলো।
বিকালে টিভিতে প্রায় দু’ঘন্টা যাবৎ নানারকম খবর শুনলাম। তারপর খেয়ে দেয়ে রাত এগারটায় বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। আজকের রাতটি খুবই সুন্দর মনে হলো। চারদিকে হাল্কা বৃষ্টি, বরফ পড়ছে, গাছপালা-তৃণলতা সব বৃষ্টির পানি পেয়ে নতুন প্রাণের রসে উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। কাল সকালে দিনের আলোয় প্রকৃতির দৃশ্য উজ্জ্বলতর হয়ে উঠবে। গাছে গাছে পাখিরা উড়ে বেড়াবে, বিচিত্র কলোরবে চারিদিক মুখরিত করে তুলবে। সে উজ্জ্বল নতুন দিনের সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতে আমি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।

১৭ মার্চ জু’মাবার
আজ জু’মাবার। আমরা সবাই নামায পড়তে মসজিদে গেলাম। মসজিদে আজ বিশেষ অতিথি হলেন ডক্টর সুহাইল। তিনি ওয়াশিংটনস্থ Muslim American Society (MAS)-এর নির্বাহী পরিচালক। সেন্টারের পক্ষ থেকে তিনি একজন আমন্ত্রিত অতিথি। তিনি আজ জু’মার খুৎবা পেশ করবেন। ডক্টর সুহাইল তাঁর খুৎবায় তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করলেন। সেগুলো হলো: ১. মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য, ২. ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য, ৩. বর্তমান যুগ ও অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
মহান রাব্বুল-আলামীন মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল-কুরআনে সুষ্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, একমাত্র ইবাদতের উদ্দেশ্যেই জ্বীন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইবাদতের অর্থ শুধু কলেমা, নামায, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাত পালন করা নয়। এর ব্যাখা ও তাৎপর্য অনেক গভীর ও ব্যাপক। আল্লাহতালা আল-কুরআনে এবং রাসুল্লাহর(স) আল-হাদীসে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখা ও বর্ণনা রয়েছে। তিনি আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসের উল্লেখ করে বলেন ইবাদতের মূলভিত্তি ঈমান, অর্থ্যাৎ এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) উপর বিশ্বাস। ঈমানের দাবী হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (স) মানা ও অনুসরণ করা অর্থ্যাৎ আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলের (স) সুন্নাহর নির্দেশিত পথে সমগ্র জীবন পরিচালনা করা। এর অর্থ ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জীবন পরিচালনায় অন্যকোন মত, আদর্শ ও পন্থার অনুসরণ করা যাবে না, একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স) এর নির্দেশিত পথেই সমগ্র জীবন পরিচালনা করতে হবে। পৃথিবীতে যত রকমের কাজ করা হয়, তা যদি আল্লাহ ও রাসূল(স) নির্দেশিত পথে করা হয়, তাহলে সেটাই প্রকৃত ইবাদত। ঈমান, নামায, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত ইবাদতের মূলভিত্তি। কিন্তু শুধু এগুলো পালন করলেই ইবাদতের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করা হবে না। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আল্লাহ ও রাসূল (স) নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই ইবাদতের হক পূর্ণরূপে আদায় হবে।
ডক্টর সুহাইল ইবাদতের হক পালনের নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করেন। ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স) হুকুম- নির্দেশ মেনে চলা। ২. তাকওয়া অর্জন। এর অর্থ আত্মশুদ্ধি ও সর্বাবস্থায় সকল কাজ, কথা ও চিন্তায় আল্লাহকে স্মরণ করা। ৩. তাবলীগ অর্থ্যাৎ দ্বীনের প্রচার। দ্বীন গ্রহণের পর প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব হলো অন্য সকলের নিকট দ্বীনের দাওয়াও পৌঁছানো। তবে দ্বীন প্রচারের আগে নিজেকে অব্যশই দ্বীনের প্রকৃত অর্থ, তাৎপর্য বুঝতে হবে এবং নিজেকে তা পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করতে হবে। দ্বীন অনুযায়ী নিজেকে গঠন না করে অন্যকে সে দ্বীনের দাওয়াত দিলে অন্যের উপর তার কোন প্রভাব পড়বে না। ৪. নিজের জীবনের সমস্ত অসংগতি ও ইসলাম-বিরোধী চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রেখে সমাজ থেকেও সেসব অসংগতি ও ইসলাম-বিরোধী চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ড দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। ৫. অন্যের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রকাশ করা। মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য মোচনে ও বিপদ-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এক্ষেত্রে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান উদার ও মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। রাসূল্লাহ (স) বলেছেন, জালেম ও মজলুম উভয়কেই সাহায্য করো। মজলুমকে সাহায্য করার অর্থ তাকে যেন জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করা যায় আর জালেমকে সাহায্য করার অর্থ অন্যকে জুলুম করা থেকে তাকে বিরত রাখা। এভাবে প্রতিটি মুসলমান যদি তার সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করে তাহলে আমাদের সমাজ সুন্দর, সুস্থ্য ও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ডক্টর সুহাইল সংক্ষেপে ইসলামের মূল শিক্ষা ও আদর্শ তুলে ধরে বর্তমান যুগ ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ পেশ করে খুৎবা শেষ করলেন। তাঁর আলোচনা খুবই জ্ঞানগর্ভ ও বর্তমান যুগে মুসলমানদের জন্যে অত্যন্ত উপযোগী বলে আমার ধারণা হলো।

১৮ মার্চ শনিবার
আজ আমরা শিকাগো শহর দেখতে গেলাম। শিকাগো আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর। আমেরিকার প্রধান শহর নিউইয়র্ক এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লসএ্যাঞ্জেলস। শিকাগো ইলিনয়েজ রাজ্যের রাজধানী। সিডার র‌্যাপিডস্ থেকে এর দুরুত্ব ৩০০ মাইল অর্থ্যাৎ ৪৮০ কিলোমিটার। শিকাগো শহরের সর্বোচ্চ বিল্ডিং হলো ১০৭ তলা বিশিষ্ট Sears Tower. বর্তমানে এটি আমেরিকার সর্বোচ্চ বিল্ডিং। একসময় এটি পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ বিল্ডিং হিসাবে গণ্য হতো। কিন্তু মালয়েশিয়ার টুইন টাওয়ার বর্তমানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিল্ডিং হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। অবশ্য নির্মীয়মান ‘দুবাই টাওয়ার’ অচিরেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিল্ডিং হিসাবে পরিগণিত হবে। Sears Tower-এর আর্কিটেক্ট হলেন বিশ্ববিখ্যাত বাংলাদেশী স্থপতি ফজলুর রহমান খান। ফজলুর রহমান খান এক সময় শিকাগো শহরে বসবাস করতেন। কৃতজ্ঞ আমেরিকানরা এ কৃতি স্থপতির স্মরণে Sears Tower-এর পার্শ্ববর্তী রাস্তাটির নাম রেখেছে ফজুলর রহমান খান ওয়ে। ফজলুর রহমান খানের একটি আবক্ষ মূর্তি Sears Tower-এ সংরক্ষিত আছে। তিনি নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ বিল্ডিং ওয়ার্ল্ড টাওয়ারেরও স্থপতি। তিনি এখন আর বেঁচে নাই। কিন্তু তাঁর কন্যা এখনোও শিকাগোতে বসবাস করেন।
শিকাগো শহর মিশিগান লেকের পাশে নির্মিত। লেকটি এত বিশাল যে, এটাকে একটি সমুদ্র বললেও অত্যুক্তি হবে না। শিকাগো থেকে সুদূর মিশিগান পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। সম্ভবত এজন্যই এর নাম হয়েছে মিশিগান লেক। মিশিগান লেকের পাশে যখন আমাদের গাড়ি থামলো, তখন দুপুর একটা বাজে। মধ্য-মার্চের উজ্জ্বল সূর্যকিরণে তখন দিগন্ত উদ্ভাসিত। লেকের পাড়ে আরো অনেক গাড়ি ও মানুষের ভিড়। দেখে আমাদের মন আনন্দ-চঞ্চল হয়ে উঠলো। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নামলাম। কিন্তু কি আশ্চর্য! লেকের ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমরা সেখানে এক মুহূর্ত তেষ্টাতে পারলাম না। তীব্র শীত এবং ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমাদের হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেলো। মনে হলো শরীরের হাড়-মাংস যেন বরফের মত জমে আসছে। আমি সহ্য করতে না পেরে দ্রুত গাড়িতে এসে উঠলাম। আমাকে অনুসরণ করে অন্যরাও গাড়িতে উঠলো। আমি অবাক হলাম, এত শীতের মধ্যেও এখানে লোকেরা সমুদ্র-সৈকতে আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শীতের সময় এখানকার অবস্থা কী রকম হয়, তা আমি আর ভাবতেও পারলাম না। মনে হলো মানুষ প্রকৃতির নিয়মে চলে। যে পরিবেশ ও আবহাওয়া মানুষের জন্ম বা বেড়ে ওঠা সে পরিবেশ ও আবহাওয়ার মধ্যেই সে জীবনযাপনে অভ্যস্থ। চির বরফের দেশ আইসল্যান্ডে এস্কিমোরা স্বচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে। অথচ আমাদের পক্ষে মিশিগান লেকের মধ্য-মার্চের শীতের হাওয়া সহ্য করাই কঠিন। কারণ আমরা গ্রীষ্ম প্রধান দেশের মানুষ।
গাড়িতে উঠে আমরা শিকাগো শহরের একপাশে লেকের পাড় ঘেঁসে নির্মিত দীর্ঘ পথ ধরে অগ্রসর হলাম। শহরে বড় বড় বিল্ডিং ও রাস্তা-ঘাট আমাদের চোখে পড়ল। দীর্ঘপথ অতিক্রম করে শহরের একপ্রান্তে এসে পৌঁছালাম। এ জায়গার নাম ডেভোন। এখানে অধিকাংশ এলকা জুড়ে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশী মানুষের বসবাস। অন্যান্য জাতির লোকেরাও আছে, তবে উপমহাদেশীয় লোকের সংখ্যাই বেশি। এলাকায় খ্রীস্টান, ইহুদী, মুসলিম, হিন্দু ও বিভিন্ন ধর্মের লোক রয়েছে। চার্চের পাশাপাশি পোগডা, মন্দির ও মসজিদের একত্র সমাবেশ। একটি রাস্তার নাম দেখলাম ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ওয়ে’, অন্যটির নাম ‘নেহেরু ওয়ে’। রাস্তার দু’পাশে অনেক ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশীদের দোকান। উপমহাদেশীয় বিভিন্ন পণ্য-দ্রব্য এসব দোকানে সাজানো। এখানে অনেক উপমহাদেশীয় হোটেল রেস্টুরেন্ট রয়েছে। সেখানে উপমহাদেশীয় খাদ্য-দ্রব্য পরিবেশিত হয়। উপমহাদেশের বিভিন্ন লোকজন এসব হোটেল রেস্টুরেন্টে ভীড় করে আছে। দুপুরের খাবার সময়। তাই স্বভাবতই খাবার জন্য তখন প্রচন্ড ভীড় লক্ষ্য করা গেলো। আমরা ‘গরীব নেওয়াজ ফ্যামেলি রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি হোটেলে ঢুকলাম। মালিক একজন দিল্লীওয়ালা। এখানে পাকিস্তানী ও মুগলাই খাবার পরিবেশন করা হয়। আমরা রুটি, কাবাব, গোশত ও সালাদ দিয়ে পেট ভরে খেলাম। রাতের জন্য আমরা এখান থেকে প্যাকেট খাবার সংগ্রহ করে নিলাম।
খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা কেনাকাটায় বেরিয়ে পড়লাম। অনেকগুলো বাংলাদেশী দোকান। সবগুলো দোকানের সাইবোর্ড বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা। দেখে আমরা খুব উৎফুল্ল হলাম। একটি দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরাজি ও বাংলাতে লেখা-‘ফিশ কর্ণার ইনকর্পোরেটেড’। মালিকের নাম লেখা জাহাঙ্গীর আলম ও মোর্শেদা আলম। দোকানে ঢুকে তাদের পরিচয় জেনে নিলাম। দোকানে তখন মোর্শেদা আলম ও তার বাবা ছিলেন। মূলত বেশির ভাগ সময় তারাই দোকান চালান। পরিচয়ের এক পর্বে জানা গেলো, ঢাকার আহমদনগরে আমার বাড়ির পাশে জোনাকী রোডেই তাদের বাড়ি। ফলে তাদের সাথে মুহূর্তেই যেন ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হলো। খুব ভালো লাগলো, আমেরিকায় এসে একজন বাংলাদেশী তাও আবার নিকট-প্রতিবেশীর দোকানে ঢুকে বাজার করতে পারার সুযোগ। এটা এক বিরল সৌভাগ্য বটে। কেনাকাটার পর তারা আমাদেরকে তাদের বাসায় দাওয়াত করলো। বললো, এখান থেকে তাদের বাসা মাত্র তিন মিনিটের পথ। কথায় কথায় তারা বললো যে, এখানে তারা দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করছে। শিকাগোতে তাদের নিজস্ব বাড়িতে থাকে। তাদের বহু আত্মীয়-স্বজনকেও তারা এখানে নিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা এখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি। শুনে খুব ভালো লাগলো। নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তারা সকলে মিলেমিশে বিদেশ-বিভূঁইয়ে একত্র বসবাস করছে। বিদেশে আয় করে দেশে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করছে। সেটা দেশ গড়ার কাজে লাগছে। এটা তাদের দেশাত্মবোধের পরিচয় বহন করে।
আমরা খাওয়া-দাওয়া, কেনা-কাটা সেরে ডেভোনের বিশাল জামে মসজিদে যোহর ও আসরের কসর নামায পড়লাম। এরপর আমরা শিকাগো শহরের ঐুধঃঃ ঐড়ঃবষ-এ গেলাম। সেখানে আমরা রাত্রিযাপন করবো। পাশাপাশি দু’টি ডবল বেড ভাড়া নেয়া হলো। একটি জামাই, মেয়ে ও নাতি-নাতনির জন্য, অন্যটি আমার স্ত্রী, আবিদ ও আমার জন্য। হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে আমরা জামাতে মাগরিবের নামায পড়লাম। তারপর সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলের পাশেই বিখ্যাত ওশবধ ইঁষফরহম. বিল্ডিংটি বিশাল ও তিনতলাবিশিষ্ট। আমরা সব তলা ঘুরে বিভিন্ন ধরনের চমৎকার চমৎকার সব আইকা ফার্নিচার পরিদর্শন করলাম। ফার্নিচার-জগতে আইকার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ফার্নিচারগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো যে, এগুলো হালকা কিন্তু মজবুত ও টেকসই। এগুলো ভাঁজ করে সহজেই এখানে-ওখানে সরানো বা সাজানো যায়। আমাদের ফার্নিচার কেনার কোন প্রয়োজন ছিল না। শুধু দেখা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই সেখানে যাওয়া। টুকটাক সামন্যকিছু কেনা-কাটা করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলে এসে এশার নামায পড়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা হোটেলের নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।

১৯ মার্চ রবিবার
সকাল সোয়া দশটায় আমরা হোটেল থেকে বের হয়ে আবার ডেভোনে গেলাম নাস্তা করার জন্য। এবারে আমরা ‘জমজম’ নামে একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। এটির মালিক জনৈক হায়দ্রাবাদী (ইন্ডিয়া) মুসলিম। নাস্তা করে আমরা আমাদের পূর্বদিনের পরিচিত ‘ফিশ কর্ণার ইনকর্পোরেটেড’-এ গেলাম। সেখান থেকে আমরা বাংলাদেশী ইলিশ, পাবদা, কেচকি, চান্দা ইত্যাদি বিভিন্ন জাতের মাছ ও তরিতরকারী পর্যাপ্ত পরিমাণে কিনলাম। কারণ সিডার র‌্যাপিড্স- এ বাংলাদেশী মাছ-তরিতারকারী পাওয়া যায় না। এরপর ওখানকার বিভিন্ন দোকান-পাট ঘুরে-ফিরে দেখে আমরা এখানকার বিশাল শিকাগো জামে মসজিদে যোহরের নামায আদায় করলাম। মসজিদটি বিরাট, এর সৌন্দর্য ও সৌকর্য দৃষ্টিনন্দন। এখানে একসাথে একহাজার মুসল্লি নামায পড়তে পারে। নামাযের পর মসজিদে ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে স্থানীয় মুসলমানদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিলাম। ইমাম সাহেব খুব আশাবাদী। আমেরিকায় দ্রুত ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটছে। তার ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমেরিকার রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডে মুসলমানদের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পাবে।
মসজিদ থেকে বের হয়ে আমরা নিকটবর্তী এনামের পরিচিত জনৈক বাংলাদেশীর বাসায় গেলাম। ছুটির দিন। তিনি সস্ত্রীক বাসায়ই ছিলেন। তারা আমাদেরকে আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করলেন। তাদের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ই চাকরি করেন। যে বাড়িতে তারা থাকেন, সেটা তাদের ক্রয় করা নিজস্ব বাড়ি। তাদের মাত্র একটি ছোট মেয়ে। সুন্দর ফুটফুটে চেহারা। আমাদের সাথে পূর্ব পরিচয় নেই। কিন্তু মনে হলো, আমারা যেন তাদের অনেক আপনজন। বিদেশে স্বদেশীরা সকলেই পরস্পর আপনজন। তাদের ওখানে চা-নাস্তা খেলাম। কথাবার্তা, গল্প-গুজবের ফাঁকে মহিলা রান্না-বান্নার কাজ সেরে ফেলেছেন। আমরা আগে থেকে খবর দিয়ে আসিনি। তা সত্ত্বেও নানা মজাদার ব্যঞ্জনাদি সহকারে আমাদের জন্য খাবার টেবিলে পরিবেশন করা হলো। না খেয়ে উপায় নেই। অগত্যা সবাই খেলাম। খুব তৃপ্তি সহকারে। খাওয়া-দাওয়ার পর আবার কিছুক্ষণ গল্প-গুজব। এরপর চা-নাস্তা।
সেখান থেকে বের হয়ে আমরা ফেরার পথে ঝবধৎং ঞড়বিৎ-এ ঢুকলাম। সবকিছু ঘুরে-ফিরে দেখলাম। সেখানে আবিদ কিছু ছবি তুললো। আমাদের মন গর্বে ফুলে উঠলো। একজন বাংলাদেশী স্থপতির কীর্তি আমাদেরকে যুগপৎ আনন্দ-বিস্ময়ে অভিভূত করলো। আমরা ঝবধৎং ঞড়বিৎ থেকে বের হয়ে ঋধুষঁৎ জধযসধহ কযধহ ডধু অতিক্রম করে আমাদের গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। এরপর ধীরে ধীরে শিকাগো শহর ছাড়িয়ে আমরা সিডার র‌্যাপিডস-এর পথ ধরলাম। রাত সাড়ে আটটায় আমরা বাসায় পৌঁছে গেলাম। শিকাগো শহর দেখার আনন্দ ও অভিজ্ঞতা আমাদের মনে উজ্জ্বল হয়ে থাকলো। আবিদ রাত্রিতেই তার কর্মস্থল ক্যানসাস সিটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। পরের দিন সোমবার তার অফিস। দীর্ঘপথ। যাত্রাপথে বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সে কিছুটা বিলম্বে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছে। আমরা তার জন্য কিছুটা উদ্বিঘ্ন ছিলাম। রাত পৌনে তিনটায় তার পৌঁছার খবর পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। এরপর আমি ও আমার স্ত্রী ঘুমাতে গেলাম।