বিকাল পাঁচটা বিশ মিনিটে আমরা লুক্সেমবার্গ থেকে রওয়ানা হয়ে ৭.৪৫ মিনিটে বেলজিয়ামের খওঊএঊ শহরে উপনীত হলাম। সেখানে ‘রামাদা হোটেলে’ (LIEGE) আমাদের রাত্রি-যাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ‘রামাদা হোটেল’ মোটামুটি নাম করা হোটেল। আমি হোটেলে উঠে আমার রুমে সবকিছু রেখে শহরে বেড়াতে বের হলাম। বেশী দূর ঘোরাঘুরি করা সম্ভব হল না। তখন রাত হয়ে এসেছে। রাত্রি বেলায় ইউরোপীয় বিভিন্ন শহরের চেহারা দেখলাম প্রায় একই রকম। কেবল হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, পানশালা ও প্রমোদ-কেন্দ্রগুলোই সেখানে খোলা থাকে। আর সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। ইউরোপীয়ানরা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে আর বিকাল থেকে নানা আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং পানশালায় মদ্য পানরত অসংখ্য নারী-পুরুষের অসংলগ্ন আচরণ দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। বরং ওগুলো দেখে অস্বস্তিই লাগে। সুতরাং ঐ ধরনের পরিবেশে শহরে একা একা বেড়ানো নিরাপদ মনে হল না। তাই অল্পক্ষণ পরেই আমি আমার হোটেল রুমে ফিরে এলাম। সেখানকার পরিবেশও রাত্রি বেলায় তেমন স্বস্তিকর ছিল না। অতএব, রাত্রির খাওয়া-দাওয়া সেরে, এশার নামায পড়ে আমি বিছানায় গিয়ে পরম শান্তি অনুভব করলাম।
পরের দিন ২১ জুলাই সকাল সাতটায় আমরা LIEGE শহর ছেড়ে ইংল্যান্ডের দিকে রওয়ানা হলাম। দু’পাশে রাস্তার মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি চলতে লাগলাম। ভাবলাম এ পথে তো আর কখনো আসা হবে না, এ দৃশ্যও আর কখনো দেখার সুযোগ হবে না। তাই প্রাণ ভরে সব দেখতে লাগলাম। সুন্দর প্রশস্ত রাস্তা। গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে। দু’পাশে কখনো আধুনিক দালানকোঠা, কখনো সবুজ বনানী আবার কখনো মনোরম সবুজ ফসলের মাঠ। দেখার যেন শেষ নেই। আনন্দের অনুভূতিতেও যেন নতুন নতুন রঙের স্পর্শ লেগে হৃদয়ে আবেগের বন্যা বইয়ে দিতে লাগলো।
প্রায় সোয়া দু’ঘন্টা চলার পর আমরা ৯.১৫ মিনিটে ওস্টেন্ড (Ostend) ফেরী ঘাটে গিয়ে পৌঁছলাম। এখানেই আমাদের বাস চলার বিরতি। ওস্টেন্ড থেকে ফেরী জাহাজে পার হয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে হবে। তাই বাস ড্রাইভারের নিকট থেকে আমাদের বিদায় নিতে হল। সে বিদায়ের দৃশ্যটিও ছিল কিছুটা আবেগ-ঘন। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ইউরোপের ছয়টি দেশের মধ্য দিয়ে ড্রাইভার আমাদের বাস চালিয়েছে। সে আমাদেরকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে গেছে। বাস চালনায় সে বেশ পারদর্শী। এ কয়দিনে সে সর্বমোট ২,১০১ মাইল রাস্তা অতিক্রম করেছে। এ কাজে যথেষ্ট ধৈর্যের প্রয়োজন। এ দীর্ঘ যাত্রা-পথে সে কখনো একটু অসতর্ক হয়ে পড়লে যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকতো না। সৌভাগ্যবশত সেরকম কোন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় নি আমাদেরকে। আমরা নিরাপদে গত কয়েক দিন মনের আনন্দে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ফিরে বেড়িয়েছি। তাই আমরা ড্রাইভারকে সকলে ধন্যবাদ জানালাম এবং প্রত্যেকেই কিছুকিছু বকশিস দিয়ে তাকে বিদায় করলাম। সে খুশী হয়ে আমাদের সকলের সাথে হ্যান্ডশেক করে বিদায় গ্রহণ করল। মনে হলো, বিদায় তা যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কিছুটা বিষাদঘন অবস্থার সৃষ্টি করে থাকে।
২১ জুলাই ওস্টেন্ড থেকে সকাল এগারটায় আমাদের ফেরী জাহাজ ছাড়লো ইংল্যান্ডের দিকে। সমুদ্র পথে সাড়ে তিন ঘন্টা চলার পর বিকাল দু’টা তিরিশ মিনিটে আমরা ডোভার (Dover) পৌঁছলাম। এখান থেকে ট্রেনে লন্ডন যেতে হবে। আমরা ট্রেনে উঠে বসলাম এবং যথাসময়ে লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া স্টেশনে গিয়ে পৌঁছলাম, যেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেখান থেকে যার যার মতো চলে গেলাম নিজেদের গন্তব্যস্থলে।
পরের দিন ২২ জুলাই আমি একটি মনুমেন্ট দর্শনে গেলাম। এ মনুমেন্টটি নির্মিত হয়েছে লন্ডনের এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের বিষাদময় ঘটনার কথা স্মরণ করে। ১৬৬৬ সনে লন্ডন শহরে এক বিশাল অগ্নিকান্ড ঘটে। লন্ডন শহরের সবগুলো অগ্নি-নির্বাহক সংস্থা সম্মিলিতভাবে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে আগুন নিভাতে চেষ্টা করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ আগুন নিভাতে তাদের পুরো তিনদিন সময় লেগেছিল। এ বিশাল অগ্নিকান্ডে মোট তের হাজার বাড়ি-ঘর পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। লন্ডনের চার’শ সত্তর একর এলাকা এ অগ্নিকান্ডের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের স্মরণে ২০২ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এ সুউচ্চ স্তম্ভে মোট তিন’শ এগারটি ধাপ বা সিঁড়ি রয়েছে। এটা দেখে মনে হলো, ইংল্যান্ডবাসীরা কোন কিছুই সহজে বিস্মৃত হয় না। তাদের জাতীয় জীবনের দুঃখ-বেদনা-আনন্দের স্মৃতিগুলো ধরে রাখতে চায় এবং তা থেকে তারা নিজেরা যেমন শিক্ষা গ্রহণ করে, তেমনি নতুন প্রজন্মের সামনেও সেগুলোকে শিক্ষণীয় রূপে তুলে ধরার প্রয়াস পায়। কোন জাতি যখন এভাবে আত্ম-সচেতন হয়ে ওঠে, তখন তার অগ্রযাত্রাকে কেউ রুখতে পারে না।
২৩ জুলাই লন্ডন-প্রবাসী বাংলাদেশীদের ইসলামী সংগঠন ‘দাওয়াতুল ইসলাম’-এর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমি সেখানে যোগদান করলাম। লন্ডন-প্রবাসী বাংলাদেশীদের এ বার্ষিক সম্মেলনে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে প্রধান অতিথি হিসাবে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়। সম্মেলনে গিয়ে লাভ হলো এই যে, সেখানে লন্ডনস্থ আমার পরিচিত অনেক বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া সকলের ঠিকানাও জানা নেই। তাই সম্মেলনে উপস্থিত পরিচিত অনেকজনকে একসঙ্গে পেয়ে খুব খুশি হলাম। সম্ভবত তারাও অপ্রত্যাশিতভাবে আমাকে পেয়ে খুশিই হয়েছিলেন। খুব ভাল লাগল সেদিনের বিকালটি। মনে হলো, যেন বাংলাদেশেই আছি। তাছাড়া, ইসলামী আন্দোলনের ভাইদের সাথে থাকলে দুনিয়ার যেকোন স্থান বা পরিবেশই একান্ত নিজস্ব বলে মনে হয়। আমার মনের অনুভূতিও ছিল তেমনি। অনেক রাত করে সেদিন ঘরে ফিরলাম।
রাত্রিতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হল, মুসলমান সব সময়, সব অবস্থায় আল্লাহর গোলাম। কোন অবস্থায় সে তার নিজ দায়িত্বের কথা ভুলতে পারে না। বিদেশ-বিভূঁইয়ে যেখানেই থাকুক না কেন, দ্বীনী দায়িত্ব পালন করা সে সব সময়ই ফরয মনে করে। আমি নিজেও দীর্ঘকাল বিদেশে অবস্থান করছি। সব সময়ই মনের মধ্যে দ্বীনী দায়িত্ব পালনের তাগিদ অনুভব করেছি এবং নিজের চাকরি-বাকরি, ঘর-সংসারের দায়-দায়িত্ব পালন করেও সাধ্যমত তা আনজাম দেয়ার চেষ্টা করেছি। লন্ডন-প্রবাসী বাংলাদেশীদের তৎপরতা দেখে মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম এবং তারা যাতে আরো ভালভাবে দ্বীনী দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে সে জন্য রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রাণভরে দোয়া করলাম। অবশ্য লন্ডনের পরিবেশ ইউ.এ.ই.-এর মতো নয়। ইংল্যান্ডকে বলা হয়, গণতন্ত্রের সূতিকাগার। এখানকার পরিবেশ অনেকটা স্বাধীন। দেশী-প্রবাসী সকলেই এখানে স্বাধীন-গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিজেদের কর্মকান্ড চালাতে সক্ষম। কিন্তু ইউ.এ.ই.-তে গণতন্ত্র নেই। সেখানে শেখডম বা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। তাই স্বভাবতই গণতন্ত্র সেখানে নির্বাসিত। ফলে হেকমতের সাথে সেখানে শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে সীমিত আকারে অর্থাৎ কোরআন-হাদীস পাঠ, ইসলামী সাহিত্য-চর্চা ও আত্মগঠনমূলক কাজের মধ্যেই ইসলামী আন্দোলনের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়।
দুবাই থেকে আসার সময় আমি ফ্রান্সের ভিসা নিয়ে আসতে পারি নি। লন্ডন এসেই আমি ফ্রেন্স এম্বেসীতে গিয়ে ফ্রান্সের ভিসার আবেদন সংবলিত কাগজপত্র জমা দিয়ে ইউরোপ সফরে বের হয়েছিলাম। সফর থেকে ফিরে ফ্রেন্স এম্বেসীতে গিয়ে দেখলাম আমার ভিসা রেডি হয়েছে। সেখান থেকে ভিসা সংগ্রহ করে আমি ২৪ জুলাই প্যারিসের পথে রওয়ানা হলাম। প্রথমে গেলাম লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে করে ডোভার পৌঁছলাম। ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল ২.৩০ মিনিটে। ডোভার পৌঁছলাম বিকাল চারটায়। সেখানে ফেরী জাহাজ অপেক্ষমান ছিল। আমি ফেরীতে গিয়ে উঠলাম। ফেরী ছাড়ল বিকাল পাঁচটায়। সমুদ্রে উপর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আমি যাচ্ছি ফ্রান্সের দিকে। চারদিকে গোধূলির রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের উপর। সমুদ্রের কালো পানির উপর সূর্যের আলো পড়ে এক অনিন্দ্য-সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। আমি জাহাজের ছাদের উপর রেলিং ধরে সে দৃশ্য অপলক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম।
দেড় ঘন্টা সাগরের উপর দিয়ে চলার পর ফেরী-বোট বিকাল সাড়ে ছয়টায় ফ্রান্সের পার-ঘাটে গিয়ে উপনীত হল। এ জায়গাটির নাম ক্যালেইস (Calais)। সেখান থেকে ট্রেনে প্যারিসে গেলাম। তখন রাত সাড়ে নয়টা। সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা স্থান। কোথায় হোটেল অথবা নিরাপদ একটি আশ্রয় পাওয়া যাবে তা কিছুই জানা ছিল না। আশপাশের লোকজনদের জিজ্ঞেস করে নিকটবর্তী একটি হোটেলে উঠে আশ্রয় নিলাম। রাত্রিবেলায় আর কিছু করার ছিল না। তাই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু নিশ্চিন্তভাবে ঘুমাতে পারলাম না। কোথাও একটু আওয়াজ হলেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। কোন রকমে রাতটি কাটিয়ে ফজরের সময় উঠে নামায পড়ে রাস্তায় বের হলাম। লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে একটি ট্যুরিস্ট অফিসে গেলাম। সেখানে গিয়ে ট্যুরিস্ট বাসে উঠে গাইডের নেতৃত্বে প্যারিস শহর পরিদর্শনে বের হলাম।
প্যারিসের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় বিষয় হলো ‘আইফেল টাওয়ার’। সুবিশাল উঁচু টাওয়ারে ওঠার সিঁড়ি আছে। অনেকেই টিকিট কেটে উঁচু টাওয়ারে আরোহণ করে থাকে। ‘আইফেল টাওয়ারে’র অনতি দূরে একটি ক্ষুদ্র নদী প্রবাহিত। নদীটি শহরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে কোথায় জানি না। কিন্তু মনে হলো, প্রত্যেক শহরের মাঝখান দিয়েই এরূপ নদী থাকলে শহরের পরিবেশ সুন্দর হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে। নদীর চলমানতার দৃশ্য মানুষের জীবনে গতি এনে দেয়। নদীর দু’টি পাড় মনোরম স্নিগ্ধতায় ভরে আছে। আমাদের দেশে শহরের পাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, ইছামতি ইত্যাদি নদী যেমন কর্দমাক্ত, আবর্জনায়পূর্ণ এবং নানা কদর্যতায়পূর্ণ, সেখানকার নদী তেমনটি নয়, তা প্রকৃতির মতোই সুন্দর এবং জীবনের মতোই গতিমান।
‘আইফেল টাওয়ার’ থেকে আমরা গেলাম প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দর্শনে। প্রাসাদের কাছে বাস যাওয়া নিষেধ। তাই একটু দূরে বাস পার্কিং করে আমরা হাঁটতে হাঁটতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের গেট পর্যন্ত চলে গেলাম। সেখানে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের লোকেরা গেট পাহারা দিচ্ছে। আমাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না, আমাদের সেরূপ কোন পরিকল্পনাও ছিল না। তাই গেট থেকেই আবার পেছন ফিরে বাসে এসে উঠলাম।
সেখান থেকে আমরা গেলাম নেপোলিয়ান স্কয়ারে। নিপোলিয়ান বোনাপার্টে হলেন ফ্রান্সের জাতীয় বীর। তিনি কয়েকবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করে ফ্রান্সের জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করেন। অবশ্য সর্বশেষ ওয়াটারলুু যুদ্ধে ইংল্যান্ডের সাথে পরাজিত হয়ে তিনি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করে মৃত্যুবরণ করেন। শোনা যায়, শেষ জীবনে তিনি ইসলামের ইতিহাস অধ্যয়ন করে এবং ইসলাম ও মহনবীর (স) জীবনাদর্শে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হয়েছিলেন। কিন্তু যেকোন কারণেই হোক, এ খবরটি বিশ্ববাসীর কাছে সেভাবে প্রচারিত হয় নি। হয়ত এর পেছনে খৃস্টানদের ষড়যন্ত্র কাজ করেছে।
মহাবীর নেপোলিয়ানের প্রাসাদে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র আজও পরিপাটিভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাসাদের জাঁকজমক ও রক্ষী-সান্ত্রী সবই আছে। কেবল নেই সেই মহাপরাক্রান্ত শাসক, যিনি দোর্দন্ড প্রতাপে শাসনকার্য পরিচালনা করে ফ্রান্সের গৌরব ও খ্যাতি বৃদ্ধি করেছিলেন। ফ্রান্সের চির-প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড তাঁর ভয়ে সবসময় সন্ত্রস্ত থাকতো। কিন্তু এখন তা কেবলই দর্শনীয় স্থান হিসাবে দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষকে আকর্ষণ করে থাকে। প্রাসাদের সামনে বিশাল স্কয়ার। সেখানে নেপোলিয়ানের বিশাল ভাস্কর্য মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। দর্শকদের জন্যে তা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ফ্রান্স তার জাতীয় বীরের জন্য গর্ববোধ করে থাকে। তিনি তাঁর জীবনকালে বিভিন্ন ঐতিহাসিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে ফ্রান্সের জন্য যে গৌরব বয়ে এনেছিলেন, জাতি সে জন্য তাঁকে যথার্থ মর্যাদা দিয়ে থাকে।
বিকাল বেলা আমি একাকী ঘুরে ঘুরে শহর দেখতে বের হলাম। আমার প্যারিস সম্পর্কে কোনই ধারণা নেই, এখানকার রাস্তা-ঘাট বা দর্শনীয় স্থান সম্পর্কেও আমার কোন জ্ঞান নেই। শুধু এটুকু জানি যে, প্যারিস এক আশ্চর্য সুন্দর নগরী। সৌন্দর্যের জন্য তার সুখ্যাতি রয়েছে। পাশ্চাত্যের ‘সৌন্দর্য নগরী’ হিসাবে প্যারিস সুপরিচিত। আমি ঘুরে ঘুরে প্যারিসের এ সৌন্দর্য অন্বেষণ করতে লাগলাম। রাস্তা-ঘাট বেশ প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলো সুন্দর করে সাজানো। পণ্যদ্রব্যগুলো ক্রেতাদের জন্য এমনভাবে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে যে, তা সহজেই ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মডেলিং-এর প্রচলন খুব বেশী দেখলাম। অর্থাৎ বিক্রয়যোগ্য অধিকাংশ পণ্যই আকর্ষণীয় প্লাস্টিক মডেলের মাধ্যমে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফ্রান্সের লোকেরা খুবই আনন্দ-প্রিয়। বিকালের প্যারিস নগরী যেন নব-বধূর সাজে সজ্জিতা এক অপরূপ মোহনীয় সুন্দরী রমণী। প্যারিসবাসীরা যেন সবাই সন্ধ্যার আলো-আঁধারীতে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসে নগরীর বিভিন্ন রাস্তায় ও বিপণি কেন্দ্রে। সবাই থাকে আমুদে মেজাজে। অসংখ্য ফেরিওয়ালা নানা রং-বেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে বিভিন্ন পণ্যের ফেরী করে বেড়ায়। সৌখিন জাদুকরেরাও রাস্তায় নানা রকম জাদু প্রদর্শন করে থাকে। অনেকেই দেখলাম, নানা রকম নাচ-গানের আসর জমিয়ে বসেছে। নিয়ন আলোর স্নিগ্ধধারায় স্নাত সমগ্র প্যারিস নগরী যেন এক বিশাল রঙ্গ-মঞ্চ। রাতের প্যারিস নগরী যেন আনন্দ-স্ফূর্তিতে মত্ত হয়ে ওঠে। এভাবে আনন্দোচ্ছল পরিবেশে প্যারিস নগরী যেন এক সময় রাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
আমি ঘুরে ঘুরে সব দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে এবং পথচারীদের জিজ্ঞেস করতে করতে এক সময় এসে প্যারিসের সর্ববৃহৎ রেলস্টেশন GARE DU NORD NORTH STATION-এ উপনীত হলাম। লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি টিকিট কেটে পরবর্তী গাড়ির অপেক্ষায় স্টেশনের প্লাটফরমে একটি চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জানি না, হয়ত কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। ট্রেন আসার শোরগেনে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ৪৯১ নম্বর গাড়িটি এসে প্লাটফরমে ভিড়ল। আমি আস্তে আস্তে গিয়ে ট্রেনের একটি কামরায় ঢুকে আমার নির্দিষ্ট সিটে আসন গ্রহণ করলাম। রাত ১০:৪০ মিনিটে ট্রেন ছাড়ল। তারপর ক্যালাইস। এরপর ক্যালাইস থেকে জাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ডোভারে এসে পৌঁছলাম। ডোভার থেকে ট্রেনে লন্ডন পৌঁছলাম যখন তখন লন্ডনের সময় সকাল সোয়া নয়টা। সেদিনের তারিখটা ছিল ২৬ জুলাই। আমি ভিক্টোরিয়া স্টেশন থেকে লন্ডনে আমার অস্থায়ী ডেরায় ফিরে গেলাম।