লন্ডনে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের জন্যে ভালো ব্যবস্থা আছে। বাস-ট্রেন ও অন্যান্য নানা বাহনে করে মানুষ যাতায়াত করে থাকে। এটা সব শহরেরই সাধারণ যাতায়াত-ব্যবস্থা। বিশেষত্ব এই যে, নিয়মিত যাত্রীদের জন্য এখানে বিশেষ মেয়াদি টিকিটের ব্যবস্থা আছে। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, এক মাস, তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর ইত্যাদি বিভিন্ন মেয়াদের টিকিট পাওয়া যায়। এসব টিকিট কিনলে টিকিটের মেয়াদকালীন সময়ে ট্রেনে-বাসে সর্বত্র আনলিমিটেড জার্নি করার সুযোগ পাওয়া যায়। এতে যাতায়াতের খরচ খুব কম হয়। আর যারা ভ্রমণকারী, শুধু এখানে-ওখানে যাতায়াত করে ঘুরে বেড়ানোই যাদের কাজ, তাদের এসব টিকিট কেনায় অনেক লাভ। আমি তো ভ্রমণ করতেই গেছি। অতএব, একটি মেয়াদী টিকিট কিনে আমি লন্ডন শহরে সর্বত্র যথেচ্ছা ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ গ্রহণ করলাম।
লন্ডনে মাটির উপরে বাস, গাড়ি-ঘোড়া ইত্যাদি চলে আর ট্রেন চলে সাধারণত মাটির নিচে। এগুলোকে বলে সাব-ওয়ে বা টিউব লাইন। লন্ডন শহরে টিউব লাইনের দৈর্ঘ্য সর্বমোট ছয় হাজার সত্তর মাইল (তখনকার হিসাবে)। টিউব লাইনগুলো আবার অনেক স্থানে বিশেষত জংসনে মাটির নিচে স্তরে স্তরে সাজানো। লন্ডনের বিখ্যাত হাইড পার্কের পাশে এক জায়গায় দেখলাম, মাটির নিচে টিউব লাইন তিন স্তর বিশিষ্ট। নিচের দিকে কত গভীরে লাইন চলে গেছে তা ভাবতেও অবাক লাগে। দীর্ঘকাল আগে এসব সাব-ওয়ে লাইন তৈরি করা হয়েছে এবং আজ অবধি যথারীতি তা চলছে। এসব লাইনে প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ লোক তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাতায়াত করে (তখনকার হিসাবে)। মাটির উপরের রাস্তায় ভিড় কমাতে এবং ঝানজটের হাত থেকে যাত্রীদের রেহাই দিতে মাটির নিচ দিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকাতে যে ধরনের যানজট এবং তার ফলে দেড় কোটি মানুষের যে বিপুল কর্ম-সময়ের অপচয় ও বিড়ম্বনা, তা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য অচিরেই এ ধরনের পাতাল রেলের ব্যবস্থা না করলে এখানকার জীবনযাত্রা অতিশয় দুঃসহ হয়ে উঠবে।
লন্ডনে আমার পরিচিত অনেক বন্ধু-বান্ধব আছেন। এরা অধিকাংশই থাকেন ইস্ট-লন্ডনে। একদিন ইস্ট-লন্ডনে গেলাম, সেখানে অনেক বাংলাদেশীর বসবাস। তারা সকলে মিলে সুন্দর, সুদৃশ্য মসজিদ নির্মাণ করেছেন, পাঠাগার গড়ে তুলেছেন, স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর উদ্দেশ্যে। ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। প্রায় পুরো দিন কেটে গেল এসব দেখতে। খুব ভাল লাগল। বিদেশে আমাদের দেশের লোকেরা নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যতটা সম্ভব নিজস্ব ধর্মীয় ও সংস্কৃতির চর্চা করছে এবং ছেলেমেয়েদেরকেও সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমি কয়েকজন বাংলাদেশের ছেলের সঙ্গে আলাপ করলাম, তারা ইংরাজি শেখার পাশাপাশি বাংলা ভাষাও শিখছে, ইসলামী আদব-কায়দা, ধর্মীয় শিক্ষায়ও শিক্ষিত হয়ে উঠছে। এরা প্রায় সকলেই নামায-কালাম পড়ে, মসজিদে যায়, বাবার সাথে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও যোগদান করে। আমার খুব ভালো লাগলো এসব দেখে। ইস্ট-লন্ডন মসজিদে যোহর, আছর, মাগরিব তিন ওয়াক্ত নামায পড়ার সুযোগ হলো। ইমাম সাহেবসহ অধিকাংশ মুসল্লীই বাংলাদেশী। মনে অফুরন্ত আনন্দ নিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে সাবওয়ে অর্থাৎ পাতাল ট্রেনে চড়ে আপন ডেরায় ফিরে এলাম।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ফেরার পথে ইস্ট লন্ডনের একটি বাজারে ঢুকলাম। কোনকিছু কেনাকাটার প্রয়োজন ছিল না। তবু ভাবলাম, যদি সুবিধামত কিছু পাই, তাহলে কিনব। কিন্তু মনে হলো, দুবাইর তুলনায় এখানে সব জিনিসেরই দাম বেশী। তাই কোন কিছু কেনার সিদ্ধান্ত বাতিল করলাম। তাছাড়া, আমি লন্ডন থেকে আরো আট-নয়টি ইউরোপীয় দেশ সফরে বের হবো। তাই কেনাকাটা করে বোঝা বাড়ানোর কোন যুক্তি নেই। অবশ্য বেশী দামেই এক জোড়া জুতা কিনলাম। কারণ দুবাই থেকে যে জুতা পরে এসেছিলাম, সফরে তা খুব একটা আরামদায়ক মনে হয়নি।
সাত জুলাই আমি লন্ডন চিডিয়াখানা দেখতে গেলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে সারাদিন ঘুরে ঘুরে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তবু সব দেখা শেষ হলো না। পিঁপিলিকা থেকে শুরু করে অসংখ্য প্রকার কীট-পতঙ্গ, সরীসৃপ, জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদির সুশৃংখল সমাবেশ ঘটানো হয়েছে চিড়িয়াখানায়। সবকিছুর পরিচিতি লেখা আছে, তাই কোন কিছুই চিনতে বা জানতে কোনরূপ অসুবিধা হয় না। আমার মতো আরো বহুলোকই চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছে, যার যেটা দেখার সেটা দেখে চলে যাচ্ছে। কোনরূপ হৈচৈ নেই, বিশৃংখলা নেই, মনে হয় যেন সবাই খুব সিরিয়াস। জানার ব্যাপারে সবাইর আগ্রহ প্রবল। কেউ কাউকে বিরক্ত করে না, যার যার কাজে সে খুব ব্যস্ত। আমার খুব ভাল লাগলো এ পরিবেশ। খোলামেলা সৌন্দর্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্তু-জানোয়ার, কীট-পতঙ্গ, সরীসৃপের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষও বিচরণ করছে, কেউ কাউকে উত্যক্ত করছে না। সারাদিন ঘুরে ঘুরে চিড়িয়াখানা দেখে অবশেষে দেহ-মন ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে পড়ল। সন্ধ্যার ম্লান অন্ধকারে বাসে চড়ে সবুজ মনোরম প্রান্তর পেরিয়ে আমি আমার দক্ষিণ লন্ডনের ডেরায় ফিরে এলাম।
একদিন গেলাম বিখ্যাত লন্ডন মিউজিয়াম দেখতে। প্রাসাদপম বিশাল অট্টালিকায় মিউজিয়াম করা হয়েছে। অট্টালিকাটি যেমন প্রাচীন, মিউজিয়ামের বয়সও তেমনি। দেশের প্রাচীন ও আধুনিক যুগের অসংখ্য দর্শনীয় ও শিক্ষামূলক বহু নিদর্শন এখানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। শুধু দেশেরই নয়, একসময় ইংল্যান্ডের শাসন যখন চলতো সারা বিশ্বময় তখন সারা বিশ্ব থেকে সংগৃহীত ও লুটপাট করে আনা অসংখ্য ঐতিহাসিক দর্শনীয় বিষয়ও এখানে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মিউজিয়ামের সবকিছুই অত্যন্ত দর্শনীয় ও পরিপাটি করে সাজানো। এর মধ্যে গ্রন্থশালা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হলো। পৃথিবীর জ্ঞান-ভান্ডার যেন এখানে এ মিউজিয়ামের সুরম্য প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। বাংলা ভাষারও অনেক দুষ্পাপ্য গ্রন্থ এখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। দেশ-বিদেশের অনেক জ্ঞান-পিপাসূ ব্যক্তি এ মিউজিয়াম পরিদর্শনে যান জ্ঞানের অনুসন্ধানে, বিভিন্ন বিষয়ে গবষেণার উদ্দেশ্যে। ঐতিহাসিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ, ভাস্কর্যবিদ, স্থাপত্যশিল্পী ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগণ এ মিউজিয়ামে আসেন উচ্চতর গবেষণার জন্য। এভাবে দেশ-বিদেশের অসংখ্য কৃতবিদ গবেষক এ সমৃদ্ধশালী প্রাচীন মিউজিয়ামের সদ্ব্যবহার করে বিশ্বের জ্ঞান-ভান্ডার নানাভাবে পূর্ণ করে তুলছেন। অবশ্য আমার মতো অনেক সাধারণ দর্শনার্থীও আসেন এখানে। বরং সংখ্যায় তারাই অধিক। দেশ-বিদেশের অসংখ্য সাদা-কালো নানা বর্ণ, গোত্র ও জাতির মানুষ, মেয়ে-পুরুষ-শিশু এখানে আসে শুধু দেখার জন্য। মিউজিয়াম পরিদর্শন করে তারা অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। একটি সমৃদ্ধ মিউজিয়াম যেন একটি জাতির ইতিহাস-সভ্যতা-ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক- জাতির দীর্ঘদিনের জ্ঞান-চর্চা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার গৌরবময় পাদপীঠ, সহস্র বছরের সাধনায় গড়ে তোলা এক অত্যুজ্জ্বল আলোকস্তম্ব।
একদিন গেলাম প্রখ্যাত ‘লন্ডন প্যানাটোরিয়াম’ দেখতে। এক অসাধারণ আধুনিক বৈজ্ঞানিক কারু-কর্মের অভিনব আবিষ্কার। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা, চরিত্র, দৃশ্যপট ও কাহিনী সিনেমার মতো করে ধরে রাখা হয়েছে। সিনেমা হলের গ্যালারীর মতোই দর্শক গ্যালারী বানানো হয়েছে। টিকিট কেটে সেখানে গিয়ে বসলাম। যথাসময়ে শুরু হলো প্রদর্শনী। আমি অভিভূত হয়ে ইংল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাস যেন জীবন্তভাবে পর্দায় অবলোকন করতে লাগলাম। একের পর এক নানা ঘটনা, চরিত্র ও দৃশ্যপট আমার দৃষ্টির সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। ইতিহাস-বিখ্যাত ওয়াটারলু যুদ্ধের দৃশ্য দেখানো হলো। ফ্রান্সের জাতীয় বীর নেপোলিয়ান বোনাপার্টির দ্বিকবিজয়ী বাহিনীর সাথে বৃটিশ বাহিনীর প্রচন্ড জল-যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন নেলসন। তিনি এখন বৃটিশ ইতিহাসের বিজয়ী বীরদের অন্যতম প্রধান কীর্তিমান পুরুষ হিসাবে নন্দিত। যুদ্ধের দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে অসংখ্য রণপোত, অস্ত্রধারী বীরগণ তুমূল পরাক্রমের সাথে যুদ্ধ করছে। এ যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে। এটা বৃটিশ ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। এখান থেকেই বৃটিশ জাতির নব উত্থান। বলাবাহুল্য, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ইউরোপীয় এ দুই দেশের মধ্যে মধ্যযুগে পর্যায়ক্রমে অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কোন যুদ্ধে ইংল্যান্ড আবার কোন যুদ্ধে ফ্রান্সের জয় হয়। আধিপত্য বিস্তারের এ যুদ্ধ ইউরোপের মানচিত্রকে বহুবার পাল্টে দিয়েছে। ইউরোপের সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসে এর যথেষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। প্যানাটোরিয়ামে সব কিছু দেখার পর ইতিহাসের বই না পড়লেও চলে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য এটা খুবই উপকারী। দর্শনার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্ররাই সংখ্যায় অধিক বলে মনে হলো।
‘লন্ডন প্যানাটোরিয়াম’ থেকে গেলাম মাদাম তুসোর তৈরি মিউজিয়াম দেখতে। এ বিদূষী ইংরাজ মহিলা শুধু মোম দিয়ে বিশ্বের ইতিহাস-খ্যাত বিভিন্ন ব্যক্তির প্রমাণ-সাইজ মূর্তি নির্মাণ করেছেন। মূর্তিগুলোর বিশেষত্ব হলো এই যে, দেখলে মনে হবে যেন বিভিন্ন ভঙ্গীতে জীবন্ত মানুষগুলো স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিদ্যমান রয়েছেন। অসাধারণ শৈল্পিক নৈপুণ্যের প্রবল পরাকাষ্ঠা। পাকিস্তানী জাতির পিতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, মোহন চাঁদ করম চাঁদ গান্ধী, জওহারলাল নেহেরু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু, বাংলাদেশের শেখ মুজিবর রহমানসহ বিশ্বের অসংখ্য ইতিহাস-বিখ্যাত সব ব্যক্তির মূর্তি এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। যদিও বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন যুগে তাঁদের জন্ম তবু লন্ডন শহরের এ আধুনিক অট্টালিকার সুরম্য কক্ষে সকলকে একত্র করা হয়েছে। দেখে মনে হয়, বিশ্বের বিশাল ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরী করে সেখানে এঁদের সকলকে একত্র সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এ যেন এক আশ্চার্য কারু-জাদু চিত্রশালা। এখান থেকে স্মৃতি হিসাবে আমি ছোট-খাট কয়েকটি জিনিস কিনলাম।
একদিন গেলাম রিজেন্ট পার্ক মসজিদে জুমার নামায পড়তে। সঙ্গে ছিলেন আলী হোসেন। তিনি বহু দিন হলো লন্ডন-প্রবাসী। বর্তমানে বৃটিশ নাগরিক। তিনি এখানে একটি বাংলা কাগজের সম্পাদক। একবার তিনি দুবাই গিয়েছিলেন বেড়াতে। সে সময় তার সঙ্গে ব্যরিস্টার কোরবান ভাইর বাসায় আমার পরিচয়। সে সূত্র ধরে লন্ডনে এসে তাকে টেলিফোন করতেই তিনি আমাকে বললেন, জুমার দিন সকালে রেডি থাকতে। তিনি এসে আমাকে নিয়ে যাবেন বেড়াতে। যথাসময়ে তিনি এলেন এবং আমাকে নিয়ে বের হলেন। তার সাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে অবশেষে নামাযের আগে হাজির হলাম রিজেন্ট পার্ক মসজিদে। আলী হোসেন আমাকে এ মসজিদ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা দিলেন। সৌদি সরকারের টাকায় গড়ে ওঠা এ মসজিদটি লন্ডন-প্রবাসী বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের এক ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। বিশাল সবুজ মনোরম রিজেন্ট পার্কের একপাশে এ মসজিদের অবস্থান। সুরম্য আধুনিক শিল্পকলাসম্মত সুবিশাল মসজিদ। নানা বর্ণ, গোত্র ও দেশের মুসলমান একসঙ্গে নামায পড়ছে। লন্ডনে বসবাসকারী অনেক মুসলমানই দূর-দূরান্ত থেকে জুমার নামায পড়তে আসে এ মসজিদে। নামাযের পর বিভিন্ন গ্র“পে বিভক্ত হয়ে অনেকেই খোশ-গল্পে মেতে ওঠে। অনেকে সিরিয়াস কথাবার্তায়ও সময় কাটায়। মুসলমানদের নানা সমস্যা, তাদের উন্নতি-অগ্রগতির বিষয়ও অনেকের আলোচনায় উঠে আসে। মনে হলো, লন্ডনবাসী মুসলমানদের এটা এক সাপ্তাহিক গুরুত্বপূর্ণ মিলন-মেলা। আমি ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। এক সময় মসজিদের ইমাম সাহেবের রুমেও ঢুকে পড়লাম। অনেকেই সেখানে ছিল, সে হিসাবে আমিও ঢুকে গেলাম। মূলত আলী হোসেনই আমাকে নিয়ে গেলেন সেখানে এবং ইমাম সাহেবের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। মুসলমানদের সমস্যা ও ইসলামী বিষয় নিয়ে নানা রকম আলোচনা হলো। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। খুব ভালো লাগলো। মনে হলো, যেসব দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু সেখানেই তারা ইসলাম ও মুসলমানদের সমস্যা নিয়ে বেশী উদ্বিগ্ন। সর্বদা তাদেরকে সতর্ক থাকতে হয়, নানা সমস্যা ও সংকটের মোকাবিলা করে তাদের চলতে হয়। তাই তারা যে মুসলমান একথা তারা কখনো ভুলে থাকতে পারে না, প্রতিবেশী অমুসলমানরাই সবসময় তাদেরকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয় নানা কথা ও আচার-আচরণে। আমি আছরের নামায পড়ে তারপর মসজিদ থেকে বিদায় হলাম।
একদিন গেলাম ট্রাফালগার স্কয়ারে। সেখানে বিশাল এলাকার মধ্যস্থলে উঁচু করে বৃটিশ জেনারেল নেলসনের ভাস্কর্য মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ১৮০৫ সনে বৃটিশ বাহিনীর সাথে ফ্রান্স ও স্পেনের যৌথ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইতঃপূর্বে অন্য আরেকটি প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বৃটিশ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন সেনাপতি নেলসন। সে যুদ্ধে বৃটিশ বাহিনীর জয় হয়েছিল। সেই বিজয়ের গৌরব-গাঁথার স্মরণে এ ট্রাফালগার স্কয়ার নির্মিত হয়েছে। এখানে অসংখ্য নারী-পুরুষ-শিশু দর্শনার্থীর ভীড় জমে প্রতিদিন। আমাদের বায়তুল মোকারমের সামনে যেমন নানা ধরনের ঔষধ-বিক্রেতা ও ফেরিওয়ালাদের ভীড় জমে, অসংখ্য দর্শনার্থী তাদের ঘিরে থাকে, তেমনি এখানেও দেখলাম নানা জাতের লোক তাদের বিচিত্র ক্রীড়া-কৌশল, নাচ-গান ইত্যাদি দেখিয়ে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জাতীয় ও সামাজিক কোন বড় অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য লন্ডনবাসীরা এখানে এসে ভীড় জমায়। আমাদের দেশে এখন যেমন বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য রমনা পার্কে এসে ভোর বেলায় সকলে মিলিত হয়, লন্ডনবাসীরাও তেমনি ইংরাজি নববর্ষ উদযাপন করে এই ট্রাফালগার স্কয়ারে এসে। শুনেছি, নানারূপ আনন্দ-স্ফূর্তি ও রঙ্গ-তামাসার মধ্য দিয়ে তারা এ দিনটি উদযাপন করে থাকে। ইংরাজরা কাজে-কর্মে যেমন সিরিয়াস আবার আনন্দ-ফূর্তিতেও তেমনি অনেকটা বল্গাহীন।
লন্ডন একটি প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ শহর। এখানে অনেক কিছু দেখার আছে। লন্ডন টাওয়ার, পোস্ট অফিস টাওয়ার, লন্ডন টান্সপোর্ট মিউজিয়াম, হাউজ অব লর্ডস, হাউজ অব কমন্স, বিগ বেন বেল ইত্যাদি অনেক কিছু, যা পুরাপুরি দেখতে গেলে কয়েক সপ্তাহ সময় দরকার। এত সময় আমার হাতে ছিল না। তবু যতটুকু পারি, কিছু কিছু দেখে মনের ও চোখের তৃপ্তি মেটাবার চেষ্টা করলাম। প্রতিদিন সকালে নাস্তা করে বের হই। সারাদিন বাসে-ট্রেনে চড়ে যেখানে খুশি, যত্রতত্র মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই। দুপুরে রাস্তার পাশে কোথাও পটেটো চিপ্স অর্থাৎ আলু ভাজা অথবা পাউরুটি-কলা ইত্যাদি কিনে খাই। সারাদিন ঘুরে ফিরে রাতের অন্ধকারে লন্ডনে আমার আস্তানায় ফিরে আসি।
একদিন গেলাম হাউজ অব কমন্সে। টিকিট কেটে দর্শক গ্যালারীতে ঢুকে ঘন্টাখানেক বসে থাকলাম। ইংল্যান্ডকে বলা হয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার। হাউজ অব কমন্সই এ গণতন্ত্র চর্চার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে তিনটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বৃটিশ জনগণের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে। একটিকে বলা হয় কনজার্ভেটিভ (রক্ষণশীল) বা টোরী দল, একটি লেবার পার্টি (শ্রমিক দল) ও অন্যটি লিবারেল পার্টি। সাধারণত টোরী দল ও লেবার পার্টি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসীন হয়। কদাচিৎ লিবারেল পার্টি ক্ষমতায় আসে। হাউজ অব কমন্স একটি অত্যন্ত সাদা-মাটা ধরনের প্রাচীন অট্টালিকা। আমাদের জাতীয় সংসদ তাঁর চেয়ে অনেক বেশী আধুনিক ও বহুবিধ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সুরম্য অট্টালিকা। সেখানে দেখলাম তিন দলের লোকেরাই প্রায় গাঁ ঠাসাঠাসি করে বসে যুক্তিপূর্ণ বিতর্কে অবতীর্ণ হচ্ছেন। কোনরূপ গন্ডগোল নেই, সাধু-সজ্জন বেশে সকলেই যার যার বক্তব্য পেশ করে চলেছেন অতিশয় ধীর-স্থিরভাবে ও যুক্তিতর্কসহকারে। আমি যখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম, তখন সেখানে বৃটিশ হেলথকেয়ার সম্পর্কে মনোজ্ঞ আলোচনা চলছিল। গণস্বাস্থ্য সম্পর্কে তারা কত সচেতন এবং গণস্বাস্থ্য উন্নয়নে সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সকলে কতটা উদগ্রীব তা তাদের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল।
হাউজ অব কমন্স থেকে বের হয়ে গেলাম হাউজ অব লর্ডস-এ। সেখানে সব প্রবীণ-বিজ্ঞ আইন-প্রণেতাগণ বসেন। যেসব প্রবীণ রাজনীতিবিদ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তাদের মধ্য থেকেই ইংল্যান্ডের রাণী কিছু কিছু বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে মনোনীত করেন হাউজ অব লর্ডস-এ। এঁরা জনগণের প্রতিনিধি নন, মূলতঃ রাণীর প্রতিনিধি। তাই তাঁরা যে দলেরই হোক না কেন, তাঁদের ভূমিকা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। হাউজ অব কমন্স থেকে যেসব বিল পাশ করা হয়, সেগুলো হাউজ অব লর্ডস-এ পাঠানো হয় অনুমোদনের জন্য। জাতীয় ও গণস্বার্থ বিবেচনা করে হাউজ অব লর্ডস সেসব বিল অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। এটাকে বলা যায়, সর্বোচ্চ বিবেকের আসন। তাই বৃটিশ জনগণের কাছে হাউজ অব লর্ডসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম।