এবারে আমাদের যাত্রা যুগোস্লাভিয়ার দিকে। দুপুর ১২.৪০ মিনিটে ভিলাক শহর থেকে যাত্রা শুরু হলো আমাদের। বিকাল ২:১০ মিনিটে আমরা অস্ট্রিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে যুগস্লোাভিয়ায় প্রবেশ করলাম। প্রবেশ-পথেই একটি লেক- নাম ‘Lake Wurte’. শান্ত-সমাহিত বিশাল সরোবর। চারদিকে সবুজ-শ্যামল বীথি। দেখে মনে হয়, পানিতে নেমে সাঁতার কাটি, গোসল করি। কিন্তু সবকিছু ইচ্ছা করলেই তো আর করা যায় না। আমরা মুসাফির, চলাই আমাদের কাজ। লেকের পাড় দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সামনের দিকে। অল্প অল্প বাতাস বইছিল। ফুরফুরে বাতাসে আনন্দে মন ভরে উঠলো। বিকালের ম্লান রোদে, অনেকটা আলস্যে ভরা দেহ-মনে নানা কিছু ভাবনা এসে একত্রে মনের অলিন্দে ভীড় জমাতে লাগল। শরীরে পথ চলার ক্লান্তি, চোখে ঘুমঘুম ভাব। আধো ঘুম, আধো জাগ্রত অবস্থায় দেশে রেখে আসা পরিবার-পরিজনের কথা মনে পড়তেই সারাটা মন বিষণ্ণতা আর দেহ ক্লান্তিতে ভরে উঠল।
বিকাল ২.৫৫ মিনিটে আমরা যুগোস্লাভিয়ার একটি সুন্দর ছোট্ট শহর ‘ব্লেড’ (Bled)-এ গিয়ে উপনীত হলাম। শহরটি ছোট্ট হলেও অত্যন্ত মনোরম, ছবির মতো সুন্দর। আমাদের সহযাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন এখানে থেকে গেল। তারা এক সপ্তাহ এখানে ছুটির অবসর সময়গুলি কাটাবে। বাকি অধিকাংশ যাত্রীরা যাবে অন্য আরেকটি শহরে। আমিও তাদের সঙ্গী। ‘ব্লেড’ শহরে কিছুক্ষণ অবসর নিয়ে, চা-নাস্তা খেয়ে আমরা চারদিকে ঘুুরে কিছুটা পায়চারী করলাম। এখানে প্রকৃতির বিচিত্র সাজসজ্জা দেখে আমরা বিস্ময়-পুলকে অভিভূত হলাম। তারপর বিকাল ৪.২৮ মিনিটে আমরা রওয়ানা হলাম ‘ওপাতিজা’ (Opatija) শহরের দিকে। বিকাল ৭.২৫ মিনিটে আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। সমুদ্র তীরবর্তী ‘ওপাতিজা’ শহর তখন সন্ধ্যার অন্ধকার কালো চাদরে মুখ ঢেকে যেন ঘুমের প্রতীক্ষায় ঢুলুঢুলু আঁখি নিয়ে তার নতুন মেহমানদেরকে সাদর-সম্ভাষণ জানালো।
‘ওপাতিজা’ যুগোস্লাভিয়ার একটি সমুদ্র-তীরবর্তী ছোট্ট সুন্দর শহর। এখানকার জনসংখ্যা বেশি নয়। সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে অসংখ্য বাড়ি-ঘর ও হোটেল নির্মিত হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এখানে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য ভ্রমণকারীরা আসে অবসর মুহূর্তগুলো কাটাতে। বেশ দীর্ঘ সমুদ্র-সৈকত। বাঁকা ধনুকের মতো বিস্তৃতৃত হয়ে আছে সমুদ্রের পাড়। পাড়ে অসংখ্য ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। স্থলভাগে মাঝে মাঝে অনুচ্চ পাহাড়। পাহড়ের গা ঘেঁষে সমুদ্রের পাড় দিয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে দীর্ঘ সড়ক পথ।
সকাল থেকেই ভ্রমণকারীরা সমুদ্র-সৈকতে এসে ভীড় জমায়। তারপর জামা-কাপড় ছেড়ে পুরুষেরা শুধু হাফ-প্যান্ট এবং মেয়েরা বিকিনি পরে রৌদ্রস্নান শুরু করে। অনেক নারী-পুরুষকে দেখেছি সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় সৈকতে ঘন্টার পর ঘন্টা শুয়ে কাটাতে। আমি জীবনে কখনো এরূপ দৃশ্য দেখিনি। সূর্য-স্নানের ফাঁকে ফাঁকে তারা পানিতে নেমে জলকেলি করে, স্নান করে ও তাদের পুরুষ সাথীদের নিয়ে নানারূপ রঙ্গ-তামাসায় লিপ্ত হয়। আবার কিছুক্ষণের জন্যে পাড়ে উঠে স্নাক্স খায়, বীয়ার পান করে বা অন্যকিছু খায়। এভাবে তারা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সমুদ্রের তীরে সময় কাটায়। কী আনন্দ পায় তারা, তা হয়তো তারাই জানে। তবে আমি যেটুকু বুঝলাম তাহলো-শীত-প্রধান দেশের জনগণ সূর্যের জন্য উন্মখ হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে তাই তারা সমুদ্র-সৈকতে অথবা অন্যকোন স্থানে সপরিবারে এসে সূর্যস্নানে মগ্ন হয়। এটা তাদের জীবনধারা বা কালচারে পরিণত হয়েছে। সকলেই যেখানে নগ্ন, সেখানে নগ্নতা বলে নাক-সিটকানোর মতো কোন লোকই সেখানে অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। তাই যে যার মতো নগ্নতায় আবিষ্ট হয়ে আছে, কারো দিকে কারো তাকাবার অবকাশ নেই।
আমরা ‘ওপাতিজা’র একটি হোটেলে উঠেছিলাম, হোটেলটির নাম ‘Hotel Bellevue’. আমার জন্য সেখানে একটি রুম নির্দিষ্ট ছিল। আমি একাই সে রুমে ছিলাম। অন্যরা কেউ কেউ এক রুমে একাধিক ব্যক্তি থাকতো। একা এক রুমে থাকায় সুবিধা ছিল যে, আমি যথারীতি ঠিক মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামায রুমেই পড়তে পারতাম। এখানে আমাদের সাত দিন থাকতে হয়। এতগুলো দিন এখানে আমার করার মতো কিছুই ছিল না। অন্যদেরকে দেখতাম, সারাদিন তারা সমুদ্র-সৈকতে কাটাতো, বিকাল হলে বিভিন্ন নাইট ক্লাবে গিয়ে আনন্দ-ফূর্তি করত। আমি সকালে উঠে ফজরের নামায পড়ে নাস্তা করতাম। নাস্তা হোটেল থেকে রুমে সরবরাহ করা হতো। নাস্তা খেয়ে আমি সমুদ্র-সৈকতে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াতাম। তখন সমুদ্র-সৈকত থাকতো অনেকটা নির্জন, শান্ত ও নিরবচ্ছিন্ন। সমুদ্রের পাড় থেকে খোলা আকাশের নিচে যতটুকু দৃষ্টি যায়, আমি দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। মাছ-শিকারীদেরকে তখন ছোট ছোট নৌকা নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে ব্যস্ত দেখা যেতো। বিভিন্ন ধরনের জাহাজও সমুদ্রে চলাচল করতো। আমি সে সব দৃশ্য ঘুরে ঘুরে দেখতাম। তারপর ধীরে ধীরে সমুদ্র-সৈকতে একজন দু’জন করে স্নানার্থীদের আগমন ঘটতো। আমি তখন ধীরে ধীরে আমার হোটেল রুমে ফিরে আসতাম।
সাধারণত বিকাল বেলায় আছরের নামায পড়ে আমি আবার রাস্তায় বের হতাম। পরন্ত রোদের উত্তাপহীন মুহূর্তে আমি তখন বিভিন্ন বিপণি-কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতাম। কারণ এখানে দেখার মতো তেমন আর কিছুই ছিল না। তাই বিভিন্ন বিপণি-কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে রকমারি জিনিসের দাম জিজ্ঞেস করে, তার গুণগত মান পরীক্ষা করে অযথা সময় কাটাতাম। কেনার মতো তেমন কিছুই চোখে পড়েনি। তবে এন্টিক জাতীয় ও দেশীয় কুটির-শিল্পজাত দু’একটি জিনিস কিনেছিলাম বলে মনে পড়ে। সন্ধ্যার আগেই আমি হোটেলের রুমে চলে আসতাম। কারণ সন্ধ্যার পরে শহরের দৃশ্যটি হতো কিছুটা ভিন্ন ধরনের, যা কোন রুচিশীল, ঈমানদার মানুষের জন্য সহনীয় ছিল না।
একদিন বিপণি-কেন্দ্রের একটি দোকানে দেখলাম একজন তরুণী কেনাবেচা করছে। তখন তার দোকানে কোন গ্রাহক ছিল না। আমি কৌতূহলবশতঃ তার দোকানে ঢুকলাম। এটা-ওটা দাম জিজ্ঞাসা করে, অবশেষে তার নাম জিজ্ঞাসা করলাম। সে তার নাম বলল। তার বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করতেই সে অঙ্গুলী-ইশারায় দূরে সমুদ্র-পাড়ের একটি বাড়ি দেখিয়ে বলল ওটাই তার ঘর। আমি তার ঘর কোনটি তা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে না পারলেও, এটুকু বুঝলাম যে, ঐ দূর সমুদ্র-পাড়ের নিবিড় ঘন জনপদের কোন একটি ঘরেই সে বসবাস করে। আমি তার লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। জানা গেল, সে তখনো প্রবেশিকা পাশ করেনি। সুন্দরী, একহারা গড়নের দীর্ঘাঙ্গী তরুণী। সে এক যুবককে ভালবাসে। বিয়ে করার জন্য তার কিছু খরচপাতি দরকার। সে খরচ করার সামর্থ তার বা তার প্রেমিকের নেই। তাই সে দোকানে কাজ নিয়েছে কিছুটা টাকা কামানোর জন্য। তখন গ্রীষ্মের ছুটি। ছুটির অবসরে সে এ কাজে ঢুকেছে। কাজ করে কিছুটা পয়সা হাতে এলেই প্রবেশিকা পরীক্ষার পর সে আর তার প্রেমিক বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হবে। সে বেশ কিছু সময় ধরে আমার সঙ্গে নিঃসংকোচে তার ও তার পরিবার সম্পর্কে অনেক কথাই খুলে বলল। দোকানে তখন কোন ক্রেতা ছিল না। তাই নিঃসঙ্গ দুপুরে, কর্মহীন অলস মুহূর্তে সে তার নিজের সব কথা বলে মনটাকে কিছুটা হালকা করে নিল। একজন অজানা-অচেনা ব্যক্তির সাথে হঠাৎ দেখা হতেই কোন তরুণী এত কথা অকপটে বলতে পারে দেখে আমার বিস্ময়ের অবধি রইল না।
আমার হোটেলটি ছিল ঠিক সমুদ্রের পাড়েই। হোটেলের খোলা জানালা দিয়ে সৈকতের দিকে তাকালে রৌদ্র-স্নানরত অসংখ্য নারী-পুরুষকে দেখা যেত। আরো দূরে তাকালে দেখা যেত দিগন্ত বি¯তৃত শুভ্র নীলাকাশ ও সফেদ সমুদ্র। প্রভাত ও সন্ধ্যা বেলায় যখন সমুদ্র-সৈকত নির্জন হয়ে পড়তো, তখন আমি অনেক সময় জানালার শিক ধরে দাঁড়াতাম। যতদূর দৃষ্টি যায়, তাকিয়ে থাকতাম। অধিকাংশ সময় আমি আমার রুমে নির্জন সময় অতিবাহিত করতাম। সাথে কোন বই-পুস্তকও নিয়ে আসিনি যে, তা পড়ে সময় কাটাবো। অগত্যা সময় কাটাবার এক সুন্দর সুযোগ মিলে গেল। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে আমি কবিতা লিখতাম। এম.এ. ক্লাসে পড়া পর্যন্ত অনেক কবিতা লিখেছি। তবে সেগুলো প্রকাশের ব্যাপারে আমার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। এবারে যুগোস্লাভিয়ার সমুদ্র-তীরবর্তী এ সুন্দর শহরে এসে কর্মহীন অলস মুহূর্তে আমার মনে কবিতার কল্প-পরীরা এসে ভীড় জমাতে লাগলো। আমি এ কয়দিনে একের পর এক অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেললাম। সবগুলো কবিতাই আমার সফর-সম্পর্কিত। সফরে যেসব দেশ ও প্রাকৃতিক দৃশ্যরাজি দেখেছি, সেসব বিষয় নিয়েই আমার কবিতা। কবিতায় বেশ কয়েকদিন আমি একান্ত মগ্ন হয়ে থাকলাম। খুব ভাল লাগলো। নিজের মনের মধ্যে আরেকটি অপরূপ, স্বপ্নময় জগৎ তৈরি হয়ে গেল। সে জগতের অসংখ্য মানুষ ও সুন্দর দৃশ্যমালা নিয়ে আমার কবিতার এক বর্ণাঢ্য ভুবন নির্মিত হলো। সে স্বপ্নময়, বর্ণাঢ্য ভুবনে পরম আনন্দে আমি কয়েকদিন মগ্ন হয়ে থাকলাম। কোথা দিয়ে কীভাবে একটি সপ্তাহ কেটে গেল, তা টেরই পেলাম না। এ থেকে আমার ধারণা হলো, কবিতা নির্জনতার সঙ্গী। নির্জন মানুষের সাথে নানা বর্ণ-সুষমায় অপুরূপ মনোহর বেশে সে ছলনাময়ী নারীর মতো খেলা করে। মনে হলো, কবিতা এক ধরনের মনোরোগগ্রস্তদের জন্য উত্তম ঔষধও বটে, যা পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে সক্ষম না হলেও, মনের ক্ষুধা নিবারণে যথেষ্ঠ সক্ষম।
‘ওপাতিজা’ একটি ছোট শহর হলেও এর গুরুত্ব কম নয়। যুগোস্লাভিয়ার অন্যতম প্রধান প্রমোদ-কেন্দ্র এটি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রীষ্মকালে অসংখ্য ভ্রমণকারীরা আসে এখানে। তার ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। যুগোস্লাভিয়ার জন্য এ বৈদেশিক মুদ্রা অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ ও উপায় খুবই সীমিত। অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মতো যুগোস্লাভিয়া শিল্পোন্নত দেশ নয়। তাই ভ্রমণ খাতে অর্জিত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যুগোস্লাভিয়ার জাতীয় বাজেটের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভ্রমণকারীদের জন্য ‘ওপাতিজা’য় মোট সাত হাজার বেড-সংবলিত পঞ্চাশটি হোটেল ও পাঁচ হাজার বেড-সংবলিত প্রাইভেট এপার্টমেন্ট রয়েছে। প্রত্যেকটি হোটেলে এবং প্রাইভেট এপার্টমেন্টে আবাসিকদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা ছাড়াও সমুদ্র-সৈকত বরাবর আঠাশটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে ভ্রমণকারীদের খাওয়া-দাওয়ার জন্য। যুগোস্লাভিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা ভ্রমণকারীরাও এখানে খাওয়া-দাওয়া করে থাকে। তবে তাদের খরচ করবার মতো যথেষ্ঠ টাকা-পয়সা আছে বলে মনে হলো না। অনেক তরুণীই এখানে আসে, বিদেশীদের সঙ্গদান করে কিছু রোজগারের আশায়। যুগোস্লাভিয়ার অনেক যুবতী গৃহিনীরাও গ্রীষ্মকালের এ সময়টাকে বেছে নেয় কিছুটা বাড়তি আয়ের উপলক্ষ হিসাবে। সামাজিক অবস্থা ও আর্থিক প্রয়োজন মানুষের জীবনধারাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, এখানে এসে তা কিছুটা উপলব্ধি করলাম।
যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। এটি ইউরোপের একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। ইউরোপের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো থেকে এর পার্থক্য সহজেই উপলব্ধি করা যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ উন্নত ও সমৃদ্ধ, সেখানে কমিউনিস্ট যুগোস্লাভিয়া এসব ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুবই অনুন্নত ও অনগ্রসর। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যেখানে তার প্রাকৃতিক ও মানব-সম্পদকে বিভিন্নভাবে সর্বোত্তম উপায়ে কাজে লাগিয়ে দেশের সমৃদ্ধি সাধন করেছে, কমিউনিস্ট যুগোস্লাভিয়া সে তুলনায় তেমন কিছুই করতে সক্ষম হয়নি। এখানকার সাধারণ মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র। গ্রাম-জনপদে উন্নতির তেমন কোনই ছোঁয়া লাগেনি। শহরেও তেমন কোন উন্নতির স্পর্শ লেগেছে বলে মনে হলো না। ‘ওপাতিজা’ শহরের কোথাও কোন বিলাসোপম আধুনিক সুউচ্চ ইমারত চোখে পড়েনি। সব বাড়ি-ঘর, হোটেল রেস্তোরাঁ খুবই সাধারণ মানের, প্রায়ই পুরাতন ও জাঁকজমকহীন। পুঁজিবাদী ইউরোপীয় শহরগুলোর তুলনায় এখানকার শহরগুলো অত্যন্ত দীনহীন। এখানকার রাস্তা-ঘাটও তেমন উন্নত মানের নয়। তবে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের কোন অভাব নেই। তবে তা সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন বলে মনে হলো। দেশের মানুষদেরকেও মনে হলো শান্তশিষ্ট, নিরীহ ও কর্মঠ। কিন্তু কমিউনিজমের নিপীড়নমূলক সমাজ-ব্যবস্থায় জনগণ পিষ্ট হয়ে আছে। তাদের কথা বলার কোন সুযোগ নেই। স্বাধীনভাবে কোন কাজ করার ক্ষমতাও নেই। পুঁজিবাদী শোষণ-শাসনের যাঁতাকল থেকে মেহনতি মানুষকে মুক্তি দেয়ার কথা বলে যে কমিউনিজম একদিন বিশ্বের অধঃপতিত-ভাগ্যবঞ্চিত মানুষদেরকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার পর কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর অগণিত মানুষের সে স্বপ্ন এক কঠিন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে, কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্রেই মেহনতি মানুষের বা জনগণের মুক্তি তো ঘটেই নি, বরং কমিউনিজমের নিপীড়নমূলক কঠোর বিধি-ব্যবস্থার কবলে পড়ে জনগণ সর্বদিক দিয়ে হয়েছে শৃংখলাবদ্ধ। আর তাই মাত্র সাত দশক কাল কমিউনিজমের দোর্দন্ড প্রতাপ চলার পর সেসব দেশের নিপীড়িত জনগণ কমিউনিজমের শৃংখল-মুক্ত হয়ে আজ তারা গণতান্ত্রিক বিশ্বের কাতারে শামিল হতে উন্মুখ।
আমি যে হোটেলে থাকতাম, সে হোটেলের নিচের তলায় ডাইনিং রুম। আমি দুপুর এবং রাত্রির খানা সেখানেই সেরে নিতাম। আমি কোনরূপ গোশত খেতাম না, বীয়ার পান করতাম না, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যথাসম্ভব হালাল-হারামের বিধি-নিষেধ মেনে চলতাম। শুধুমাত্র ভাত, মাছ ও সব্জি দিয়ে আমি দু’বেলা আহার করতাম। এসব দেখে হোটেলের একজন বেয়ারার আমাকে একদিন একান্তে আমার নাম ও পরিচয় জানতে চাইল। আমি মুসলমান জেনে সে অত্যন্ত খুশি হলো। সে বলল, আমার খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি থেকেই সে ধারণা করেছিল যে, আমি নিশ্চয়ই একজন মুসলমান। তাই সাহস করে সে আমার নাম- পরিচয় জিজ্ঞেস করেছে।
তারপর সে বলল, তার নাম মোহাম্মদ ইসমেত। সে আরো জানালো যে, তার সহকর্মী আরো একজন মুসলমান বেয়ারার এই হোটেলে কাজ করে। তাকেও একদিন এনে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। তারপর সে বলল, এদেশে এখনও ষাট লক্ষ মুসলমান বসবাস করে। আগে মুসলমানদের সংখ্যা আরো বেশি ছিল, কমিউনিজমের নির্যাতনের ফলে এ সংখ্যা এখন অনেক হ্রাস পেয়েছে। যারা এখনো মুসলমান হিসাবে টিকে আছে, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। কমিউনিস্ট সরকার ইসলাম ও মুসলমানদের ঘোরতর শত্র“। এখানে মুসলমানরা প্রকাশ্যে নামায-রোযা বা ইসলামের অন্যান্য হুকুম-আহকাম মানতে পারে না। তাদের উপর নানা বাহানায় নানা রকম অত্যাচার-নির্যাতন চলে অহরহ। অনেকে তাই মুসলমান হিসাবে প্রকাশ্যে নিজের পরিচয় দিতেও ভয় পায়। সে আমার সঙ্গে যতক্ষণ কথা বলছিল, ততক্ষণই তাকে দেখলাম সভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে এবং নিচু স্বরে কথা বলতে, যাতে অন্য কেউ তা শুনতে না পারে। যাওয়ার সময় সে আমাকে বলল যে, এখানে বেশীক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বললে আমাকে সন্দেহ করে বসতে পারে। তবে সে আমাকে অভয় দিয়ে বলল, আপনি সবসময় একা একা কোন একটি কোণার টেবিলে এসে বসবেন, আমি আপনাকে খাবার পরিবেশন করার সুযোগে কিছু কথা বলার চেষ্টা করব।
এরপর যে ক’দিন আমি ওখানে ছিলাম প্রতিদিনই খাওয়ার সময় হোটেলের এক কোণায় নিরিবিলি গিয়ে বসে পড়তাম। আমাকে দেখামাত্র মোহাম্মদ ইসমেত ছুটে আসতো এবং পরম যত্নে আমার চাহিদা মাফিক খানা পরিবেশন করতো। সে মুসলমান জেনে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম যে, সে আমাকে কখনো হারাম জিনিস খেতে দেবে না। খাবার পরিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে সে আমার সাথে টুক্টাক্ কথা বলতো। আমার দেশের কথা, জনগণের কথা, মুসলিম বিশ্বের কথা যতটা সম্ভব সে জানার চেষ্টা করতো। তার অবস্থা দেখে আমার মনে হতো, যেন সে একটি শ্বাসরুদ্ধ প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ। আবদ্ধ ঘরের ক্ষুদ্র গবাক্ষ-পথে সে যেন উন্মুক্ত আকাশ দেখার কোসেস করছে। আমি তার জন্য সেই ক্ষুদ্র গবাক্ষ। আমার মাধ্যমে সে মুক্ত বিশ্বের খবরা-খবর জানার চেষ্টা করছে এবং যেটুকু জানতে পারছে তাতেই যেন সে এক অনাবিল তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে। আমি তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করলাম এবং তার মাধ্যমে গোটা কমিউনিস্ট বিশ্বের বন্দী জনগণের অবস্থা উপলব্ধি করলাম। আসার দিন তাকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানালাম এবং কিছু বকশিস তার হাতে তুলে দিলাম।
সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। মনে হলো, তার এক পরম আত্মীয়কে সে যেন চিরদিনের জন্য বিদায় জানাচ্ছে। আমিও বুকে বড় কষ্ট অনুভব করলাম। বিশাল বিশ্বের এক অজানা জনপদে একজন অজ্ঞাত-অবহেলিত তরুণের সাথে মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়। কখন কীভাবে তার জন্য আমার হৃদয়ে ভালবাসা জমা হয়েছিল, তা আমরা কেউই টের পাই নি। এ সম্পর্ক একদিকে যেমন মানবিক, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বাসের। ঈমানী সম্পর্কের কারণেই তার সাথে এক নিঃস্বার্থ, নিবিড় ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাই আজো আমার নিভৃত মনের কোণায় মাঝে-মধ্যেই মোহাম্মদ ইসমেতের করুণ মুখচ্ছবি ভেসে উঠে আমাকে বিহবল করে তোলে। কমিউনিজমের নির্দয় নিগড় হতে যুগোস্লাভিয়া এখন মুক্ত হয়েছে। মোহাম্মদ ইসমেত ও তার মতো প্রায় ষাট লক্ষ যুগোস্লাভিয়ার মুসলিম জনগণও কি এখন মুক্ত স্বাধীন পরিবেশে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে সক্ষম হয়েছে?