১৯৮৪ সনের ১৬ জুলাই সকাল সাড়ে সাতটায় আমরা যুগোস্লাভিয়ার ওপাতিজা থেকে ইতালীর দিকে রওয়ানা হলাম। আধ ঘন্টা চলার পর সকাল আটটায় আমরা পাসতাজ (Pastaj) নামক স্থানে উপনীত হলাম। এ জায়গাটি ইতালী, যুগোস্লাভিয়া ও অস্ট্রিয়ার সীমান্ত এলাকা। এর উপর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তাটি ঐ তিন দেশের সংযোগ-সড়ক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই ঐ সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানী বোমা মেরে সড়কটি উড়িয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল ইতালী, অস্ট্রিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। এভাবে তিন দেশের এ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি ধারণ করে আছে।
এরপর আমরা আর মাত্র চল্লিশ মিনিট অগ্রসর হয়ে ৮.৪০ মিনিটে ইতালীর অভ্যন্তরে পৌঁছলাম। এখানে ট্রিয়েস্টি উপসাগর (TRIESTE GULF) অবস্থিত। এ জায়গায়টিও একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ উপসাগরের তীরে অবস্থিত বন্দর নগরীতে ত্রিশ হাজার লোকের বসবাস (তখনকার হিসাবে)। এ সীমান্ত এলাকায় যুগোস্লাভিয়া, ইতালী ও অস্ট্রিয়ার সীমান্ত-রেখা একত্র হয়েছে। এখানকার বন্দর এলাকা এ তিন দেশের আমদানী-রপ্তানীর কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এ তিন দেশের জন্যই এ বন্দর নগরীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্র এদের মেল-ব›ধনকে নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য করে রেখেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটিশ বাহিনী এ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হলে ইতালীয় বাহিনী তাদের প্রতিরোধ করে। এ প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রায় এক হাজার ইতালীয় সৈন্য নিহত হয়, যাদেরকে সমাহিত করা হয় এখানকার মাটিতেই। এ কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিষাদময় করুণ স্মৃতি ধারণ করে আছে এ স্থানটি। যুদ্ধে নিহত বীরদের কথা স্মরণ করে এখানকার মানুষের মন অনেক সময় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।
এরপর আমরা একটি দীর্ঘ লেগুন সেতু পার হয়ে দুপুর বারটায় বহু ঐতিহাসিক স্মৃতি-বিজড়িত ইতালীর ভেনিস নগরীতে প্রবেশ করলাম। লেগুন সেতুটি সত্তর ফুট গভীর পানির উপরে নির্মিত। এর দৈর্ঘ্য ২.৮ মাইল। ভেনিস নগরীও মূলত পানির উপরে ভাসমান একটি প্রাচীন ঐতিহ্যময় শহর। এখানে সড়ক পথ নেই বললেই চলে। শহরের মধ্যে চলাচলের জন্য নৌকাই প্রধানতম বাহন। নৌকায় করে শহরের এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করতে হয়। মাঝে মধ্যে রয়েছে সেতু। এ নৌকা ও সেতুই হলো ভেনিস নগরীর সংযোগ-সূত্র। নৌকাগুলোও বাহারী রং-এ সাজানো। নানা রং-বেরংয়ের কারু-কাজ দিয়ে সাজানো, সুদৃশ্য ও সুন্দর নৌকাগুলো ভ্রমণকারীদের জন্য একটি অতিরিক্ত আকর্ষণ। ভেনিস নগরে মাটির দেখা পাওয়াই কঠিন। এখানকার বাড়ি-ঘর-অট্টালিকা যেন পানিতে ভাসছে। চারদিকে পানির অলি-গলি। শহরের চারপাশেও সমুদ্র। সমুদ্রের মধ্যে ঘেরা দিয়ে শহর নির্মিত হয়েছে। তাই অন্যান্য শহর থেকে এর বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ ভিন্নতর।
ভেনিস নগরীতে সর্বমোট ঊনিশ হাজার অট্টালিকা ও চার্চ রয়েছে। শহরে সেতুর সংখ্যা সর্বমোট ৩০৬৯টি। শহরের অভ্যন্তরে মোট ১৪৭টি খাল বা নালা রয়েছে। সেতুগুলোর মধ্যে ‘ব্রীজ অব সাঈ’ (BRIDGE OF SIEGH) সবচেয়ে বিখ্যাত। এ সেতুটির কথা অনেক কবি-সাহিত্যিকের লেখায় উল্লেখিত হয়েছে। বিখ্যাত ইংরাজ কবি ও নাট্যকার উইলিয়ম শেক্সপীয়ার রচিত ‘রোমীয় ও জুলিয়েট’ নাটকের নায়ক-নায়িকার অভিসার স্থান হিসাবে এর উল্লেখ রয়েছে। ভেনিস শহরের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হলো ‘বেল টাওয়ার’ (BELL TOWER)। এর উচ্চতা ৩২৮ ফুট। ভ্রমণকারীরা সকলেই এটা দেখতে আসে। এখানে অসংখ্য কবুতর সবসময় উড়ে বেড়ায়। ভ্রমণকারীরা সখ করে অনেকে কবুতরকে খেতে দেয়। কবুতরেরাও খাবারের লোভে ঝাঁকে ঝাঁকে ‘বেল টাওয়ারে’র চত্ত্বরে এসে ভীড় করে। অনেক কবুতর খাবারের লোভে ভ্রমণকারীদের হাতও ঠোঁকরাতে থাকে। এ দৃশ্য দেখতে খুবই ভাল লাগে। ‘বেল টাওয়ারে’র পাশে একটি অভিজাত রেস্টুরেন্ট রয়েছে। প্রত্যেকটি আইটেমের দাম অত্যন্ত চড়া। সে কারণে সবার জন্য আকর্ষণীয় না হলেও অনেক বিত্তবান ভ্রমণকারীই সেখানে খাবারের লোভে ভীড় জমায়। এখানে খাওয়াটা অনেকের জন্য আভিজাত্যের পরিচায়ক। তাই অনেকেই সে আভিজাত্যের আকর্ষণে এখানে খেতে আসে। অনেক যুবক-যুবতীর জন্য এটা এক অনিবার্য আকর্ষণ। ভ্রমণকারীদের জন্যও এটার আকর্ষণ অসাধারণ।
ভেনিস একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক নগরী। এখানকার অট্টালিকাগুলো অত্যন্ত প্রাচীন। এর অনেকগুলোই নানা ঐতিহসিক স্মৃতি-বিজড়িত। এখানকার চার্চ, সেতু, দোকানপাট ও নৌকাগুলোও ভেনিস শহরের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ। অতীতকাল থেকেই এখানে দেশ-বিদেশের নানা লোকের আনাগোনা। উপসাগরীয় এলাকা হওয়াতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে নৌ-পথে ভেনিসের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ। ফলে বাণিজ্য-কেন্দ্র হিসাবে ভেনিসের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত এসব কারণেই সুদূর অতীতকাল থেকে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ এখানে এসেছে নানা কাজে। ব্যবসায়ী, কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিক, সাধারণ ভ্রমণকারী, বিত্তবান চিত্ত-বিনোদনকারীরা নিজ নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য হাজির হয়েছে এখানে। ভেনিস সব ধরনের মানুষের জন্যই একটি আকর্ষণীয় শহর। পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে তাই এর গুরুত্ব সমধিক। ইতালীর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও ভেনিসের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
আমরা দুপুর বেলায় হালকা খাবার খেয়ে দল বেঁধে বের হলাম নগর দর্শনে। গাড়ি চলার রাস্তা নেই। তাই পায়ে হেঁটেই যাত্রা শুরু হলো আমাদের। অসংখ্য দর্শনীয় স্থান একে একে দেখে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। দেখার যেমন শেষ নেই, দর্শনীয় বস্তুরও কোন অভাব নেই। এখানকার একটি ছোট্ট ঘটনার কথা আমার মনে আছে। সব দেশেই ফেরিওয়ালারা থাকে। আমাদের দেশে হয়ত তাদের সংখ্যা বেশি ও চোখে পড়ার মতো। অন্য দেশেও আছে এবং তাদের স্বভাব-প্রকৃতির সাথে আমাদের দেশের ফেরিওয়ালাদের স্বভাব-প্রকৃতিও হয়ত একই রকম। আমরা একটি বিপণি এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিলাম। এমন সময় এক ফেরিওয়ালা এসে আমার কাছে ঘড়ি বিক্রি করতে চাইল। ঘড়ির আকর্ষণীয় ডিজাইন দেখে আমি পছন্দ মতো একটি ঘড়ির দরদাম ঠিক করে নিতে উদ্যত হয়েছি, এমন সময দূর থেকে আমার ইংরাজ গাইড আমাকে দেখে ছুটে এসে আমাকে ওটা নিতে বারণ করল। আমি বিস্মিত হলাম। পরে গাইড আমাকে বুঝিয়ে বলল যে, ওরা আসলে ঠগ-বাটপার। মানুষকে বিশেষত অজানা ভ্রমণকারীদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঠকানোই তাদের কাজ। আমি গাইডের আচরণে খুশি হলাম এবং ফেরিওয়ালার পাল্লায় পড়ে যে ঠকি নি সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
ইতালীর জুতা বিশ্ব-বিখ্যাত। সারা পৃথিবীতে ইতালীতে তৈরি জুতার সুখ্যাতি আছে। দুবাইতেও আমরা ইতালীর জুতা ব্যবহার করে থাকি। পর্যাপ্ত পরিমাণে ইতালীর জুতা দুবাইতে যায় এবং দামও তুলনামূলকভাবে সস্তা। আমি জুতার দোকানে ঢুকলাম। নানা ধরনের সুন্দর সুন্দর জুতা সাজানো রয়েছে। ভাবলাম, দুবাইতে ইতালীর যে জুতা কিনে থাকি, সেটা হয়ত এখানে খোদ ইতালীতে অনেক সস্তায় পাবো। কিন্তু দাম শুনে আমি তো হতবাক। দুবাইর তুলনায় দাম অনেক বেশী মনে হলো। তাই এখান থেকে বেশী দামে জুতা কিনে কষ্ট করে বোঝা বয়ে নেওয়ার কোন যুক্তি নেই। এখানে দাম বেশী হওয়ার কারণ হলো, বিক্রিত মূল্যের উপর অতিরিক্ত বিক্রয় কর আরোপ করা হয়। অন্যদিকে, রপ্তানীর ক্ষেত্রে কর কম রাখা হয় রপ্তানী বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার জন্য। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন দ্রব্যের দাম বেশী এবং অন্য দেশে রপ্তানীকৃত সেই দ্রব্যের মূল্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সারা বিকাল ভেনিস শহরে যতটা সম্ভব হেঁটে হেঁটে সবকিছু দেখলাম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও দেখার কোন ক্লান্তি নেই। মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়। এর মধ্যে হেঁটে হেঁটে সবকিছু দেখা প্রায় অসম্ভব। প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ এ শহর যত দেখি, ততই ভাল লাগে। কিন্তু আমাদের সময় বেঁধে দেওয়া ছিল। তাই নির্দিষ্ট সময়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে নিয়ন লাইটে পথ দেখে দেখে আমরা আবার ফিরে এলাম শহরের এক প্রান্তে। সেখান থেকে একটা বড় জলাশয় জাহাজে করে পার হয়ে যেতে হবে ওপারে ত্রিয়েস্তা উপসাগরের এক পাড়ে। সেখানে আমাদের বাস স্ট্যান্ড করা ছিল।
বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে একবার শহরের দিকে ফিরে তাকালাম। ভিয়েনা শহরকে বিদায় জানাতে হবে। বড় কষ্ট হচ্ছিল। মুহূর্তের জানাশোনায় ভিয়েনা শহরের প্রতি একধরনের মায়া জন্মে গিয়েছিল। শহরের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালাম। বাকি সব দিকেই ত্রিয়েস্তা উপসাগরের তরঙ্গ-বিক্ষোভ। সেদিন সমুদ্রে কি ঝড় উঠেছিল? ত্রিয়েস্তা উপসাগরের বিক্ষুব্ধ জলরাশি দেখে তাই মনে হচ্ছিল। রাত্রির অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে। দূর থেকে ভিয়েনা শহরের উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ছে। আমরা গিয়ে বাসে উঠলাম। বাস ছাড়লো কিছুক্ষণ পরেই।
ফিরতি যাত্রা শুরু হলো। লেগুন সেতু পার হয়ে আবার সেই একই পথে আমরা ফিরে এলাম ওপাতিজায়। যার যার হোটেল রুমে গিয়ে রাত্রি কাটালাম। ওপাতিজায় ওটাই আমাদের শেষ রাত্রি। পরের দিন ফিরতি যাত্রা শুরু হবে জার্মানীর পথে।
ভোর সাতটায় হোটেল রুম ছেড়ে সবকিছু গুছিয়ে বাসে উঠলাম। তারপর শুরু হলো ফিরতি যাত্রা। সকাল দশটায় গিয়ে পৌঁছলাম ব্লেড শহরে। সেখানে এক সপ্তাহ আগে আমাদের কয়েকজন সহযাত্রীকে রেখে এসেছিলাম। তাদেরকে বাসে তুলে সকাল সাড়ে দশটায় আবার যাত্রা শুরু হলো। সকাল সাড়ে এগারটায় আমরা সীমান্ত শহর ভিলাকে গিয়ে উপনীত হলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ও হাল্কা খাবার খেয়ে দুপুর সোয়া বারটায় আমাদের আবার যাত্রা শুর হলো। পথে সন্ধ্যা ছয়টায় আমরা জার্মানীর ইল্ নদী পার হলাম। ছোট্ট নদী র্ত র্ত বেগে বেয়ে চলেছে। চারদিকে ঘন বনচ্ছায়া। সুন্দর-শ্যামল প্রাকৃতিক দৃশ্যে ভরপুর এলাকাটি। তারপর সন্ধ্যা সাতটায় আমরা গিয়ে পৌঁছলাম জার্মানীর বিখ্যাত মিউনিক শহরে। সেখানে হোটেল ওর্লিতে (Hotel Orly) আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
মিউনিক এক সময় স্বাধীন ব্যাভেরিয়ার রাজধানী ছিল। এখন ব্যাভেরিয়া কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, জার্মানীর একটি প্রদেশ মাত্র। অতএব, মিউনিক বর্তমানে একটি প্রাদেশিক রাজধানী। মিউনিক শহরের দোকানপাট মনে হলো দীর্ঘ রাত পর্যন্ত খোলা থাকে না। দোকানপাট আগেভাগেই বন্ধ হয়ে যায়। যা খোলা থাকে, তা হলো বিভিন্ন প্রমোদ-কেন্দ্র, পানশালা ও হোটেল রেস্টুরেন্ট। আমরা কয়েকজন দল বেঁধে কিছু সময় শহরের এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালাম। নির্দিষ্ট কোথাও যাওয়ার বা দেখার মতো সময় ছিল না। রাস্তা-ঘাটও আমাদের জানা ছিল না। তাই এলোপাতাড়ি ঘুরে বেড়িয়ে তেমন আনন্দ পাওয়া গেল না। রাস্তায় একে-ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু কিছু জায়গা ঘুরে দেখলাম। জার্মানীর লোকজন ইংরাজি বলতে অভ্যস্ত নয়। আমরাও কেউ জার্মান ভাষা জানি না। তাই রাস্তায় জিজ্ঞাসাবাদ করে চলাফেরা করাও সহজ মনে হল না। অতএব, রাত এগারটার মধ্যেই আমরা ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। খাওয়া-দাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি বিছানায় গেলাম। সারাদিনের সফরের ক্লান্তিতে দেহ-মন অবসন্ন। তাই বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো দু’চোখ।
পরের দিন ২১ জুলাই সকাল ৭.৪৫ মিনিটে মিউনিক শহর ছেড়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো লুক্সেমবার্গের (Luxembourg) দিকে। বিকাল চারটায় লুক্সেমবার্গ সীমান্তে গিয়ে উপনীত হলাম। বর্ডার থেকে মাত্র পনের মিনিটের মধ্যেই আমরা লুক্সেমবার্গ শহরে এসে পৌঁছলাম। লুক্সেমবার্গ একটি ছোট্ট রাজ্য। এটাকে বলা হয় ‘গ্রীন হার্ট অব ইউরোপ’(Green Heart of Europe)। সবুজ বনানী আর শ্যামল শস্য-ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দেশটি। দেশের জনসংখ্যা মাত্র আশি হাজার। অবশ্য প্রতি বছর অসংখ্য ভ্রমণকারী আসে এখানে। তাই দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা নিরূপণ করা কিছুটা কঠিন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পূর্ণ দেশটির প্রতি ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ থাকাই স্বাভাবিক। তাই প্রতি বছর এখানে অসংখ্য ভ্রমণকারী আসে আনন্দ উপভোগের জন্য। এ খাতে প্রচুর অর্থাগম ঘটে, যা লুক্সেমবার্গের জাতীয় রাজস্বের একটি বড় অংশ।
লুক্সেমবার্গ শহরের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে River Moselle. নদীর দু’পারে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ইত্যাদি। দু’পাশের শহরকে সংযুক্ত করেছে নদীর উপরে তৈরি করা এক’শ একটি সেতু। এসব সেতু দিয়ে অতি সহজেই শহরের দুই পাশের লোকেরা এপার-ওপার যাতায়াত করতে পারে। নদীটি খুব প্রশস্ত নয়। নদীর উপরে তৈরি করা সাঁকোগুলো শুধু পারাপারের জন্যই ব্যবহৃত হয় না, বিকাল বেলায় অসংখ্য মানুষ সেখানে গিয়ে ভীড় জমায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে, নির্মল হাওয়ায় নিঃশ্বাস ফেলে। সেতুর নিচ দিয়ে প্রভাহিত ছোট নদী, নদীর আশপাশে অনুচ্চ পাহাড়, চারদিকে দোকানপাট, দেশ-বিদেশের নানা জাতের মানুষের আনাগোনা-এসব দেখে ভালই লাগে। আমিও একটি সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় কাটালাম।
লুক্সেমবার্গ শহর অন্য আরেকটি কারণে বিখ্যাত। এটিকে বলা হয় Seat of European Court of Justice অর্থাৎ ইউরোপীয় দেশসমূহের বিচারালয়। এ দেশটির কোন সৈন্য বাহিনী নেই। শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ আইন-শৃংখলা রক্ষার জন্য একটি পুলিশ বাহিনী রয়েছে। জনগণ শান্তশিষ্ট ও নিরীহ প্রকৃতির। রাজার প্রতি তারা খুব অনুগত। রাজ-পরিবারের লোকেরা দেশীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির তেমন ধার ধারে না। লুক্সেমবার্গ জোট-নিরপেক্ষ, নির্বিরোধ দেশ হিসাবে পৃথিবীতে পরিচিত।
আমরা সারাটা বিকাল লুক্সেমবার্গ শহরে ঘুরে ফিরে কাটালাম। এখানকার রেস্টুরেন্টগুলোর খ্যাতি আছে। ভ্রমণকারীরা এখানকার খাবার পছন্দ করে। আমরা শহরের একটি নামকরা রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া সারলাম। বাংলাদেশীদের রুচিসম্মত না হলেও খাবার আন্তর্জাাতিক মানসম্পন্ন। তাই সবার সামনে খাবারের প্রশংসাই করতে হলো।