আমার বড় ছেলে আহমদুর রহমান জাহিদ আমেরিকায় ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে ১৯৯৬ সনে দেশে ফিরে এসেছে। বর্তমানে সে দুবাইতে কর্মরত। বড় মেয়ে সুমাইয়া রহমান ও ছোট ছেলে আবিদুর রহমান আমেরিকায় থাকে। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করেছে। জামাই এনামুল হক আমেরিকায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং-এ এমএস করে সেখানে চাকরি করছে। ছোট ছেলে আমেরিকায় ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই কাজ করছে। বড় মেয়ে ও ছোট ছেলেকে দেখার জন্য আমি ও আমার স্ত্রী বেগম খালেদা রহমান ২০০৬ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকায় বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাওয়া ও আসার পথে দুবাইতে বড় ছেলে ও আমার নাতির সাথেও দেখা করে আসার ব্যবস্থা করলাম। এর আগে আমি কখনও আমেরিকায় যাইনি। এবারই আমার প্রথম আমেরিকা যাত্রা। আমেরিকা স্বপ্নের দেশ, অনেকের কাছেই। সে স্বপ্নের দেশ কেমন তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার আগ্রহও কম ছিল না।
ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে আমি ও আমার স্ত্রী সকাল বেলা ফযরের নামায পড়ে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। সকাল ৬.৩০ টায় আমার ছোট জামাই স্কোয়ার্ডন লিডার মইনুল হক আমার ছোট মেয়ে আফিয়া রহমানকে নিয়ে আমার বাসায় এলো। গাড়িতে মালপত্র তুলে আমরা সকাল ৭টায় এয়ারপোর্টের দিকে রওয়ানা হলাম। এয়ারপোর্টে ঢুকে মালপত্র চেক-ইন করিয়ে মেয়ে ও জামাইর কাছ থেকে আমারা বিদায় নিয়ে যথারীতি প্লেনে উঠলাম।
এমিরেটস এয়ার লাইনস-এর বোয়িং ০০৭-৩০০ প্লেনটি বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। সকাল সাড়ে দশটায় আমাদের প্লেন উড়তে শুরু করলো। স্থানীয় সময় সোয়া ১টায় আমরা দুবাই এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছালাম। আমার বড় ছেলে ও আত্মীয় রাজিব এসেছিলো এয়ারপোর্টে আমাদের নিতে। আমরা গিয়ে এমিরেটস এয়ার লাইনসের হোটেলে উঠলাম। হোটেলে আমাদের থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার পর হোটেল রুমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে জাহিদ ও রাজিবের সাথে আমরা বেড়াতে বের হলাম। দুবাইর বিভিন্ন বাজার ঘুরেফিরে কিছু কেনাকাটা করলাম। তারপর রাত্রিতে এসে নায়েফ রোডে অবস্থিত দিল্লী রেস্টুরেন্টে সবাই মিলে পাকিস্তানি ডালÑরুটিÑকাবাব পেট ভরে খেলাম। এরপর আমরা জাহিদের বাসায় গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। সেখানে বেশিক্ষণ থাকা হল না। আমার নাতি আফনানকে আদর জানিয়ে তারপর আমরা আবার সবাই হোটেলে ফিরে এলাম। কেননা আজ রাতেই আবার আমাদের ফ্ল্যাইট। দুবাই থেকে এমিরেটস এয়ার লাইনসে করে আমরা লন্ডন হয়ে আমেরিকায় যাব।
হোটেলে এসে সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে আমরা রাত একটায় রওনা হলাম এয়ারপোর্টের দিকে। রাত সোয়া তিনটায় আমাদের প্লেন ছাড়লো। আমরা যথারীতি আমাদের নির্দিষ্ট সীটে বসে সীট বেল্ট বেঁধে নিলাম। দুবাই থেকে লন্ডন আট ঘন্টার পথ। লন্ডনের প্রসিদ্ধ হিথ্রো এয়ারপোর্টে আমাদের কয়েক ঘন্টার ট্রানজিট। সেখানে ট্রানজিট লাউঞ্জে বসে এবং কিছুক্ষণ এটা ওটা দেখে আমরা সময় কাটালাম। এরপর আমাদের ডাক পড়লো। আমেরিকার ইউনাইটেড এয়ারলাইনসে আমরা যাব আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম শহর শিকাগোতে। তারপর সেখান থেকে আইওয়া রাজ্যের সিডার র্যা পিডস্-এ।
লন্ডন থেকে শিকাগো যেতে সাড়ে সাত ঘন্টা সময় লাগলো। শিকাগো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বিমান বন্দর। সেখান থেকে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের একটি ছোট প্লেনে করে আমাদেরকে সিডার র্যা পিডস যেতে হবে। আমাদের জন্য সবকিছুই নতুন। বিশাল শিকাগো এয়ারপোর্টের এক পাশে সিডার র্যা পিডসগামী প্লেনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে অথবা শাটল ট্রেনে যেতে হয়। মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে গিয়ে পৌঁছালাম। প্লেন প্রস্তুত ছিল। আমরা সাথে সাথে গিয়ে সেখানে উঠে বসলাম। মাত্র চল্লিশ মিনিটের পথ। যথাসময়ে সিডার র্যা পিডস এয়ারপোর্টে আমরা পৌঁছে গেলাম। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। সেখানে পৌঁছেই দেখি আমার বড় মেয়ে, জামাই ও নাতনি জারা আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জারা দৌঁড়ে এসে আমার কোলে উঠল। আমাদের মালপত্র সব জামাই কাউন্টার থেকে বুঝে নিয়ে আমাদেরসহ গাড়িতে উঠল। মাত্র বিশ মিনিট গাড়ি চালিয়ে আমরা সিডার র্যা পিডস-এ আমার বড় মেয়ে ও জামাইর বাসায় পৌঁছে গেলাম।
আমার মেয়ে ও জামাইর বাড়িটি এক বিঘা জমির উপর নির্মিত। তারা দু’বছর আগে এ জায়গাটি কিনে সেখানে একটি তিনতলা ভিলা তৈরি করেছে। এ বিশাল বাড়িতে শুধু মেয়ে, জামাই ও নাতনি বসবাস করে। পাঁচটি বেডরুম, ড্রইং, ড্রাইনিং, কিচেন ও সুপ্রশস্ত বসার রুম। আমরা ঘরে ঢুকে হাতমুখ ধূয়ে খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম। তারপর রাত দশটায় এশার নামায পড়ে শুয়ে পড়লাম। রাত দু’টায় আমার ঘুম ভাঙলো। ওযু করে এসে তাহাজ্জুতের নামায পড়ে আবার শুয়ে পড়লাম।
সিডার র্যা পিডস আমেরিকার অন্যতম অঙ্গরাজ্য আইওয়ার অন্তর্ভুক্ত একটি শহর। আইওয়া, ইলিনয়েস, ক্যানসাস, মিজৌরি প্রভৃতি রাজ্যকে বলা হয় Heart Land of Amarica Mid-Amarica নামেও পরিচিত। আমেরিকাকে বলা হয়, ‘The Land of Settlers’ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লোকেরা আমেরিকায় এসে বসতি স্থাপন করেছে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর থেকে অভিভাসীদের আগমন দ্রুত গতি লাভ করেছে। প্রথম দিকে শুধুমাত্র যুক্তরাজ্য ও বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ থেকে অভিভাসীরা আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎসঙ্গে কানাডায় আগমন করেছে। প্রথম অভিভাসীরা আমেরিকায় সর্ববিধ সুযোগ-সুবিধা, জায়গা-জমি ইত্যাদি দখল করে বসেছে। পরবর্তীতে যারা এসেছে, তারা এসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে অনেক কম। এখনও অভিভাসীদের আগমন ঘটছে এবং পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই তারা আসছে। এরা আগের মত সুযোগ-সুবিধা আর কেউ পাচ্ছে না। বরং তারা নানারূপ বিধি-বিধান ও আইন-কানুনের বেড়াজালে নানারূপ নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। গরফ-অসধৎরপধ – এর অভিভাসীগণ অধিকাংশই আদি অধিবাসী। তাই তারা প্রায় সকলেই ইউরোপীয়-আমেরিকান। তবে ইউরোপিয়ান হলেও এদের মধ্যে জার্মান-বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। সকলেই ইউরোপীয় অরিজিন হওয়ায় তাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবই প্রায় এক ও অভিন্ন। অবশ্য এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আরব, বিশেষত লেবানীজ বংশোদ্ভূত আরবও রয়েছেন, যাদের থার্ড জেনারেশন এখন সেখানকার অধিবাসী। আমেরিকার সর্বপ্রাচীন মসজিদ এ এলাকায় নির্মিত হয় ১৭৭৫ সনে। বর্তমানে এটিকে একটি মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। তারপর যেসব মসজিদ এ এলাকায় পরিদৃষ্ট হয়, তা অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের। সিডার র্যা পিডস-এ বর্তমানে বেশ কয়েকটি মসজিদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দি ইসলামিক সেন্টার অব সিডার র্যা পিডস মসজিদটি ১৯৩৪ সনে প্রতিষ্ঠিত। এটি আমেরিকার অন্যতম প্রাচীনতম মসজিদ।
Mid-Amarica-য় দাস প্রথা চলে বহুদিন পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন যখন দাসমুক্তির ঘোষণা দেন, তখন এ Mid-Amarica থেকেই তার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়। সে বিদ্রোহ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম শক্ত হাতে তা দমনে সক্ষম হন। কিন্তু Mid-Amarica-র বিদ্রোহ দমনে দীর্ঘ সময় লাগে। আমেরিকার সর্বশেষ দাস-মুক্তি ঘটে মিজৌরীতে। বলাবাহুল্য, মিজৌরী Mid-Amarica-র অন্তর্ভুক্ত।
Mid-Amarica-কে বলা হয়, Christian Belt. এখানকার আদি অভিভাসীরা প্রায় সকলেই ছিলেন খ্রীস্টান। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয় শ্রেণীর খ্রীস্টানই এখানে পরিদৃষ্ট হয়। তবে প্রোটেস্ট্যান্টদের সংখ্যাই বেশি। এখানকার মানুষ মোটামুটি ধর্মভীরু। এখানে পাড়ায়-মহল্লায় প্রায় সর্বত্র চার্চ দেখা যায়। রাস্তার পাশে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অসংখ্য চার্চ গড়ে উঠেছে। চমৎকার সুদৃশ্য পুরনো বিল্ডিং। একসময় এসব চার্চে প্রচুর লোক সমাগম হত। অবশ্য এখন আর সে অবস্থা নেই। কেবলমাত্র অল্পসংখ্যক বয়স্ক নারী-পুরুষেরাই সেখানে যাতায়াত করেন। যুবক শ্রেণীর মধ্যে খ্রীস্টান ধর্মের আবেদন কম। তাছাড়া, বস্তুতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায় জাগতিক সুখ-শান্তি-সম্পদের প্রতি মানুষের আগ্রহ যতটা বাড়ছে, ধর্মের প্রতি আগ্রহ ততটাই কমে আসছে। আমেরিকার শাসনতন্ত্রে এড়ফ-এর উপর আস্থা স্থাপনের কথা উল্লেখ থাকলেও এবং আমেরিকার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য পদস্থ ব্যক্তিগণ বাইবেলকে সাক্ষী রেখে শপথ নিলেও আমেরিকার সমাজ-ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে সেক্যুলার হয়ে পড়েছে। Mid-Amarica-র লোকেরা সাধারণত ভদ্র ও শান্তিপ্রিয়। এখানে চরি-ডাকাতি বা অপরাধমূলক কার্যক্রম একরকম নেই বললেই চলে। ফলে এখানকার লোকেরা মোটামুটি নিরুদ্বিগ্ন জীবনযাপন করে থাকে। আমেরিকার নিউইয়র্কসহ অন্যান্য বড় বড় শহরে যেমন প্রতিদিন নানারূপ খুন-ডাকাতি-ছিনতাই-ধর্ষণ ইত্যাদি নানারূপ অপরাধমূলক কার্যক্রম চলে, Mid-Amarica তার ব্যতিক্রম। এখানকার জীবনযাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেকটা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ।