আমি দুবাই থেকে লন্ডন রওয়ানা হওয়ার আগেই ইউরোপের কয়েকটি দেশ সফরের উদ্দেশ্যে ভিসা নিয়ে গিয়েছিলাম। লন্ডনে বিভিন্ন ট্যুর-অপারেটর কাজ করে। কেউ বিমানে, কেউ বাসে বা ট্রেনে করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাত্রীদের সফরের ব্যবস্থা করে। বিমানে যাতায়াত খরচ বেশি, বাস ও ট্রেনে খরচ অপেক্ষাকৃত কম। ফলে আমি বাসে করে ইউরোপ সফরে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তাছাড়া, বাসে সফর করলে আমি ইউরোপের মাটি-মানুষ ও ভৌগোলিক অবস্থান মোটামুটি দু’চোখ ভরে দেখার সুযোগ পাব। ট্যুর-অপারেটররা যাত্রীদেরকে এক একটা গ্রুপে ভাগ করে নেয়। তুলনামূলকভাবে তাতে যাত্রীদের খরচ পড়ে কম। যাতায়াত, হোটেলে থাকা-খাওয়া এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে এরা। প্রত্যেকটি গ্রুপের সাথে কমপক্ষে দু’জন গাইড থাকে, যারা পর্যায়ক্রমে সারা পথ যাত্রীদেরকে পথিমধ্যে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও বিষয়ের নাম, পরিচয় ও আনুষঙ্গিক বিবরণ দিয়ে সকলকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। এসব গাইড ব্যতীত ভ্রমণ নিতান্ত নিরস ও অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই ট্যুর অপারেটরদের সাথে সফরে যাওয়াই সব দিক দিয়ে সমীচিন।
আমি একটি গ্রুপের সঙ্গে ৯ জুলাই ইউরোপ সফরে বের হলাম। এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইংল্যান্ড মূলত একটি দ্বীপ বিশেষ। কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি নিয়ে যুক্তরাজ্য বা ইউনাইটেড কিংডম গঠিত। এটাকে একসঙ্গে বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ British Islands বলেও অভিহিত করা হয়। মূল ইউরোপীয় ভূখন্ড থেকে এটি বিচ্ছিন্ন। ইউরোপের অন্য কোন দেশে যেতে হলে বিমান অথবা ফেরী ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। অবশ্য এখন ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে সূড়ঙ্গ পথ (টানেল) হয়েছে। টানেলের মাধ্যমে ট্রেন ও মোটরযান যোগে ফ্রান্সে যাওয়া যায়। সেখান থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাথে স্থলপথে যোগাযোগের সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। আমি ১৯৮৪ সনের কথা বলছি, তখন টানেলের কাজ চলছিল। তাই বিমান ও ফেরী ছাড়া ইউরোপের মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগের অন্য কোন ব্যবস্থা ছিল না।
যাই হোক, কর্মসূচী অনুযায়ী আমি লন্ডনের প্রখ্যাত ভিক্টোরিয়া রেল-স্টেশনে উপনীত হলাম সকাল এগারটার দিকে। ট্যুর অপারেটরদের লোকেরা কোম্পানীর ব্যাজ লাগিয়ে স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা ব্যাজ দেখে তাদেরকে চিনতে পারলাম এবং তাদের কাছে গিয়ে যথারীতি রিপোর্ট করলাম। এরপর আমরা আমাদের গাইডদের অনুসরণ করে যথারীতি ট্রেনে উঠে আমাদের নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করলাম।
ঠিক দুপুর সাড়ে বারটায় গাড়ি নড়া-চড়া শুরু করল। গ্রীষ্মের মিষ্টি রোদে (ওখানকার গ্রীষ্মের রোদ আমাদের দেশের শীতকালের মতোই) জানালা দিয়ে আমি রাস্তার পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে অগ্রসর হলাম। ঘন সবুজ-বনানী, মাঝে মাঝে ফসলের সমারোহ, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির উড়ে যাওয়ার শব্দ-সবকিছু দেখে আমি আমার কৌতূহলী মনে অপার আনন্দ লাভ করলাম। প্রকৃতির সৌন্দর্য সর্বত্রই মনোরম। ইংল্যান্ডের এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ আমি কিছু কিছু আগেও বই-পুস্তকে পড়েছি। আমার পাঠ্য-পুস্তকের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ইংরাজ কবির কবিতায়ও তার বিবরণ পড়ে ছাত্র-জীবনে মুখস্ত করেছি। বিখ্যাত ইংরাজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০), পি.বি.শেলী (১৭৯২-১৮২২), জন কীট্স (১৭৯৫-১৮২১) প্রমুখ বিশেষভাবে প্রকৃতির কবি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁদের লেখা বিভিন্ন কবিতায় প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা স্থান পেয়েছে। সেগুলো আমার স্মৃতিতে এখনো কিছু কিছু অম্লান হয়ে রয়েছে। বাস্তবে সে প্রকৃতির দৃশ্যময়, বর্ণময়, বৈচিত্র্যময় অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করে আনন্দে মন আপ্লুত হয়ে উঠলো। বাস্তবের সাথে স্বপ্ন-কল্পনার সমন্বয় যখন ঘটে তখন সেটা যথার্থই রোমাঞ্চকর ও আনন্দদায়ক হয়।
বিকাল দু’টায় ডোভার ফেরী ঘাটে গিয়ে ট্রেন থামলো। এ ফেরী ঘাট দিয়ে জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একদিকে ফ্রান্স ও অন্যদিকে বেলজিয়ামে যাওয়া যায়। আমরা লন্ডন থেকে প্রথমে যাব বেলজিয়াম। তাই বেলজিয়াম যাওয়ার ফেরীতে উঠে পড়লাম। ফেরী মানে তিন তলা বিশিষ্ট বিশাল সমুদ্রগামী জাহাজ।
আমরা ফেরীতে উঠলাম। অসংখ্য যাত্রী, বিভিন্ন ধরনের মোটরযানে ভর্তি হয়ে বিশাল ফেরী গভীর সমুদ্র-পথে যাত্রা শুরু করল বিকাল তিনটা ত্রিশ মিনিটে। অসংখ্য যাত্রীর সাথে আমিও চলছি। আমার সহযাত্রী কোন একজন ব্যক্তিকেও আমি চিনি না। তাই দু’দণ্ড কারো সঙ্গে কথা বলার কোন সুযোগও নেই। জাহাজের রেলিং ধরে আমি সমুদ্রের রূপ অবলোকন করতে লাগলাম। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। পানির রং মনে হলো কালো। রাত্রের অন্ধকারে কোনকিছু সঠিকভাবে ঠাহর করতে পারছিলাম না। বিস্তীর্ণ, তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্রের কালো বিপুল জলরাশি অতিক্রম করে জাহাজ এগিয়ে চলল। তখন সমুদ্রে ঝড় বইছিল, বাতাসের গতি অবশ্য তেমন তীব্র ছিল না। তবু বুক দুরু দুরু করছিল। তরঙ্গ-বিক্ষোভে সমুদ্রে টালমাটাল অবস্থা। ধীরে ধীরে সূর্যের আলো ম্লান হয়ে এলো। গোধূলির লালিমা ছড়িয়ে পড়লো পশ্চিম দিগন্তে। মুহূর্তের মধ্যে কালো অন্ধকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। নিচে অথৈ জলরাশি, উপরে অনন্ত বিস্তৃত আকাশ, চারিদিকে নিঃসীম দিগন্ত রাত্রির অন্ধকারে ঢাকা। জাহাজের বাইরে আর কিছুই দেখা যায় না। জাহাজে অবশ্য আলোর অভাব ছিল না। আমরা সে আলোতে জাহাজের মধ্যে এখানে-ওখানে চলাফেরা করে সময় কাটাতে লাগলাম। আমি অজু করে নামায পড়লাম। মনে হলো, এ বিশাল জাহাজে হয়তো আমিই একমাত্র মুসলমান অথবা সফর অবস্থায়ও নামায পড়তে অভ্যস্থ মুসলমান সম্ভবত ওখানে আর কেউ ছিল না।
রাত সাড়ে আটটায় বেলজিয়ামের উপকূলে অবস্থিত ‘অসটেন্ড’ সমুদ্র বন্দরে এসে আমাদের জাহাজ ভিড়লো। সেখান থেকে আমাদের নির্দিষ্ট বাসে করে গ্র“পের অন্যান্য যাত্রী ও গাইডদ্বয়কে নিয়ে আমাদের বাস ছাড়লো। রাত্রির অন্ধকারে চকমকে বিজলী আলোয় উজ্জ্বল সারা শহর। আমরা সে আলোয় পথ চলছিলাম। দ্রুত বেগে আমাদের বিলাসোপম বায়ান্ন সিটের বৃহদাকার বাস ছুটে চলল। রাত দশটা পঞ্চাশ মিনিটে আমাদের বাস ব্রাসেল্স নগরীর ‘ডেলটা হোটেলে’ উপনীত হলো। হোটেলে যার যার সিটে অবস্থান নিয়ে তারপর আমি জামা-কাপড় চেঞ্জ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। শরীর-মন ছিল ক্লান্ত-অবসন্ন। বিছানায় শুয়ে পড়তেই রাজ্যের ঘুম এসে দু’চোখে ভর করলো। কিন্তু ঘুমাতে পারলাম না। একটু পরেই দরজার কড়া নড়ে উঠলো। খাবার জন্যে নিচে যেতে বলা হলো। আমি নিচে গিয়ে সবার সঙ্গে খেতে বসলাম। খেয়ে-দেয়ে রুমে এসে অজু করে এশার নামায পড়ে ঘুমাতে গেলাম। মুহূর্তেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে এলো দু’চোখ।
পরদিন ১০ জুলাই আমরা হোটেল ত্যাগ করলাম। যাত্রা শুরু হলো নতুন গন্তব্য অভিমুখে। সকাল ৮.১০ মিনিটে আমাদের বাস গিয়ে থামলো সীমান্তরেখা বরাবর। একসঙ্গে তিন দেশের সীমান্ত যুক্ত হয়েছে এখানে। বেলজিয়াম, জার্মানী ও হল্যান্ড- এ তিন দেশের সীমানা মিলিত হয়েছে একই স্থানে। এরূপ অবস্থা অবশ্য খুব বিরল। সাধারণত দু’টি দেশের সীমান্ত এক হওয়ার কথা, কিন্তু এখানে তিনটি দেশের সীমান্ত এক সাথে মিলিত হয়েছে। বর্ডারে চেক-ইন করে, পাসপোর্টে সীল লাগিয়ে আমরা জার্মানীর অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লাম। মাত্র দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই সব ঝামেলা চুকে গেল। বর্ডারের লোকেরা এত এফিসিয়েন্ট, আমি দেখে অবাক হলাম।
সকাল ৮.১৫ মিনিটে আমাদের বাস আবার যাত্রা শুরু করল। নতুন আরেকটি দেশের দিকে। আমরা জার্মানীর উত্তরাঞ্চল দিয়ে পরিভ্রমণ করছি। এ এলাকাটি প্রায় সম্পূর্ণ কৃষি-প্রধান এলাকা। আমরা প্রশস্ত, সুরম্য রাজপথ পেরিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। গাড়ি চলছে দ্রুত বেগে। রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ শস্য-শ্যামল মনোরম প্রান্তর। সবুজের বিপুল সমারোহ মন ভরিয়ে দেয়। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রাণ আনন্দে দুলতে থাকে। ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি, বাংলাদেশ সবুজের দেশ। কিন্তু ইউরোপ সফরে বের হয়ে দেখলাম, এখানকার সবগুলো দেশই বাংলাদেশের মতোই সবুজ-শ্যামল-সুন্দর। আমার মন আবেগে আপ্লুত হলো। মুহূর্তের মধ্যে আমার প্রিয় চির সবুজ মাতৃভূমির কথা মনে হয়ে আনন্দে আত্মহারা হলাম।
জার্মানীর উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকা ছাড়িয়ে আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে গিয়ে উপনীত হলাম একটি শিল্পোন্নত শহরে। এ শহরের নাম কোলন কোবলেঞ্জ KOLN KOBLENZ সুন্দর আধুনিক শিল্প-নগরী। জার্মানী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পোন্নত দেশ। সারা বিশ্বে জার্মানীর শিল্পজাত দ্রব্য রপ্তানী হয়ে থাকে। এর মানও অত্যন্ত উন্নত। তাই জার্মানীর শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদাও রয়েছে বিশ্বব্যাপী।
জার্মানীর বিখ্যাত রাইন নদীর তীরে অবস্থিত কোবলেঞ্জ নগরী উত্তর সাগর North Sea থেকে ৮২০ মাইল উজানে অবস্থিত। আমাদের বাস এসে রাইনের তীরে থামলো। আমরা সবাই নেমে পড়লাম। নদীর এক পাশে অনুচ্চ পাহাড়, আরেক পাশে বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট, রাস্তা ও ভ্রমণকারীদের ভীড়ে সদা চঞ্চল। নানা দেশের, নানা জাতের মানুষের কল-কোলাহলে রাইনের তীর সদা মুখরিত। আমরা এখানে পথের পাশের একটি রেস্টুরেন্ট-এ বসে কিছু হালকা খাবার খেয়ে নিলাম। ছোট ছোট অসংখ্য দোকান। লোকজনের মধ্যে সফরকারীদের সংখ্যাই বেশী মনে হলো। দোকানগুলোর মধ্যে খাবারের দোকান ও রকমারী ফুলের দোকানের সংখ্যাই বেশী। মাঝে মধ্যে দু’একটি মুদী বা স্টেশনারী দোকানও চোখে পড়ে।
কোবলেঞ্জ রোমান আমলে তৈরি একটি প্রাচীন শহর। শহরের জনসংখ্যা মাত্র দশ হাজার। তবে ভ্রমণকারীদের ভীড় এখানে সবসময়ই লেগে থাকে। অধিবাসীদেরকে মনে হলো খুবই সৌখিন ও সৌন্দর্য-বিলাসী। প্রত্যেকটি বাড়িতেই জানালার খিলানে, ছাদে সর্বত্র অসংখ্য ফুলের টব। টবগুলোতে নানা জাতের, বিচিত্র বর্ণের অসংখ্য ফুলের সমারোহ। বাড়িগুলোকে মনে হয় এক একটি সাজানো ফুলের বাগান। নানা জাতের, নানা রঙ-বেরঙের বিচিত্র ফুলের অপরূপ সমাহার। সাধারণ বাড়ি-ঘরগুলোকে যে এভাবে ফুলের বাগানে পরিণত করা যায়, তা কোবলেঞ্জ-এ এসেই প্রথম লক্ষ্য করলাম।
মনে হলো, জার্মানীরা সকলেই বুঝি এরকম সৌন্দর্যপ্রিয়। রাইন নদীর ওপারে বরাবর বি¯তীর্ণ পাহাড়। পুরো পাহাড় এলাকা জুড়ে আবাদ করা হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে খাচ্ কেটে কেটে আবাদী ভুমি তৈরি করা হয়েছে। কোথাও এতটুকু জায়গা খালি নেই। পুরো পাহাড় আবাদ করে নানা ফসলে ভরে তোলা হয়েছে। জার্মানরা শুধু সৌন্দর্য-প্রিয়ই নয়, তারা অসম্ভব পরিশ্রমী। সারা দেশে কোথাও এতটুকু জায়গা খালি দেখলাম না। বাড়ি-ঘর, শহর, দোকান-পাট, শিল্প-কারখানা, দিগন্ত বি¯তৃত ফসলের মাঠ, সবুজ বনানী ইত্যাদি সবকিছু যেন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির সাথে মানুষের যেন এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এখানে। প্রকৃতির মাঝেই তারা বেড়ে উঠেছে, এবং প্রকৃতি থেকেই তারা নানা উপাদান সংগ্রহ করে নিজেদের জীবনকে সম্পন্ন ও সুন্দর করে তুলেছে।
রাইন নদীতে নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। দু’ঘন্টার জার্নি। টিকিট কেটে আমরা নৌ-ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিলাসপূর্ণ জাহাজে উঠে পড়লাম। মুহূর্তের মধ্যে জাহাজ পূর্ণ হলো। তিন তলা জাহাজের একটি সীটও খালি থাকলো না। আমরা রাইন নদীর দু’পারের মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে সামনের দিকে অগ্রসর হলাম। নানা দেশের নানা জাতের নারী-পুরুষ একত্র নদী-ভ্রমণের আনন্দে মগ্ন। আমার খুব পানি পিপাসা লাগলো। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় সবার হাতেই বীয়ারের পাত্র। আমি ওয়েটারকে ডেকে এক বোতল পানি দিতে বললাম। আমাকে এক বোতল পানি দেওয়া হলো। পানির রং ও বোতলের গায়ে জার্মান ভাষায় লেখা লেভেল দেখে আমার মনে খটকা সৃষ্টি হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি তো এক বোতল সাদা পানি চেয়েছি। বলা হলো, এটা মিনারেল ওয়াটার। শুনে আমি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে পানি পান করতে লাগলাম। কিন্তু খেতে পারলাম না। ভাবলাম সাদা পানি এরা হয়তো খায় না, না হয় তার ব্যবহার এখানে অত্যন্ত সীমিত। আমি আকণ্ঠ পানির পিপাসা নিয়ে বিষণ্ন বদনে দেশ-জাতির বিচিত্র কৃষ্টি-কালচার ও জীবনাচারের বিষয় নিয়ে ভাবতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর বিল নিয়ে ওয়েটার এলো। আমি দুই জার্মান মার্ক মূল্য দিয়ে তাকে বিদায় করলাম।
গ্রীষ্মের মেঘহীন রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে রাইন নদীর উপর ভ্রমণ অত্যন্ত আরামপ্রদ মনে হলো। দু’ঘন্টা পর নৌ-ভ্রমণ শেষে আমরা আবার এসে তীরে উপনীত হলাম। তারপর আমাদের বাসে উঠে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলাম। বাস ছুটে চলল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে এঁকে-বেঁকে প্রশস্ত পাকা রাস্তা নির্মিত হয়েছে। শান্ত-নিরিবিলি ফসলে ভরা সবুজ মাঠ। বিকেলের স্নিগ্ধ নরম রোদের সাথে খেলা করতে করতে যেন আমাদের বাস এগিয়ে চলল। বিকেল ৪.৫০ মিনিটে আমরা জার্মানীর অন্যতম বৃহৎ শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট-এ উপনীত হলাম। ফ্রাঙ্কফুর্ট অত্যন্ত বড় শহর। লোকসংখ্যাও প্রচুর। কিন্তু এত সুন্দর ও পরিছন্ন যে, এটাকে বিশ্বের অন্যতম সৌন্দর্য নগরী হিসাবে গণ্য করা চলে। শহরের উপর দিয়ে বাসে করে শুধু একবার ঘুরে এসেছি। তাই সবকিছু দেখার সুযোগ হয়নি। তবে এক নজরেই এ শহরকে আমার খুব ভাল লেগেছে। এর ছিমছাম ঘর-দুয়ার, দোকান-পাট, রাস্তা-ঘাট সবকিছু অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুরুচিসম্পন্ন।
ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর অতিক্রম করে আমরা ছুটে গেলাম আরেক ঐতিহাসিক নগরী ন্যুরেমবার্গের দিকে। এ অঞ্চলকে বলে ব্যাভেরিয়া অঞ্চল। ব্যাভেরিয়া অঞ্চল হলো একটি বিস্তীর্ণ সমতল কৃষি এলাকা। এখানে পর্যাপ্ত কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয়। নানা রকম গবাদির পশুরও আবাদ হয় এখানে। তাই এ এলাকাকে জার্মানীর একটি উর্বর শস্য-ভান্ডার রূপে আখ্যায়িত করা হয়।
রাত ৭.৫০ মিনিটে আমরা ন্যুরেমবার্গ শহরের একটি হোটেলে এসে আশ্রয় নিলাম। হোটেলটির নাম ‘মার্কুর’ Merkur। ন্যুরেমবার্গ শহরে যুদ্ধাপরাধী নাজি জার্মানীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত বসে। এখানে সে ঐতিহাসিক বিচার কার্য সমাধা হয় বলে এ শহরটি একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। শহরটি তেমন বড় নয়। তবে অত্যন্ত পরিছন্ন, ছিম-ছাম সুন্দর নগরী। লোক সংখ্যাও খুব বেশি মনে হলো না। ন্যুরেমবার্গ শহরে হোটেল মার্কুরে এসে আমরা অবস্থান নিলাম। এখানে এসে এক অভিনব বিপত্তি ঘটল ।
রাত্রিতে আমাদেরকে খাবার দেওয়া হলো। সাদা ভাত এবং গোশ্ত। জিজ্ঞাসা করলাম কীসের গোশ্ত ? হৃষ্টচিত্তে বেয়ারা জবাব দিল, শুয়োরের গোশ্ত। শুয়োরের গোশ্ত ওখানে খুবই জনপ্রিয়। সকলেই তা পছন্দ করে ও সাগ্রহে খেয়ে থাকে। তাই বেয়ারাও খুশি মনে আমাকে তা জানালো। শুনে আমি বললাম, নিরামিষ থাকলে আমাকে তাই এনে দাও অথবা কমপক্ষে একটি অমলেট দাও। বেয়ারার খাবার প্লেট নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে আরেক প্লেট ভাত নিয়ে এলো আমার জন্যে। এবারে ভাতের উপরে কোন গোশ্ত নেই, আছে গোশ্তের ঝোল। বেয়ারার সবিনয়ে বলল কোন নিরামিষ নেই, আন্ডাও নেই। তাই যেহেতু আপনি গোশ্ত খান না, শুধু গোশ্তের ঝোল নিয়ে এসেছি। বেচারা বুঝতেই পারেনি যে, ঐ গোশ্ত যেমন আমার নিকট হারাম, তার ঝোলও তেমনি। আমি রাগ করে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গেলাম।
হোটেল থেকে বেরিয়ে রাস্তার দু’পাশে কোন মুদী দোকানের অনুসন্ধান করতে লাগলাম। দুধ-কলা-রুটি যা পাই, তা দিয়েই পেটের ক্ষুধা মিটাতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তখন একটি দোকানও খোলা ছিল না। রাত এগারটার মধ্যেই অথবা তার আগেই এখানে সমস্ত দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যায়। আমি কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে হতাশ হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। বাথরুমে ঢুকে ওজু করে নামায পড়ে টেবিলে রাখা পানি পেট ভরে খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সেদিন রাত্রিতে আমার আর কিছু খাওয়া হলো না।