১৯৮৪ সনের ১১ জুলাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামায পড়ে নাস্তা করলাম সকাল ৬ টায়। তারপর বাসে উঠে যাত্রা শুরু হলো। এক-ঘন্টা পঞ্চাশ মিনিট অবিরাম পথ চলে আমরা সকাল ৮.২৫ মিনিটে মিউনিখ অলিম্পিক সিটিতে উপনীত হলাম। সেখানে আধ-ঘন্টা যাত্রা বিরতি হলো একটি ছোট্ট শহরে। শহরটির নাম ভ্যাটারস্ট্যাটেম Vaterstattem। এরপর আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। দীর্ঘ সোয়া-তিন ঘন্টা চলার পর আমরা গিয়ে পৌঁছলাম ব্যাভেরিয়ান সমতল ভূমির আল্পস এলাকায়। সেখানে আবার আধ-ঘন্টার জন্য যাত্রা বিরতি। আল্পস এলাকা জার্মানীর একটি অংশ। এটার শেষ প্রান্তে জার্মানীর সীমান্ত এলাকা। এখান থেকে ক্রিনসী লেক KRIN SEA LAKE চোখে পড়ে। বিরাশি স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এ লেকটি একটি হলিডে স্পট হিসাবে খ্যাত। ছুটির দিনে এখানে অনেকেই আসে ঘুরে বেড়াতে, আনন্দ-স্ফূর্তি করে ছুটির অলস মুহূর্তগুলো কাটাতে। আমরা ৯.৫৫ মিনিটে এখানে এসে ১০.৫০ মিনিটে আবার যাত্রা শুরু করলাম নতুন গন্তব্যের দিকে। এ অল্প সময়ের মধ্যে চারদিকে তাকিয়ে শুধু প্রকৃতির দৃশ্য, মানুষের আনাগোনা ও চালচলন দু’চোখ ভরে দেখলাম।
প্রায় পঞ্চাশ মিনিট চলার পর ১০.৪৫ মিনিটে আমরা অস্ট্রিয়ার সীমান্ত এলাকায় এসে উপনীত হলাম। বর্ডারে ইমিগ্রেশন কাজ-কর্ম সারতে দশ-বার মিনিট সময় লেগে গেল। তারপর ১০.৫৮ মিনিটে আমরা নতুন দেশ অস্ট্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে লাগলাম। মাত্র দশ মিনিট পথ অতিক্রম করে আমরা গিয়ে উপনীত হলাম অস্ট্রিয়ার একটি সুন্দর ছোট্ট শহর সস্বার্গ Sasburg-এ। সেখানে গিয়ে উঠলাম হোটেল জুম হিরসেন Hotel Zum Hirschen-এ।
অনুচ্চ পাহাড়-ঘেরা সুন্দর মনোরম শহর সল্সবার্গ। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত সল্জাক নদী (ঝধষুধপয জরাবৎ) সল্জ-সল্ট পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে এ শহরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে তার গন্তব্য স্থলে। নদীটি তেমন প্রশস্ত নয়, বরং দেখতে এটাকে একটি নালার মতোই মনে হয়। কিন্তু খর-স্রোতা। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে এই সুন্দর শহর। ভ্রমণকারীরা সবাই আসে এ নদীর তীরে বেড়াতে। নদীর দুই পাড়ে কৌতূহলী অনেক মানুষ এসে ভীড় করে। কুলু কুলু বেগে বয়ে যাওয়া নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই বিস্ময়-বিমুগ্ধ নেত্রে। আমাদের দেশে এরকম বহু নদী রয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য ছোট-বড় নদী বয়ে চললেও তার দৃশ্য দেখার জন্য এভাবে কাউকে বসে থাকতে দেখা যায় না। তাই আমি এখানে নদীর তীরে অসংখ্য মানুষকে বসে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হলাম। বিশেষত বিকালে নরম রোদের আলোয় বেশী মানুষের ভীড় জমে এখানে। অসংখ্য নারী-পুরুষ হাত ধরাধরি করে এসে বসে নদীর দুই পাড়ে। মিহি গলায় পরস্পর কথাবার্তা বলে, কেউ বা মিষ্টি গলায় সুর তুলে পরিবেশকে মোহাচ্ছন্ন করে তোলে। কেউ বা শুধু খর-স্রোতা নদীর দিকে অবাক-বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে অলস মুহূর্তগুলো নীরবে কাটিয়ে দেয় বা নিজেদের মতো উপভোগ করে।
সল্সবার্গ শহরটি ছোট হলেও এখানে অসংখ্য ভ্রমণকারীরা আসে প্রায় সারা বছর ধরেই। তবে গ্রীষ্মকালে তাদের আগমনের হার বেড়ে যায় অনেক গুণে। অস্ট্রিয়ার জাতীয় রাজস্বের একটা বড় অংশ আসে ভ্রমণ খাত থেকে। জানা গেল, অস্ট্রিয়ায় বছরে মোট পঁচাত্তর লক্ষ (১৯৮৪ সনে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী) লোক আসে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। এর অর্ধেক ভ্রমণকারীই নাকি সসবার্গে আসে কিছুটা সময় কাটাতে।
বিকেলের দিকে আমরা গাইডসহ বের হলাম শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে। শহরটি তেমন বড় নয়। এখানে কোন সমুদ্র নেই। একটি বড় জলাশয় চোখে পড়ল। তার চারপাশে নানা সবুজ মনোরম দৃশ্য, ছোট ছোট ঘর-বাড়ি এবং দু’একটি আনন্দ-বিহার কেন্দ্র। সামান্য পয়সার বিনিময়ে ভ্রমণকারীরা এখানে কিছুক্ষণের জন্য নিরিবিলি সময় কাটাতে পারে। পাশেই দেখলাম একটি মাঠ। মাঠের সাথে কৃত্রিম জলাশয়। অসংখ্য নারী-পুরুষ সেখানে ভীড় করে আছে। আমরাও গিয়ে দাঁড়ালাম সেখানে। দেখলাম নারী-পুরুষ অনেকেই সেই জলাশয়ে নেমে শরীর ভিজিয়ে নিচ্ছে। আনন্দে উন্মুখর সকলেই। ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের আনন্দই সব চেয়ে বেশী।
সন্ধ্যার ম্লান অন্ধকারে আমরা ঘুরতে ঘুরতে গেলাম এখানকার মার্কেট প্লেসে। নানারকম পণ্য-দ্রব্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন দোকানে। দোকানগুলোকে খুব আধুনিক মনে হলো না। পণ্য-সামগ্রী দেখে মনে হলো, যেন সবই ভ্রমণকারীদের জন্যই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। স্থানীয় এন্টিক জাতীয় দ্রব্যাদির সংখ্যাই বেশী। এগুলো ভ্রমণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে। দেখলাম, অনেকেই তা নেড়ে চেড়ে পরখ করছে। কেউ কেউ কেনাকাটায়ও বেশ ব্যস্ত। আমি আগ্রহ নিয়ে সবকিছু ঘুরে ফিরে দেখলাম। দু’একটি টুকটাক জিনিস ক্রয় করলাম। তারপর সকলের সাথে ফিরে এলাম হোটেলে।
সল্সবার্গে একটি জিনিস আমাকে অবাক করল। এখানে যত উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে, তার মধ্যে একটি জিনিসই সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয়। এখানে এক সময় এক ফেরীওয়ালা ছিলেন, যিনি আইসক্রিম ফেরী করে বেড়াতেন। ধীরে ধীরে তার আইসক্রিম স্থানীয় লোক, বিশেষত শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে তার ব্যবসাও বেড়ে যায় দ্রুত গতিতে। রোজগারও বাড়ে সেই হারে। অবশেষে সে নিজেই একটি আইসক্রিম ফ্যাক্টরী স্থাপন করে। এর ফলে তার আইসক্রিমের চাহিদাও এত বেড়ে যায় যে, সারা শহরে একমাত্র তার আইসক্রিম কেনার জন্যই সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। কিন্তু মানুষ মরণশীল। এক সময় আইসক্রিমওয়ালার মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুতে সারা শহরের লোক শোকে মুহ্যমান হয়। মৃত্যুর পর তার স্মরণে সল্সবার্গ শহরের কেন্দ্রস্থলে এক সুউচ্চ বিশাল স্মৃতি-স্তম্ভ নির্মিত হয়। সকলে এখনো এ স্মৃতি-স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে সেই জনপ্রিয় আইসক্রিমওয়ালার কথা স্মরণ করে তার বিদেহী স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে।
রাত্রিতে খাবার টেবিলে বসে আমার সহযাত্রী এক ইংরাজ পরিবারের সাথে আমার আলাপ-পরিচয় হলো। ভদ্রলোক, তার স্ত্রী ও এক অবিবাহিতা মেয়ে- এ নিয়ে তার পরিবার। একসঙ্গে সবাই ভ্রমণে বের হয়েছেন। আলাপের সূত্র হলো খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। আমি তাদের সাথে একই টেবিলে খেতে বসেছিলাম। আমি কোন রকম গোশত খাই না দেখে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কি নিরামিশভোজী? আমি বললাম, না আমি নিরামিশভোজী নই, তবে গোশত খাবার ব্যাপারে আমি হালাল-হারামের বিধান মেনে চলি। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ঃ হালাল-হারাম বলতে কী বুঝায়? আমি তাকে হালাল-হারামের বিষয় বুঝাতে চেষ্টা করলাম। বললাম, সব পশুর গোশতই হালাল নয়, ইসলামে হালাল এবং হারাম পশুর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সে নিয়ম অনুযায়ী কিছু পশুর গোশত হালাল এবং কিছু পশুর গোশত হালাল নয় অর্থাৎ হারাম। যেমন ঃ উট, দুম্বা, গরু, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগী, কবুতর ইত্যাদি পশু-পাখির গোশত হালাল। অন্যদিকে, ঘোড়া, হাতি, শুয়র, কুকুর, বিড়াল, সাপ, চিল, শকুন ইত্যাদি পশু-পাখির গোশত হারাম। এ ব্যাপারে ইসলামে সুস্পষ্টভাবে নিয়ম-নীতি বিধিবদ্ধ রয়েছে। প্রত্যেক মুসলমানই এ নিয়ম মেনে চলে।
দ্বিতীয়ত হালাল পশু-পাখির গোশতও হালাল হয় তখনই যখন তা একমাত্র আল্লাহ্র নামে বা লা-শরীক মহান স্রষ্টার নামে জবেহ করা হয়। আল্লাহর নামে জবেহ করা ছাড়া কোন হালাল পশু-পাখির গোশতও হালাল হয় না। আমি বিদেশ সফর করছি, এখানে যারা আমার খাবার-দাবার তৈরি করছেন, তারা হালাল-হারামের এ বিধান সম্পর্কে সচেতন নন। তাই আমি আমার খাবার তালিকা থেকে গোশত জাতীয় সবকিছু বাদ দিয়েছি। যদিও আমি নিজে গোশত খুব পছন্দ করি, তবু হালাল গোশত এখানে পাওয়া সম্ভব নয় বলে আমি তা খাওয়া থেকে বিরত থাকছি। আমার খাবার তালিকায় তাই শুধু নিরামিশ ও মাছের আইটেম রয়েছে। এ দিয়েই আমি পরম তৃপ্তির সাথে আমার ক্ষুধা নিবারণ করে থাকি। ভদ্রলোক ও তার স্ত্রী খুব বিস্ময়বোধ করলেন এবং ইসলাম সম্পর্কে তারা আমার কাছ থেকে আরো কিছু জানতে চাইলেন। আমি সাগ্রহে সে সুযোগ গ্রহণ করলাম।
প্রথমেই আমি তওহীদ বা আল্লাহ সম্পর্কে ইসলামের ধারণা সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম। তারপর একে একে রিসালাত ও আসমানী কিতাবসমূহের কথা উল্লেখ করলাম। সব নবী-রাসূলই এক আল্লাহর বার্তাবহ এবং তাদের প্রত্যেকের প্রচারিত ধর্মই ইসলাম। ইসলামের শাশ্বত ও সর্বজনীন বিধান এক ও অভিন্ন। তবে দেশ-কাল ও অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রেরিত পুরুষের শরীয়তের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। প্রসঙ্গত আমি হযরত ঈসা (আ)-এর কথা উল্লেখ করলাম। তিনিও একজন আল্লাহর নবী ছিলেন এবং তাঁকে নবী হিসাবে আমরা পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধা করে থাকি। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর প্রচারিত ধর্ম ছিল ইসলাম। তাঁর উপর নাজিলকৃত আসমানী কিতাবের নাম ছিল ইঞ্জিল। তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। আল্লাহতা’য়ালা গায়েবীভাবে তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে কিয়ামতের পূর্বে তিনি আবার আল্লাহর ইচ্ছায় পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে দ্বীন ইসলাম প্রচার করবেন এবং তখন পৃথিবীর সকল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আমি আরো বললাম, হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা পরবর্তীতে তাঁর প্রচারিত ধর্ম ও তাঁর উপর নাযিলকৃত কিতাব ইচ্ছামত বিকৃত করে নিয়েছে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা দেওয়া আছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কি আল-কুরআনের কথা শুনেছেন বা তা পড়েছেন ? তারা নেতিবাচক জবাব দিলেন। আমি তাদেরকে অনুরোধ করলাম যে, আপনাদের স্বদেশেই বিভিন্ন ইসলামিক সেন্টার কাজ করছে এবং সেখানে ইংরাজি অনুবাদসহ কুরআন গ্রন্থ পাওয়া যায়। তাছাড়া ইংরাজিতে লেখা ইসলাম সম্পর্কিত আরো অনেক বই সেখানে মওজুদ রয়েছে। আমার নোট বইতে এরূপ কয়েকটি সেন্টারের ঠিকানা লেখা ছিল। আমি তাদেরকে সে ঠিকানাগুলো লিখে দিলাম। মনে হলো, বৃটিশ দম্পতি খুব আগ্রহের সাথে আমার কথা শুনলেন এবং ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। পাশে বসা তাদের মেয়েটির চোখে-মুখে কোন আবেগ লক্ষ্য করা গেল না। তবে সেও খুব মনোযোগ দিয়ে চুপচাপ আমাদের কথা শুনলো। কোন মন্তব্য করলো না।
আমি সুযোগ পেয়ে তাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে পারায় মনে মনে খুবই আনন্দ অনুভব করলাম। সেদিন রাত্রিতে খুব চমৎকার ঘুম হলো।
পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটায় সল্সবার্গের হোটেল ত্যাগ করে আমরা নতুন গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলাম। পথিমধ্যে আমরা চার মাইল দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করলাম। পাহাড়ের নিচ দিয়ে এ পথটি নির্মিত হয়েছে। আমাদের গাইড বলল, ঐ সময় পর্যন্ত নাকি ওটাই ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ পথ। অস্ট্রিয়ায় দ্বিতীয় দীর্ঘতম যে সুড়ঙ্গ পথটি রয়েছে তার দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন মাইল। অস্ট্রিয়া দেশটি পাহাড়ে ঘেরা, সবুজ বনানীতে ঢাকা একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। এখানে এ রকম অনেক সুড়ঙ্গ পথ নির্মিত হয়েছে।
চার মাইল দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথ অতিক্রম করার সময় গা ঝিমঝিম করছিল। আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম গভীরভাবে। রাস্তার পাশে ছোট-বড় পাহাড়। কোন কোন পাহাড় এ গ্রীষ্মকালেও বরফে আচ্ছাদিত হয়ে আছে। মনে হয় যেন বিশাল বিস্তৃত বরফাচ্ছাদিত শ্বেত প্রান্তর। সেখানে অসংখ্য নারী-পুরুষ মনের আনন্দে স্কী খেলছে। আমাদের দেশে বরফ পড়ে না, স্কী খেলারও কোন প্রচলন নেই। এর আগে টিভিতে অথবা বই-পুস্তক-পত্রিকায় স্কী খেলার দৃশ্য দেখেছি। বৃটিশ যুবরাজ চার্লস স্কী খেলায় অত্যন্ত পারদর্শী। তাঁর কাহিনীও পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। এটা ইউরোপে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা। তবে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ খেলাও বটে। অনেক সময় পড়ে গিয়ে কারো হাত-পা ভাঙ্গে, কেউ বা নিহত হয়। প্রত্যেক খেলায়ই এরূপ কম-বেশী ঝুঁকি থাকে। তবে স্কী খেলায় ঝুঁকির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত একটু বেশী। পথ চলতে চলতে বাস থেকেই রাস্তার পাশে পাহাড়ের উপর অনুষ্ঠানরত স্কী খেলার দৃশ্য উপভোগ করলাম। বাস্তবে এ খেলা আগে কখনো দেখার সুযোগ হয় নি। তাই দেখার আনন্দ ও কৌতূহল ছিল অনেকটা তীব্র।
আমাদের বাস ছুটে চলছিল অস্ট্রিয়ার সীমান্ত এলাকার দিকে। পাহাড়ের উপর দিয়ে এঁকেবেঁকে পাকা রাস্তা চলে গেছে উপরের দিকে। রাস্তার দু’পাশে গভীর খাদ। ড্রাইভার একটু অসতর্ক হলেই বাস গিয়ে পড়বে সেই খাদে। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। আমি এরূপ ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় জীবনে আর কখনো চলাচল করি নি। ভয়ে শরীরে ঘাম বেরিয়ে আসার যোগার। একমাত্র আল্লাহকে স্মরণ করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। আমি ভয়ার্ত চিত্তে রাস্তার পাশে গভীর খাদের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সর্বত্র গাছ আর গাছ। খাদের নিচ পর্যন্ত সর্বত্রই সবুজ গাছের মনোলোভা চিত্র। একদিকে যেমন আনন্দময় দৃশ্য অন্যদিকে, তেমনি আতঙ্ক ও ভয়ের বিষণ্ণ অনুভূতি।
কিছুক্ষণ পর আমরা একটি ছোট্ট শহরে এসে উপনীত হলাম। এ শহরটির নাম ‘ভিলাখ’ (ঠরষষধপয)। এটি অস্ট্রিয়ার অন্তবর্তী একটি সীমান্ত শহর। এখান থেকে ইতালীর সীমান্ত বিশ কিলোমিটার দূরে আর যুগোশ্লাভিয়ার সীমান্ত পঁচিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ছোট, সুন্দর ছিমছাম ‘ভিলাখ’ শহর। বুঝা গেল, ভ্রমণকারীরা এখানে যাত্রা ভঙ্গ করে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেয়, খাওয়া-দাওয়া সেরে নেয়, দু’দণ্ড আরাম করে। এটাকে ভ্রমণকারীদের শহর বলাই শ্রেয়। এখানকার অধিকাংশ লোকই দেখলাম বিদেশী, ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তারা এসেছে এখানে। অনেকটা আমার মতোই। এখানকার হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিক কর্মচারীরাই হয়তো শুধু স্থানীয়।
আমাদের বাস থামলো এখানে। সবাই নেমে পড়লাম। ছোট্ট শহরের এদিক-ওদিক কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে দেখলাম। কোথাও আধুনিকতার তেমন কোন চিহ্ন চোখে পড়ল না। বাড়ি-ঘরগুলো সাধারণ মানের। কোন সুউচ্চ বিলাসোপম বাড়ি একটিও চোখে পড়লো না। সহযাত্রীদের সাথে দল বেঁধে ঘোরাঘুরির পর সবাই মিলে গাইডের নির্দেশ মতো আমরা একটি হোটেলে ঢুকে পড়লাম। সাদা ভাত আর মাছ। মোটামুটি তৃপ্তির সাথে পেট পুরে খেলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে দু’দণ্ড বিশ্রাম নিয়ে পথের ক্লান্তি কিছুটা দূর করার প্রয়াস পেলাম। একটু পরেই আবার যাত্রা শুরু হবে- ‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে’। নতুন নতুন দৃশ্য, লোকালয় ও জন-মানব দেখার কৌতূহল নিয়ে নতুনের পথে আবার যাত্রা শুরু হলো আমার।