প্রায় এক মাস ইউরোপ সফরের পর এবার দুবাই ফেরার পালা। ১৯৮৪ সনের ২৭ জুলাই আমার লন্ডনস্থ অস্থায়ী ডেরা ৭৫ নম্বর ফলকন রোড (Falcon Road) থেকে সকাল ৯.৪৫ মিনিটে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা হলাম। আমাকে ‘সী অফ’ করার জন্য আমার বন্ধু ও মেজবান মাওলানা হাফেজ নেছার উদ্দিন আহমদ ও তরুণ বন্ধু মুরশিদ আমার সাথে রওয়ানা হলেন আমাকে রেল স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। মুরশিদের সঙ্গে লন্ডনে এসেই আমার পরিচয়। সে লন্ডনের কোন এক কলেজে পড়াশোনা করে। পার্ট-টাইম কিছু একটা কাজও করে। সে থাকে ৭৫ নম্বর ফলকন রোডের ইসলামিক সেন্টারে। গত কয়েক দিনে তার সঙ্গে কিছুটা পরিচয় ও তা থেকে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। সে আমাকে যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা করতো। তাই আজ বিদায়ের দিন সেও বন্ধু নেছার উদ্দিনের সাথে এসেছে আমাকে বিদায় জানাতে।
আমরা তিনজনে অল্পক্ষণের মধ্যেই রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে ট্রেনে করে গ্যাটউইক (Gatwick) বিমান বন্দরে যেতে হবে। তারপর শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের প্লেনে জুরিখ হয়ে দুবাই পৌঁছানোর কথা। রেল স্টেশনে এসে বন্ধু নেছার উদ্দিন ও মুরশিদ আমাকে বিদায় জানিয়ে ঘরে ফিরে গেল। সে বিদায়ের মুহূর্তটি ছিল বেশ আবেগঘন। বিদায়ের ক্ষণগুলো সবসময় বুঝি এরকমই হয়ে থাকে। আমি ট্রেনে উঠে আমার নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করলাম। ট্রেন ছাড়লো সকাল ১০.১৫ মিনিটে। সেখান থেকে গ্যাটউইক (Gatwick) এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে আধ-ঘন্টা সময় লাগলো। তারপর কাউন্টারে গিয়ে ব্রিফিং সেরে প্লেনে গিয়ে আমার সিটে বসে পড়লাম। প্লেন ছাড়লো ১২.৪০ মিনিটে।
প্লেনে উঠে আমি বিগত কয়েকদিনের কথা চিন্তা করছিলাম। ফলকন রোডে আমরা কয়েকজন একসঙ্গে কয়েকদিন বসবাস করেছি। অল্প কয়েকদিনেই তাদের প্রতি একটা মহব্বত জন্মে গিয়েছিল। প্রবাসে তারাই ছিল আমার একান্ত আপনজন। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে এবং এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়ে সময়গুলো পার করে দিয়েছি। বন্ধু নেছার উদ্দিনের বাসায় কয়েকদিন দাওয়াতও খেয়েছি। তার বাসায় নিয়মিতই দাওয়াত থাকতো। কিন্তু আমার থাকার জায়গা থেকে তার বাসা একটু দূরে বলে আমি সবসময় সেখানে যেতে পারতাম না। ফলকন রোডের ইসলামিক সেন্টারে আমরা কয়েকজনে একসঙ্গে রান্না করে খেতাম। তাছাড়া, আমি প্রায় সময়ই শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতাম এবং লন্ডনের বাইরেও অনেকদিন থাকতে হয়েছে, তাই ঘরে আমার তেমন একটা খাবার সময়ও হতো না। তবু একসঙ্গে কয়েকদিন মিলেমিশে সময় কাটানোর ফলে একটা মহব্বতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আদর্শগত মিলের কারণে এ সম্পর্ক ছিল বেশ মজবুত।
বন্ধু নেছার উদ্দিন ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাশ করে তিনি মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর দ্বীনের দ’ায়ী হিসাবে লন্ডনে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। সৌদী আরবের ইসলামী দাওয়াহ বিভাগের টাকায় তিনি সেখানে অর্থাৎ ৭৫ নম্বর ফলকন রোডে একটি পরিত্যক্ত গীর্জা ক্রয় করে সেটাকে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে রূপান্তরিত করেন। এর মাধ্যমে তিনি এলাকার মুসলমান ছেলেমেয়েদেরকে আরবি ও দ্বীনী শিক্ষা প্রদানের জন্য ‘সানডে’ ক্লাসের ব্যবস্থা করেন। অমুসলমানদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করাও ছিল তার প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্মসূচি।
আমি যে ক’দিন সেখানে ছিলাম, সে ক’দিন বন্ধু নেছার উদ্দিন তথা ইসলামিক সেন্টারের কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যথাসম্ভব সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমার সেখানে অবস্থানকালে একজন খৃস্টান তরুণ ইসলাম গ্রহণ করে। আমি তাতে খুব উৎসাহবোধ করি। সে তরুণটি একদিন বন্ধু নেছার উদ্দিনকে তার বাসায় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যায় তার পরিবারের অন্যান্যদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আমি তার সাথে সেখানে গিয়েছিলাম বন্ধু নেছার উদ্দিনের অনুরোধে। সেখানে দ্বীন সম্পর্কে ছেলেটির পরিবারের সবার সাথে খোলামেলা আলাপ হল। দেখলাম, খৃস্টান হলেও নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই নেই। ইসলামের কথা শুনতে তাদের বেশ আগ্রহ দেখা গেল। একদিনে না হলেও বার বার দাওয়াত দিলে তারা একদিন ইসলাম গ্রহণ করবে বলেই আমার প্রতীতি জন্মালো।
বন্ধু নেছার উদ্দিন বললেন, লন্ডনে এরূপ বহু খৃস্টান পরিবার আছে যারা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। ধর্ম পালনেও তারা চরম উদাসীন। তারা কেউ কোনদিন গীর্জায় যাওয়ারও কোন প্রয়োজনবোধ করে না। ফলে এখানকার অধিকাংশ গীর্জাই অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। গীর্জার পাদ্রীরা নিজেদের চাকরি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে শুধু মাত্র রবিবারের দিন দু’চারজন ধর্মপ্রাণ খৃস্টানদের নিয়ে উপাসনার ব্যবস্থা করে গীর্জাগুলোকে কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছে। তারপরও অনেক গীর্জাই বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। এসব গীর্জা যথরীতি সাধারণ বাড়ি-ঘরের মতো বিক্রিও হচ্ছে। সেরকম একটি গীর্জাই বন্ধু নেছার উদ্দিন ক্রয় করে সেখানে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরকম আরো অনেক গীর্জাই বর্তমানে মসজিদ বা সাধারণ বাসস্থানে পরিণত হয়েছে।
তাই এরূপ ধর্মহীন তথা ধর্মের প্রতি উদাসীন একটি সমাজে ইসলাম ধর্ম প্রচারের একটা বিরাট সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া, ধর্মহীন-নৈতিকতাহীন খৃস্টান সমাজে আজ শান্তির নিদারুণ অভাব। সেখানে বিত্ত-বৈভব থাকলেও এবং বস্তুগতভাবে তারা উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হলেও মানসিক দিক দিয়ে অনেকইে বিপর্যস্ত। রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন, সামাজিক বিধি-বিধান ও শিক্ষা-ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সামগ্রিক জীবনায়নকে সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এজন্য চাই, এক সুন্দর সুসঙ্গত জীবন-ব্যবস্থা। এ ধরনের জীবন-ব্যবস্থার অভাবে ইউরোপে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অশান্তি বিরজমান।
এ অশান্তির কারণেই সেখানে মাদকাসক্তি, যৌন-উশৃংখলতা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, জারজ সন্তানের জন্ম, অভিভাবকহীন সন্তানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের একটি সমাজে ইসলামের মতো সুষ্ঠু-সুন্দর ও সর্বাঙ্গীন জীবন-ব্যবস্থার একান্ত প্রয়োজন। শান্তি সবার কাম্য। নৈরাজ্যপূর্ণ সামাজিক অবস্থা থেকে মানুষ স্বভাবতই নি®কৃতি চায়। এ অবস্থায় ইসলামের দাওয়াত সেখানে যথাযথভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা হলে গোটা ইউরোপের সমাজ অচিরেই পাল্টে যেতে পারে। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন এ কাজ ধীরে ধীরে চালিয়ে যাচ্ছে এবং তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। গোটা ইউরোপে আজ ইসলাম এক শক্তিশালী আদর্শ হিসাবে বিবেচিত এবং সেখানে মুসলমানরা বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার অবস্থাও তাই। ফলে পাশ্চাত্য আজ দ্রুত প্রসারমান ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত। এ কারণে তারা ইসলামের প্রসার-প্রচারকে প্রতিরোধ করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির অবলম্বনে তৎপর।
এভাবে চিন্তা করতে করতে এক সময় সুইজারল্যান্ডের জুরিখ এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। তখন আমার ঘড়িতে বিকাল ২টা বাজে। মূলত পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার সুইজারল্যান্ডেও বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। দুবাই থেকে সুইজারল্যান্ডের ভিসাও সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু ঐ সময় ফ্রান্সের ভিসা না পাওয়ায় আমার রুট-প্ল্যান পরিবর্তন করতে হয় এবং পরিবর্তিত প্ল্যানে সুজারল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিল না। পরবর্তীতে ফ্রান্সের ভিসা পেয়ে সেখানে সফর করে এলেও সুইজারল্যান্ডে যাওয়া ছিল সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার। এদিকে আমার ছুটিও শেষ হয়ে আসছে। তাই বাধ্য হয়ে সুইজারল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করে আমি সরাসরি দুবাই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।
জুরিখ এয়ারপোর্টে প্লেনে এক ঘন্টা দশ মিনিট অপেক্ষার পর প্লেন আবার আকাশের দিকে উড়াল দিল। দীর্ঘ ছয় ঘন্টা অবিরাম পথ চলতে হবে আকাশে। তারপর দুবাই। শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের বিশালাকার প্লেনটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিল। প্লেনে বিভিন্ন দেশের মানুষ, কিন্তু কারো সাথেই আমার কোন পরিচয় ছিল না। কথা বলার কেউ নেই, দীর্ঘ ক্লান্তিকর আকাশ-যাত্রা। আমি বড় অস্বস্তিবোধ করছিলাম। এ অস্বস্তি আরো বেড়ে গেল, খাবার-দাবারের বিষয় নিয়ে। আমি নিরামিষ অথবা মাছ-ভাতের অর্ডার দিলাম। কিছুক্ষণ পর জনৈক বিমানবালা এসে আমাকে জানালো যে, আমার অর্ডারকৃত কোন ম্যানু তাদের কাছে নেই। তখন আমি ভাতের সাথে অমলেট দিতে বললাম আমাকে। কিছুক্ষণ পর বিমানবালা আবার এসে আমাকে জানালো যে, অমলেট বা আন্ডাও নেই তাদের কাছে। আমি বেশ মেজাজ দেখালাম তাকে। বললাম, তোমাদের ইনচার্জকে ডেকে দাও।
ইনচার্জ এলে আমি তাকে আমার সমস্যার কথা জানালাম। কিন্তু সে কোন সমাধানই দিতে পারল না। বরং আমাকে বুঝাতে লাগলো যে, তাদের রান্না করা চিকেন, মাটন, বীফ ইত্যাদি তরকারী খুব উন্নত মানের। আপনি খেয়ে দেখতে পারেন। আমি বললাম, ওগুলো আমার খাওয়া চলবে না। সে বলল, আপনি কি নিরামিষভোজী ? আমি বললাম, না। সে বলল, তাহলে আর আপত্তি কিসের? আমি বললাম, আপত্তি হলো হালাল-হারামের বিষয় নিয়ে। আমি মুসলমান তাই আমার খাদ্য হালাল কিনা আমাকে তা বিবেচনা করতে হয়। সে বলল, প্লেনে অনেক মুসলিম আরোহী আছে তারা কেউ এ ব্যাপারে কোন আপত্তি তোলে নি। আমি বললাম, তাদের কথা আমি জানি না। তবে আমাকে অবশ্যই হালাল-হারাম বিবেচনা করে চলতে হয়। এরপর আমি খুব শক্তভাবে তার কাছে অভিযোগ করে বললাম যে, ভবিষ্যতে তোমাদেরকে অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। কেননা, এটা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এখানে বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা যাতায়াত করে থাকে। সব আরোহীর প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী তোমাদেরকে সেবা দানের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রসঙ্গত আমি তাকে আমার দুবাই-লন্ডন রুটের সফর অভিজ্ঞতার কথাও বললাম। সেখানে এক গ্লাস পানি চেয়েও আমি পাইনি। অথচ, মদের ছড়াছড়ি ছিল। চাওয়া মাত্র বিয়ার এনে হাজির করা হতো। কিন্তু বার বার চেয়েও আমাকে এক গ্লাস পানি দিতে পারে নি কেউ। ইনচার্জ আমাকে বলল, এসব অভিযোগ লিখিতভাবে জানাতে। আমি তার কাছ থেকে অভিযোগ-খাতা নিয়ে আমার সব কথা লিখে দিলাম।
সারা পথ আমি না খেয়ে বেশ কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আমার তৃপ্তি ওখানেই যে, আমি অন্তত আমার ঈমান রক্ষা করতে পেরেছি এবং পৃথিবীর দেড়’শ কোটি মুসলমানের পক্ষ থেকে তাদের একটি ন্যায্য শরীয়তি দাবীর বিষয় লিখিতভাবে একটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের নিকট রেকর্ডভুক্ত করতে পেরেছি। এভাবে একটা অসহনীয় কষ্ট ও অস্বস্তির মধ্য দিয়ে আমার দীর্ঘ ছয় ঘন্টা পথযাত্রা শেষ করে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। তখন দুবাই সময় হলো দুপুর সোয়া বারটা।